Sunday, June 27, 2021

মনু মুখোপাধ্যায়ঃ স্মরণে ও শ্রদ্ধায়


'মছলিবাবা'র চেয়ে কোনো অংশে কম যান না 'গোবিন্দ অপয়া'। বরং মনে করি অনেকাংশে টেক্কাও দিয়েছেন তিনি।

গোবিন্দ বিশ্বাস ওরফে গোবিন্দ অপয়া। 

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'পাতালঘরে'র অবিশ্বাস্য সেই চরিত্র। সকাল সকাল যার মুখ দেখলে কপাল পুড়তে বাধ্য৷ বিপদ অবশ্যম্ভাবী। আর সেই চরিত্রেই বাজিমাৎ করেছিলেন মনু মুখার্জি। 

১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের 'জয় বাবা ফেলুনাথ'। 'মছলিবাবা'র চরিত্রে মনু মুখোপাধ্যায় অদ্বিতীয়। সংলাপ সে অর্থে ছিল না কিছুই। রেবা মুহুরির কণ্ঠে "মোহে লাগি লগন গুরু" ভজন শুনতে শুনতে মাথা নাড়ানো। তার পর চোখ বড় বড় করে "এক হী ব্রহ্মা, এক হী সূর্য, এক হী চন্দ্র মা"... যার ডায়লগ থ্রোয়িং শুনে জটায়ু সভয়ে বলেছিলেন - "গায়ে কাঁটা দিচ্ছে মশাই...গ্রেট পার্সোনালিটি!" 


সত্যজিৎ ও মনু মুখার্জির যুগলবন্দীতে 'মছলিবাবা' অমরত্ব পেয়েছেন। বাঙালি কোনোদিন তাকে ভুলবে না। 'বোলো বোলো মছলিবাবা কী...'!

সাল ২০০৩। 'জয় বাবা ফেলুনাথে'র প্রায় ২৫ বছর পর মুক্তি পেয়েছিল অভিজিৎ চৌধুরীর 'পাতালঘর'। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে। ছোটদের সিনেমা নিয়ে আমার দেখা অন্যতম সেরা কাজ৷ অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মিতা বশিষ্ঠ, রমাপ্রসাদ বণিক, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কেতকী দত্ত, সুনীল মুখার্জি, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, সৌরভ ব্যানার্জি এবং 

'গোবিন্দ অপয়া'র চরিত্রে মনু মুখোপাধ্যায়।

পার্শ্বচরিত্র কী ভাবে কাহিনির মূলচরিত্র'দের ছাপিয়ে যায় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল 'পাতালঘর'। আর 'মেথড" অভিনয়ের মুনশিয়ানা কোন উচ্চতায় যেতে পারে তা আরও একবার প্রমাণ দিয়েছিলেন মনু বাবু। যারা 'পাতালঘর' দেখেছেন 'গোবিন্দ অপয়া' চরিত্র'টিকে ভুলতে পেরেছেন বলে তো মনে হয় না। আর যদি ভোলেন, 'মছলিবাবা'র কসম, গোবিন্দ অপয়ার 'শকুনদৃষ্টি' তাঁদের উপর পড়বেই, তা এই বেলা বলে রাখলুম...

'পাতালঘর'-এর আরও একটি সম্পদ এই ছবির গান ও আবহ। গীতিকার রঙ্গন চক্রবর্তী। সংগীত পরিচালনায় দেবজ্যোতি মিশ্র, আমাদের দেবুদা। 

আজও মনে করি দেবুদার অন্যতম সেরা ১০ টি কাজের মধ্যে থাকবে 'পাতালঘর'। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক হোক ভারতীয় মার্গ সংগীত, লোকসংগীত হোক বা কীর্তন...বাংলা সিনেমা সংগীতে এমন অসাধারণ মেলবন্ধন সত্যিই 'বিরল'! 

'পাতালঘরে'র প্রতিটি গানই অনবদ্য। তবে আমার অলটাইম ফেভারিট স্বপন বসুর কণ্ঠে মনু মুখার্জির লিপে - "তুমি কাশী যেতে পারো যেতে পারো গয়া/ পাবে না এমন দ্বিতীয় অপয়া!" কীর্তনাঙ্গে গাঁথা সেই গানে মনু বাবুর নাচ, এক্সপ্রেশন, টাইমিং...আহা অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। 

আজ মনুবাবুর প্রয়াণের সাথেসাথেই শেষ হল বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী অধ্যায়ের। সত্যিই শেষ কী? নাকি পুনর্জাগরণ? শুরুর শুরু? 

মনু মুখোপাধ্যায়ের ক্ষয় হতে পারে। 
কিন্তু 'মছলিবাবা' বা 'গোবিন্দ অপয়া'র ক্ষয় নেই। 
তাঁরা অমর, চিরশাশ্বত। 


অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীঃ স্মরণে ও শ্রদ্ধায়


২০০৮-০৯ সাল৷ তখন যাদবপুরে৷ ওয়ার্ল্ডভিউ'তে। 

কাজ বলতে সপ্তাহের পাঁচদিন বুকস্টোর সামলানো। আর সপ্তাহান্তে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া অজানা কোনো গ্রাম, নাম না জনপদে লোকগানের সন্ধানে৷

সাথে থাকতো ডায়েরি, কলম, রেকর্ডার, ক্যামেরা, জলের বোতল এবং সুধীর বাবু বা শক্তিনাথ বাবুর  লেখা কোনো বই। অব্যর্থ গাইডবুক হিসেবে। 

সেবার এসেছি কৃষ্ণনগর। আমি আর সাথে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সোহম, সোহম দাশগুপ্ত। আমার সব গবেষণার বিষয়ে সঙ্গী, ভ্রাতৃপ্রতিম সুজন চাটুজ্যের বাড়ি ওখানে। ওখানেই বাড়ি বন্ধু অভিনন্দনদত্ত, অয়ন দত্তের। তাঁরাও সবাই জুটলো একে একে। 

আমাদের গন্তব্য চাপড়া। পবিত্র বড়দিন উপলক্ষে খ্রীষ্ট-বাউলদের জমায়েত ও আখড়ায়। সুধীর বাবুর একটি লেখা থেকেই হদিশ পাওয়া। এমন একটি সম্প্রদায় যে আছে, তাই জানতাম না। তাঁদের ধর্ম, জীবনদর্শন, সংগীত, তথাকথিত বাউলদের সাথে তাঁদের মিল-অমিল ও লোকায়ত ভাবধারা তখন আমাদের গবেষণার বিষয়। তাই কৃষ্ণনগর...

কলকাতা ছাড়ার আগেই ওঁনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। এক নয়, একাধিক বার৷ যেদিন আসব, তার আগের দিন - "আসছো? বাহহ, ভালো কথা। দেখা করো।" সে আর বলতে! কৃষ্ণনগর যাচ্ছি আর সুধীরবাবুর সাথে দেখা করবো না, তা কী হয়? সে ভাবেই হল সব বন্দোবস্ত। 

যথা সময়ে পৌঁছলাম কৃষ্ণনগর। জলঙ্গীর ধারে পানুবাবুর লজে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুজন, অয়ন। অয়নের বাবা অঞ্চলের শ্রদ্ধেয় নেতা গৌরীশঙ্কর (দত্ত) কাকুর লাইব্রেরি এখনো ভুলিনি৷ ভুলিনি আমার এই দুই বন্ধুর বাড়িতে কাটানো কিছু অসাধারণ মুহূর্ত। সেই আন্তরিকতা, ভালোবাসা ভোলার নয়৷ 

চাপড়ায় রওনা হওয়ার আগের দিন রাতে চার মক্কেল হাজির হয়েছিলাম সুধীরবাবুর বাড়ি৷ সেই সুধীরবাবু, শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তী। এতদিন শুধুই তাঁর লেখাই পড়েছি, হয়েছে ফোনে কথা। এবার মুখোমুখি হওয়া "বাংলার গৌণধর্ম", "দেহতত্ত্বের গান", "জনপদাবলি", "গভীর নির্জন পথে" তথা "বাউল ফকির কথা" র লেখকের সঙ্গে।

সেই রাতটি আজও ভুলিনি। মোটা ফ্রেমের, ফর্সা, রাশভারি চেহারার মহাপণ্ডিত মানুষটির মুখোমুখি আমরা চার নভিশ। অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছিলেন গবেষণার কথা, লোকায়ত দর্শন, সংগীত নিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত চর্চার কথা। দিয়েছিলেন পথের হদিশ৷ বলেছিলেন - "সব রেকর্ড করে নিও। ভালো ভাবে কাজ করো।" 

পরের দিন হাজির হয়েছিলাম চাপড়ায়। সাক্ষী থেকেছিলাম খ্রীষ্ট মেলা ও খ্রীষ্ট বাউলদের সংগীত যাপনের। অবাক হয়েছিলাম চাপড়ার প্রাচীন চার্চ ও গোরস্থান দেখে। সুধীরবাবুর নির্দেশ মেনেই দেখা করেছিলাম খ্রীষ্ট বাউল সম্প্রদায়ের অন্যতম বাউল স্যামুয়েল মণ্ডলের সাথে৷ শুনেছিলাম গান ও তাঁদের জীবন যাপনের অলৌকিক আখ্যান। সুধীরবাবু পথ না দেখালে তা কতটা সম্ভব হতো জানা নেই। 

পরবর্তী কালে বেশ কয়েকবার কথাও হয় সুধীর বাবুর সঙ্গে। খ্রীষ্ট-বাউলদের নিয়ে আমার আর্টিকেল পড়ে খুশি হয়েছিলেন। চেস্টারে পিএইচডি-র জন্য বাংলার খ্রীস্ট বাউল'দের গবেষণার কাজ হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা শুনে, মনে আছে ফোনে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন - "ভালো করে কাজ করো৷ কিছু দরকার হলে বলো।" আজ সে সব অতীত। 

সুধীর চক্রবর্তীর প্রয়াণের সাথেসাথে বাংলার গান ও লোকায়ত সংগীত বিষয়ক গবেষণার জগতে নিঃসন্দেহে এক যুগের অবসান হল। সংগীত সহ লোকধর্ম, নিম্নবর্গের সংস্কৃতি, দেশজ শিল্পকলা ও সাহিত্য-শিক্ষা জগতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। শুধু পাণ্ডিত্যের প্রতিফলনই নয়, আমাদের মতো বর্তমান প্রজন্মের কাছে যথাযথ 'মাস্টারমশাই' হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷ চিনিয়ে ছিলেন প্রত্ন সংগীতের লোকজ রূপ, মাটির সুরে মিশে থাকা গ্রাম্য জীবন দর্শনের অপাপবিদ্ধ আলো। 

সেদিন কৃষ্ণনগর যাওয়ার সময়ে ব্যাগে ছিল তাঁরই লেখা বই। "ব্রাত্য লোকায়ত লালন"। ভেবে ছিলাম যদি একটা অটোগ্রাফ দেন...কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। কথায় মাঝে হারিয়ে গেছিল সময়। আজ তাঁরই সেই বইয়ের পাতা ওল্টাতে গিয়ে চোখ পড়ে গেল উৎসর্গ পত্রে লেখা দুটি লাইন - 

"যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে 
তখন ভাবের খেলা ভেঙে যাবে।" 

শব্দ-নৈঃশব্দ্যের পাড়ে যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন 'মাস্টারমশাই'! 

Sunday, June 13, 2021

তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়ঃ তসাওয়ার খানুমের সফর


দিন দুয়েক আগের খবর। 

নিউজে শুনলাম রাহুল রয়, নয়ের দশকে বলিউডের ডাকসাইটে অভিনেতা কার্গিলে শুটিং করতে গিয়ে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। নানাবতী'তে ভর্তি, আইসিইউ-তে। 

রীতিমতো মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই অভিশপ্ত বছর, ভারি অলুক্ষুনে সময়। কতশত প্রিয় মানুষ অসময়ে পাড়ি দিচ্ছেন না-ফেরার দেশে। সেই তালিকায় বুঝি যুক্ত হলেন রাহুলও। আমার একলা দোকলা ছেলেবেলার একসময়ের প্রিয় নায়ক তিনি। 

রাহুল মানেই আমার কাছে 'জুনুন' (১৯৯২) 'ফির তেরি কহানী ইয়াদ আয়ি' (১৯৯৩) বা 'প্যায়ার কা সায়া' (১৯৯১) আর অতি অবশ্যই মহেশ ভাটের 'আশিকী'র মত সিনেমাগুলি। অদ্ভুত ভালো লাগতো তাঁর হেয়ার স্টাইল। রবিবার প্রভাত'দার দোকানে চুল কাঁটতে গিয়ে বলেছি "আশিকী কাট করে দাও"। প্রভাত'দা হাসতে হাসতে বাটি ছাঁট মেরে ছেড়ে দিয়েছে।  

কী অসাধারণ ছিল 'আশিকী'র (১৯৯০) গানগুলি। আহা, নাদিম-শ্রবণের সুরে সমীরের লেখা অসামান্য সব গানগুলি গেয়ে ইতিহাস রচেছিলেন কেদারনাথ ভট্টাচার্য ওরফে কুমার শানু। তার 'ফিমেল ভার্সানে' কোনও অংশে কম যাননি অনুরাধা পোড়ওয়াল'ও।  

'আশিকী'র একডজন গানের মধ্যে প্রায় সবকটিই হিট। প্রতিটি গানই সুরে, কথায়, গায়নে অনবদ্য। তিরিশ বছর পেরিয়ে এসে আজও তার রেশ রয়ে গেছে। বলিউডের অন্যতম সেরা কম্পোজিশন। ২ কোটির উপর 'আশিকী'র ক্যাসেট বিক্রি হয়েছিল সেই সময়। আজও সেই রেকর্ড অক্ষত। 


অথচ খুব কম মানুষই জানেন যে এর অধিকাংশ গান-ই ছিল সাতের দশকের পাকিস্তানি গজল ও কাওয়ালি অনুপ্রাণিত। ইচ্ছে করেই 'কপি' শব্দটি উল্লেখ করলাম না৷ কারণ মূল গানের সুর ও কথার বিস্তর প্রভাব থাকলেও, এর রিমেক ভার্সানগুলিও গুণগত মানে কোনো অংশে কম ছিল না। 

তেমনই একটি অত্যন্ত প্রিয় গান ছিল "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"। সত্তরের দশকে অপূর্ব এই গজলটি গেয়েছিলেন বিখ্যাত পাকিস্তানি গায়িকা তসাওয়ার খানুম। মূল গানটির রচনাকার তসলিম ফজলি ও সুর দেন ললিউডের কিংবদন্তি সুরকার নাসাদ। 

তসাওয়ার খানুমের জন্ম পাক গুজরাটে, ১৯৫০ সালে। তসাওয়ারের তালিম বিখ্যাত গায়ক পরভেজ মেহেদীর কাছে। পরে প্রথিতযশা সারেঙ্গী বাদক উস্তাদ বুটা আলী খানের কাছেও তালিম নেন তিনি। অল্প বয়সেই পাক টেলিভিশন ও রেডিও'তে গজল গাওয়া শুরু করেন তসাওয়ার। এরপর সরাসরি নেমে পড়েন প্লে ব্যাকে। 

পঞ্চাশ বছরের কেরিয়ারে অসংখ্য হিট গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর নাম চিরতরে জুড়ে যায় "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"-র সাথে। ১৯৭৭ এ আমীর আলী শাহ নির্দেশিত "মহব্বত মর নেহি সকতি" সিনেমাটি'তে পুনরায় এই গানটি শোনা যায় মেহেদি হাসান, নূরজাহানের কণ্ঠে। কিন্তু তসাওয়ারের 'উচ্চতা' অন্তত এই গানে স্পর্শ করতে পারেননি তাঁরা, এমনটাই মনে করে থাকেন গুণীজনেরা। 

১৯৯০ তে সেই বিখ্যাত গজলটিকেই নতুন আঙ্গিকে নিয়ে এলেন নাদিম-শ্রবণ। নতুন করে তাকে শব্দের মোড়কে মুড়লেন গীতিকার সমীর। বাকি ইতিহাস গড়ে দিলেন কুমার শানু। রাহুল রয় অভিনীত "আশিকী"কে নতুন উচ্চতা দিয়েছিল কাওয়ালী অঙ্গের এই গানটি। 

খবর পেলাম সুস্থ হয়ে উঠছেন রাহুল। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। তিনি দ্রুত আরোগ্য লাভ করুন এই প্রার্থনা করি। আর একই সাথে আবারও ফিরে যাই কিন্নরকণ্ঠি তসাওয়ার খানুমের কাছে। 

কুমার শানু এই গানটি যতই অসাধারণ গান না কেন, কিন্তু তসাওয়ারের কণ্ঠমাধুর্য ও অভাবনীয় সেই স্বর্গীয় আকুতির তল পাওয়া দুস্কর। কারণ আজও তামাম সঙ্গীতরসিক মানুষের কাছে "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়" মানেই তসাওয়ার খানুম। 

গান ও গায়িকা, এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে একে অন্যের সাথে...আজও তা অবিচ্ছেদ্য! 

"মেরি দিল মে তু হি তু হ্যায় / তেরি রোশনী হ্যায়..."

Wednesday, June 9, 2021

ব্যোমকেশ ধ্বনিঃ এক অপার্থিব যুগলবন্দী


'I have had a dream to try to combine Western and Indian music into a new form, a music which has no particular name but is melodious and touching...' 

- Ananda Shankar, Sitar Virtuoso 

সেলুলয়েডে যে কোন চরিত্র, প্লট বা বিষয়কেন্দ্রীক রূপায়নে 'থিম' বা আবহ সঙ্গীতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রথমসারির চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সঙ্গীত পরিচালকেরা দীর্ঘদিন ধরে থিম নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এসেছেন। রেখেছেন 'থিম' নির্মাণে নিজস্ব মুনশিয়ানার স্বতন্ত্র ছাপ। 

উদাহরণ স্বরূপ প্রথমেই যার নাম মনে আসে তিনি সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের ফেলুদা থিম আমাদের অতি পরিচিত, রোমাঞ্চ ও ভালোলাগার বিষয়। এই থিমটিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা 'থিম' সংগীত রূপেও মনে করা হয়। ম্যোৎসার্টের সিম্ফনি নং ২৫ এর বিস্তর প্রভাব পাওয়া যায় মানিকবাবুর রচনায়। সঙ্গীতজ্ঞ'দের একাংশ মনে করে থাকেন, প্রাশ্চাত্য সঙ্গীতের উচ্চমানের সমঝদার ছিলেন মানিকবাবু। তাঁর 'কম্পোজিশনে' বারংবার ঘুরে ফিরে এসেছে বাখ, ম্যোৎসার্ট, বিঠোফেনের ছায়া। এসেছে লোক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রয়োগও। থিম মিউজিক কিম্বা আবহ নিয়ে সত্যজিতের চিন্তাভাবনা, প্রয়োগ এবং দর্শন যে কোন মার্গে উন্নীত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।  

১৯৬৭ তে প্রকাশ্যে আসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের প্রথম ও উত্তম কুমার অভিনীত সত্যজিৎ রায়ের 'চিড়িয়াখানা'।  ১৯৭৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিতের 'সোনার কেল্লা'। সেই একই সালে মুক্তি পেয়েছিল মঞ্জু দে অভিনীত ও পরিচালিত 'শজারুর কাঁটা'। সতীন্দ্র ভট্টাচার্য হয়েছিলেন ব্যোমকেশ, অজিত শৈলেন মুখার্জি যিনি 'চিড়িয়াখানা'তেও অজিত হয়েছেন। পাঁচ বছর পর ৭৯' সালে তার সিক্যুয়ল 'জয়বাবা ফেলুনাথ'। এর পাক্কা ১৪ বছর পর ৯৩' সালে দূরদর্শনে প্রচারিত হয় সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জি'র এপিক হিন্দি সিরিয়াল - 'ব্যোমকেশ বক্সী'। কথা-সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্রটিকে প্রথম প্রাদেশিকতার গণ্ডী উত্তীর্ণ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। ১৯৯৩-৯৭ সালের মধ্যে দূরদর্শনের হাত ধরে বাংলা  তথা বাংলার বাইরে তথাকথিত গোয়েন্দা চরিত্রটি তুলে ধরা সহজসাধ্য ছিল না। সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। তাঁর হাত ধরেই প্রথম ব্যোমকেশ বক্সীকে চিনেছিল গোটা দেশ। বাংলা সহ অবাঙালি মহলে কি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায় বাসুবাবুর 'ব্যোমকেশ বক্সী', তা সর্বজনবিদিত। ব্যোমকেশের চরিত্রে রজিত কাপুর, অজিত কে কে রায়না ও সত্যবতীর চরিত্রে সুকন্যা কুলকার্নির সে অসাধারণ অভিনয়, গল্পের পাতা থেকে যেন উঠে এসে চরিত্রগুলির সার্থকতা লিখে দিয়ে গেছিল। পাশাপাশি উৎপল দত্ত (সীমন্ত হীরা) এবং রবি ঘোষের (অমৃতের মৃত্যু) মত বরেন্য অভিনেতাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল এই সিরিজ। 


এরপর আদিগঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে বহু জল। মুড়ি মুরকির মত নির্মিত হয়েছে ব্যোমকেশ-কে নিয়ে অগুনতি সিনেমা, সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ তথা রেডিও ড্রামা ইত্যাদি ইত্যাদি। গুণগত মানে তার অনেকগুলি খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পেলেও, নয়ের দশকে নির্মিত সেই হিন্দি টেলি-সিরিজের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, সবদিক মিলিয়েই। হিন্দি বলয়ে 'ব্যোমকেশ বক্সী'কে নিয়ে চর্চা করার আর একবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন আরেক তরুণ বাঙালি পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জি তাঁর নির্মিত 'ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী' (২০১৫) সিনেমাটির মাধ্যমে। সিনেমাটি তেমন না চললেও গবেষক ও বিদ্দ্বজ্জন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। হিন্দি বলয়ে বাঙালি ডিটেকটিভ ফেলুদা চরিত্র'টিকে প্রতিষ্ঠিত করার দুঃসাহসিক চেষ্টা করেছিলেন সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়। শশী কাপুর ও মোহন আগাশে'কে নিয়ে হিন্দি টেলি সিরিয়াল 'কিসসা কাটমান্ডু কা', আশির দশকের শেষার্ধে। অবাঙালি মহল তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও, বাঙালি দর্শক তা খারিজ করে দিয়েছিল একেবারেই। 

ফিরে আসি 'থিমে'র প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রে গোয়েন্দা কাহিনিতে 'থিমে'র একটি বিশেষ অবস্থান আছে বলে আমার মনে হয়। সত্যজিতের ফেলুদা থিমের সূত্র ধরে যদি আমরা দেখি, তবে কিন্তু উঠে আসবে বহু দৃষ্টান্ত। হলিউডে 'জেমস বন্ড' মুভিজে ব্যবহৃত বিখ্যাত সেই 'থিমে'র কথা মনে করুন। পাঁচ পাঁচটি অস্কার জয়ী বিখ্যাত মার্কিন কম্পোজার জন ব্যারি (১৯৩৩-২০১১) ছিলেন তার সুর রচয়িতা। পরবর্তী কালে ডেভিড আর্নল্ড, জর্জ মার্টিন সহ থমাস এম নিউম্যান, মাইকেল কামেন বা হ্যান্স জিমারের মত প্রথিতযশা সুরকারেরা ব্যারির সেই 'ঐতিহ্য'ই বহন করে চলেছেন। 

আশির দশকের শেষে আগাথা ক্রিস্টির এরক্যুল পয়রো টেলি সিরিজের সেই অসামান্য মেলোডিক স্যাক্সোফনিক 'থিম' আমরা কেউই ভুলিনি। ব্রিটিশ কম্পোজার ক্রিস্টোফার গানিং ছিলেন তার অমর স্রষ্টা। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অমর সৃষ্টি শার্লক হোমস সিরিজের সেই 'থিম' বানিয়ে তাকে রাতারাতি দর্শকের মনের কাছাকাছি এনে ছিলেন ডেভিড আর্নল্ড, মাইকেল প্রাইস ও পরবর্তী কালে হ্যান্স জিমার। এই তালিকা যথেষ্ট দীর্ঘায়িত। 

মজার বিষয়, আজ যখন পিছনে ফিরে অসামান্য এই ডিটেকটিভস 'থিম'গুলিকে শুনি, অদ্ভুতভাবে চোখে পড়ে ব্যোমকেশ বক্সীর সেই অনন্যসাধারণ থিম মিউজিক বা সিগনেচার টিউন'টির কথা। যার কথা নিয়ে তেমন আলোচনা চোখেই পড়েনা। বাসু চ্যাটার্জি'র হিন্দি টেলি সিরিয়ল ব্যোমকেশ বক্সীর সেই 'থিম' উৎকর্ষতার নিরিখে অনায়াসেই কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাতে পারে ফেলুদা, হোমস, বণ্ড বা পয়রো সিরিজের বিখ্যাত সেই সিগনেচার টিউন বা থিম গুলিকে। 'ব্যোমকেশ বক্সী-র সেই অসাধারণ থিম'টি বানিয়েছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক আনন্দশঙ্কর। ভারতীয় টেলি সোপ ইতিহাসে অন্যতম সেরা 'সিগনেচার টিউন'টি আজও বিশেষ  সমাদৃত। 

১১ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে আলমোড়ায় জন্ম নেন আনন্দ শঙ্কর। বাবা-মা কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর ও অমলা শঙ্কর। কাকা আরেক কিংবদন্তি সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ছোটবেলা থেকেই সেতারের প্রতি ঝোঁক থাকলেও, মজার ব্যাপার, বিশ্ববিখ্যাত কাকার কাছে কখনো তালিম নেননি আনন্দ। পরবর্তী কালে সম্ভাবনা থাকলেও যাননি কোন অযাচিত প্রতিযোগীতায়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মহাপণ্ডিত, শিক্ষক, সেতারি এবং বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক গুরু লালমনি মিশ্রের কাছে তালিম নেন আনন্দ। মার্গ সঙ্গীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্য সঙ্গীত, বিশেষ করে ক্ল্যাসিকল ও আধুনিক রকের প্রতি সমান আকৃষ্ট হন তিনি। 'ফিউশনে'র প্রতি বরাবর ছিল তাঁর মুনশিয়ানা। সেই আগ্রহ যথার্থ রূপ পায় ষাটের দশকে আনন্দ শঙ্করের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জিমি হেন্ড্রিক্স সহ বহু প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে তিনি পারফর্ম করেন। শুরু হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়ে তাঁর অসাধারণ সব 'এক্সপেরিমেন্ট'। উঠে আসে 'Jumping Jack Flash' বা 'Light my Fire' এর মত কম্পোজিশন। ১৯৭৫'র মাঝামাঝি দেশে ফিরে নতুন করে গবেষণায় মাতেন আনন্দ।  সেতারের মূর্চ্ছনার সঙ্গে অবলীলায় মিশতে থাকে ওয়েস্টার্ন রক গিটার, স্যাক্সোফোন, ড্রামস, বাঁশী, সিন্থেসাইজার। ১৯৭৮-৯৮ সাল, কুড়ি বছরের মধ্যে 'ফিউশন মিউজিকে'র নয়া দিগন্ত খুলে দিয়েছেন আনন্দ। ফলস্বরূপ, সৃষ্টি হয় 'India Remembers Elvis', 'A Musical Discovery of India', 'Missing You' বা 'Sa Re Ga Machan' এর মত অসাধারণ সব কম্পোজিশন। পরবর্তী কালে 'Streets of Calcutta', 'Indra Sabha', 'The River', 'Snow Flower', 'Dancing Drums' বা 'Walking On'-র মত রচনা তাকে খ্যাতির শীর্ষে তোলে। ১৯৯৯-এর ২৬ মার্চ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত তাঁর নির্দেশিত পথে বিশ্ব সঙ্গীতকে আরও কতভাবে সমৃদ্ধ করতো তা সত্যি কল্পনাতীত। 


নয়ের দশকে বাসু চ্যাটার্জির অনুরোধে 'ব্যোমকেশ বক্সী'র টাইটেল ট্র‍্যাকের জন্য সুর দেন তিনি। বাসু চেয়েছিলেন সেই সুরে যেন আধুনিকতার ছোঁয়া ও টানটান রোমাঞ্চের সাথে মিশে থাকে বাঙালিয়ানা। তাই করেছিলেন আনন্দ। ব্যোমকেশ বক্সীর ট্র‍্যাকে সেতারের মূর্চ্ছনা, সরোদের রহস্যাবৃত মন্দ্র স্বরের পাশাপাশি শ্রীখোলের অসাধারণ ট্রিটমেন্ট আজও অবিস্মরণীয়। পাশাপাশি ব্যবহার হয় সিন্থ-ডেলিক টিউন। তৈরি হয় ইতিহাস। সত্যজিতের ফেলুদার থিমের পাশাপাশি আনন্দ শঙ্করের ব্যোমকেশ ধ্বনি সিগনেচার টিউন বা থিম মিউজিকে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সোয়া এক মিনিটের সেই টাইটেল ট্যাক আজকের ভারতীয় দর্শকদের এক নিমেষে মথিত, রোমাঞ্চিত, নস্ট্যালজিক করে তোলে। 

সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জির স্মৃতির পথে হেঁটে আরও এক প্রথিতযশা সুরকার, সেতারবাদক ও বিশ্ব সঙ্গীতের কীর্তিমান সাধক আনন্দ শঙ্করের সাঙ্গীতিক অবদানের কথা তুলে ধরার একটাই উদ্দেশ্য - আমরা যেন সেই সব অতুলনীয় কীর্তির কথা বিস্মৃত না হই। সেই 'আনন্দ' ধ্বনি দশকের পর দশক এভাবেই আমাদের অনুপ্রাণিত করুক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে উঠে আসা অনাবিল সুরের ঝরনাধারায়... 

বেদেনী বাঁশির সুরেঃ দুই বাংলার সুরেলা সফর


লম্বা বেণী, কাঁখে কলসি, পাছাপেড়ে হলুদ শাড়ি পড়া মেয়েটি জিভ ভেঙিয়ে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। টকটকে লাল রঙের ব্যাণ্ডমাস্টারের পোশাকে পড়া নায়ক তাল গাছে পিঠ ঠেকিয়ে, তেমনি লাল রঙা বাঁশিতে তুলছে সুর। গাইছে গান - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে / আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়েছে"। 

আশি-নব্বইয়ের দশক হোক বা একুশ শতক, এই গান শোনেনি বা এই গানের কথা জানে না এমন বাঙালি 'বিরল'। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল তোজাম্মেল হক বকুলে'র ম্যাগনাম ওপাস 'বেদের মেয়ে জোসনা'। ছবির নায়ক ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জু ঘোষ। কিছু কিছু সিনেমার শুধু নাম-ই যথেষ্ট তার গোত্র চেনানোর জন্য, বাকি কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। 'বেদের মেয়ে জোসনা' নিঃসন্দেহে সেই ঘরানার অন্যতম জ্যোতিষ্ক৷ এই গান-ই তার 'সিগনেচার মার্ক'। 

কাঞ্চন তখন প্রতিষ্ঠিত নায়ক৷ ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবীর পরিচালিত 'পরিণীতা'র জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। 'বসুন্ধরা', 'ডুমুরের ফুল', 'শেষ উত্তর', 'নালিশ', 'অভিযান'...একের পর এক হিট ছবি দিয়ে গেছেন কিশোরগঞ্জের তরুণ'টি। সেই তুলনায় ইন্ডাস্ট্রি'তে তখনো 'মাটি' পাননি অঞ্জু। কেরিয়ারের প্রথম দিকে হিট ছবি দিলেও সে সময় একের পর এক ছবি তাঁর ফ্লপ। কেউ কাজ দিচ্ছে না। অঞ্জুর সাথে তখন কাজও করতে চাইছেন না ইন্ডাস্ট্রির অন্য কলাকুশলীরা। কিন্তু তাঁর সহজাত অভিনয় ক্ষমতার উপর ভরসা রেখেছিলেন বকুল। 'ডেবিউ' ছবি 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তে নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জুকেই বেছে নেন তিনি। বাকিটা ইতিহাস। 

১৯৮৯ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় তোজাম্মেলের এই ফোক ফ্যাণ্টাসি 'বেদের মেয়ে জোসনা'। কী আছে এই সিনেমায়? সাপে কাঁটা রাজকন্যা, পালক বেদে পিতার ঘরে বড় হওয়া, বীণ বাজিয়ে সাপ নাচানো, রাজপুত্রের সাথে প্রেম, ফলে রাজার বিরাগভাজন, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, সন্দেহ, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে মিলন ও ভালোবাসার জয়। সেই অর্থে ভাবতে গেলে, সাদামাটা লোককথার ছায়াদৃশ্য নির্মাণ। কিন্তু সেই সহজ-সরল, চড়া দাগের আর্তি-ই মানুষের মন ছুঁয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। অতি  সাধারণ খেটে-খাওয়া নিম্নবর্গের গরীব মানুষের। আর ঠিক এখানেই বাজি মেরেছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা'। মানুষ এই ছবি দেখতে গিয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়ে, আবার হাসিমুখে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। 

ছবি মুক্তির আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল গানের রাইটস। প্রথম দুটি সপ্তাহ চলে 'ড্রাই রান'। এর পরেই আসে সুনামি। বক্স অফিসের যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে দেয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। বোধকরি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ব্যবসায়িক ভাবে চূড়ান্ত সফল 'বেদের মেয়ে জোসনা' রাতারাতি রচে ফেলে ইতিহাস। 'ঢালিউডে' (ঢাকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) আজও সেই রেকর্ড অক্ষুন্ন। রাতারাতি কয়েক লক্ষ ক্যাসেট বিক্রি হয়ে যায় এই সিনেমা-টির। ওপার বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শোনা গেছিল সেই গান। 

কালক্রমে বেদেনী বাঁশির সুর কাঁটাতার পেরিয়ে ঢুকে পড়ে এপারেও। ১৯৯১ সালে প্রযোজক মতিউর রহমান পানু এপার বাংলার দর্শকের জন্য তৈরি করেন নতুন ভার্সন, যেখানে নায়িকা এক থাকলেও আসেন এপার বাংলার নায়ক চিরঞ্জিত। ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু দে'র মতই চিরঞ্জিত-অঞ্জুর অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রি দারুণ সাড়া ফেলেছিল। এপার বাংলাতেও তুমুল হিট হয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। চিরঞ্জিতের কেরিয়ারের অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে ওঠে এই ছবি'টি৷ এই ছবির সূত্র ধরেই পরবর্তী কালে ঢাকা ছেড়ে কলকাতামুখী হন অঞ্জু। সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিসরে পা রেখে বিজেপি-তে যোগ দেন তিনি। 

বলে রাখা ভালো, তথাকথিত বাঙালি 'এলিট' সমাজ অবশ্য কোনও দিনই এই ছবিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং তাচ্ছিল্যের সাথে নাক সিঁটকিয়েছে, ঠাট্টা-তামাশাও করেছে৷ কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, শহরতলি বা মফস্বলে যে ম্যাজিক ঘটিয়েছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা', অনেক তাবড়-তাবড় সিনেমাকেও তা ম্লান করে দেবে। তবে ছবির গ্রহণীয়তা ও গুণমত মান নিয়ে সে সময়েও চলেছে বহু তর্কবিতর্ক, আজও তা নিয়ে উঠতে পারে সওয়াল। নানা মুনির নানা মত৷ তাই সে নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। 

সিনেমায় ছিল একটি-দুটি নয়, ১১ টি গান। ছবির সুরকার ছিলেন আবু তাহের, গীতিকার তোজাম্মেল হক বকুল ও হাসান মতিউর রহমান৷ প্রায় এক ডজন গানের অধিকাংশ-ই হিট। অ্যান্ড্রু কিশোর, রুণা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং খুরশিদ আলমের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা কণ্ঠদান করে ছিলেন এতে৷ দশটি গানের কথা লেখেন বকুল। 'মা আমি বন্দী কারাগারে'র কথা লিখেছিলেন মতিউর রহমান৷ এক সময় দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছিল এই ছবির গান৷ 'মায়ায়  গড়া এই সংসার', 'প্রেম যমুনায় সাঁতার দিলাম', 'পাহাড়িয়া সাপের খেলা', 'আমার লাগিয়া বন্ধু' বা 'কী ধন চাইব আমি রাজা'র মতো অসংখ্য গান সহজ সরল কথা ও গ্রাম্য সুরের প্রভাবে মানুষের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রুণা লায়লা এবং অ্যান্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে টাইটেল সং - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে..."। এপার ওপার দুই বাংলাতেই আজও যার জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। 

তবে খুব কম লোক'ই জানেন এই গানটির একটি বিখ্যাত হিন্দি গানের সুরে অনুপ্রাণিত৷ সুরকার আবু তাহের (১৯৫৪-১৯৯৯) ছিলেন ঢাকা সিনে ইন্ডাস্ট্রির খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক। সাবেক বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু সব রকমের গানে ছিল তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী প্রাক্তনী আবু তাহেরের পিতা ধীর আলি মিঁয়া ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। সংগীত পরিবারের ছেলে আবু তাহের ইন্ডাস্ট্রি'তে কাজ শুরু করেন  সুরকার আলাউদ্দিন আলির সহকারী রূপে৷ এর পর একে একে 'ভাগ্যবতি', 'ঘোমটা', 'ধনবান', 'আশা ভালবাসা', 'সুজন সখি', 'তুমি আমার', 'গাড়িয়াল ভাই', 'ভালবাসার ঘর', ও 'রাখাল রাজা'র মতো একাধিক হিট ছবির সুর দেন। তবে 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছিল তাঁর সেরা কাজ। এইচ এম ভি থেকে পান ডবল প্ল্যাটিনাম ডিস্ক'ও৷ এক সাক্ষাৎকারে তাহের বলেছিলেন, বলিউডের গান তাঁকে আকৃষ্ট করতো। 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তেও নিঃশব্দে রয়ে গেছিল তার প্রভাব। ১৯৯৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর অকালমৃত্যু না হলে আরও অনেক প্রত্যাশা ছিল তাহের মিঁয়ার কাছে। এও এক দূর্ভাগ্য! 

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ভারত ভূষণ ও মধুবালার 'ফাগুণ'। বিভূতি মিত্রের পরিচালনা সহ কামার জালালাবাদির রচনা ও কিংবদন্তি সুরকার ও পি নইয়ারের সুরে 'ফাগুনে'র প্রায় সবক'টি গান ছিল হিট। অধিকাংশ গান গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে ও মহম্মদ রফি। সিনেমা যতটা না হিট হয়, তার চেয়ে বেশি হিট হয় এর গান। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল "ইক পরদেশী মেরা দিল লে গ্যয়া" গানটি। সাপুড়ে বীণের সুরে গান'টি সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেই সুরে-ই মথিত হন তাহের। 'বেদের মেয়ে জোসনা'র টাইটেল সং-এ পুনরায় শোনা যায় সেই সুর। একই সুর, একই ছন্দ ও একই চলন; হিন্দির পাশাপাশি এবার বাংলা-তেও তুলেছিল জনজোয়ার। খারাপ, ভালোর ঊর্ধ্বে সেই গানের অসম্ভব, অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। 

সুরের বৈশিষ্ট্যই বুঝি এরকম। অন্য ভাষার সুর, কী অবলীলায় মিশে যায়, ওতপ্রোত হয় আরেকটি ভাষায়। বেদেনী বাঁশির সুরে মিলেমিশে এক হয়ে যায় প্রাদেশিকতা, আন্তর্জাতিকতা। এখানেই সুরের মাহাত্ম্য, দেশ কাল পেরিয়ে সংগীতের অখণ্ড বিজয় যাত্রা। লোকজ, মেঠোসুরের অভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা। 

অতএব, জয় কালনাগিনীর জয়!  

Tuesday, June 8, 2021

সই, কেবা শুনাইল শ্যামনামঃ পদাবলী কীর্তনের কথকতা



শীতকালের সঙ্গে কীর্তনের এক রহস্যময় সম্পর্ক। অনেকটা ঠিক পুরনো প্রেমের মত। হারিয়ে গিয়েও যা ফিরে আছে বারবার। অথচ কেন হারায়, হারিয়ে যেতে হয়, তা কেউ জানে না। সে এক আশ্চর্য!

তিনদিন ধরে পেছনের মাঠে বসেছিল নামকীর্তনের আসর৷ আজ শেষ হল। ছাদ থেকে দেখলাম খিচুড়ি খাওয়ানো হচ্ছে। খুলে ফেলা হচ্ছে শামিয়ানা। ছুটে বেড়াচ্ছে কচিকাঁচার দল, এদিক সেদিক। শশব্যস্ত তদারকি করছেন কর্মকর্তারা। 

বাসিমালা, গেঁদাফুল পড়ে আছে বিরহী বিষ্ণুপ্রিয়ার মত, একাকি। একটু দূরে অবাক চোখে এসব কীর্তি দেখছেন রাধামাধব। তাঁর দিকে নজর দেওয়ার মত সময় নেই কারোর৷ একটা কুকুর, ছানাপোনা সমেত শালপাতায় তখন উচ্ছিষ্টসন্ধানী৷ 

মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কথা। মফস্বল ঘেঁটে উঠে আসা শৈশব, কৈশোর এ দৃশ্য বহুবার দেখেছে। তখন এক মায়াবী সময়। শীতকাল কখন ঝুপ করে নেমে এসেছে ঠাহর হতো না। শুধু দেখতাম এ পাড়া, সে পাড়ায় ভেসে উঠতো অলীক ছাউনি। জ্বলজ্বল করছে হ্যাজাক, বা ঘোলাটে টিউব। একপাশে তার মহাপ্রভুর মূর্তি। অন্য পাশে রাধাগোবিন্দ। ঘামতেল গন্ধমাখা ত্রিভঙ্গমুরারি। প্রেমঘন, ধ্যানস্থ, এবার বুঝি জাগবেন, সাড়া দেবেন। 

সমুদ্রের ঢেউয়ের মত একটু একটু আছড়ে পড়তো শ্রীখোলের বোল। চাপ চাপ কুয়াশা পিছনে ফেলে বেজে উঠতো হারমনিয়াম, কর্তাল, মঞ্জিরা। অনন্ত শূন্য থেকে নেমে আসা মাইক, কখনও তাও উধাও। খালি গলায় ঝড় উঠতো গাদানহাটি ও রেনেটি'তে। তাকে শান্ত করতো মনোহর্ষী বা মান্দারনি। অঞ্চল জুড়ে ধ্বনিত হতো - 'হরি বলো! হরি বোল!' স্নায়ু জুড়ে, রক্তমাংসে তখন অষ্টপ্রহর নাম-সংকীর্তণ।

অবাক চোখে দেখতাম মানুষগুলো'কে। রাত জেগে জেগে গান। সকালে গান, বিকেলে গান, দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে গান। রসকলি কাটা কীর্তনীয়ার পাগলের মত ঊর্ধ্ববাহু নৃত্য। নাচতে নাচতে কাঁদতো, কাঁদতে কাঁদতে হেসে লুটোপুটি, হঠাৎ আবার একে অন্যকে জড়িয়ে 'চোখের জলে লাগল জোয়ার'। কী ভাবে যে কাটতো দিন, গড়াতো রাত তাও বোঝা যেত না। সে এক অলৌকিক 'সাইকডেলিক ট্রান্স'।

সময় ঘুরতে থাকে। মফস্বলি মায়া কাটিয়ে অতিদ্রুত  ''নাগরিক হয়ে ওঠা। রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন শুধু-ই ইস্পাত আর ধাতব সংঘাত। কবে হারিয়ে গেছে পালাকীর্তন, মাথুর, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, রাসলীলা, পদাবলী বা নামসাধন। এবার বাড়ির পিছনে, রেললাইনের ধারে একচিলতে মাঠে তিনদিন ধরে চলা পালাকীর্তন তবু ফিরিয়ে দিল অনেকটা'ই। 

সেও এক আশ্চর্য সমাপতন। সন্ধ্যের মুখে কলমের ডগায় তখন আছড়ে পড়ছে কৃষক আন্দোলন, দিল্লি সীমান্তে সারসার তাঁবু, ভুখা চাষির মুখ, ঘড়ির ব্যস্ত কাঁটায় ডেডলাইনের তাড়া, বাজেট অধিবেশন আর কানের গোড়ায় খাবি খাচ্ছে পূর্বরাগ লীলা, গৌরাঙ্গ আবির্ভাব। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে 'পরবর্তী নিবেদন বলরাম গোস্বামী ও সম্প্রদায়, নদীয়া'। না চাইতেও কান চলে যাচ্ছে অমোঘ আকর্ষণে। 'মরিব মরিব সখী, নিশ্চয়ই মরিব'। এবার আসছেন রামপুরহাট থেকে সঙ্গীতা চক্রবর্তী ও সম্প্রদায়৷ 'ধরা দেবে কী দেবে না কানাই / মরণ বাঁশি পোড়াব আগুনে'। 

আমি কান পেতে শুনি। গানের পর গান ভেসে চলে। আহা, এ তো মনে হচ্ছে শ্যাম কল্যাণ, আরে এটা যে দেশ, এ তো কেদার...আহা দরবারি আছে তাহলে। অন্য দিকে চলতে থাকে কলম। কৃষকরা আন্দোলন প্রত্যাহার করবে না৷ নিঃশর্ত আইন প্রত্যাহারে তারা অটল। ট্র‍্যাক্টর র‍্যালির পর এবার কী লংমার্চ, সংসদ ঘেরাও নাকি আলোচনার টেবিল? কলম ছুটে চলে। মাইকে ভেসে আসে গান - 'সখী, আমি কেন গেলাম যমুনায়?' 

বহুদিন পর কর্ণকুহরে বৃষ্টি নামে। তবে শুধুই যে তা 'অমৃতবারিধারা' এমন নয়, কিঞ্চিৎ 'হলাহল'ও ছিল। মোহভঙ্গ হয়েছে যখন দেখেছি হিন্দি বা বাংলা চটুল সুরকে কীর্তনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে এক ভয়াবহ বিস্ময়। বোঝা যায়, বেনোজল অনেকটা-ই ঢুকে পড়েছে 'মহানামব্রতে'। হয়তো কোনও অশনি সংকেত, আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। হয়তো বোধ, মনন, চিন্তনের দৈন্যতার সুপ্রকাশ। ভেসে যাওয়াই যেখানে অনিবার্য। নজরুলের ভাষায় - 'বৃথা প্রবোধ দিস নে ললিতে'! 

একসময় সব আসর-ই ভাঙে৷ মিলনমেলা যেখানে নিতান্তই রূপক মাত্র। ভালো আর খারাপ সেখানে হাত ধরাধরি করে উঠে আসে। বলে ওঠে 'জগন্নাথ মিশ্রের কুপুত্র নিমাই / এইটা বুঝি আর সেইটা করে গো'। স্তব্ধতা নেমে আসে চরাচরে। আর আমি ভাঙা দেরাজ খুলে বের করে আনি 'গীতশ্রী'-র ক্যাসেট। চালাবার উপায় নেই। রিল জড়িয়ে গেছে বহুদিন৷ আমি তার গায়ে হাত বোলাই। পরম মমতায়। ভাঙা টেপ রেকর্ডার থেকে ফের যেন উপচে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সময়। আমার 'মাথুর' ছেলেবেলা। 


মীরাবাঈ'কে কতটাই বা চিনেছি আমরা? আমাদের 'গীতশ্রী'-ই সম্বল। তিনিই বাঙালির একান্ত, প্রেমতীর্থ মীরা। আধ্যাত্মিক, সাঙ্গীতিক সাধনসঙ্গী। 

'গীতশ্রী'র কণ্ঠে মাথুর, মহানাম সংকীর্তন, পদাবলী আমাদের মীরাভাব ঘটিয়েছে। মধ্যবিত্তের পরিধিতে জাগিয়েছে কৃষ্ণনাম, লীলাময় অতীন্দ্রিয় ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ। তিনি ব্যতিত বাংলার সাধনমার্গ অসম্পূর্ণ। 

দোল পূর্ণিমার শেষলগ্নে তাই 'গীতশ্রী'-ই পরমাশ্রয়। তাঁর সুরের পথ ধরে বৃন্দাবনের ফাগুয়া ভেসে আসে বাংলার আকাশে৷ গভীর রাতে সেই লীলাক্ষেত্র যেন হয়ে ওঠে সুরের মায়াবী মথুরা৷ পদাবলী কীর্তন শুধু একা রাত জাগে গৃহস্থালি চৌকাঠে৷ 

দূর বহুদূর হতে ভেসে আসে রাতের গাড়ির হুইসিল। পদাবলী কীর্তনের ঘোরে আমরা ভাবি কানুর বাঁশি বেজে উঠেছে মফস্বলি দৈনন্দিনতায়। এমন রঙের উৎসবের কী আদৌ শেষ বলে কিছু আছে? 

আমি দেখতে পাই ছোট্ট মফস্বল। চাপ চাপ কুয়াশা নেমেছে রেললাইনে। ছোট ছোট শামিয়ানা। প্রবীণ, প্রবীণা-দের ভিড়। কীর্তন হচ্ছে সেখানে। ঘুরে ঘুরে গান গাইছেন এক মহিলা। গলায় গেঁদাফুলের মালা, কপালে রসকলি। দূরে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, পায়েস, পাঁচ মেশালি, নিরামিষাশী। কীর্তনীয়া শ্রীখোল হাতে তালে তালে নাচছেন। বাজছে হারমনিয়াম, বেহালা, মঞ্জিরা৷ দূরে ফুলে ফুলে সুসজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাধামাধব। আহা, শ্রীমুখে তাঁর অলৌকিক আঁধারবিনাশী আলো। সে আমার একান্ত নিজস্ব, অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তণ। 

'সখী রে, সে আনন্দ রসোঘন বিগ্রহ...'

Monday, June 7, 2021

প্রগতো হে রাগ কেদারঃ সৌরাষ্ট্র গীতি ও মান্না দে


মান্না দে এক অপার বিস্ময়। এক আলোকজ্জ্বল সুরেলা সফরের সমনামী।

১৯৪২ সালে 'তমান্না' সিনেমায় 'জাগো আঈ ঊষা' গানে সুরাইয়ার সাথে ডুয়েটে কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে'র হাত ধরে প্রথম যাত্রা শুরু। ২০০৬  সালে 'উমর'-এ সুরকার সমীর ট্যাণ্ডনের পরিচালনায় কাওয়ালিতে 'দুনিয়াওয়ালো কো নহী কুছ খবর'-এ সেই সুরেলা বৃত্তের পরিপূর্ণতা। 

সিনেমায় প্লে ব্যাক থামলেও, অন্যান্য এক্সপেরিমেন্ট  থেকে কখনই সরে আসেননি মান্না। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বহাল থেকেছে সেই ধারা। কতই কিছুই না গড়েছেন, ভেঙেছেন...ভাঙতে ভাঙতে গড়েছেন এক অন্য পৃথিবীর সুরালোক।

ছ'দশকের বেশি দীর্ঘ সময়। এর মাঝখানে না জানি কতই না ইতিহাস। শুধুই বলিউড বা টলিউডে নয়, 'আঞ্চলিক' সুরবীক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর পথচলা। 

হিন্দি ও বাংলার পাশাপাশি অসংখ্য গান গেয়েছেন কন্নড়, তামিল, মালয়ালাম, অহমিয়া, উর্দু, সিন্ধি বা পঞ্জাবি, মৈথিলী, গুজরাটির মত একাধিক ভাষায়। যে প্রদেশে যেমন করে যতবার তিনি লাগিয়েছেন সুর, ততবার জ্বলে উঠেছে 'আলো', নতুন করে লেখা হয়েছে ইতিহাস। কিন্তু বাংলা বা হিন্দির আড়ালে মান্নার সেই 'ভারতদর্শনে'র কথা কতটুকুই বা জানি আমরা। প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও। 

১৯৭৪ সালে রিলিজ করেছিল গুজরাটি চলচ্চিত্র 'কুনওয়ার বাইনু মামেরু'। পরিচালনায় রবীন্দ্র দাভে (১৯১৯-১৯৯২)। সংগীত পরিচালনায় গুজরাটের 'শচীন দেব বর্মণ' অবিনাশ ব্যাস (১৯১২-১৯৮৪)। পঞ্চদশ শতাব্দীর মহাকবি সন্ত নরসিংহ মেহতার 'বায়োপিক' এই ছবি অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে ছায়াছবির গানগুলি সেই সময় আলোড়ন ফেলেছিল গুজরাটে৷ বলে রাখা ভালো, এই নরসিংহ দাসজি মেহতার রচনা 'বৈষ্ণব জন কো' ছিল মহাত্মা গান্ধীর অন্যতম প্রিয় ভজন। 

'মাইহার' ঘরানার প্রবর্তক উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছাত্র অবিনাশ ব্যাস নরসিংহ মেহতার একাধিক রচনায় সুর দিয়ে তাকে অমরত্ব দেন। সিনেমায় ছটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মান্না দে-সহ মহেন্দ্র কাপুর ও সুমন কল্যাণপুরের মত শিল্পীরা।

এর মধ্যে কেদার রাগে 'প্রগতো হে রাগ কেদার' গেয়ে গোটা সৌরাষ্ট্রে সাড়া ফেলেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে সহ ভিণ্ডিবাজার ঘরানার পথিকৃৎ উস্তাদ আমান আলী খান এবং দাবির খাঁ সাহেবের সুযোগ্য ছাত্র প্রবোধ চন্দ্র, ওরফে মান্না দে। আজও গুজরাটে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিক বা সাঙ্গীতিক সমাবেশে গাওয়া হয়ে থাকে এই গান। 

কেদার রাগের এমন বিন্যাস, সম্মোহন মান্না দে বলেই হয়তো সম্ভব। তিনি এক অপার বিস্ময়। যার ক্ষয় নেই। আছে শুধু মুগ্ধতা। মান্না-র চরাচরব্যাপী সুরেলা সাম্রাজ্যের অশ্রুত 'দাস্তানে'। 

কই ফরিয়াদ তেরে দিল মেঃ অতল সমুদ্রের সুর



কিছু কিছু গান আছে উন্মাদের মত, বাঁধভাঙা ঢেউ এর মত সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তছনছ করে।

তারপর দেখি কখন আবার সব সাজিয়ে রেখেছে, ফেলে আসা প্রেমের স্মৃতির মত৷ সেখানে জারিজুরি খাটে না কোনও। শুধু নতজানু হওয়া ছাড়া। 

জগজিৎ-এর 'কই ফরিয়াদ তেরে দিল মে' তেমনই একটা ঢেউ। দেখতে দেখতে ২০ বছর পার করিয়েও বারবার আছড়ে ফেলে তার অতল ঘূর্ণিপাকে৷ রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও সেই উন্মুক্ত জলোচ্ছ্বাস টের পাই।  

২০০১ সাল। রিলিজ করেছে অনুভব সিনহার 'তুম বিন'। কলেজে পড়ি তখন। গোটা সিনেমা'টি জুড়ে সে এক অদ্ভুত মাদকতা, নস্ট্যালজিয়া। নবাগত কুশিলব'দের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু জগজিৎ'কে ভুলি কী করে? 

প্রায় এক ডজন গান ছিল 'তুম বিন'-এ। দুই তরুণ সংগীত পরিচালক নিখিল-বিনয়ের সুরে প্রায় সব গানই হিট৷ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ফয়েজ আনোয়ারের কলম আর জগজিৎ সিং-র কণ্ঠের জাদুতে মথিত - 'কই ফরিয়াদ' যে অমরত্ব পেয়েছে, তা তুলনাহীন। 

জগজিৎ স্বীকার করেছিলেন বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গজল এটি৷ লোকে ভুলে গেছে তার সুরকার বা গীতিকারের নাম। অতন্দ্র নক্ষত্ররাজির মধ্যে শুধু জ্বলজ্বল করছেন জগজিৎ ও তাঁর স্বপ্নের 'কই ফরিয়াদ'। 

দেখতে দেখতে দু দশক পার। এই দু'দশকে কম করে দুশোবার শুনেছি এই গান। আলোড়িত হয়েছি, তছনছ হয়েছি ভেতরে ভেতরে যখন জগজিৎ তাঁর ব্যারিটোনের স্পর্শে জাগিয়েছেন - 

"জাগতে জাগতে এক উম্র কাটি হো জ্যয়সে
জান বাকি হ্যায় মগর সাঁস রুকি হো জ্যয়সে" 

কী করে ভুলি সে গানের 'সঞ্চারী', জগজিৎ ঘটিয়ে ফেলেছেন যেখানে অনাবিল জাদু বাস্তবতার সুতীব্র বিস্ফোরণ? তিনি গাইছেন, বলা ভালো যেন ধ্যানে বসেছেন - 

"এক লমহে মে সিমট আয়া হ্যায় সদিয়ো কা সফর
জিন্দেগী তেজ বহুত তেজ চলি হো জ্যয়সে..." 

এখানেই এই গানের সার্থকতা, অমরত্বের স্পর্শ। 

কথায়, সুরে, গায়কী'তে এমন অতুলনীয় মেলবন্ধন সত্যি বিরল। দু দশক পেরিয়েও যার ভাঙাগড়ার খেলা আজও অক্ষুণ্ণ। সাড়ে ন' মিনিটের বিস্ময়।

আমার রাতজাগা, ক্লান্ত চোখ অবাক হয়ে দেখছে স্বয়ং জগজিৎ উঠে এসেছেন শুশ্রুষার ভাণ্ড হাতে৷ তছনছ হতে হতে আবারও গুছিয়ে নিচ্ছি জীবন। কারণ তিনিই শিখিয়ে গেছেন - 

"জান বাকি হ্যায় মগর সাঁস রুকি হো জ্যয়সে..."

চতুষ্কোণঃ এক অলীক কথোপকথন ৩


জীবন এক অলীক 'চতুষ্কোণ'। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু আর মুক্তির জাফরিকাটা আলোয় রাঙানো। 

আজকাল দিন শুরু এদের নিয়েই। ঘুম ভেঙে চোখ মেলে মনে হয়, কী আশ্চর্য, বেঁচে আছি তবে। আরও একটা দিন, আরও কিছু মুহূর্ত যাপন। 'আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে'। কারা যেন কড়া নাড়ে। কেউ কী এসেছে তবে কারফিউ পেরিয়ে?

তারপর যত সময় গড়ায়, বুঝতে পারি 'জরা' এসে নিঃশব্দে বসেছে পাশে৷ শরীরে নয়, মস্তিষ্কে। খবর চলতে থাকে বোকাবাক্সে। সংক্রমণ আর মৃত্যুর হার নিয়ে লোলচর্ম বিশেষজ্ঞ। ভেসে আসে মুঠোফোন - বার্তা। ঘষঘষ শব্দে চলতে থাকে কলম। পেশাদারি স্বভাব দোষে। লকডাউনের মধ্যে শিশুর দল খেলা করে রাস্তায়। 

সাত-পাঁচ ভাবতেই সশব্দে ব্রেক। গড়িয়ে পড়ে দেহ। পাশে বসা প্রৌঢ়া, হাতে জলের বোতল, ঠোঁটে ঠোঁট প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টায়৷ লুকিং গ্লাসে মুখ টিঁপে হাসে 'ব্যাধি'। এ শহরে আজকাল নিঃশ্বাস নেয় না কেউ। কবন্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ায় ফাঁকা সিলিন্ডারে। অজান্তে শিখে ফেলি, মুখোশের রাজনীতি, আর রাজনীতির মুখোশের ফারাক।

শ্বেতশুভ্র 'মৃত্যু' আসে ব্যস্ত পায়ে৷ জ্বলে ওঠে চিতা, লেলিহান। ছাই ভাসে বিছানায়। পাক খায় কালো ধোঁয়া। তিনদিন মানুষটা দরজা খোলেনি। কেউ কী নিয়েছে খবর? ককিয়ে ওঠে সাইরেন। মুর্দাফরাশ, জ্বালাবার আগে ব্যবচ্ছেদ করে দেখে নিও, আদৌ কেউ ভালো বেসেছিল কি না। 

জানি অসম্ভব, তবু জেনো বৃষ্টি নামবে শহরে৷ বাঁশি, ঢোলক, হারমনিয়াম আর করতালি দাওয়ায় বসবে মুখোমুখি। হবে গান, বেসুরো বেতালায়। অন্ধকারের ঘন্টাধ্বনি বাজবে দূরে৷ চারটে জীবন, ভ্রুক্ষেপহীন, আলোর সওদাগরি সেরে বলবে, যাও এবার 'মুক্তি' খুঁজে নাও মূর্চ্ছনায়। 

জীবন এক অলীক 'চতুষ্কোণ'। ক্ষমাসুন্দর আলোয় রাঙানো। আমি তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসি। অদৃশ্য শূন্য থেকে সুর বেরিয়ে শূন্যে হারিয়ে যায়। তথাগত তার নাম রেখেছিলেন 'বোধি'। আমি তাকে খাম্বাজ বলে ডাকি।

জান-এ-গজলঃ সুখবিন্দর সিং ও তাঁর গান


ভোর হয়ে এলো। পাখি ডাকছে। একটু একটু করে সরছে রাত। চারপাশ যদিও এখনো শুনশান। একটু পরেই অবশ্য জেগে উঠবে শহর৷ শুরু হবে ব্যস্ততা। অথচ আমি কিনা এখনও...এখনও হাবুডুবু খাচ্ছি এই গান'টির স্থায়ী, অন্তরার সন্ধিক্ষণে। 

সুখবিন্দর বড় পছন্দের গায়ক। যেমন তাঁর গায়কী, কণ্ঠ, ভোকাল রেঞ্জ ও ডেপথ্, তেমনই সুরের দখল। তাঁর গায়কী'তে মিরাসির ছোঁয়ায় মাটির গন্ধ লেগে থাকে। কখনো সেই মাটি কচ্ছের 'বঞ্জর' রণের মত, কখনো বা হিমাচলের পাহাড়িয়া মেঠোপথের ধুলো মাখা। 

সুখবিন্দর সুর লাগালেই যেন একসাথে তরবারির ঝনঝনানি আর বিদ্যুতের চমক ঝলসায়। তার পর অঝোরে নামে বৃষ্টি। যেন হার্ড রক, মেটালের তালে কী অদ্ভুত ভাবে উঠে আসে পঞ্জাবের নামধারী'দের কীর্তন, 'গুরুবাণী'র সাথ-সঙ্গত। এতক্ষণ যা মনে হয়েছিল 'সাইকডেলিক', পরক্ষণেই তাতে সাক্ষাৎ পেলাম ওয়ারিস শাহ, বাবা ফরিদ, বুল্লেহ শাহের। সুখবিন্দর আমার কাছে আজও এক রহস্য।

অন্যান্য সকলের মত আমিও তাঁর 'হাইপিচে'র ভক্ত। ভালোবাসি 'ছইয়া ছইয়া', 'জয় হো', 'ওমকারা', 'দুয়া' বা 'বিসমিল', 'লগন লগি', 'চিন্নাম্মা'র মত ফাস্ট ট্র‍্যক গুলি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি টানে তাঁর 'হীর', 'রব্বা', 'ন্যয়না', 'মিট্টি তেরি'র মত স্লো ট্র‍্যাক-গুলি। মনে হয় এক অন্য সুখবিন্দরকে খুঁজে পাই সেখানে।

তবে 'গায়ক' সুখবিন্দরের পাশাপাশি কিন্ত 'সুরকার' সুখবিন্দর ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দি, তামিল, কন্নড়, তেলেগু, মারাঠি, উর্দু (কেন যে বাংলায় গান না) তে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি গান গাইলেও বেশ কিছু ছায়াছবিতে তিনি সংগীত পরিচালনার কাজও দক্ষ হাতে সামলেছেন। 'অস্তিত্ব', 'ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট' বা 'হাল্লা বোল' তার অন্যতম। 

'মারাঠি মানহুস' মহেশ মঞ্জরেকরের 'অস্তিত্ব' আমার খুব ভালোলাগা একটি অভিজ্ঞতা। যারা দেখেছেন তারা নিঃসন্দেহে ভুলতে পারেননি। প্রায় একুশ বছর আগে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে ছিল কিছু অসাধারণ গান। সুখবিন্দর সিং ছিলেন সংগীত পরিচালনায়। 'চল চল মেরে সঙ্গ সঙ্গ' নিজের সুরে তাঁরই গাওয়া। 

লঘু শাস্ত্রীয় অঙ্গের অদ্ভুত সুন্দর সেই গানে চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন 'সুখি'। আহীর ভৈঁরো ও ভাটিয়ার - দুটি ভোরের রাগ'কে পাশাপাশি মিশিয়ে দিয়েছিলেন অসামান্য দক্ষতায়। আলাপে যেখানে আহীর ভৈঁরোর সরগম উঠে আসে, স্থায়ী-অন্তরায় তাকেই ঢেকে দিচ্ছে, অন্য মার্গে যেন উত্তীর্ণ করছে ভাটিয়ার। দুই মিলেমিশে এক অতি-প্রাকৃত মুর্চ্ছনা। এমন 'কম্পোজিশন' রাতের সুখনিদ্রা কেড়ে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী।

ভোরের আলো ফুটলো। এক অস্তিত্ব মিললো অন্য 'অস্তিত্বে'। আঁধারের পর যেমন আলো। রাতের পর যেমন সকাল। শব্দহীনতার ভেতর যেমন ধ্বনিকল্প। জীবনের পর আরেক অনন্ত জীবন৷ এটাই সুর, কল্প, সংগীত, মূর্চ্ছনা ও ভাবের 'অস্তিত্ব'।

আসুন, কিছুটা পথ না হয় হাঁটা যাক একসাথে...

Sunday, June 6, 2021

আল্লাহ তেরো নামঃ হারানো সুরের রেশ ধরে



লতা মঙ্গেশকরের নাম শুনিনি তখনো। জয়দেব নামে বুঝি কোনও সংগীত পরিচালক আছেন, তাও জানা ছিল না। শাহীর লুধিয়ানভি অজ্ঞাত কোনও এক সমুদ্রের নাম। জানতাম না তাও। নিতান্তই কাঁচা বয়সে শোনা এই গান। অনেক কিছু না জেনেও কেমন যেন চেনা হয়ে গিয়েছিল সেই প্রার্থনার সুর। অদ্ভুত সেই মোহ মায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল সেই না-জানা'র 'দাস্তান'।

কিন্তু গানটা জানতাম। মা গাইতেন৷ অদ্ভুত তার সুর। ছোটবেলায় শোনা। মা আজও এই গান-টি না গেয়ে থাকতে পারেন না। স্নানঘরে, ঠাকুরঘরে বা রান্নাঘরে চা বানাতে বানাতে শুনতাম ভেসে আসছে "ও সারে জগ কে রখওয়ালে/ নির্বল কো বল দেনেওয়ালে"... 
কী অদ্ভুত বুক মোচরানো সুর৷ যেন পাঁচ আঙুলের অদৃশ্য দাগ বসে গেছে গভীর অন্তঃস্থলে৷ 

অনেক পরে, আব্বার কাছে তখন সরোদ শিখি৷ সে দিন উস্তাদজি বললেন - "গৌড় সারঙ্গ শেখো।" দুপুর বেলার রাগ, কল্যাণ ঠাট। আমি কাঁচুমাচু মুখে ঘাড় নাড়ি। আব্বা আলাপ শুরু করেন। 'আওচার' সেরে বিস্তারে ঢুকতেই চমকে উঠি৷ এত সেই সুর। আমার ফেলে আসা ছোটবেলার গান। মায়ের গন্ধ জড়ানো আষ্টেপৃষ্টে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করেছিল। 

কলেজে পড়ার সময় প্রথম জেনেছি 'হাম দোনো'র কথা। আমার জন্মের বিশ বছর আগে, ১৯৬১ সালে দেব আনন্দ, নন্দা, লীলা চিটনিস, সাধনা অভিনীত 'এটারনাল ক্লাসিকস' -- 'হাম দোনো'র কথা৷ 


কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উত্তরায়ণ' অবলম্বনে নির্মিত দেব আনন্দের অসাধারণ সৃষ্টি। সংগীত পরিচালনায় উস্তাদ আলী আকবর খানের সুযোগ্য শিষ্য জয়দেব ভার্মা ও গীত রচনায় শাহীর লুধিয়ানভি। লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফির স্বর্ণালী কণ্ঠে কালজয়ী সব 'কম্পোজিশন'। 

প্রায় প্রত্যেকটি গান'ই মনের খুব কাছাকাছি। কিন্তু 'আল্লাহ তেরো নাম' আজও কেমন যেন মোহাবিষ্ট করে রাখে৷ শুনলে মনে হয়, এক্ষুনি যেন ঘন্টা বেজে উঠবে মন্দিরে, শুরু হবে আরতি। একটু দূরে ঈদগাহ থেকে ভেসে ওঠে 'মগরিবে'র আজান। প্রার্থনা ঘন্টা বেজে চলে রুক্ষ প্রান্তরের এক কোনায় থাকা ছোট এক চিলতে গির্জায়। এ সময় ঈশ্বর লাঠি হাতে যেন সান্ধ্যভ্রমণে বেরোন। গরীব চাষার দাওয়ার সামনে এসে বলেন, "কই গো, হারাণের মা! একটু জল দাও দিকি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে!" 

আমার কাছে এই গান আজও যেন এক অনাবিল ঈশ্বরীয় আহবান৷ যার পরতে পরতে লেগে আছে, অন্য কিছু নয়, আমার মায়ের গন্ধ৷ চোখ বুঁজলে আমি টের পাই৷ চন্দনের হালকা গন্ধ ভেসে বেড়ায় আকাশে। ঠিক যেমন মন্দির প্রান্তে ভেসে বেড়ানো অনির্বচনীয় নাম না জানা কোনও ফুলের গন্ধ৷ যা ভোরে তুলে দেওয়া হবে রাধামাধবের পায়ে। শান্তি জলের মত অলক্ষ্যে। নেমে আসে বৃষ্টিধারা। আমি ভিজতে থাকি।

কাল মায়ের জন্মদিন ছিল। আজ এই গান শুধু তাঁর জন্য৷ আমার নিজস্ব মন্দিরে একান্ত নৈবেদ্য ডালা। আমার ফেলে আসা ছোটবেলার মায়াতীর্থ, স্বপ্নের 'গৌড় সারঙ্গ'। 

Saturday, June 5, 2021

স্যাক্সোফোন ও 'স্যামসন'-দের অজানা কিসসা


স্যাক্সোফোন। মাদকতার আরেক নাম। অঞ্জন দত্ত প্রথম চিনিয়েছিলেন। 'স্যামসনে'র হাত ধরে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে চিনতে শেখা মনোহারী সিং, স্ট্যানলি স্যামুয়েল, লুই ব্যাঙ্ক, কাদরি গোপালনাথকে। একটু একটু করে জানা চার্লি পার্কার, জন কোলট্রেন ও ব্র‍্যাজ গঞ্জালেস কিম্বা ক্যানি জি। যত শুনেছি, মুগ্ধ হয়েছি তারও বেশি৷ 

বলিউডের গানে 'স্যাক্সে'র ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। অথচ বরাবর স্যাক্সোফোন'কে ঠেলে দেওয়া হয়েছে ব্যাক বেঞ্চে৷ আজকাল ক'জনই বা শোনেন! ১৮৪০ সালে বেলজিয়ান কম্পোজর অ্যাডল্ফ স্যাক্সের হাত ধরে যার যাত্রা শুরু, ইতিহাস-ই বা তাকে কতটুকু মর্যাদা দিয়েছে! আমরা তাকে ঠেলে দিয়েছি শুঁড়িখানা পাব বা ঔপনিবেশিক রেস্তোরাঁর অন্ধকারে। অথচ এত তাড়াতাড়ি বোধহয় হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না স্যাক্সোফোনের৷ 

প্রয়াত পরিচালক অনন্ত বালানি এবং সুধীর মিশ্রার 'চামেলি' (২০০৪) শুধুই এক দেহপসারিনী ও একলা বিষাদগ্রস্ত মানুষের বন্ধুত্ব, প্রেম, সান্নিধ্য, বিচ্ছেদের গল্প নয়। বঞ্চনার সুদীর্ঘ নৈঃশব্দ্য ভেঙে বেজে ওঠা এক স্যাক্সোফোনের গল্প বটে। গোটা সিনেমা জুড়ে তার আধিপত্য। প্রতিটি গানের শরীরেই লেগে তার জাদু স্পর্শ। শুনেছি, কাদরি গোপালনাথের 'স্যাক্স' শুনে স্তব্ধ হয়েছিলেন 'চামেলি'র সংগীত পরিচালক সন্দেশ শাণ্ডিল্য। গীতিকার ইরশাদ কামিল বলেন, 'এই গান আর দৃশ্যায়ন ফুটিয়ে তুলতে স্যাক্স ছাড়া অন্য উপায় নেই। আর তাকে অন্য উচ্চতায় স্থাপন করেছিলেন কাদরি।' ফিরিয়ে এনেছিলেন হারিয়ে যাওয়া স্যাক্স-ঐতিহ্য। 


'ভিগি হুই' - খুব সাধারণ হয়েও অসাধারণ একটি কাজ। সুনিধি চৌহান বা জাভেদ আলীর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। তাঁরা বলা-কওয়ার ঊর্ধ্বে। কিন্তু ওই স্যাক্সোফোন? ওই বৃষ্টি, মেঘের ডাক, ঠাণ্ডা লোনা বাতাস ছুঁয়ে আসা 'ব্যারিটনিক সাউন্ড'? আজও কী অদ্ভুত জাদু করে মাথার মধ্যে। কখনো গভীর অতল খাদ, কখনো বা মেঘেদের ঘরবাড়ি নিঙড়ানো সেই শব্দ, 'সেমি সাইকডায়ালিক ট্রান্সে' বুঁদ হয়ে থাকা। 

আমার কাছে স্যাক্সোফোন আজও 'চামেলি'র তীব্র, শ্বাসরোধী মিষ্টি নির্যাস। সেই অদ্ভুত নির্যাস, আমি যার পরতে পরতে বৃষ্টি, সস্তা মদের গন্ধ, সিগারেট আর আকণ্ঠ ভিজতে থাকা লালবাতির নিষিদ্ধাঞ্চলে কোনও এক অষ্টাদশীর উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনায় ভরা  শিশুসুলভ নাচ দেখতে পাই...আজও...

Friday, June 4, 2021

'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' ~ এক বিরল ব্যাধি ও গানের গল্প


মেলোফবিয়া। সনোফবিয়া। ফোনোফবিয়া। 

একটি বিরল মানসিক রোগ। নাম অনেক। 'ভয়'টা একটাই। সঙ্গীত, সুর বা সুরেলা শব্দের ভয়। অদ্ভুত এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন ম্যহলার, স্ট্রস, ক্যারেন এন বা স্ত্রকোভিচের মত 'কম্পোজার'রা। 

এই রোগেই আক্রান্ত হয়েছিল গানপাগল ছেলেটি। গিটার ধরতে ভয় পেত সে। ভয় পেত গান গাইতে। অথচ এমনও ছিল না তার জীবন। 

গানপাগল ছেলেটি ভালবাসতো সুর, পায়ের ছন্দে খুঁজে পেত বেঁচে থাকবার আনন্দ। 'স্ট্রিট সিঙ্গার' থেকে 'ডিস্কো ড্যান্সারে'র দুর্লঙ্ঘ পথ অতিক্রম করার সাহস দেখিয়েছিল সে। সাধাসিধে অনিল থেকে হয়ে উঠেছিল 'জিমি'- দ্য ডিস্কো ড্যান্সার। 

কিন্তু প্রত্যেক গল্পেই ভালো লোকেদের পাশাপাশি যেমন কিছু 'মন্দলোক' থাকে, এখানেও যথারীতি ছিল তারা। তারা জিমির ক্ষতি চায়। চায় সে যাতে আর কোনদিন গান না গাইতে পারে। আর সে জন্য চক্রান্ত করে ছেলেটির সাধের 'ইলেক্ট্রিক গিটারে' জড়িয়ে দেয় বিদ্যুতের তার। ছুঁলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু।

স্টেজে পারফর্ম করতে গিয়ে 'ইলেক্ট্রকিউটেড' হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। লেসলি হার্ভে, কেথ রেল্ফ, অগাস্টিন ব্রিওলিনি, বারবারা ওয়েল্ডেন মত শিল্পীরা 'তড়িতাহত' হয়ে মারা যান। 'রক লিজেন্ড' কেথ রিচার্ডস, ব্রিটিশ গিটারিস্ট নিয়াল হোরা, পপ গায়িকা ক্যেশা, এমনকি 'বিটলস'-র বিখ্যাত জর্জ হ্যারিসনের মত শিল্পীরা ইলেক্ট্রকিউটেড হয়ে মরতে মরতে প্রাণে বাঁচেন। 

সেই দলেই নাম লেখাতে পারত জিমি। কিন্তু গিটার ছুঁয়ে ফেলেন তার মা। চোখের সামনে তার মা'কে 'বিদ্যুৎস্পৃষ্ট' হয়ে মরতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। 'মেলোফবিয়া'র শিকার হয় জিমি। যদিও সে ভেঙে পড়েনি। আরেক 'স্ট্রিট সিঙ্গার' রাজু চাচার উৎসাহে সেই গিটারই হাতে তুলে নেয়। যে গিটার কেড়ে ছিল তার মায়ের প্রাণ, সেই গিটার বাজিয়ে সে গেয়েছিল - 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায় তেরা পেয়ার'। 


১৯৮২ সালে মুক্তি পেয়েছিল মিঠুন চক্রবর্তীর ডান্স ড্রামা 'ডিস্কো ড্যান্সার'। ভারতীয় সিনেমা সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা মিউজিক্যাল'টি নির্দেশনা করেন বি সুভাষ। কাহিনি লিখেছিলেন 'মহাভারত' খ্যাত ড. রাহী মাসুম রেজা। গীতিকার ছিলেন সেই সময়কার দুই প্রথমসারির লিরিসিস্ট অঞ্জন এবং ফারুক কাইজার। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী অপরেশ ও বাঁশরী লাহিড়ীর ছেলে অলকেশ, বলিউড ইন্ডাস্ট্রি যাকে চেনে বাপি লাহিড়ীর নামে। 

সাতের দশকের মাঝামাঝি ভারতে ছড়ায় ডিস্কোর উন্মাদনা। ভারতে তখন একটু একটু করে ছড়াচ্ছে 'হিপি' সংস্কৃতি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী আন্দোলনের যে ঢেউ আছড়ে পড়ে ছিল, পরবর্তী কালে তাই রূপ নেয় যাযাবর জীবন এবং আধ্যাত্মিকতার এক অন্য দিগ-দর্শনের অন্বেষণে। উত্তর আধুনিক সমাজচেতনা, গৃহযুদ্ধ, ভিয়েতনাম ওয়ার, আফগানিস্তানে গণ অভ্যুত্থান, ইওম কিপুর যুদ্ধ তথা ইরান-ইরাক সংঘর্ষের নেপথ্যে নতুন করে 'ইউটোপিয়ান' চিন্তাধারা সমৃদ্ধ করেছিল হিপি ও জিপসী জীবনধারাকে। হিপিদের সেই বিশ্ব পর্যটন নতুন সংজ্ঞা পায় ভারতে এসে। গান্ধীবাদী দর্শনের আলোয় প্রতিফলিত হয় আধ্যাত্মিক চেতনাবিকাশ ও বিনির্মানের সংস্কৃতি। উঠে আসে 'মোক্ষলাভে'র নয়া মার্গ, গঞ্জিকাসেবন, নেশান্মক্ততা সহ যৌনতা, গিটার বাজিয়ে উচ্চৈঃস্বরে গান, অদ্ভুত পোশাক, নাচ ও যোগের মাধ্যমে। অনেকে এও মনে করেন ভারতে ডিস্কো সংস্কৃতির পুরোধা হিপি'রাই। সাতের দশকের মধ্যভাগ পেরিয়ে ভারতই সে সময় বিশ্বের হিপি'দের কাছে নয়া তীর্থক্ষেত্র। 

স্বাভাবিকভাবেই বলিউড সেই প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেনি। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ফিরোজ খান পরিচালিত ও অভিনীত 'কুরবানী'তে প্রথম শোনা গেছিল সেই ডিস্কো ট্র‍্যাক 'আপ জ্যায়সা কই মেরে জিন্দেগী মে আয়ে'র মত গান। জন্মসূত্রে ভারতীয় অথচ ব্রিটিশ সুরকার বিড্ডুর সুরে গান গেয়ে মাত করেছিলেন ১৫ বর্ষীয় পাক-তরুনী নাজিয়া হাসান।  
হাসানের গাওয়া 'ডিস্কো দিওয়ানে'ও প্রবল সাড়া ফেলেছিল ভারত ও পাকিস্তানে। আরাবিয়ান ফক এসে মিশেছিল ডিস্কোতে, সৃষ্টি হয়েছিল 'লায়লা ও লায়লা'র মত গানও। এরপর বলিউডে ছেয়ে পড়ে ডিস্কো ঝড়। উঠে আসে সালমা আগার 'ঝুম ঝুম ঝুম বাবা', 'ডিস্কো স্টেশন', ঊষা উত্থুপের 'রাম্বা হো হো' কিম্বা আশা ভোঁসলের কন্ঠে 'প্যার করনে ওয়ালে'র মত একাধিক অবিস্মরণীয় সব ট্র‍্যাক। গানের কথাতেও আসে বিরাট 'পরিবর্তন'। আজও মানুষ সেই সব ব্যতিক্রমী সৃষ্টি ভোলেনি। 

সেই ডিস্কো জোয়ারে নয়া ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে মিঠুন চক্রবর্তীর 'ডিস্কো ড্যান্সার'। 'মেলোফবিয়া' আক্রান্ত এক নাচিয়ের গল্প। গল্প তার সংগ্রামের, ডিস্কোর প্রতি তার উন্মাদনা। গল্পের সাথেই তাল মিলিয়ে উঠে আসে এর গান। আজও সেই কাজ বাপি লাহিড়ীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ রূপে চিহ্নিত। 'কুরবানী'র দু'বছর পর '৮২ সালে মুক্তি পাওয়া 'ডিস্কো ড্যান্সার' ভেঙে দিয়েছিল সব রেকর্ড। এই সিনেমায় শোনা যায় ৮ টি গান। যার মধ্যে বিজয় বেনেডিক্ট'র 'আই এম আ ডিস্কো ড্যান্সার', 'জিমি জিমি আজা আজা' গেয়ে ঝড় তোলা পার্বতী খান, বাপি ও ঊষা উত্থুপের ডুয়েটে 'আউব্বা আউব্বা' বা নন্দু ভিণ্ডের 'কৃষ্ণা ধরতি পে আ যা তু' ছিল ১০০% ডিস্কো ট্র‍্যাক। অধিকাংশ গানগুলিই ছিল পাশ্চাত্য ডিস্কো, রক, সফট মেটাল ও 'সিন্থপপ' অনুপ্রাণিত। সাথে ছিল সুরেশ ওয়াদেকরের কন্ঠে 'গোরো কি না কালো কি' বা কিশোর কুমারের গলায় 'এ ওহ আহ'র মত সফট স্কোর ও 'ফাঙ্ক'ও। তবে সে সব ছাপিয়ে যায় অঞ্জনের কথায় ও বাপি লাহিড়ীর নিজস্ব গায়কীতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' গানটি। সৃষ্টি হয়েছিল এক নয়া ইতিহাস। 


বহু সঙ্গীতজ্ঞের মতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' ছিল সে সময়কার 'ডিস্কো আন্থেম'। বলিউডে এর আগে এমন হার্ডট্র‍্যাক, হাই-টেম্পোর, ইলেকট্রনিক ডিস্কো আগে কেউ শোনেননি। যার সাথে অদ্ভুত দক্ষতায় ভারতীয় রাগ সঙ্গীতকে মিশিয়ে ছিলেন লাহিড়ী। হার্ডকোর ডিস্কোর সঙ্গে গানের স্থায়ী ও অন্তরায় ঝিঁঝোটি'র হালকা টাচ-আপ এক অনন্যসাধারণ উচ্চতা দিয়েছিল গানটিকে। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন নিজে ছিলেন এই গানের মুগ্ধ প্রশংসক। কি অসাধারণ সেই কালজয়ী কম্পোজিশন। স্কুল জীবনের অবিস্মরণীয় মুগ্ধতা আজও অক্ষুন্ন। 

প্রায় চল্লিশ বছর ছুঁয়ে ফেলা, আজও ডিস্কো ঘরানার এক পথিকৃৎ হয়ে আছে বাপি লাহিড়ির গাওয়া এই গানটি। তার সুর, ছন্দের মাদকতা ও সর্বোপরি মিঠুন চক্রবর্তীর পারফরম্যান্স গানটিকে করে তুলে ছিল সর্বকালের সেরা 'ডিস্কো নাম্বার'। ইলেক্ট্রিক গিটার হাতে, হাত কাটা সাদা ঝকমকে টাইট পোশাকে মিঠুনের লিপে সেই গান, গায়ের চাদর ছুঁড়ে দেয়া ও গিটার আঁকড়ে নিজের ভয় ও বাঁধা পেরিয়ে সুরেলা তীর্থে ঐকান্তিক সমর্পণ এই গানটিকেই শুধু নয়, গোটা প্রজেক্ট'টিকে বেঁধে দিয়েছে অপার্থিব, প্রাণবন্ত এক অনন্য সুরেলা নস্ট্যালজিয়ায়...

সেই নস্ট্যালজিয়া যা আজও আমরা বহন করে চলেছি 'ডিস্কো'র উন্মাদনা ও অনাবিল মূর্চ্ছনায় ঝংকৃত অবিনাশী আলোর উদ্ভাসে। 


* গ্রাফিক্সঃ সোহম সেন, দ্য প্রিন্ট 

Thursday, June 3, 2021

ইশরাত-এ-কাতরাঃ একটি ভুলে যাওয়া গজল


অবিশ্বাস্য মুহূর্ত এক। খুব সম্ভবত ছয়ের দশকের প্রথম ভাগ। দক্ষিণ ভারতের লবনাক্ত বাতাসে ভাগ বসিয়েছে বসন্তকালীন হাওয়া।

মাদ্রাজের (অধুনা চেন্নাই) কিলপকে ২০ গুরুস্বামী মুদলিয়র রোডে 'কল্কি গার্ডেনে'র বাড়িতে মুখোমুখি বসে দুই নারী। সেই সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও লঘু সংগীত জগতে অবিংসবাদি যাদের আধিপত্য। না জানি সে কোন পুণ্যতিথি'তে তাঁরা প্রথম ও শেষবার মুখোমুখি বসেছেন, কালের অভূতপূর্ব, মহার্ঘ্য চক্রান্তে।

তাঁরা কোন সামান্য মানুষ নন। পরম করুণাময় ঈশ্বরের অধিষ্ঠান তাঁদের কণ্ঠে। সমসাময়িক হয়েও তবু তাঁরা দুই ভিনগ্রহের বাসিন্দা। একজনের চারণ ভূমি গজল, লঘু শাস্ত্রীয়, ঠুমরী, রাগাশ্রয়ী গান। অন্য জন আদি-অকৃত্রিম দক্ষিণ ভারতীয় মার্গ সংগীতের 'সুরলক্ষ্মী'র মহাসাধিকা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মহাজাগতিক মেলবন্ধন।

ভারিক্কি চেহারা, গলায় সোনার হার, জারদৌসির আড়ালে সপ্রতিভ চাহুনির মহিলাটির হাতে তানপুরা খেলা করে। তিনি বলেন, "আও বহেন, গাও মেরে সাথ!" অন্যদিকে একটু যেন জড়োসড়ো দ্বিতীয় জন। নীল রঙা কাঞ্জিভরমের আঁচল টেনে বললেন, "আমি কী পারব? এমন গান তো কখনো আগে গাইনি!" 

হেসে ওঠেন সেই সুন্দরী। তামাম হিন্দুস্তান যাকে 'মল্লিকা ই গজল' নামে চেনে। তিনি বলে ওঠেন - "পারবে বোন, শুধু তুমিই পারবে। কতদিনের শখ ছিল তোমায় নিজের হাতে এই গান শেখাব। আল্লা রহমত, আজ সেই সুযোগ এসেছে। তুমি তোমার মত করে গাও। তাহলেই হবে।" 

এবার যেন একটু ভরসা পেলেন শান্ত চোখের সেই নারী৷ একটু আগেই আখতারি বাঈ-র অনুরোধে তাঁকে শুনিয়েছেন মীরার ভজন 'মোহে চাকর রাখো জি'। সেই ভজন শুনে চোখের জলে ভেসে ছিলেন বেগম সাহিবা৷ জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর থেকে বছর দুয়েকের ছোট 'কুঞ্জাম্মা'কে। আর সময় নষ্ট না করে না জানি কী তাড়নায় দ্রুত হাতে তুলে নিয়েছিলেন তানপুরা৷ দিয়ে যেতে চেয়েছেন তাঁর 'রত্নখনি' থেকে সামান্য কিছু উপহার। 

সুব্বুলক্ষ্মীর কাছে অনেক আগেই আসতে চেয়েছেন আখতারি বাঈ। একসাথে কাটাতে চেয়েছেন সময়৷ করতে চেয়েছেন নিবিড় চর্চা সংগীতের অতীন্দ্রিয় জগৎ নিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা এসেছে৷ বাতিল হয়েছে মাদ্রাজ সফর।

এই তো সেবার, আখতারি বাঈয়ের মাদ্রাজ আসা প্রায় নিশ্চিত। হঠাৎ শুনলেন সুব্বুলক্ষ্মীর বাড়িতে হাজির হয়েছেন সিদ্ধেশ্বরী দেবী৷ সরস্বতীর আরেক অবতার। ছ মাস 'কল্কি গার্ডেনে' ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী৷ সে ছ'মাসে সুব্বুলক্ষ্মী পেয়েছিলেন বিশেষ তালিম। নিজের ভাণ্ডার উপুড় করে দিয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। দু'হাতে শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে তা কুড়িয়েছেন সুব্বুলক্ষ্মী।

অবশেষে এসেছে বহু প্রতিক্ষিত সময়'টি। মুখোমুখি বসেছেন দুই বিরল ব্যক্তিত্ব। বেগম আখতার ও এম এস সুব্বুলক্ষ্মী। আখতারি তাঁকে গজলের নজরানা দিতে চান৷ এমনি সেমনি 'নজম' তা নয়। খোদ মির্জা  আসাদৌলা বেগ গালিবের 'দিবান'। 

"ইশরাত-এ-কাতরা হ্যায় দরিয়া মে ফনা হো জানা
দর্দ কা হদ সে গুজারনা হ্যায় দবা হো জানা..." 

পিলু রাগের (দক্ষিণে কাপি রাগম) সেই অসাধারণ গজল আত্মস্থ করেছিলেন সুব্বুলক্ষ্মী। যেন যমুনার জল এসে মিশে গেল ভারত মহাসাগরে। সৃষ্টি হল এক অভূতপূর্ব সুরেলা জলোচ্ছ্বাস৷ বড়ে গোলাম আলী খানের ভাই বরকত আলী খানও গেয়েছেন এই গজল। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠে গালিবের যেন পুনর্জন্ম হয়েছিল সেদিন৷ 

এতদিন যে কণ্ঠে পরম শ্রদ্ধায় 'ভজ গোবিন্দম' বা 'শ্রী ভেঙ্কটেশ সুপ্রভাতম' ধ্বনিত হয়েছে, সেই কণ্ঠেই কী পরম আকুতিতে ধ্বনিত হল - 'আল্লাহ'! যেন এক আলোকিত ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য এক আলোকিত ঘরে মিশে গেল সুরকল্প। ছোট ছোট মুরকি, গমক ও মীরখণ্ড তাকে দিল এক অকল্পনীয় উচ্চতা যাকে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। রূপকথা বুঝি এভাবেই সৃষ্টি হয়৷ 

আজ বেগম আখতার বা এম এস সুব্বুলক্ষ্মী কেউই ধরাধামে নেই৷ শুধু রয়ে গেছে সে গজলটি। অসংখ্য অজানা, অশ্রুত কিংবদন্তির সাক্ষী হয়ে। ভারতীয় সংগীতের দুই কিংবদন্তি মহাসাধিকার মহাসাধনার যৌথ স্বাক্ষর স্বরূপ। 


'তবু প্রাণ নিত্যধারা' ~ এক অলীক কথোপকথন ২


রাত্রি গভীর হলে এ শহরে বিষাদ নেমে আসে। 

তোমরা তাকে চিনতে পারো না। তোমরা জানো না তাকে। একা একা পথ হাঁটে সে এ গলি-সে গলি। মাথা ঢাকা টুপি তার। গায়ে আলখাল্লা। হাতে বুঝি লাঠি থাকে। মৃদু ঠকঠক। 

রাত্রি গভীর হলে শহরে নামে বিষাদ প্রহরী। নিজস্ব কোনও নাম নেই তার। যে নামেই ডাকো, সে সাড়া দেবে না। শুধু অন্ধকার ছেঁনে হাওয়ায় ভেসে দাঁড়ায় কোনও বন্ধ দরজায়৷ অদৃশ্য নখর দিয়ে চিহ্ন আঁকে। যেন পুরনো জোব্বা থেকে এক চিমটে বিষাদ, লেপে দেয় ঘরে৷ তারপর এগিয়ে যায় অন্য দরজার দিকে৷

'নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে
বিকশিবে প্রাণ তাঁর গুণগানে...'

ধরা যাক, বিষাদের নাম 'যোগিয়া'। 'ভৈরবপুরে' তার বাড়ি৷ তার হাতে ধরা যে লাঠি, রাস্তায় মৃদু ঠকঠকে ছিটকে পড়ে কোমল রেখাব, কোমল ধৈবত নামের দুই জিন। আর থাকে এক অদৃশ্য এক মায়া, গান্ধার যার নাম। মধ্যম, বিষাদের কাঁধে বসা নীলরঙা পাখি তাকে আলতো ঠেলে দেয়। অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে৷

রাত্রি ঘন হলে বিষাদ প্রহরী গুনগুনিয়ে ওঠে। যেন পুরনো জানলার কাঁচে কাঁপন ধরায় কোনো অতন্দ্র রেলগাড়ি। বা পরিত্যক্ত গির্জার পাশে বসে থাকা উন্মাদ পাদরির প্রলাপ। আমি শুনতে পাই সেই সুর।

'তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে...'

প্রহরী জানে বিষাদের তল কোথায়। সে জানে কোন রঙে রাঙানো মন-খারাপ। তাই বারবার ফিরে আসে সুর। ঘুমন্ত শহরের অলিগলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তার মূর্চ্ছনা। 

'বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল,   
কে আর রহিল এ বনে...' 

এ বনে সত্যি আজ আর কেউ নেই। জনমানবশূন্য। একাকি রয়ে গেছে প্রহরী৷ তার কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ ভোর হয়ে আসার আগে শেষ পরিক্রমণ। দেখে নেওয়া মেপে মেপে, বিষাদ কিছু কম পড়লো কিনা! সে জানে তাড়াতাড়ি সাঙ্গ হবে কাজ। একটু পরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে সকাল। তার সাথে ফিরবে বুলেটের আওয়াজ, চাপ চাপ রক্ত, রাজনৈতিক হিংসার ভোর...

তার আগে শেষবার, শহরের পথেপথে রাত্রি গভীর হলে তার মৌরসীপাট্টা। অন্ধকার অন্ধ নয়। তারও নিজস্ব আছে চোখ, দেখার৷ অথচ তোমরা দেখতে পাও না৷ তোমরা আজও অন্ধ হয়েই আছে৷ বিষাদ তোমাদের অন্ধত্ব জানে৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে তোমার চোখের পাতা ছুঁইয়ে দেয়৷ তলিয়ে যাওয়ার আগে সে টুপি নামায়, মাথা ঝুঁকিয়ে করে সালাম। তারপর পায়ে-পায়ে হেঁটে যায় দিকচক্রবালে। 

রাত্রি গভীর হলে এ শহরের প্রতিটি দরজায় জেগে থাকে তার নখের দাগ। জন্মদাগের মত জেগে থাকা সেই আঁচড়ের নাম - 'যোগিয়া'। তার ক্ষয় নেই। 

'নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   
নাহি নাহি দৈন্যলেশ -
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে...'

* Picture. Varanasi by Donell Gumiran 

দিবান-এ-জাফরঃ এক অলীক কথোপকথন ১


"গম-এ-ইশক তো অপনা রফিক রহা
কোই ঔর বলা সে রহা না রহা..."

সুবহ হয়ে এল। আমাকে লিখতে দাও এবার। এই খাগের কলম, অস্থিমজ্জা গলিয়ে লিখেছি যে নজম, তাকে ভুলো না প্রিয় শহর। কামানের গোলায় ধ্বংস যে ঈদগাহ, দু'দণ্ড সেখানে বিছাই জায়নামাজ। ঈশা ভর করে ওষ্ঠে আমার। আয়াত নয়, নজম মিশেছে ইবাদতে৷ আমায় লিখতে দাও, পর্বরদিগার!

"দিয়া অপনি খুদ-হি কো জো হমনে উঠা
উহ জো পর্দা সা বিচ মে থা, না রহা..."

আমার সফরনামা 'গরীব-নওয়াজ' জানেন। যা কিছু অন্তরাল, যুমনার মিঠি হাওয়ায় ভেসে যাক। এখনও বাতাসে বারুদের ম্যহেক, ছিন্নভিন্ন খিলান। স্তব্ধতার ভাষা আমি লিখেছি 'দিবান' জুড়ে। শেষবারের মতো আমার জানাজায় হতে দিও সামিল। শেষবার, খুদা ই রহমত, আমায় লিখতে দাও! 

"পড়ি অপনি বুরাইয়ো পর জো নজর
তো নিগাহ মে কোই বুরা না রহা..." 

ভিরানায় একলা দাঁড়িয়ে তুমি কে? কে তুমি বলো হে ছায়াময়, পয়গম্বর আমার? নিঃস্ব, কপর্দকশূণ্য এই তাজ-ও-তখৎ  আমি কাকে দিয়ে যাব? কেউ নেই, শুধু এক বিষাদবৃক্ষ ছাড়া। আমার সলতনৎ তোমার র‍্যহম-ও-করমে ভেসে উঠুক। ভেসে যাক এই গজল, গ্রহে গ্রহান্তরে। এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই এতিমের। 

ঘুমিয়ে পড়ার আগে, আউলিয়া, শেষবার আমায় লিখতে দাও...

Wednesday, June 2, 2021

"যদি থাকি কাছাকাছি দেখিতে না পাও" ~ স্মরণে বিক্রম সিং খাঙ্গুরা


ফেরার কথা ছিল যাদের, ফেরেনি তাঁরা৷ কথা ছিল সন্ধ্যে নামার আগে জ্বলবে প্রদীপ তুলসি তলায়। তা জ্বলেনি আজও। অন্ধকার, দরজায় কড়া নাড়ে।

বহুদূর কোনো শহরতলি, মফস্বলি রাস্তায় পাক খায় ওয়াগন ভাঙার শব্দ। একলা পথের বাঁকে সে কোন অজানা সুরে কেঁদে ওঠে এস্রাজ, পিলু-বাঁরোয়ায়...

সেই পথে তুমি হাঁটোনি কোনোদিন। সে পথের ধূলো মাটিতে মিশে থাকে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা। কী হবে ঘরে ফিরে এতো তাড়াতাড়ি, ভেবে সেই রাস্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যারা ঘাঁই মেরেছিল...আজও তারা ঘরে ফেরেনি৷ কুয়াশার মতো লকডাউন নামে শহরে। 

কী হবে তাঁদের কথা ভেবে? কী-ই বা হবে যদি দেখা না মেলে এই দুঃখরাতে? এস্রাজে জমে থাকা অতৃপ্ত শীতকাল...ধুলো ঝেড়ে ফেলে রজন ঘষে নিই ছড়ে।

এ পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে যারা, তাঁদের পায়ের ছাপ আজও বৃষ্টি মুছে দিতে পারেনি। আর তুমি আবারও সেই জলছাপ ধরে হেঁটে গেছ উধাও, দিকচক্রবালে। 

ফেরার কথা ছিল যাদের, ঘরে ফেরেনি তাঁরা। আজ রাতে আমায় তাঁদের গল্প বলো...

এই বুড়ো পুরনো গিটারঃ না-বলা কিছু কথা


যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি। 
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই আজ। সত্যিই করি। 

আমি গিটার বাজাতে পারি না। অথচ সেতার বা সরোদ শেখার বহু আগে গিটার চিনেছিলাম। মনে মনে ফেলেছিলাম, ভালোবেসে। দু'একবার যে চেষ্টা করিনি, এমন নয়৷ কিন্ত ওই, শেষমেশ হয়ে ওঠেনি। 

গিটারে প্রথম হাতেখড়ি শিবুদার। মফস্বলি পাড়ার 'রেবেল', 'হাইপার ইন্টেলেকচুয়াল', কোঁকড়াচুলো, কানে দুল, গলায় অদ্ভুত সব মালা, হাতে 'জয়েন্ট'। শিবুদার ঘরের দেওয়ালে জিমি হেন্ড্রিক্স, বব মার্লে, ম্যাডোনার ছবি ছাড়াও বিস্তর আঁকিবুঁকি, গ্রাফিত্তি। 

শিবুদা গিটার অন্তপ্রাণ। তাঁর ঘরভর্তি ক্যাসেট, কী নেই সেখানে...'মাইলস', 'এলআরবি', 'ভূমি', 'মহীন', 'ক্যাকটাস', 'চন্দ্রবিন্দু', 'ফসিলস' আর অপ্রতিরোধ্য সুমন-অঞ্জন-নচিকেতার ত্রয়ী সঙ্গম। তারও আগে 'বিটলস', 'রোলিং স্টোন', এরিক ক্ল্যাপটন, ডিলান, বায়েজ, প্রিস্টলে...ছিল বব মার্লে, সান্তানা, জনসন, কোবেন, লেনন, ম্যাকললিন। আজও 'ঈগলসে'র 'হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া'র সেই পৌঁনে দু মিনিটের 'প্রিলিউড' ভুলতে পারিনি। 

শিবুদা বলতো - "গিটার শেখ!" মাঝেমাঝে জোর করে বসাতো তাঁর অ্যাকুইস্টিক নিয়ে। চিনিয়ে দিত কর্ড, প্লেকট্রাম ধরতে শেখা, স্ট্যাকাটো, বসা নোভা আরও কত কী...সেই প্রথম জানতে পারি অষ্টম শতাব্দীতে গ্রীস ও এশিয়া মাইনরে 'কিথারা' বা দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের 'গিথারা'র কথা। এরাই গিটারের বাপ-ঠাকুর্দা, আদিরূপ। 

আয়োজন কম ছিল না। অথচ জানি না কেন শিখে উঠতে পারিনি। এর পর নিঃশব্দে গিটারের জায়গা দখল করে নিয়েছে সেতার, পরে সরোদও। শুরু হয় অন্যধারার পঠনপাঠন। শাস্ত্রীয় সংগীতের কড়াক্কড় বাঁধনে৷ কিন্তু গিটার হারিয়ে যায়নি। অলিখিত রয়ে গিয়েছিল কোথাও। 

তারপর দেখি, হঠাৎ একদিন আমার পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছেন ব্রিজভূষণ কাবরা, কমলাশঙ্কর, বিশ্বমোহন ভাট, পলি ভার্গিস, দেবাশিষ ভট্টাচার্য'রা। ক্লাসিকাল গিটারের সাম্রাজ্য দখল করছে ক্লাসিকাল স্লাইড গিটার। পাশাপাশি উঠে আসছেন গোরক্ষ শর্মা, চিন্টু সিং, রমেশ আইয়ার বা ভুপেন্দ্র। সে এক অবাক পৃথিবী। 

কলেজ-ইউনিভার্সিটির 'ফেস্টে' মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াত গিটারের তরুণ তুর্কিরা। 'হার্ড রক', 'ডেথ মেটালে'র মৌরসীপাট্টা। ইলেকট্রিক গিটারে কর্কশতা ছাপিয়ে অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার 'কনানড্রাম'। আমি অবাক চোখে দেখতাম সেই মাদকতা, 'ইউটোপিয়ান টেরিটোরি'র হাতছানি। হিংসা, দুঃখ, ভালোলাগা সব মিলিয়ে সে এক অনির্বচনীয় 'সাইকডেলিক ট্রান্স'...

মাথার মধ্যে অন্ধকার এক স্টেজে কে যেন সশব্দে আছাড় মেরে ভাঙতো গিটার। ছিঁড়ে ফেলতো তার, আগুন ধরিয়ে দিত ভাঙা কাঠের শরীরে। 

একসময় ঝড় থামে। স্তব্ধতা মেখে রাত্রি নামে বোবা পৃথিবীর বুকে৷ আমি জেগে থাকি। আমার সঙ্গে রাত জাগেন অঞ্জন দত্ত। 'পুরনো গিটারে'। তিনি গাইছেন -

"ফেলে আসা কত মুখ, কত নাম ঠিকানা 
বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে
নানা কথা, নানা সুরে গান নিয়ে ঘুরে ঘুরে 
সুমনের কাছে এনে দিয়েছে
এই বুড়ো পুরনো গিটার..." 

আর সুমন! তিনি আদ্যোপান্ত মজে 'বিভূতিভূষণে'। 

"তখন বিকেল দেয় সন্ধের আল ধরে হানা
গোধুলি আঙুল রাখে আলগোছে পথের ধুলিতে..."

আমি দেখি, মানুষ নয়, দুটো গিটার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আদি অনন্তের কথোপকথন উঠে আসছে চরাচর জুড়ে। সত্যি সত্যিই, দিনের যাবতীয় আওয়াজ, কোলাহল ঝিঁঝিঁর কোরাসে মিশে যায়। 

গান নয়, কথা নয়, দুটো গিটার একে অন্যের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের তীব্র সূচক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আলতো স্পর্শ রেখে যেতে যেতে মিলিয়ে যায় শূন্যে। 

যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি খুব। 
আজও। এখনও। চিরকাল-ই।


"ইয়াবাহার', কী বাহার!" ~ ভূমধ্য সাগরের এস্রাজ

মহাকাশ। অনন্ত শূন্য। গ্রহপুঞ্জের সমষ্টি। ছায়াপথে মিশে থাকা নক্ষত্ররাজি। তারও ঊর্ধ্বে, অপার শূন্য ও স্তব্ধতার স্তব। শব্দ নেই, প্রাণ নেই, নেই স্পন্দন। অথচ তারও কী কোনও নিজস্ব সুর থাকে? 

মাটি। মাটির গভীরে মাটি। তারও গভীরে ক্লেদজল, শিকড়, খনিজ স্তর, সালফার, উত্তাপ। আর তারও গভীরে নেমে গেলে অন্ধকার। যেন সেই 'ইনফার্নো', 'পুর্গাতরি' ও 'পারাদিসো'র মধ্যবর্তী শূন্যতায় মিশে থাকা রিরংসার ধ্বনি আলেখ্য৷ 

অথবা সসাগরা পৃথিবী। অবিরত ভেঙে পড়া ঢেউ, বালিয়াড়ি, সরীসৃপ আর শৈবালের মধ্যে খুঁজে দেখা ফাঁপা শঙ্খ। যার গায়ে কান পাতলে সমুদ্রের মূর্চ্ছনা শোনা যায়৷ 

যেন কোনও দাবানল শেষ হওয়ার পর পুড়ে কালো, চিড়ে দু'ফাঁক যাওয়া কাঠের মধ্যে দিয়ে এক চিলতে হাওয়া খেলা করে ভস্মাধারে। লেলিহান অগ্নিশিখার ধ্বনিকল্পের সুরে সুরে। 

ক্ষিতি,অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। এই সেই অনাদি পঞ্চরহস্য। 

পঞ্চভূত, পঞ্চতত্ত্ব  বা পঞ্চ আঙ্গিকের সমাহারে গড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এই পঞ্চতত্ত্বেই সৃষ্টি ও লয়ের বিন্যাস। পৃথিবী জলে, জল সূর্যে, সূর্য বায়ুতে তথা বায়ু অনন্ত আকাশে লীন হয়। আর এর ঊর্ধ্বে? এর ঊর্ধ্বে কী?


তুরস্কে ভূমধ্যসাগরের তীরে, এক পরিত্যক্ত লাইট হাউসের মধ্যে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এই কথা ভাবছিল বছর পঁচিশের এক যুবক। 

গোর্কেম সেন, জন্ম ১৯৮২, ইস্তানবুল। ছোটবেলায় প্রকৃতিই ছিল তাঁর একমাত্র বন্ধু। প্রকৃতিকে নিজস্ব ছন্দে অনুভব করতো সংগীতের সুরে। যন্ত্রসংগীতে সিদ্ধহস্ত গোর্কেম চিনেছিল, তাঁর অনন্ত আশ্রয়, সুর ও ধ্বনিকল্পের জগৎ'কে।

একাকীত্ব পছন্দ করতো গোর্কেম। অবসরে বেরিয়ে পড়তো পাহাড়ে, জঙ্গলে, সমুদ্রে। সঙ্গী বলতে শুধুই 'নেহ' (তুর্কিদেশীয় বাঁশী), 'বালমা' (তুর্কিশ স্ট্রিং) বা 'খামাঞ্চে'। এই প্রাচীন যন্ত্রেই সে পেয়েছিল প্রকৃতির ছোঁয়া। কিন্তু তাতেও আসেনি সন্তুষ্টি। 

গোর্কেম মনে করতো, পঞ্চতত্ত্বের আধার বা তারও ঊর্ধ্বে থাকা অন্য কোনও তত্ত্ব (ষষ্ঠ তত্ত্ব বা সিক্সথ এলিমেন্ট) কে কী ভাবে স্পর্শ করা যায়! দার্শনিক ব্যাখায় তা সম্ভব হলেও, বাস্তবিক অর্থে তা আদৌ সম্ভব কী? হয়তো নতুন কোনও শব্দকল্পদ্রুম তার চিরকাঙ্ক্ষিত সেই খোঁজ'কে সম্পূর্ণতা দিতে পারে৷ 

গোর্কেম বিশ্বাস করেছিলেন, সাঙ্গীতিক প্রয়োগ বা ধ্বনিতত্ত্বের সূত্রে সেই 'সিক্সথ এলিমেন্ট'কে স্পর্শ করা সম্ভব। তার জন্য দরকার নতুন চিন্তা-ভাবনা, নতুন সৃষ্টি, নতুন শব্দব্রহ্ম গঠন। 

সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গোর্কেম। সুদীর্ঘ আট বছরের পরিশ্রম ও অগনিত ব্যর্থতার পর তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেই অদ্ভুত সুন্দর যন্ত্র। ইয়াবাহার। 

২০০৯ সালে তৈরি হল এক সম্পূর্ণ অন্য ধারার যন্ত্র। অবৈদ্যুতিন, কাঠ ও মেটালনির্মিত, চেলোর মত ছড় টানা, দুটি 'থাণ্ডার ড্রামে' তারের শব্দে প্রতিধ্বনি ও অস্ট্রেলিয়ার 'অ্যাবরিজিনাল'-দের বাঁশীর আদলে অতিকায় কাঠামো। এই বহুমাত্রিক সম্মেলনে উঠে এল 'ইয়াবাহারে'র বাস্তবিক রূপ। আর শব্দ? 

গোর্কেম নিজেই বলেন, প্রথম প্রথম এর শব্দ ছিল কর্কশ৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন সূক্ষ্ম 'এক্সপেরিমেন্টে'র ফলে যে শব্দটি পাওয়া গেল, তা আক্ষরিক অর্থেই 'মহাজাগতিক'। সে শব্দ এক পরাবাস্তব, অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার প্রকাশ। অন্য পৃথিবীর সুর। যা পঞ্চতত্ত্বের সম্মিলনে ষষ্ঠ তত্ত্বের আভাস। এককথায় অভূতপূর্ব  সাঙ্গীতিক 'স্পেস ওডিসি' যাকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। 

তুর্কিতে 'ইয়া' শব্দের অর্থ তার, 'বাহার' বসন্ত। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ও রাগবিন্যাসে (মাকাম) গোর্কেম সত্যি সত্যিই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন পঞ্চতত্ত্বের নেপথ্যে থাকা আরেক জগৎ'কে। সে জগৎ'কে তিনি তাঁরই সৃষ্টির হাত ধরে দিলেন বসন্তের ছোঁয়া। ২০১১ সালে গোর্কেমের 'ইয়াবাহার'-কে শতাব্দীর অন্যতম সেরা আবিষ্কারের তকমা দিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা। 

আজও গ্রীসে ও তুরস্কের সমুদ্রের ধারে গ্রামে বসে নিত্যনতুন যন্ত্র বানিয়ে চলেছেন গোর্কেম। ইয়াবাহার পেয়েছে তার দোসর - শানবাহার ও দার্ববাহার। তাঁর সৃজনশীলতা অনন্য দর্শনের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।

পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চভূত যে সৃষ্টির আধার, তার মাধ্যমে এক সম্পূর্ণ অন্যধারার তত্ত্ব এবং জগতের পরিচয় করিয়েছেন তুরস্কের এই অজানা সঙ্গীতজ্ঞ। গোর্কেম ও তাঁর 'ইয়াবাহার' এক অনন্য সুরলোকের সন্ধান দিয়েছেন, নিঃশব্দে। নিজের কথায়, যদি তিনটি শব্দে তাঁর সৃষ্টির ব্যাখা করা যায়, তবে তা হল - 

'ইনার - স্পেস - শিপ' 

সুরমূর্চ্ছনার 'অলৌকিক' মহাকাশ সফর অক্ষয় হোক। 
www.gorkemsen.com

'খুশ আমদিদ, টেগোর সাব!' পাকিস্তানে রবীন্দ্র জয়ন্তী


২৫ শে বৈশাখ অতিক্রান্ত। পায়ে পায়ে আমরা পেরিয়ে এসেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী।

অতিমারীর প্রকোপে যখন পর্যুদস্ত ভারত সহ গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে অনাড়ম্বর হলেও রাবীন্দ্রিক উৎসব, চর্চার মেজাজে মেতেছিল দুই বাংলা। 

রবি ঠাকুরের অখণ্ড বিশ্বজনীনতা শুধু দুই বাংলা বা বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যাপ্তি অপার, অভাবনীয়। বিশ্বের কমবেশি প্রায় সব দেশেই দিনটি পালিত হয়ে এসেছে৷ কোভিড আবহে সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনায় এসেছে ভাটা; তবুও বিশ্বকবির আত্মিক আরাধনায় পিছিয়ে ছিলেন না রবিভক্তরা। তা সে ভারত, বাংলাদেশ হোক বা পাকিস্তান৷ 

হ্যাঁ পাকিস্তানও৷ শুনতে আশ্চর্য লাগলেও তা সত্যি৷ খুব কম লোক জানেন, পাকিস্তানের একটি প্রাচীন সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও, ছোট আকারে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। অবশ্য তা কিন্তু অন্যান্য দেশের মতো ইংরেজি ক্যালেন্ডার মেনে। ১২৬৮ সন ২৫ বৈশাখের মাহাত্ম্য বোধকরি শুধু এপার-ওপার বাংলার মানুষ'ই কেবল বোঝে।

১৮৬৪ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রাচীন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র তিন বছর ৷ কলেজ-টির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ড. চার্লস উইলিয়াম ফর্ম্যান (১৮২১-১৮৯৪)। ১৮৪৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের দশ বছর আগে অবিভক্ত ভারতে, কলকাতায় প্রথম পা রাখেন ড. ফর্ম্যান। ১৮৪৯ এ তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাহোরে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পঞ্জাব প্রদেশে গড়ে তোলেন রঙ মহল স্কুল। এই স্কুলের লাগোয়া অঞ্চলে লাহোর ক্যানেলের ধারে একটি কলেজ গড়ে তোলেব ফর্ম্যান। প্রথমে তার নাম ছিল 'লাহোর মিশন কলেজ'। 


শোনা যায় সম্রাট শাহজাহানের এক ওয়াজিরের বংশধর জায়গাটি ফর্ম্যানকে মিশনের কাজকর্মের জন্য 'লিজ' দেন। এখানেই ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে মিশন কলেজ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কলেজের পরিচালনা কমিটির শীর্ষ পদে থেকেছেন ড. চার্লস ফর্ম্যান। তাঁর উদ্যোগেই ওই অঞ্চলে ছড়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও ভাবনা। ১৮৯৪ সালে লাহোরেই প্রয়াত হন পাকিস্তানী শিক্ষাজগতের প্রবাদ পুরুষ ড. ফর্ম্যান। আজও লাহোরের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান সিমেট্রি'তে (গোরা কবরিস্তান) চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন তিনি৷ ফর্ম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মিশন কলেজের নতুন নাম রাখা হয় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপ্রাচীন কলেজটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত৷ দেশভাগের পর তা চলে আসে লাহোরের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ২০০৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

১৫৭ বছরের ইতিহাসে এ কলেজ বহু নজিরবিহীন কৃতিত্ব গড়েছে। দিয়েছে অসাধারণ কিছু শিক্ষার্ত্রী, পরবর্তী কালে যারা আধুনিক পাকিস্তান ও ভারতে শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাজনীতির জগতের বহু স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেন। এই কলেজের প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুরেন্দ্র কুমার দত্ত, গণিতজ্ঞ আলমা মাশরিকি, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল, পঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল, মুসলিম লীগের নেতা মিঁয়া বরকত আলী, পঞ্জাবের সাংসদ বলরাম জাখর, প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ শরিফ, পাক সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুল রশিদ, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র, সাংবাদিক ও লেখক কুলদীপ নায়ার, সাহিত্যিক কৃষন চন্দ ও প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশারফ৷ নোবেলজয়ী বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার কম্পটন'ও এই কলেজে গবেষণা করেছেন, করেছেন শিক্ষকতা। আজও পাকিস্তানের আধুনিক শিক্ষাঙ্গনে গৌরবময় অধ্যায়ের নাম ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

কথিত আছে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে এ কলেজে একটি শোকসভা আয়োজিত হয়, তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রকুমার দত্তের উদ্যোগে। ২০ বছর পর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গড়া হয় একটি কমিটি৷ কিন্তু '৬৭ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যাবতীয় রবীন্দ্রচর্চায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন জেনারেল আয়ুব খান সরকার। বন্ধ হয়ে যায় রবীন্দ্রচর্চা। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় কবি আলমা ইকবালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা টেনে এনে কবিগুরুর সাহিত্য প্রতিভাকে কখনই সম্মান দিতে চায়নি কট্টরপন্থী পাক সরকার। পরে নয়ের দশকের প্রথম ভাগে পরিস্থিতি শান্ত হলে আবারও নতুন করে পাকিস্তানে শুরু হয় রবীন্দ্র চর্চা। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তাতে নিয়েছিল অগ্রনী ভূমিকা। নয়ের দশকের মাঝামাঝি কলেজের ইতিহাস ও সাহিত্য বিভাগ যুগ্ম ভাবে পালন করা শুরু করে রবীন্দ্র জয়ন্তী৷ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকেরা একসাথে অংশ নেন তাতে। 'সেই ট্র‍্যাডিশন আজও সমানে চলেছে'। 

২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিখ্যাত 'ডন' পত্রিকায় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে বছর কলেজে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের শতবর্ষ পালিত হয়। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সাথে এউইং লিটারারি সোসাইটি যৌথ ভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে৷ রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্র রচনা পাঠ ও সত্যজিৎ রায়ের ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সে উপলক্ষে। 

কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান ড. ইয়াকুব বাঙ্গাশ বলেছিলেন, "অবিভক্ত ভারত হোক বা বর্তমান সময়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রবাদ ও সমাজচেতনা চির অক্ষয়, অমলিন। কোনও দেশকালের গণ্ডি দিয়ে তাকে মাপা সম্ভব নয়।" কলেজের আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ড. ওয়াসিম আনওয়ার জানান, "একসময় রবীন্দ্র ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু খ্যাতনামা পড়ুয়ারা শান্তিনিকেতন পাড়ি দিয়েছেন। রাজেশ্বরী বাসুদেব (কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত) তার অন্যতম। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, চিন্তা ও মননের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে দেখছে। তাঁর ভাবধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছ।" আনওয়ার বলেন, "ভুললে চলবে না পাকিস্তানের রাষ্ট্রপিতা মহম্মদ আলী জিন্না নিজে রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। আজও আমাদের কাছে বিশ্ব সাহিত্যের ত্রয়ী সাধক নমস্য। এঁনারা হলেন আলমা ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং রবীন্দ্রনাথ।" 

২০২০ সালে গোটা বিশ্ব জুড়ে আছড়ে পড়েছে কোভিড ঢেউ৷ ২০২১ এ এসেছে দ্বিতীয় তরঙ্গ। সেই মারণ হিল্লোলে লণ্ডভণ্ড ভারত, পাকিস্তানও। তবু দু'দেশের সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতিমনস্ক উদারমনা মানুষ আজও রবীন্দ্রচর্চা থেকে সরে আসেননি। সরে আসেনি ১৫৭ বছরের ঐতিহ্যশালী লাহোরের ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। নিঃশব্দে, নিভৃতে রবীন্দ্র সাধনা করে চলেছেন তারা। অতিমারীর সঙ্কটকালে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের কাছে আজও সমান ভাবে গৃহীত রবি ঠাকুরের সেই বাণী - "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত..." 

রবীন্দ্র প্রদর্শিত সেই মুক্তির আলোয় ভেসে, আজও দেশকালের বিরোধ ভুলে রবীন্দ্র আরাধনায় নিমগ্ন লাহোরের 'প্রেসিডেন্সি' - ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

---------------------
তথ্যসূত্র. 'দ্য ডন' সংবাদপত্র, 'ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্র, ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, দিল্লি, উর্দু আকাদেমি - লাহোর ও দিল্লি, জার্নাল অফ রিসার্চ ইন হিউম্যানিটিজ এবং হিস্টরিকাল সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি অফ পঞ্জাব, লাহোর এবং নিউজলেটার, ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ, লাহোর। 


ছবি. ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ গ্যালারি।