মেলোফবিয়া। সনোফবিয়া। ফোনোফবিয়া।
একটি বিরল মানসিক রোগ। নাম অনেক। 'ভয়'টা একটাই। সঙ্গীত, সুর বা সুরেলা শব্দের ভয়। অদ্ভুত এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন ম্যহলার, স্ট্রস, ক্যারেন এন বা স্ত্রকোভিচের মত 'কম্পোজার'রা।
এই রোগেই আক্রান্ত হয়েছিল গানপাগল ছেলেটি। গিটার ধরতে ভয় পেত সে। ভয় পেত গান গাইতে। অথচ এমনও ছিল না তার জীবন।
গানপাগল ছেলেটি ভালবাসতো সুর, পায়ের ছন্দে খুঁজে পেত বেঁচে থাকবার আনন্দ। 'স্ট্রিট সিঙ্গার' থেকে 'ডিস্কো ড্যান্সারে'র দুর্লঙ্ঘ পথ অতিক্রম করার সাহস দেখিয়েছিল সে। সাধাসিধে অনিল থেকে হয়ে উঠেছিল 'জিমি'- দ্য ডিস্কো ড্যান্সার।
কিন্তু প্রত্যেক গল্পেই ভালো লোকেদের পাশাপাশি যেমন কিছু 'মন্দলোক' থাকে, এখানেও যথারীতি ছিল তারা। তারা জিমির ক্ষতি চায়। চায় সে যাতে আর কোনদিন গান না গাইতে পারে। আর সে জন্য চক্রান্ত করে ছেলেটির সাধের 'ইলেক্ট্রিক গিটারে' জড়িয়ে দেয় বিদ্যুতের তার। ছুঁলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু।
স্টেজে পারফর্ম করতে গিয়ে 'ইলেক্ট্রকিউটেড' হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। লেসলি হার্ভে, কেথ রেল্ফ, অগাস্টিন ব্রিওলিনি, বারবারা ওয়েল্ডেন মত শিল্পীরা 'তড়িতাহত' হয়ে মারা যান। 'রক লিজেন্ড' কেথ রিচার্ডস, ব্রিটিশ গিটারিস্ট নিয়াল হোরা, পপ গায়িকা ক্যেশা, এমনকি 'বিটলস'-র বিখ্যাত জর্জ হ্যারিসনের মত শিল্পীরা ইলেক্ট্রকিউটেড হয়ে মরতে মরতে প্রাণে বাঁচেন।
সেই দলেই নাম লেখাতে পারত জিমি। কিন্তু গিটার ছুঁয়ে ফেলেন তার মা। চোখের সামনে তার মা'কে 'বিদ্যুৎস্পৃষ্ট' হয়ে মরতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। 'মেলোফবিয়া'র শিকার হয় জিমি। যদিও সে ভেঙে পড়েনি। আরেক 'স্ট্রিট সিঙ্গার' রাজু চাচার উৎসাহে সেই গিটারই হাতে তুলে নেয়। যে গিটার কেড়ে ছিল তার মায়ের প্রাণ, সেই গিটার বাজিয়ে সে গেয়েছিল - 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায় তেরা পেয়ার'।
১৯৮২ সালে মুক্তি পেয়েছিল মিঠুন চক্রবর্তীর ডান্স ড্রামা 'ডিস্কো ড্যান্সার'। ভারতীয় সিনেমা সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা মিউজিক্যাল'টি নির্দেশনা করেন বি সুভাষ। কাহিনি লিখেছিলেন 'মহাভারত' খ্যাত ড. রাহী মাসুম রেজা। গীতিকার ছিলেন সেই সময়কার দুই প্রথমসারির লিরিসিস্ট অঞ্জন এবং ফারুক কাইজার। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী অপরেশ ও বাঁশরী লাহিড়ীর ছেলে অলকেশ, বলিউড ইন্ডাস্ট্রি যাকে চেনে বাপি লাহিড়ীর নামে।
সাতের দশকের মাঝামাঝি ভারতে ছড়ায় ডিস্কোর উন্মাদনা। ভারতে তখন একটু একটু করে ছড়াচ্ছে 'হিপি' সংস্কৃতি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী আন্দোলনের যে ঢেউ আছড়ে পড়ে ছিল, পরবর্তী কালে তাই রূপ নেয় যাযাবর জীবন এবং আধ্যাত্মিকতার এক অন্য দিগ-দর্শনের অন্বেষণে। উত্তর আধুনিক সমাজচেতনা, গৃহযুদ্ধ, ভিয়েতনাম ওয়ার, আফগানিস্তানে গণ অভ্যুত্থান, ইওম কিপুর যুদ্ধ তথা ইরান-ইরাক সংঘর্ষের নেপথ্যে নতুন করে 'ইউটোপিয়ান' চিন্তাধারা সমৃদ্ধ করেছিল হিপি ও জিপসী জীবনধারাকে। হিপিদের সেই বিশ্ব পর্যটন নতুন সংজ্ঞা পায় ভারতে এসে। গান্ধীবাদী দর্শনের আলোয় প্রতিফলিত হয় আধ্যাত্মিক চেতনাবিকাশ ও বিনির্মানের সংস্কৃতি। উঠে আসে 'মোক্ষলাভে'র নয়া মার্গ, গঞ্জিকাসেবন, নেশান্মক্ততা সহ যৌনতা, গিটার বাজিয়ে উচ্চৈঃস্বরে গান, অদ্ভুত পোশাক, নাচ ও যোগের মাধ্যমে। অনেকে এও মনে করেন ভারতে ডিস্কো সংস্কৃতির পুরোধা হিপি'রাই। সাতের দশকের মধ্যভাগ পেরিয়ে ভারতই সে সময় বিশ্বের হিপি'দের কাছে নয়া তীর্থক্ষেত্র।
স্বাভাবিকভাবেই বলিউড সেই প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেনি। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ফিরোজ খান পরিচালিত ও অভিনীত 'কুরবানী'তে প্রথম শোনা গেছিল সেই ডিস্কো ট্র্যাক 'আপ জ্যায়সা কই মেরে জিন্দেগী মে আয়ে'র মত গান। জন্মসূত্রে ভারতীয় অথচ ব্রিটিশ সুরকার বিড্ডুর সুরে গান গেয়ে মাত করেছিলেন ১৫ বর্ষীয় পাক-তরুনী নাজিয়া হাসান।
হাসানের গাওয়া 'ডিস্কো দিওয়ানে'ও প্রবল সাড়া ফেলেছিল ভারত ও পাকিস্তানে। আরাবিয়ান ফক এসে মিশেছিল ডিস্কোতে, সৃষ্টি হয়েছিল 'লায়লা ও লায়লা'র মত গানও। এরপর বলিউডে ছেয়ে পড়ে ডিস্কো ঝড়। উঠে আসে সালমা আগার 'ঝুম ঝুম ঝুম বাবা', 'ডিস্কো স্টেশন', ঊষা উত্থুপের 'রাম্বা হো হো' কিম্বা আশা ভোঁসলের কন্ঠে 'প্যার করনে ওয়ালে'র মত একাধিক অবিস্মরণীয় সব ট্র্যাক। গানের কথাতেও আসে বিরাট 'পরিবর্তন'। আজও মানুষ সেই সব ব্যতিক্রমী সৃষ্টি ভোলেনি।
সেই ডিস্কো জোয়ারে নয়া ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে মিঠুন চক্রবর্তীর 'ডিস্কো ড্যান্সার'। 'মেলোফবিয়া' আক্রান্ত এক নাচিয়ের গল্প। গল্প তার সংগ্রামের, ডিস্কোর প্রতি তার উন্মাদনা। গল্পের সাথেই তাল মিলিয়ে উঠে আসে এর গান। আজও সেই কাজ বাপি লাহিড়ীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ রূপে চিহ্নিত। 'কুরবানী'র দু'বছর পর '৮২ সালে মুক্তি পাওয়া 'ডিস্কো ড্যান্সার' ভেঙে দিয়েছিল সব রেকর্ড। এই সিনেমায় শোনা যায় ৮ টি গান। যার মধ্যে বিজয় বেনেডিক্ট'র 'আই এম আ ডিস্কো ড্যান্সার', 'জিমি জিমি আজা আজা' গেয়ে ঝড় তোলা পার্বতী খান, বাপি ও ঊষা উত্থুপের ডুয়েটে 'আউব্বা আউব্বা' বা নন্দু ভিণ্ডের 'কৃষ্ণা ধরতি পে আ যা তু' ছিল ১০০% ডিস্কো ট্র্যাক। অধিকাংশ গানগুলিই ছিল পাশ্চাত্য ডিস্কো, রক, সফট মেটাল ও 'সিন্থপপ' অনুপ্রাণিত। সাথে ছিল সুরেশ ওয়াদেকরের কন্ঠে 'গোরো কি না কালো কি' বা কিশোর কুমারের গলায় 'এ ওহ আহ'র মত সফট স্কোর ও 'ফাঙ্ক'ও। তবে সে সব ছাপিয়ে যায় অঞ্জনের কথায় ও বাপি লাহিড়ীর নিজস্ব গায়কীতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' গানটি। সৃষ্টি হয়েছিল এক নয়া ইতিহাস।
বহু সঙ্গীতজ্ঞের মতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' ছিল সে সময়কার 'ডিস্কো আন্থেম'। বলিউডে এর আগে এমন হার্ডট্র্যাক, হাই-টেম্পোর, ইলেকট্রনিক ডিস্কো আগে কেউ শোনেননি। যার সাথে অদ্ভুত দক্ষতায় ভারতীয় রাগ সঙ্গীতকে মিশিয়ে ছিলেন লাহিড়ী। হার্ডকোর ডিস্কোর সঙ্গে গানের স্থায়ী ও অন্তরায় ঝিঁঝোটি'র হালকা টাচ-আপ এক অনন্যসাধারণ উচ্চতা দিয়েছিল গানটিকে। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন নিজে ছিলেন এই গানের মুগ্ধ প্রশংসক। কি অসাধারণ সেই কালজয়ী কম্পোজিশন। স্কুল জীবনের অবিস্মরণীয় মুগ্ধতা আজও অক্ষুন্ন।
প্রায় চল্লিশ বছর ছুঁয়ে ফেলা, আজও ডিস্কো ঘরানার এক পথিকৃৎ হয়ে আছে বাপি লাহিড়ির গাওয়া এই গানটি। তার সুর, ছন্দের মাদকতা ও সর্বোপরি মিঠুন চক্রবর্তীর পারফরম্যান্স গানটিকে করে তুলে ছিল সর্বকালের সেরা 'ডিস্কো নাম্বার'। ইলেক্ট্রিক গিটার হাতে, হাত কাটা সাদা ঝকমকে টাইট পোশাকে মিঠুনের লিপে সেই গান, গায়ের চাদর ছুঁড়ে দেয়া ও গিটার আঁকড়ে নিজের ভয় ও বাঁধা পেরিয়ে সুরেলা তীর্থে ঐকান্তিক সমর্পণ এই গানটিকেই শুধু নয়, গোটা প্রজেক্ট'টিকে বেঁধে দিয়েছে অপার্থিব, প্রাণবন্ত এক অনন্য সুরেলা নস্ট্যালজিয়ায়...
সেই নস্ট্যালজিয়া যা আজও আমরা বহন করে চলেছি 'ডিস্কো'র উন্মাদনা ও অনাবিল মূর্চ্ছনায় ঝংকৃত অবিনাশী আলোর উদ্ভাসে।
* গ্রাফিক্সঃ সোহম সেন, দ্য প্রিন্ট