Wednesday, June 9, 2021

বেদেনী বাঁশির সুরেঃ দুই বাংলার সুরেলা সফর


লম্বা বেণী, কাঁখে কলসি, পাছাপেড়ে হলুদ শাড়ি পড়া মেয়েটি জিভ ভেঙিয়ে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। টকটকে লাল রঙের ব্যাণ্ডমাস্টারের পোশাকে পড়া নায়ক তাল গাছে পিঠ ঠেকিয়ে, তেমনি লাল রঙা বাঁশিতে তুলছে সুর। গাইছে গান - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে / আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়েছে"। 

আশি-নব্বইয়ের দশক হোক বা একুশ শতক, এই গান শোনেনি বা এই গানের কথা জানে না এমন বাঙালি 'বিরল'। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল তোজাম্মেল হক বকুলে'র ম্যাগনাম ওপাস 'বেদের মেয়ে জোসনা'। ছবির নায়ক ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জু ঘোষ। কিছু কিছু সিনেমার শুধু নাম-ই যথেষ্ট তার গোত্র চেনানোর জন্য, বাকি কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। 'বেদের মেয়ে জোসনা' নিঃসন্দেহে সেই ঘরানার অন্যতম জ্যোতিষ্ক৷ এই গান-ই তার 'সিগনেচার মার্ক'। 

কাঞ্চন তখন প্রতিষ্ঠিত নায়ক৷ ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবীর পরিচালিত 'পরিণীতা'র জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। 'বসুন্ধরা', 'ডুমুরের ফুল', 'শেষ উত্তর', 'নালিশ', 'অভিযান'...একের পর এক হিট ছবি দিয়ে গেছেন কিশোরগঞ্জের তরুণ'টি। সেই তুলনায় ইন্ডাস্ট্রি'তে তখনো 'মাটি' পাননি অঞ্জু। কেরিয়ারের প্রথম দিকে হিট ছবি দিলেও সে সময় একের পর এক ছবি তাঁর ফ্লপ। কেউ কাজ দিচ্ছে না। অঞ্জুর সাথে তখন কাজও করতে চাইছেন না ইন্ডাস্ট্রির অন্য কলাকুশলীরা। কিন্তু তাঁর সহজাত অভিনয় ক্ষমতার উপর ভরসা রেখেছিলেন বকুল। 'ডেবিউ' ছবি 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তে নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জুকেই বেছে নেন তিনি। বাকিটা ইতিহাস। 

১৯৮৯ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় তোজাম্মেলের এই ফোক ফ্যাণ্টাসি 'বেদের মেয়ে জোসনা'। কী আছে এই সিনেমায়? সাপে কাঁটা রাজকন্যা, পালক বেদে পিতার ঘরে বড় হওয়া, বীণ বাজিয়ে সাপ নাচানো, রাজপুত্রের সাথে প্রেম, ফলে রাজার বিরাগভাজন, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, সন্দেহ, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে মিলন ও ভালোবাসার জয়। সেই অর্থে ভাবতে গেলে, সাদামাটা লোককথার ছায়াদৃশ্য নির্মাণ। কিন্তু সেই সহজ-সরল, চড়া দাগের আর্তি-ই মানুষের মন ছুঁয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। অতি  সাধারণ খেটে-খাওয়া নিম্নবর্গের গরীব মানুষের। আর ঠিক এখানেই বাজি মেরেছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা'। মানুষ এই ছবি দেখতে গিয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়ে, আবার হাসিমুখে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। 

ছবি মুক্তির আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল গানের রাইটস। প্রথম দুটি সপ্তাহ চলে 'ড্রাই রান'। এর পরেই আসে সুনামি। বক্স অফিসের যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে দেয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। বোধকরি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ব্যবসায়িক ভাবে চূড়ান্ত সফল 'বেদের মেয়ে জোসনা' রাতারাতি রচে ফেলে ইতিহাস। 'ঢালিউডে' (ঢাকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) আজও সেই রেকর্ড অক্ষুন্ন। রাতারাতি কয়েক লক্ষ ক্যাসেট বিক্রি হয়ে যায় এই সিনেমা-টির। ওপার বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শোনা গেছিল সেই গান। 

কালক্রমে বেদেনী বাঁশির সুর কাঁটাতার পেরিয়ে ঢুকে পড়ে এপারেও। ১৯৯১ সালে প্রযোজক মতিউর রহমান পানু এপার বাংলার দর্শকের জন্য তৈরি করেন নতুন ভার্সন, যেখানে নায়িকা এক থাকলেও আসেন এপার বাংলার নায়ক চিরঞ্জিত। ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু দে'র মতই চিরঞ্জিত-অঞ্জুর অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রি দারুণ সাড়া ফেলেছিল। এপার বাংলাতেও তুমুল হিট হয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। চিরঞ্জিতের কেরিয়ারের অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে ওঠে এই ছবি'টি৷ এই ছবির সূত্র ধরেই পরবর্তী কালে ঢাকা ছেড়ে কলকাতামুখী হন অঞ্জু। সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিসরে পা রেখে বিজেপি-তে যোগ দেন তিনি। 

বলে রাখা ভালো, তথাকথিত বাঙালি 'এলিট' সমাজ অবশ্য কোনও দিনই এই ছবিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং তাচ্ছিল্যের সাথে নাক সিঁটকিয়েছে, ঠাট্টা-তামাশাও করেছে৷ কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, শহরতলি বা মফস্বলে যে ম্যাজিক ঘটিয়েছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা', অনেক তাবড়-তাবড় সিনেমাকেও তা ম্লান করে দেবে। তবে ছবির গ্রহণীয়তা ও গুণমত মান নিয়ে সে সময়েও চলেছে বহু তর্কবিতর্ক, আজও তা নিয়ে উঠতে পারে সওয়াল। নানা মুনির নানা মত৷ তাই সে নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। 

সিনেমায় ছিল একটি-দুটি নয়, ১১ টি গান। ছবির সুরকার ছিলেন আবু তাহের, গীতিকার তোজাম্মেল হক বকুল ও হাসান মতিউর রহমান৷ প্রায় এক ডজন গানের অধিকাংশ-ই হিট। অ্যান্ড্রু কিশোর, রুণা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং খুরশিদ আলমের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা কণ্ঠদান করে ছিলেন এতে৷ দশটি গানের কথা লেখেন বকুল। 'মা আমি বন্দী কারাগারে'র কথা লিখেছিলেন মতিউর রহমান৷ এক সময় দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছিল এই ছবির গান৷ 'মায়ায়  গড়া এই সংসার', 'প্রেম যমুনায় সাঁতার দিলাম', 'পাহাড়িয়া সাপের খেলা', 'আমার লাগিয়া বন্ধু' বা 'কী ধন চাইব আমি রাজা'র মতো অসংখ্য গান সহজ সরল কথা ও গ্রাম্য সুরের প্রভাবে মানুষের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রুণা লায়লা এবং অ্যান্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে টাইটেল সং - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে..."। এপার ওপার দুই বাংলাতেই আজও যার জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। 

তবে খুব কম লোক'ই জানেন এই গানটির একটি বিখ্যাত হিন্দি গানের সুরে অনুপ্রাণিত৷ সুরকার আবু তাহের (১৯৫৪-১৯৯৯) ছিলেন ঢাকা সিনে ইন্ডাস্ট্রির খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক। সাবেক বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু সব রকমের গানে ছিল তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী প্রাক্তনী আবু তাহেরের পিতা ধীর আলি মিঁয়া ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। সংগীত পরিবারের ছেলে আবু তাহের ইন্ডাস্ট্রি'তে কাজ শুরু করেন  সুরকার আলাউদ্দিন আলির সহকারী রূপে৷ এর পর একে একে 'ভাগ্যবতি', 'ঘোমটা', 'ধনবান', 'আশা ভালবাসা', 'সুজন সখি', 'তুমি আমার', 'গাড়িয়াল ভাই', 'ভালবাসার ঘর', ও 'রাখাল রাজা'র মতো একাধিক হিট ছবির সুর দেন। তবে 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছিল তাঁর সেরা কাজ। এইচ এম ভি থেকে পান ডবল প্ল্যাটিনাম ডিস্ক'ও৷ এক সাক্ষাৎকারে তাহের বলেছিলেন, বলিউডের গান তাঁকে আকৃষ্ট করতো। 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তেও নিঃশব্দে রয়ে গেছিল তার প্রভাব। ১৯৯৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর অকালমৃত্যু না হলে আরও অনেক প্রত্যাশা ছিল তাহের মিঁয়ার কাছে। এও এক দূর্ভাগ্য! 

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ভারত ভূষণ ও মধুবালার 'ফাগুণ'। বিভূতি মিত্রের পরিচালনা সহ কামার জালালাবাদির রচনা ও কিংবদন্তি সুরকার ও পি নইয়ারের সুরে 'ফাগুনে'র প্রায় সবক'টি গান ছিল হিট। অধিকাংশ গান গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে ও মহম্মদ রফি। সিনেমা যতটা না হিট হয়, তার চেয়ে বেশি হিট হয় এর গান। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল "ইক পরদেশী মেরা দিল লে গ্যয়া" গানটি। সাপুড়ে বীণের সুরে গান'টি সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেই সুরে-ই মথিত হন তাহের। 'বেদের মেয়ে জোসনা'র টাইটেল সং-এ পুনরায় শোনা যায় সেই সুর। একই সুর, একই ছন্দ ও একই চলন; হিন্দির পাশাপাশি এবার বাংলা-তেও তুলেছিল জনজোয়ার। খারাপ, ভালোর ঊর্ধ্বে সেই গানের অসম্ভব, অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। 

সুরের বৈশিষ্ট্যই বুঝি এরকম। অন্য ভাষার সুর, কী অবলীলায় মিশে যায়, ওতপ্রোত হয় আরেকটি ভাষায়। বেদেনী বাঁশির সুরে মিলেমিশে এক হয়ে যায় প্রাদেশিকতা, আন্তর্জাতিকতা। এখানেই সুরের মাহাত্ম্য, দেশ কাল পেরিয়ে সংগীতের অখণ্ড বিজয় যাত্রা। লোকজ, মেঠোসুরের অভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা। 

অতএব, জয় কালনাগিনীর জয়!  

No comments:

Post a Comment