শীতকালের সঙ্গে কীর্তনের এক রহস্যময় সম্পর্ক। অনেকটা ঠিক পুরনো প্রেমের মত। হারিয়ে গিয়েও যা ফিরে আছে বারবার। অথচ কেন হারায়, হারিয়ে যেতে হয়, তা কেউ জানে না। সে এক আশ্চর্য!
তিনদিন ধরে পেছনের মাঠে বসেছিল নামকীর্তনের আসর৷ আজ শেষ হল। ছাদ থেকে দেখলাম খিচুড়ি খাওয়ানো হচ্ছে। খুলে ফেলা হচ্ছে শামিয়ানা। ছুটে বেড়াচ্ছে কচিকাঁচার দল, এদিক সেদিক। শশব্যস্ত তদারকি করছেন কর্মকর্তারা।
বাসিমালা, গেঁদাফুল পড়ে আছে বিরহী বিষ্ণুপ্রিয়ার মত, একাকি। একটু দূরে অবাক চোখে এসব কীর্তি দেখছেন রাধামাধব। তাঁর দিকে নজর দেওয়ার মত সময় নেই কারোর৷ একটা কুকুর, ছানাপোনা সমেত শালপাতায় তখন উচ্ছিষ্টসন্ধানী৷
মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কথা। মফস্বল ঘেঁটে উঠে আসা শৈশব, কৈশোর এ দৃশ্য বহুবার দেখেছে। তখন এক মায়াবী সময়। শীতকাল কখন ঝুপ করে নেমে এসেছে ঠাহর হতো না। শুধু দেখতাম এ পাড়া, সে পাড়ায় ভেসে উঠতো অলীক ছাউনি। জ্বলজ্বল করছে হ্যাজাক, বা ঘোলাটে টিউব। একপাশে তার মহাপ্রভুর মূর্তি। অন্য পাশে রাধাগোবিন্দ। ঘামতেল গন্ধমাখা ত্রিভঙ্গমুরারি। প্রেমঘন, ধ্যানস্থ, এবার বুঝি জাগবেন, সাড়া দেবেন।
সমুদ্রের ঢেউয়ের মত একটু একটু আছড়ে পড়তো শ্রীখোলের বোল। চাপ চাপ কুয়াশা পিছনে ফেলে বেজে উঠতো হারমনিয়াম, কর্তাল, মঞ্জিরা। অনন্ত শূন্য থেকে নেমে আসা মাইক, কখনও তাও উধাও। খালি গলায় ঝড় উঠতো গাদানহাটি ও রেনেটি'তে। তাকে শান্ত করতো মনোহর্ষী বা মান্দারনি। অঞ্চল জুড়ে ধ্বনিত হতো - 'হরি বলো! হরি বোল!' স্নায়ু জুড়ে, রক্তমাংসে তখন অষ্টপ্রহর নাম-সংকীর্তণ।
অবাক চোখে দেখতাম মানুষগুলো'কে। রাত জেগে জেগে গান। সকালে গান, বিকেলে গান, দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে গান। রসকলি কাটা কীর্তনীয়ার পাগলের মত ঊর্ধ্ববাহু নৃত্য। নাচতে নাচতে কাঁদতো, কাঁদতে কাঁদতে হেসে লুটোপুটি, হঠাৎ আবার একে অন্যকে জড়িয়ে 'চোখের জলে লাগল জোয়ার'। কী ভাবে যে কাটতো দিন, গড়াতো রাত তাও বোঝা যেত না। সে এক অলৌকিক 'সাইকডেলিক ট্রান্স'।
সময় ঘুরতে থাকে। মফস্বলি মায়া কাটিয়ে অতিদ্রুত ''নাগরিক হয়ে ওঠা। রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন শুধু-ই ইস্পাত আর ধাতব সংঘাত। কবে হারিয়ে গেছে পালাকীর্তন, মাথুর, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, রাসলীলা, পদাবলী বা নামসাধন। এবার বাড়ির পিছনে, রেললাইনের ধারে একচিলতে মাঠে তিনদিন ধরে চলা পালাকীর্তন তবু ফিরিয়ে দিল অনেকটা'ই।
সেও এক আশ্চর্য সমাপতন। সন্ধ্যের মুখে কলমের ডগায় তখন আছড়ে পড়ছে কৃষক আন্দোলন, দিল্লি সীমান্তে সারসার তাঁবু, ভুখা চাষির মুখ, ঘড়ির ব্যস্ত কাঁটায় ডেডলাইনের তাড়া, বাজেট অধিবেশন আর কানের গোড়ায় খাবি খাচ্ছে পূর্বরাগ লীলা, গৌরাঙ্গ আবির্ভাব। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে 'পরবর্তী নিবেদন বলরাম গোস্বামী ও সম্প্রদায়, নদীয়া'। না চাইতেও কান চলে যাচ্ছে অমোঘ আকর্ষণে। 'মরিব মরিব সখী, নিশ্চয়ই মরিব'। এবার আসছেন রামপুরহাট থেকে সঙ্গীতা চক্রবর্তী ও সম্প্রদায়৷ 'ধরা দেবে কী দেবে না কানাই / মরণ বাঁশি পোড়াব আগুনে'।
আমি কান পেতে শুনি। গানের পর গান ভেসে চলে। আহা, এ তো মনে হচ্ছে শ্যাম কল্যাণ, আরে এটা যে দেশ, এ তো কেদার...আহা দরবারি আছে তাহলে। অন্য দিকে চলতে থাকে কলম। কৃষকরা আন্দোলন প্রত্যাহার করবে না৷ নিঃশর্ত আইন প্রত্যাহারে তারা অটল। ট্র্যাক্টর র্যালির পর এবার কী লংমার্চ, সংসদ ঘেরাও নাকি আলোচনার টেবিল? কলম ছুটে চলে। মাইকে ভেসে আসে গান - 'সখী, আমি কেন গেলাম যমুনায়?'
বহুদিন পর কর্ণকুহরে বৃষ্টি নামে। তবে শুধুই যে তা 'অমৃতবারিধারা' এমন নয়, কিঞ্চিৎ 'হলাহল'ও ছিল। মোহভঙ্গ হয়েছে যখন দেখেছি হিন্দি বা বাংলা চটুল সুরকে কীর্তনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে এক ভয়াবহ বিস্ময়। বোঝা যায়, বেনোজল অনেকটা-ই ঢুকে পড়েছে 'মহানামব্রতে'। হয়তো কোনও অশনি সংকেত, আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। হয়তো বোধ, মনন, চিন্তনের দৈন্যতার সুপ্রকাশ। ভেসে যাওয়াই যেখানে অনিবার্য। নজরুলের ভাষায় - 'বৃথা প্রবোধ দিস নে ললিতে'!
একসময় সব আসর-ই ভাঙে৷ মিলনমেলা যেখানে নিতান্তই রূপক মাত্র। ভালো আর খারাপ সেখানে হাত ধরাধরি করে উঠে আসে। বলে ওঠে 'জগন্নাথ মিশ্রের কুপুত্র নিমাই / এইটা বুঝি আর সেইটা করে গো'। স্তব্ধতা নেমে আসে চরাচরে। আর আমি ভাঙা দেরাজ খুলে বের করে আনি 'গীতশ্রী'-র ক্যাসেট। চালাবার উপায় নেই। রিল জড়িয়ে গেছে বহুদিন৷ আমি তার গায়ে হাত বোলাই। পরম মমতায়। ভাঙা টেপ রেকর্ডার থেকে ফের যেন উপচে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সময়। আমার 'মাথুর' ছেলেবেলা।
মীরাবাঈ'কে কতটাই বা চিনেছি আমরা? আমাদের 'গীতশ্রী'-ই সম্বল। তিনিই বাঙালির একান্ত, প্রেমতীর্থ মীরা। আধ্যাত্মিক, সাঙ্গীতিক সাধনসঙ্গী।
'গীতশ্রী'র কণ্ঠে মাথুর, মহানাম সংকীর্তন, পদাবলী আমাদের মীরাভাব ঘটিয়েছে। মধ্যবিত্তের পরিধিতে জাগিয়েছে কৃষ্ণনাম, লীলাময় অতীন্দ্রিয় ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ। তিনি ব্যতিত বাংলার সাধনমার্গ অসম্পূর্ণ।
দোল পূর্ণিমার শেষলগ্নে তাই 'গীতশ্রী'-ই পরমাশ্রয়। তাঁর সুরের পথ ধরে বৃন্দাবনের ফাগুয়া ভেসে আসে বাংলার আকাশে৷ গভীর রাতে সেই লীলাক্ষেত্র যেন হয়ে ওঠে সুরের মায়াবী মথুরা৷ পদাবলী কীর্তন শুধু একা রাত জাগে গৃহস্থালি চৌকাঠে৷
দূর বহুদূর হতে ভেসে আসে রাতের গাড়ির হুইসিল। পদাবলী কীর্তনের ঘোরে আমরা ভাবি কানুর বাঁশি বেজে উঠেছে মফস্বলি দৈনন্দিনতায়। এমন রঙের উৎসবের কী আদৌ শেষ বলে কিছু আছে?
আমি দেখতে পাই ছোট্ট মফস্বল। চাপ চাপ কুয়াশা নেমেছে রেললাইনে। ছোট ছোট শামিয়ানা। প্রবীণ, প্রবীণা-দের ভিড়। কীর্তন হচ্ছে সেখানে। ঘুরে ঘুরে গান গাইছেন এক মহিলা। গলায় গেঁদাফুলের মালা, কপালে রসকলি। দূরে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, পায়েস, পাঁচ মেশালি, নিরামিষাশী। কীর্তনীয়া শ্রীখোল হাতে তালে তালে নাচছেন। বাজছে হারমনিয়াম, বেহালা, মঞ্জিরা৷ দূরে ফুলে ফুলে সুসজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাধামাধব। আহা, শ্রীমুখে তাঁর অলৌকিক আঁধারবিনাশী আলো। সে আমার একান্ত নিজস্ব, অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তণ।
'সখী রে, সে আনন্দ রসোঘন বিগ্রহ...'