Sunday, July 4, 2021

গুলৌ মে রঙ ভরেঃ ফয়েজ ও রুণা লায়লার সফর


"কাফস উদাস হ্যায় ইয়ারো সবা সে কুছ ত কহো
কহী ত ব্যহর-এ-খুদা আজ জিকর-এ-ইয়ার চলে..." 

[এই বিষাদ-পিঞ্জর ছুঁয়ে, হে বন্ধু! 
ভোরের হাওয়াকে বলো, ঈশ্বরের দোহাই
আজ আমার প্রেয়সীর খবর শোনাও...]

"গুলো মে রঙ ভরে বদ-ই-নৌ-বাহার চলে" 

না জানি কতবার শুনেছি। ঘুমের মধ্যে কিম্বা জাগরণে। যেন স্বর্গভ্রষ্ট কোনো সুর। যেন অতীন্দ্রিয় কোনো টান। জড়িয়ে রয়েছে আষ্টেপৃষ্টে আমায়। 

আমি দেখতে পাচ্ছি, একটা ঘনান্ধকার জেলখানা। রাওয়ালপিন্ডির কুখ্যাত মন্টগোমারি প্রিজন। আলো পর্যন্ত ঢোকে না সেখানে। ঢুকলেও, তা না ঢোকার মতন। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন 'সেল'-এর একপাশে বসে 'নজম' লিখছেন এক রাগী যুবক। 

তাঁর উস্কোখুস্কো চুল, ঠোঁটে ধরা সিগারেট, চারপাশে বাতিল কাগজের টুকরো জানান দিচ্ছে তাঁর আসল পরিচয়। তিনি ফৈজ আহমেদ ফৈজ। সময়টা ১৯৫৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। তিনিই লিখেছেন এই কবিতা। 

এর ঠিক দশ বছর পর, ১৯৬৪ সাল। লাহোরে মুক্তি পায়  "ফিরাঙ্গি"। সুরকার রশীদ আত্রে সুর দেন ফৈজের এই রচনায়। কণ্ঠজাদুতে তাতে প্রাণসঞ্চার করলেন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী মেহেদি হাসান। সিনেমা হিট, গান কালজয়ী। বাকিটা ইতিহাস। 

গুলো মে রঙ, ফৈজ আহমেদ আর মেহেদী হাসান। যেন এক অনন্তের কারুকাজ। অনন্যসাধারণ এক যুগলবন্দী। যেন একে ওপরের দোসর। পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের 'হায়দরে'ও ঠাঁই পেয়েছিল এই সুর। আজও সেই সুরের আগুন জ্বলছে। 

এরপর বহুবার, বহু জায়গায় বিভিন্ন কাজের সূত্রে শুনেছি এই গান। শুনেছি বিভিন্ন ঘটনাচক্রে। তবে তা একচেটিয়া পুরুষ কণ্ঠেই। নারীকণ্ঠে এই প্রথম। অথচ ১৯৮১ সালে রুণা লায়লা গাইলেন এই গান। নিজস্ব আঙ্গিকে, নিজস্ব ঘরানায়, কণ্ঠমাধুর্যে। তিনি এলেন, দেখলেন ও জয় করলেন...

আজ এই গান শুনতে শুনতে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই সব ইতিহাস। সুরেলা ইতিহাস। তার কিছুটা আলোয়, কিছুটা অন্ধকারে ঢাকা। তবু সেই আলো-আঁধারিয়া থেকে ভেসে ওঠে সুর। ঝিঁঝিট রাগের অনালোকিত ছায়াপথ ধরে। বাংলাদেশ থেকে সুরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে পাকিস্তানে, তামাম দুনিয়ায়। আমি শুনতে পাচ্ছি রুণা গাইছেন -

" বড়া হ্যায় দর্দ কা রিস্তা ইয়ে দিল গরীব হী সহি 
তুমহারে নাম পে আয়েঙ্গে গম-ই-গুসার চলে।" 



Sunday, June 27, 2021

মনু মুখোপাধ্যায়ঃ স্মরণে ও শ্রদ্ধায়


'মছলিবাবা'র চেয়ে কোনো অংশে কম যান না 'গোবিন্দ অপয়া'। বরং মনে করি অনেকাংশে টেক্কাও দিয়েছেন তিনি।

গোবিন্দ বিশ্বাস ওরফে গোবিন্দ অপয়া। 

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'পাতালঘরে'র অবিশ্বাস্য সেই চরিত্র। সকাল সকাল যার মুখ দেখলে কপাল পুড়তে বাধ্য৷ বিপদ অবশ্যম্ভাবী। আর সেই চরিত্রেই বাজিমাৎ করেছিলেন মনু মুখার্জি। 

১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের 'জয় বাবা ফেলুনাথ'। 'মছলিবাবা'র চরিত্রে মনু মুখোপাধ্যায় অদ্বিতীয়। সংলাপ সে অর্থে ছিল না কিছুই। রেবা মুহুরির কণ্ঠে "মোহে লাগি লগন গুরু" ভজন শুনতে শুনতে মাথা নাড়ানো। তার পর চোখ বড় বড় করে "এক হী ব্রহ্মা, এক হী সূর্য, এক হী চন্দ্র মা"... যার ডায়লগ থ্রোয়িং শুনে জটায়ু সভয়ে বলেছিলেন - "গায়ে কাঁটা দিচ্ছে মশাই...গ্রেট পার্সোনালিটি!" 


সত্যজিৎ ও মনু মুখার্জির যুগলবন্দীতে 'মছলিবাবা' অমরত্ব পেয়েছেন। বাঙালি কোনোদিন তাকে ভুলবে না। 'বোলো বোলো মছলিবাবা কী...'!

সাল ২০০৩। 'জয় বাবা ফেলুনাথে'র প্রায় ২৫ বছর পর মুক্তি পেয়েছিল অভিজিৎ চৌধুরীর 'পাতালঘর'। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে। ছোটদের সিনেমা নিয়ে আমার দেখা অন্যতম সেরা কাজ৷ অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মিতা বশিষ্ঠ, রমাপ্রসাদ বণিক, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কেতকী দত্ত, সুনীল মুখার্জি, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, সৌরভ ব্যানার্জি এবং 

'গোবিন্দ অপয়া'র চরিত্রে মনু মুখোপাধ্যায়।

পার্শ্বচরিত্র কী ভাবে কাহিনির মূলচরিত্র'দের ছাপিয়ে যায় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল 'পাতালঘর'। আর 'মেথড" অভিনয়ের মুনশিয়ানা কোন উচ্চতায় যেতে পারে তা আরও একবার প্রমাণ দিয়েছিলেন মনু বাবু। যারা 'পাতালঘর' দেখেছেন 'গোবিন্দ অপয়া' চরিত্র'টিকে ভুলতে পেরেছেন বলে তো মনে হয় না। আর যদি ভোলেন, 'মছলিবাবা'র কসম, গোবিন্দ অপয়ার 'শকুনদৃষ্টি' তাঁদের উপর পড়বেই, তা এই বেলা বলে রাখলুম...

'পাতালঘর'-এর আরও একটি সম্পদ এই ছবির গান ও আবহ। গীতিকার রঙ্গন চক্রবর্তী। সংগীত পরিচালনায় দেবজ্যোতি মিশ্র, আমাদের দেবুদা। 

আজও মনে করি দেবুদার অন্যতম সেরা ১০ টি কাজের মধ্যে থাকবে 'পাতালঘর'। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক হোক ভারতীয় মার্গ সংগীত, লোকসংগীত হোক বা কীর্তন...বাংলা সিনেমা সংগীতে এমন অসাধারণ মেলবন্ধন সত্যিই 'বিরল'! 

'পাতালঘরে'র প্রতিটি গানই অনবদ্য। তবে আমার অলটাইম ফেভারিট স্বপন বসুর কণ্ঠে মনু মুখার্জির লিপে - "তুমি কাশী যেতে পারো যেতে পারো গয়া/ পাবে না এমন দ্বিতীয় অপয়া!" কীর্তনাঙ্গে গাঁথা সেই গানে মনু বাবুর নাচ, এক্সপ্রেশন, টাইমিং...আহা অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। 

আজ মনুবাবুর প্রয়াণের সাথেসাথেই শেষ হল বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী অধ্যায়ের। সত্যিই শেষ কী? নাকি পুনর্জাগরণ? শুরুর শুরু? 

মনু মুখোপাধ্যায়ের ক্ষয় হতে পারে। 
কিন্তু 'মছলিবাবা' বা 'গোবিন্দ অপয়া'র ক্ষয় নেই। 
তাঁরা অমর, চিরশাশ্বত। 


অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীঃ স্মরণে ও শ্রদ্ধায়


২০০৮-০৯ সাল৷ তখন যাদবপুরে৷ ওয়ার্ল্ডভিউ'তে। 

কাজ বলতে সপ্তাহের পাঁচদিন বুকস্টোর সামলানো। আর সপ্তাহান্তে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া অজানা কোনো গ্রাম, নাম না জনপদে লোকগানের সন্ধানে৷

সাথে থাকতো ডায়েরি, কলম, রেকর্ডার, ক্যামেরা, জলের বোতল এবং সুধীর বাবু বা শক্তিনাথ বাবুর  লেখা কোনো বই। অব্যর্থ গাইডবুক হিসেবে। 

সেবার এসেছি কৃষ্ণনগর। আমি আর সাথে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সোহম, সোহম দাশগুপ্ত। আমার সব গবেষণার বিষয়ে সঙ্গী, ভ্রাতৃপ্রতিম সুজন চাটুজ্যের বাড়ি ওখানে। ওখানেই বাড়ি বন্ধু অভিনন্দনদত্ত, অয়ন দত্তের। তাঁরাও সবাই জুটলো একে একে। 

আমাদের গন্তব্য চাপড়া। পবিত্র বড়দিন উপলক্ষে খ্রীষ্ট-বাউলদের জমায়েত ও আখড়ায়। সুধীর বাবুর একটি লেখা থেকেই হদিশ পাওয়া। এমন একটি সম্প্রদায় যে আছে, তাই জানতাম না। তাঁদের ধর্ম, জীবনদর্শন, সংগীত, তথাকথিত বাউলদের সাথে তাঁদের মিল-অমিল ও লোকায়ত ভাবধারা তখন আমাদের গবেষণার বিষয়। তাই কৃষ্ণনগর...

কলকাতা ছাড়ার আগেই ওঁনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। এক নয়, একাধিক বার৷ যেদিন আসব, তার আগের দিন - "আসছো? বাহহ, ভালো কথা। দেখা করো।" সে আর বলতে! কৃষ্ণনগর যাচ্ছি আর সুধীরবাবুর সাথে দেখা করবো না, তা কী হয়? সে ভাবেই হল সব বন্দোবস্ত। 

যথা সময়ে পৌঁছলাম কৃষ্ণনগর। জলঙ্গীর ধারে পানুবাবুর লজে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুজন, অয়ন। অয়নের বাবা অঞ্চলের শ্রদ্ধেয় নেতা গৌরীশঙ্কর (দত্ত) কাকুর লাইব্রেরি এখনো ভুলিনি৷ ভুলিনি আমার এই দুই বন্ধুর বাড়িতে কাটানো কিছু অসাধারণ মুহূর্ত। সেই আন্তরিকতা, ভালোবাসা ভোলার নয়৷ 

চাপড়ায় রওনা হওয়ার আগের দিন রাতে চার মক্কেল হাজির হয়েছিলাম সুধীরবাবুর বাড়ি৷ সেই সুধীরবাবু, শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তী। এতদিন শুধুই তাঁর লেখাই পড়েছি, হয়েছে ফোনে কথা। এবার মুখোমুখি হওয়া "বাংলার গৌণধর্ম", "দেহতত্ত্বের গান", "জনপদাবলি", "গভীর নির্জন পথে" তথা "বাউল ফকির কথা" র লেখকের সঙ্গে।

সেই রাতটি আজও ভুলিনি। মোটা ফ্রেমের, ফর্সা, রাশভারি চেহারার মহাপণ্ডিত মানুষটির মুখোমুখি আমরা চার নভিশ। অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছিলেন গবেষণার কথা, লোকায়ত দর্শন, সংগীত নিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত চর্চার কথা। দিয়েছিলেন পথের হদিশ৷ বলেছিলেন - "সব রেকর্ড করে নিও। ভালো ভাবে কাজ করো।" 

পরের দিন হাজির হয়েছিলাম চাপড়ায়। সাক্ষী থেকেছিলাম খ্রীষ্ট মেলা ও খ্রীষ্ট বাউলদের সংগীত যাপনের। অবাক হয়েছিলাম চাপড়ার প্রাচীন চার্চ ও গোরস্থান দেখে। সুধীরবাবুর নির্দেশ মেনেই দেখা করেছিলাম খ্রীষ্ট বাউল সম্প্রদায়ের অন্যতম বাউল স্যামুয়েল মণ্ডলের সাথে৷ শুনেছিলাম গান ও তাঁদের জীবন যাপনের অলৌকিক আখ্যান। সুধীরবাবু পথ না দেখালে তা কতটা সম্ভব হতো জানা নেই। 

পরবর্তী কালে বেশ কয়েকবার কথাও হয় সুধীর বাবুর সঙ্গে। খ্রীষ্ট-বাউলদের নিয়ে আমার আর্টিকেল পড়ে খুশি হয়েছিলেন। চেস্টারে পিএইচডি-র জন্য বাংলার খ্রীস্ট বাউল'দের গবেষণার কাজ হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা শুনে, মনে আছে ফোনে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন - "ভালো করে কাজ করো৷ কিছু দরকার হলে বলো।" আজ সে সব অতীত। 

সুধীর চক্রবর্তীর প্রয়াণের সাথেসাথে বাংলার গান ও লোকায়ত সংগীত বিষয়ক গবেষণার জগতে নিঃসন্দেহে এক যুগের অবসান হল। সংগীত সহ লোকধর্ম, নিম্নবর্গের সংস্কৃতি, দেশজ শিল্পকলা ও সাহিত্য-শিক্ষা জগতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। শুধু পাণ্ডিত্যের প্রতিফলনই নয়, আমাদের মতো বর্তমান প্রজন্মের কাছে যথাযথ 'মাস্টারমশাই' হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷ চিনিয়ে ছিলেন প্রত্ন সংগীতের লোকজ রূপ, মাটির সুরে মিশে থাকা গ্রাম্য জীবন দর্শনের অপাপবিদ্ধ আলো। 

সেদিন কৃষ্ণনগর যাওয়ার সময়ে ব্যাগে ছিল তাঁরই লেখা বই। "ব্রাত্য লোকায়ত লালন"। ভেবে ছিলাম যদি একটা অটোগ্রাফ দেন...কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। কথায় মাঝে হারিয়ে গেছিল সময়। আজ তাঁরই সেই বইয়ের পাতা ওল্টাতে গিয়ে চোখ পড়ে গেল উৎসর্গ পত্রে লেখা দুটি লাইন - 

"যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে 
তখন ভাবের খেলা ভেঙে যাবে।" 

শব্দ-নৈঃশব্দ্যের পাড়ে যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন 'মাস্টারমশাই'! 

Sunday, June 13, 2021

তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়ঃ তসাওয়ার খানুমের সফর


দিন দুয়েক আগের খবর। 

নিউজে শুনলাম রাহুল রয়, নয়ের দশকে বলিউডের ডাকসাইটে অভিনেতা কার্গিলে শুটিং করতে গিয়ে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। নানাবতী'তে ভর্তি, আইসিইউ-তে। 

রীতিমতো মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই অভিশপ্ত বছর, ভারি অলুক্ষুনে সময়। কতশত প্রিয় মানুষ অসময়ে পাড়ি দিচ্ছেন না-ফেরার দেশে। সেই তালিকায় বুঝি যুক্ত হলেন রাহুলও। আমার একলা দোকলা ছেলেবেলার একসময়ের প্রিয় নায়ক তিনি। 

রাহুল মানেই আমার কাছে 'জুনুন' (১৯৯২) 'ফির তেরি কহানী ইয়াদ আয়ি' (১৯৯৩) বা 'প্যায়ার কা সায়া' (১৯৯১) আর অতি অবশ্যই মহেশ ভাটের 'আশিকী'র মত সিনেমাগুলি। অদ্ভুত ভালো লাগতো তাঁর হেয়ার স্টাইল। রবিবার প্রভাত'দার দোকানে চুল কাঁটতে গিয়ে বলেছি "আশিকী কাট করে দাও"। প্রভাত'দা হাসতে হাসতে বাটি ছাঁট মেরে ছেড়ে দিয়েছে।  

কী অসাধারণ ছিল 'আশিকী'র (১৯৯০) গানগুলি। আহা, নাদিম-শ্রবণের সুরে সমীরের লেখা অসামান্য সব গানগুলি গেয়ে ইতিহাস রচেছিলেন কেদারনাথ ভট্টাচার্য ওরফে কুমার শানু। তার 'ফিমেল ভার্সানে' কোনও অংশে কম যাননি অনুরাধা পোড়ওয়াল'ও।  

'আশিকী'র একডজন গানের মধ্যে প্রায় সবকটিই হিট। প্রতিটি গানই সুরে, কথায়, গায়নে অনবদ্য। তিরিশ বছর পেরিয়ে এসে আজও তার রেশ রয়ে গেছে। বলিউডের অন্যতম সেরা কম্পোজিশন। ২ কোটির উপর 'আশিকী'র ক্যাসেট বিক্রি হয়েছিল সেই সময়। আজও সেই রেকর্ড অক্ষত। 


অথচ খুব কম মানুষই জানেন যে এর অধিকাংশ গান-ই ছিল সাতের দশকের পাকিস্তানি গজল ও কাওয়ালি অনুপ্রাণিত। ইচ্ছে করেই 'কপি' শব্দটি উল্লেখ করলাম না৷ কারণ মূল গানের সুর ও কথার বিস্তর প্রভাব থাকলেও, এর রিমেক ভার্সানগুলিও গুণগত মানে কোনো অংশে কম ছিল না। 

তেমনই একটি অত্যন্ত প্রিয় গান ছিল "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"। সত্তরের দশকে অপূর্ব এই গজলটি গেয়েছিলেন বিখ্যাত পাকিস্তানি গায়িকা তসাওয়ার খানুম। মূল গানটির রচনাকার তসলিম ফজলি ও সুর দেন ললিউডের কিংবদন্তি সুরকার নাসাদ। 

তসাওয়ার খানুমের জন্ম পাক গুজরাটে, ১৯৫০ সালে। তসাওয়ারের তালিম বিখ্যাত গায়ক পরভেজ মেহেদীর কাছে। পরে প্রথিতযশা সারেঙ্গী বাদক উস্তাদ বুটা আলী খানের কাছেও তালিম নেন তিনি। অল্প বয়সেই পাক টেলিভিশন ও রেডিও'তে গজল গাওয়া শুরু করেন তসাওয়ার। এরপর সরাসরি নেমে পড়েন প্লে ব্যাকে। 

পঞ্চাশ বছরের কেরিয়ারে অসংখ্য হিট গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর নাম চিরতরে জুড়ে যায় "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"-র সাথে। ১৯৭৭ এ আমীর আলী শাহ নির্দেশিত "মহব্বত মর নেহি সকতি" সিনেমাটি'তে পুনরায় এই গানটি শোনা যায় মেহেদি হাসান, নূরজাহানের কণ্ঠে। কিন্তু তসাওয়ারের 'উচ্চতা' অন্তত এই গানে স্পর্শ করতে পারেননি তাঁরা, এমনটাই মনে করে থাকেন গুণীজনেরা। 

১৯৯০ তে সেই বিখ্যাত গজলটিকেই নতুন আঙ্গিকে নিয়ে এলেন নাদিম-শ্রবণ। নতুন করে তাকে শব্দের মোড়কে মুড়লেন গীতিকার সমীর। বাকি ইতিহাস গড়ে দিলেন কুমার শানু। রাহুল রয় অভিনীত "আশিকী"কে নতুন উচ্চতা দিয়েছিল কাওয়ালী অঙ্গের এই গানটি। 

খবর পেলাম সুস্থ হয়ে উঠছেন রাহুল। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। তিনি দ্রুত আরোগ্য লাভ করুন এই প্রার্থনা করি। আর একই সাথে আবারও ফিরে যাই কিন্নরকণ্ঠি তসাওয়ার খানুমের কাছে। 

কুমার শানু এই গানটি যতই অসাধারণ গান না কেন, কিন্তু তসাওয়ারের কণ্ঠমাধুর্য ও অভাবনীয় সেই স্বর্গীয় আকুতির তল পাওয়া দুস্কর। কারণ আজও তামাম সঙ্গীতরসিক মানুষের কাছে "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়" মানেই তসাওয়ার খানুম। 

গান ও গায়িকা, এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে একে অন্যের সাথে...আজও তা অবিচ্ছেদ্য! 

"মেরি দিল মে তু হি তু হ্যায় / তেরি রোশনী হ্যায়..."

Wednesday, June 9, 2021

ব্যোমকেশ ধ্বনিঃ এক অপার্থিব যুগলবন্দী


'I have had a dream to try to combine Western and Indian music into a new form, a music which has no particular name but is melodious and touching...' 

- Ananda Shankar, Sitar Virtuoso 

সেলুলয়েডে যে কোন চরিত্র, প্লট বা বিষয়কেন্দ্রীক রূপায়নে 'থিম' বা আবহ সঙ্গীতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রথমসারির চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সঙ্গীত পরিচালকেরা দীর্ঘদিন ধরে থিম নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এসেছেন। রেখেছেন 'থিম' নির্মাণে নিজস্ব মুনশিয়ানার স্বতন্ত্র ছাপ। 

উদাহরণ স্বরূপ প্রথমেই যার নাম মনে আসে তিনি সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের ফেলুদা থিম আমাদের অতি পরিচিত, রোমাঞ্চ ও ভালোলাগার বিষয়। এই থিমটিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা 'থিম' সংগীত রূপেও মনে করা হয়। ম্যোৎসার্টের সিম্ফনি নং ২৫ এর বিস্তর প্রভাব পাওয়া যায় মানিকবাবুর রচনায়। সঙ্গীতজ্ঞ'দের একাংশ মনে করে থাকেন, প্রাশ্চাত্য সঙ্গীতের উচ্চমানের সমঝদার ছিলেন মানিকবাবু। তাঁর 'কম্পোজিশনে' বারংবার ঘুরে ফিরে এসেছে বাখ, ম্যোৎসার্ট, বিঠোফেনের ছায়া। এসেছে লোক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রয়োগও। থিম মিউজিক কিম্বা আবহ নিয়ে সত্যজিতের চিন্তাভাবনা, প্রয়োগ এবং দর্শন যে কোন মার্গে উন্নীত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।  

১৯৬৭ তে প্রকাশ্যে আসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের প্রথম ও উত্তম কুমার অভিনীত সত্যজিৎ রায়ের 'চিড়িয়াখানা'।  ১৯৭৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিতের 'সোনার কেল্লা'। সেই একই সালে মুক্তি পেয়েছিল মঞ্জু দে অভিনীত ও পরিচালিত 'শজারুর কাঁটা'। সতীন্দ্র ভট্টাচার্য হয়েছিলেন ব্যোমকেশ, অজিত শৈলেন মুখার্জি যিনি 'চিড়িয়াখানা'তেও অজিত হয়েছেন। পাঁচ বছর পর ৭৯' সালে তার সিক্যুয়ল 'জয়বাবা ফেলুনাথ'। এর পাক্কা ১৪ বছর পর ৯৩' সালে দূরদর্শনে প্রচারিত হয় সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জি'র এপিক হিন্দি সিরিয়াল - 'ব্যোমকেশ বক্সী'। কথা-সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্রটিকে প্রথম প্রাদেশিকতার গণ্ডী উত্তীর্ণ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। ১৯৯৩-৯৭ সালের মধ্যে দূরদর্শনের হাত ধরে বাংলা  তথা বাংলার বাইরে তথাকথিত গোয়েন্দা চরিত্রটি তুলে ধরা সহজসাধ্য ছিল না। সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। তাঁর হাত ধরেই প্রথম ব্যোমকেশ বক্সীকে চিনেছিল গোটা দেশ। বাংলা সহ অবাঙালি মহলে কি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায় বাসুবাবুর 'ব্যোমকেশ বক্সী', তা সর্বজনবিদিত। ব্যোমকেশের চরিত্রে রজিত কাপুর, অজিত কে কে রায়না ও সত্যবতীর চরিত্রে সুকন্যা কুলকার্নির সে অসাধারণ অভিনয়, গল্পের পাতা থেকে যেন উঠে এসে চরিত্রগুলির সার্থকতা লিখে দিয়ে গেছিল। পাশাপাশি উৎপল দত্ত (সীমন্ত হীরা) এবং রবি ঘোষের (অমৃতের মৃত্যু) মত বরেন্য অভিনেতাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল এই সিরিজ। 


এরপর আদিগঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে বহু জল। মুড়ি মুরকির মত নির্মিত হয়েছে ব্যোমকেশ-কে নিয়ে অগুনতি সিনেমা, সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ তথা রেডিও ড্রামা ইত্যাদি ইত্যাদি। গুণগত মানে তার অনেকগুলি খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পেলেও, নয়ের দশকে নির্মিত সেই হিন্দি টেলি-সিরিজের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, সবদিক মিলিয়েই। হিন্দি বলয়ে 'ব্যোমকেশ বক্সী'কে নিয়ে চর্চা করার আর একবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন আরেক তরুণ বাঙালি পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জি তাঁর নির্মিত 'ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী' (২০১৫) সিনেমাটির মাধ্যমে। সিনেমাটি তেমন না চললেও গবেষক ও বিদ্দ্বজ্জন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। হিন্দি বলয়ে বাঙালি ডিটেকটিভ ফেলুদা চরিত্র'টিকে প্রতিষ্ঠিত করার দুঃসাহসিক চেষ্টা করেছিলেন সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়। শশী কাপুর ও মোহন আগাশে'কে নিয়ে হিন্দি টেলি সিরিয়াল 'কিসসা কাটমান্ডু কা', আশির দশকের শেষার্ধে। অবাঙালি মহল তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও, বাঙালি দর্শক তা খারিজ করে দিয়েছিল একেবারেই। 

ফিরে আসি 'থিমে'র প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রে গোয়েন্দা কাহিনিতে 'থিমে'র একটি বিশেষ অবস্থান আছে বলে আমার মনে হয়। সত্যজিতের ফেলুদা থিমের সূত্র ধরে যদি আমরা দেখি, তবে কিন্তু উঠে আসবে বহু দৃষ্টান্ত। হলিউডে 'জেমস বন্ড' মুভিজে ব্যবহৃত বিখ্যাত সেই 'থিমে'র কথা মনে করুন। পাঁচ পাঁচটি অস্কার জয়ী বিখ্যাত মার্কিন কম্পোজার জন ব্যারি (১৯৩৩-২০১১) ছিলেন তার সুর রচয়িতা। পরবর্তী কালে ডেভিড আর্নল্ড, জর্জ মার্টিন সহ থমাস এম নিউম্যান, মাইকেল কামেন বা হ্যান্স জিমারের মত প্রথিতযশা সুরকারেরা ব্যারির সেই 'ঐতিহ্য'ই বহন করে চলেছেন। 

আশির দশকের শেষে আগাথা ক্রিস্টির এরক্যুল পয়রো টেলি সিরিজের সেই অসামান্য মেলোডিক স্যাক্সোফনিক 'থিম' আমরা কেউই ভুলিনি। ব্রিটিশ কম্পোজার ক্রিস্টোফার গানিং ছিলেন তার অমর স্রষ্টা। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অমর সৃষ্টি শার্লক হোমস সিরিজের সেই 'থিম' বানিয়ে তাকে রাতারাতি দর্শকের মনের কাছাকাছি এনে ছিলেন ডেভিড আর্নল্ড, মাইকেল প্রাইস ও পরবর্তী কালে হ্যান্স জিমার। এই তালিকা যথেষ্ট দীর্ঘায়িত। 

মজার বিষয়, আজ যখন পিছনে ফিরে অসামান্য এই ডিটেকটিভস 'থিম'গুলিকে শুনি, অদ্ভুতভাবে চোখে পড়ে ব্যোমকেশ বক্সীর সেই অনন্যসাধারণ থিম মিউজিক বা সিগনেচার টিউন'টির কথা। যার কথা নিয়ে তেমন আলোচনা চোখেই পড়েনা। বাসু চ্যাটার্জি'র হিন্দি টেলি সিরিয়ল ব্যোমকেশ বক্সীর সেই 'থিম' উৎকর্ষতার নিরিখে অনায়াসেই কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাতে পারে ফেলুদা, হোমস, বণ্ড বা পয়রো সিরিজের বিখ্যাত সেই সিগনেচার টিউন বা থিম গুলিকে। 'ব্যোমকেশ বক্সী-র সেই অসাধারণ থিম'টি বানিয়েছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক আনন্দশঙ্কর। ভারতীয় টেলি সোপ ইতিহাসে অন্যতম সেরা 'সিগনেচার টিউন'টি আজও বিশেষ  সমাদৃত। 

১১ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে আলমোড়ায় জন্ম নেন আনন্দ শঙ্কর। বাবা-মা কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর ও অমলা শঙ্কর। কাকা আরেক কিংবদন্তি সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ছোটবেলা থেকেই সেতারের প্রতি ঝোঁক থাকলেও, মজার ব্যাপার, বিশ্ববিখ্যাত কাকার কাছে কখনো তালিম নেননি আনন্দ। পরবর্তী কালে সম্ভাবনা থাকলেও যাননি কোন অযাচিত প্রতিযোগীতায়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মহাপণ্ডিত, শিক্ষক, সেতারি এবং বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক গুরু লালমনি মিশ্রের কাছে তালিম নেন আনন্দ। মার্গ সঙ্গীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্য সঙ্গীত, বিশেষ করে ক্ল্যাসিকল ও আধুনিক রকের প্রতি সমান আকৃষ্ট হন তিনি। 'ফিউশনে'র প্রতি বরাবর ছিল তাঁর মুনশিয়ানা। সেই আগ্রহ যথার্থ রূপ পায় ষাটের দশকে আনন্দ শঙ্করের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জিমি হেন্ড্রিক্স সহ বহু প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে তিনি পারফর্ম করেন। শুরু হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়ে তাঁর অসাধারণ সব 'এক্সপেরিমেন্ট'। উঠে আসে 'Jumping Jack Flash' বা 'Light my Fire' এর মত কম্পোজিশন। ১৯৭৫'র মাঝামাঝি দেশে ফিরে নতুন করে গবেষণায় মাতেন আনন্দ।  সেতারের মূর্চ্ছনার সঙ্গে অবলীলায় মিশতে থাকে ওয়েস্টার্ন রক গিটার, স্যাক্সোফোন, ড্রামস, বাঁশী, সিন্থেসাইজার। ১৯৭৮-৯৮ সাল, কুড়ি বছরের মধ্যে 'ফিউশন মিউজিকে'র নয়া দিগন্ত খুলে দিয়েছেন আনন্দ। ফলস্বরূপ, সৃষ্টি হয় 'India Remembers Elvis', 'A Musical Discovery of India', 'Missing You' বা 'Sa Re Ga Machan' এর মত অসাধারণ সব কম্পোজিশন। পরবর্তী কালে 'Streets of Calcutta', 'Indra Sabha', 'The River', 'Snow Flower', 'Dancing Drums' বা 'Walking On'-র মত রচনা তাকে খ্যাতির শীর্ষে তোলে। ১৯৯৯-এর ২৬ মার্চ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত তাঁর নির্দেশিত পথে বিশ্ব সঙ্গীতকে আরও কতভাবে সমৃদ্ধ করতো তা সত্যি কল্পনাতীত। 


নয়ের দশকে বাসু চ্যাটার্জির অনুরোধে 'ব্যোমকেশ বক্সী'র টাইটেল ট্র‍্যাকের জন্য সুর দেন তিনি। বাসু চেয়েছিলেন সেই সুরে যেন আধুনিকতার ছোঁয়া ও টানটান রোমাঞ্চের সাথে মিশে থাকে বাঙালিয়ানা। তাই করেছিলেন আনন্দ। ব্যোমকেশ বক্সীর ট্র‍্যাকে সেতারের মূর্চ্ছনা, সরোদের রহস্যাবৃত মন্দ্র স্বরের পাশাপাশি শ্রীখোলের অসাধারণ ট্রিটমেন্ট আজও অবিস্মরণীয়। পাশাপাশি ব্যবহার হয় সিন্থ-ডেলিক টিউন। তৈরি হয় ইতিহাস। সত্যজিতের ফেলুদার থিমের পাশাপাশি আনন্দ শঙ্করের ব্যোমকেশ ধ্বনি সিগনেচার টিউন বা থিম মিউজিকে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সোয়া এক মিনিটের সেই টাইটেল ট্যাক আজকের ভারতীয় দর্শকদের এক নিমেষে মথিত, রোমাঞ্চিত, নস্ট্যালজিক করে তোলে। 

সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জির স্মৃতির পথে হেঁটে আরও এক প্রথিতযশা সুরকার, সেতারবাদক ও বিশ্ব সঙ্গীতের কীর্তিমান সাধক আনন্দ শঙ্করের সাঙ্গীতিক অবদানের কথা তুলে ধরার একটাই উদ্দেশ্য - আমরা যেন সেই সব অতুলনীয় কীর্তির কথা বিস্মৃত না হই। সেই 'আনন্দ' ধ্বনি দশকের পর দশক এভাবেই আমাদের অনুপ্রাণিত করুক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে উঠে আসা অনাবিল সুরের ঝরনাধারায়... 

বেদেনী বাঁশির সুরেঃ দুই বাংলার সুরেলা সফর


লম্বা বেণী, কাঁখে কলসি, পাছাপেড়ে হলুদ শাড়ি পড়া মেয়েটি জিভ ভেঙিয়ে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। টকটকে লাল রঙের ব্যাণ্ডমাস্টারের পোশাকে পড়া নায়ক তাল গাছে পিঠ ঠেকিয়ে, তেমনি লাল রঙা বাঁশিতে তুলছে সুর। গাইছে গান - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে / আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়েছে"। 

আশি-নব্বইয়ের দশক হোক বা একুশ শতক, এই গান শোনেনি বা এই গানের কথা জানে না এমন বাঙালি 'বিরল'। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল তোজাম্মেল হক বকুলে'র ম্যাগনাম ওপাস 'বেদের মেয়ে জোসনা'। ছবির নায়ক ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জু ঘোষ। কিছু কিছু সিনেমার শুধু নাম-ই যথেষ্ট তার গোত্র চেনানোর জন্য, বাকি কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। 'বেদের মেয়ে জোসনা' নিঃসন্দেহে সেই ঘরানার অন্যতম জ্যোতিষ্ক৷ এই গান-ই তার 'সিগনেচার মার্ক'। 

কাঞ্চন তখন প্রতিষ্ঠিত নায়ক৷ ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবীর পরিচালিত 'পরিণীতা'র জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। 'বসুন্ধরা', 'ডুমুরের ফুল', 'শেষ উত্তর', 'নালিশ', 'অভিযান'...একের পর এক হিট ছবি দিয়ে গেছেন কিশোরগঞ্জের তরুণ'টি। সেই তুলনায় ইন্ডাস্ট্রি'তে তখনো 'মাটি' পাননি অঞ্জু। কেরিয়ারের প্রথম দিকে হিট ছবি দিলেও সে সময় একের পর এক ছবি তাঁর ফ্লপ। কেউ কাজ দিচ্ছে না। অঞ্জুর সাথে তখন কাজও করতে চাইছেন না ইন্ডাস্ট্রির অন্য কলাকুশলীরা। কিন্তু তাঁর সহজাত অভিনয় ক্ষমতার উপর ভরসা রেখেছিলেন বকুল। 'ডেবিউ' ছবি 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তে নায়িকার ভূমিকায় অঞ্জুকেই বেছে নেন তিনি। বাকিটা ইতিহাস। 

১৯৮৯ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় তোজাম্মেলের এই ফোক ফ্যাণ্টাসি 'বেদের মেয়ে জোসনা'। কী আছে এই সিনেমায়? সাপে কাঁটা রাজকন্যা, পালক বেদে পিতার ঘরে বড় হওয়া, বীণ বাজিয়ে সাপ নাচানো, রাজপুত্রের সাথে প্রেম, ফলে রাজার বিরাগভাজন, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, সন্দেহ, ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে মিলন ও ভালোবাসার জয়। সেই অর্থে ভাবতে গেলে, সাদামাটা লোককথার ছায়াদৃশ্য নির্মাণ। কিন্তু সেই সহজ-সরল, চড়া দাগের আর্তি-ই মানুষের মন ছুঁয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। অতি  সাধারণ খেটে-খাওয়া নিম্নবর্গের গরীব মানুষের। আর ঠিক এখানেই বাজি মেরেছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা'। মানুষ এই ছবি দেখতে গিয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়ে, আবার হাসিমুখে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। 

ছবি মুক্তির আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল গানের রাইটস। প্রথম দুটি সপ্তাহ চলে 'ড্রাই রান'। এর পরেই আসে সুনামি। বক্স অফিসের যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে দেয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। বোধকরি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ব্যবসায়িক ভাবে চূড়ান্ত সফল 'বেদের মেয়ে জোসনা' রাতারাতি রচে ফেলে ইতিহাস। 'ঢালিউডে' (ঢাকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) আজও সেই রেকর্ড অক্ষুন্ন। রাতারাতি কয়েক লক্ষ ক্যাসেট বিক্রি হয়ে যায় এই সিনেমা-টির। ওপার বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শোনা গেছিল সেই গান। 

কালক্রমে বেদেনী বাঁশির সুর কাঁটাতার পেরিয়ে ঢুকে পড়ে এপারেও। ১৯৯১ সালে প্রযোজক মতিউর রহমান পানু এপার বাংলার দর্শকের জন্য তৈরি করেন নতুন ভার্সন, যেখানে নায়িকা এক থাকলেও আসেন এপার বাংলার নায়ক চিরঞ্জিত। ইলিয়াস কাঞ্চন-অঞ্জু দে'র মতই চিরঞ্জিত-অঞ্জুর অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রি দারুণ সাড়া ফেলেছিল। এপার বাংলাতেও তুমুল হিট হয় 'বেদের মেয়ে জোসনা'। চিরঞ্জিতের কেরিয়ারের অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে ওঠে এই ছবি'টি৷ এই ছবির সূত্র ধরেই পরবর্তী কালে ঢাকা ছেড়ে কলকাতামুখী হন অঞ্জু। সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিসরে পা রেখে বিজেপি-তে যোগ দেন তিনি। 

বলে রাখা ভালো, তথাকথিত বাঙালি 'এলিট' সমাজ অবশ্য কোনও দিনই এই ছবিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং তাচ্ছিল্যের সাথে নাক সিঁটকিয়েছে, ঠাট্টা-তামাশাও করেছে৷ কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, শহরতলি বা মফস্বলে যে ম্যাজিক ঘটিয়েছিল 'বেদের মেয়ে জোসনা', অনেক তাবড়-তাবড় সিনেমাকেও তা ম্লান করে দেবে। তবে ছবির গ্রহণীয়তা ও গুণমত মান নিয়ে সে সময়েও চলেছে বহু তর্কবিতর্ক, আজও তা নিয়ে উঠতে পারে সওয়াল। নানা মুনির নানা মত৷ তাই সে নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। 

সিনেমায় ছিল একটি-দুটি নয়, ১১ টি গান। ছবির সুরকার ছিলেন আবু তাহের, গীতিকার তোজাম্মেল হক বকুল ও হাসান মতিউর রহমান৷ প্রায় এক ডজন গানের অধিকাংশ-ই হিট। অ্যান্ড্রু কিশোর, রুণা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং খুরশিদ আলমের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা কণ্ঠদান করে ছিলেন এতে৷ দশটি গানের কথা লেখেন বকুল। 'মা আমি বন্দী কারাগারে'র কথা লিখেছিলেন মতিউর রহমান৷ এক সময় দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছিল এই ছবির গান৷ 'মায়ায়  গড়া এই সংসার', 'প্রেম যমুনায় সাঁতার দিলাম', 'পাহাড়িয়া সাপের খেলা', 'আমার লাগিয়া বন্ধু' বা 'কী ধন চাইব আমি রাজা'র মতো অসংখ্য গান সহজ সরল কথা ও গ্রাম্য সুরের প্রভাবে মানুষের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রুণা লায়লা এবং অ্যান্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে টাইটেল সং - "বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে..."। এপার ওপার দুই বাংলাতেই আজও যার জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। 

তবে খুব কম লোক'ই জানেন এই গানটির একটি বিখ্যাত হিন্দি গানের সুরে অনুপ্রাণিত৷ সুরকার আবু তাহের (১৯৫৪-১৯৯৯) ছিলেন ঢাকা সিনে ইন্ডাস্ট্রির খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক। সাবেক বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু সব রকমের গানে ছিল তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী প্রাক্তনী আবু তাহেরের পিতা ধীর আলি মিঁয়া ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। সংগীত পরিবারের ছেলে আবু তাহের ইন্ডাস্ট্রি'তে কাজ শুরু করেন  সুরকার আলাউদ্দিন আলির সহকারী রূপে৷ এর পর একে একে 'ভাগ্যবতি', 'ঘোমটা', 'ধনবান', 'আশা ভালবাসা', 'সুজন সখি', 'তুমি আমার', 'গাড়িয়াল ভাই', 'ভালবাসার ঘর', ও 'রাখাল রাজা'র মতো একাধিক হিট ছবির সুর দেন। তবে 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছিল তাঁর সেরা কাজ। এইচ এম ভি থেকে পান ডবল প্ল্যাটিনাম ডিস্ক'ও৷ এক সাক্ষাৎকারে তাহের বলেছিলেন, বলিউডের গান তাঁকে আকৃষ্ট করতো। 'বেদের মেয়ে জোসনা'-তেও নিঃশব্দে রয়ে গেছিল তার প্রভাব। ১৯৯৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর অকালমৃত্যু না হলে আরও অনেক প্রত্যাশা ছিল তাহের মিঁয়ার কাছে। এও এক দূর্ভাগ্য! 

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ভারত ভূষণ ও মধুবালার 'ফাগুণ'। বিভূতি মিত্রের পরিচালনা সহ কামার জালালাবাদির রচনা ও কিংবদন্তি সুরকার ও পি নইয়ারের সুরে 'ফাগুনে'র প্রায় সবক'টি গান ছিল হিট। অধিকাংশ গান গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে ও মহম্মদ রফি। সিনেমা যতটা না হিট হয়, তার চেয়ে বেশি হিট হয় এর গান। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল "ইক পরদেশী মেরা দিল লে গ্যয়া" গানটি। সাপুড়ে বীণের সুরে গান'টি সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেই সুরে-ই মথিত হন তাহের। 'বেদের মেয়ে জোসনা'র টাইটেল সং-এ পুনরায় শোনা যায় সেই সুর। একই সুর, একই ছন্দ ও একই চলন; হিন্দির পাশাপাশি এবার বাংলা-তেও তুলেছিল জনজোয়ার। খারাপ, ভালোর ঊর্ধ্বে সেই গানের অসম্ভব, অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। 

সুরের বৈশিষ্ট্যই বুঝি এরকম। অন্য ভাষার সুর, কী অবলীলায় মিশে যায়, ওতপ্রোত হয় আরেকটি ভাষায়। বেদেনী বাঁশির সুরে মিলেমিশে এক হয়ে যায় প্রাদেশিকতা, আন্তর্জাতিকতা। এখানেই সুরের মাহাত্ম্য, দেশ কাল পেরিয়ে সংগীতের অখণ্ড বিজয় যাত্রা। লোকজ, মেঠোসুরের অভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা। 

অতএব, জয় কালনাগিনীর জয়!  

Tuesday, June 8, 2021

সই, কেবা শুনাইল শ্যামনামঃ পদাবলী কীর্তনের কথকতা



শীতকালের সঙ্গে কীর্তনের এক রহস্যময় সম্পর্ক। অনেকটা ঠিক পুরনো প্রেমের মত। হারিয়ে গিয়েও যা ফিরে আছে বারবার। অথচ কেন হারায়, হারিয়ে যেতে হয়, তা কেউ জানে না। সে এক আশ্চর্য!

তিনদিন ধরে পেছনের মাঠে বসেছিল নামকীর্তনের আসর৷ আজ শেষ হল। ছাদ থেকে দেখলাম খিচুড়ি খাওয়ানো হচ্ছে। খুলে ফেলা হচ্ছে শামিয়ানা। ছুটে বেড়াচ্ছে কচিকাঁচার দল, এদিক সেদিক। শশব্যস্ত তদারকি করছেন কর্মকর্তারা। 

বাসিমালা, গেঁদাফুল পড়ে আছে বিরহী বিষ্ণুপ্রিয়ার মত, একাকি। একটু দূরে অবাক চোখে এসব কীর্তি দেখছেন রাধামাধব। তাঁর দিকে নজর দেওয়ার মত সময় নেই কারোর৷ একটা কুকুর, ছানাপোনা সমেত শালপাতায় তখন উচ্ছিষ্টসন্ধানী৷ 

মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কথা। মফস্বল ঘেঁটে উঠে আসা শৈশব, কৈশোর এ দৃশ্য বহুবার দেখেছে। তখন এক মায়াবী সময়। শীতকাল কখন ঝুপ করে নেমে এসেছে ঠাহর হতো না। শুধু দেখতাম এ পাড়া, সে পাড়ায় ভেসে উঠতো অলীক ছাউনি। জ্বলজ্বল করছে হ্যাজাক, বা ঘোলাটে টিউব। একপাশে তার মহাপ্রভুর মূর্তি। অন্য পাশে রাধাগোবিন্দ। ঘামতেল গন্ধমাখা ত্রিভঙ্গমুরারি। প্রেমঘন, ধ্যানস্থ, এবার বুঝি জাগবেন, সাড়া দেবেন। 

সমুদ্রের ঢেউয়ের মত একটু একটু আছড়ে পড়তো শ্রীখোলের বোল। চাপ চাপ কুয়াশা পিছনে ফেলে বেজে উঠতো হারমনিয়াম, কর্তাল, মঞ্জিরা। অনন্ত শূন্য থেকে নেমে আসা মাইক, কখনও তাও উধাও। খালি গলায় ঝড় উঠতো গাদানহাটি ও রেনেটি'তে। তাকে শান্ত করতো মনোহর্ষী বা মান্দারনি। অঞ্চল জুড়ে ধ্বনিত হতো - 'হরি বলো! হরি বোল!' স্নায়ু জুড়ে, রক্তমাংসে তখন অষ্টপ্রহর নাম-সংকীর্তণ।

অবাক চোখে দেখতাম মানুষগুলো'কে। রাত জেগে জেগে গান। সকালে গান, বিকেলে গান, দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে গান। রসকলি কাটা কীর্তনীয়ার পাগলের মত ঊর্ধ্ববাহু নৃত্য। নাচতে নাচতে কাঁদতো, কাঁদতে কাঁদতে হেসে লুটোপুটি, হঠাৎ আবার একে অন্যকে জড়িয়ে 'চোখের জলে লাগল জোয়ার'। কী ভাবে যে কাটতো দিন, গড়াতো রাত তাও বোঝা যেত না। সে এক অলৌকিক 'সাইকডেলিক ট্রান্স'।

সময় ঘুরতে থাকে। মফস্বলি মায়া কাটিয়ে অতিদ্রুত  ''নাগরিক হয়ে ওঠা। রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন শুধু-ই ইস্পাত আর ধাতব সংঘাত। কবে হারিয়ে গেছে পালাকীর্তন, মাথুর, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, রাসলীলা, পদাবলী বা নামসাধন। এবার বাড়ির পিছনে, রেললাইনের ধারে একচিলতে মাঠে তিনদিন ধরে চলা পালাকীর্তন তবু ফিরিয়ে দিল অনেকটা'ই। 

সেও এক আশ্চর্য সমাপতন। সন্ধ্যের মুখে কলমের ডগায় তখন আছড়ে পড়ছে কৃষক আন্দোলন, দিল্লি সীমান্তে সারসার তাঁবু, ভুখা চাষির মুখ, ঘড়ির ব্যস্ত কাঁটায় ডেডলাইনের তাড়া, বাজেট অধিবেশন আর কানের গোড়ায় খাবি খাচ্ছে পূর্বরাগ লীলা, গৌরাঙ্গ আবির্ভাব। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে 'পরবর্তী নিবেদন বলরাম গোস্বামী ও সম্প্রদায়, নদীয়া'। না চাইতেও কান চলে যাচ্ছে অমোঘ আকর্ষণে। 'মরিব মরিব সখী, নিশ্চয়ই মরিব'। এবার আসছেন রামপুরহাট থেকে সঙ্গীতা চক্রবর্তী ও সম্প্রদায়৷ 'ধরা দেবে কী দেবে না কানাই / মরণ বাঁশি পোড়াব আগুনে'। 

আমি কান পেতে শুনি। গানের পর গান ভেসে চলে। আহা, এ তো মনে হচ্ছে শ্যাম কল্যাণ, আরে এটা যে দেশ, এ তো কেদার...আহা দরবারি আছে তাহলে। অন্য দিকে চলতে থাকে কলম। কৃষকরা আন্দোলন প্রত্যাহার করবে না৷ নিঃশর্ত আইন প্রত্যাহারে তারা অটল। ট্র‍্যাক্টর র‍্যালির পর এবার কী লংমার্চ, সংসদ ঘেরাও নাকি আলোচনার টেবিল? কলম ছুটে চলে। মাইকে ভেসে আসে গান - 'সখী, আমি কেন গেলাম যমুনায়?' 

বহুদিন পর কর্ণকুহরে বৃষ্টি নামে। তবে শুধুই যে তা 'অমৃতবারিধারা' এমন নয়, কিঞ্চিৎ 'হলাহল'ও ছিল। মোহভঙ্গ হয়েছে যখন দেখেছি হিন্দি বা বাংলা চটুল সুরকে কীর্তনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে এক ভয়াবহ বিস্ময়। বোঝা যায়, বেনোজল অনেকটা-ই ঢুকে পড়েছে 'মহানামব্রতে'। হয়তো কোনও অশনি সংকেত, আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। হয়তো বোধ, মনন, চিন্তনের দৈন্যতার সুপ্রকাশ। ভেসে যাওয়াই যেখানে অনিবার্য। নজরুলের ভাষায় - 'বৃথা প্রবোধ দিস নে ললিতে'! 

একসময় সব আসর-ই ভাঙে৷ মিলনমেলা যেখানে নিতান্তই রূপক মাত্র। ভালো আর খারাপ সেখানে হাত ধরাধরি করে উঠে আসে। বলে ওঠে 'জগন্নাথ মিশ্রের কুপুত্র নিমাই / এইটা বুঝি আর সেইটা করে গো'। স্তব্ধতা নেমে আসে চরাচরে। আর আমি ভাঙা দেরাজ খুলে বের করে আনি 'গীতশ্রী'-র ক্যাসেট। চালাবার উপায় নেই। রিল জড়িয়ে গেছে বহুদিন৷ আমি তার গায়ে হাত বোলাই। পরম মমতায়। ভাঙা টেপ রেকর্ডার থেকে ফের যেন উপচে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সময়। আমার 'মাথুর' ছেলেবেলা। 


মীরাবাঈ'কে কতটাই বা চিনেছি আমরা? আমাদের 'গীতশ্রী'-ই সম্বল। তিনিই বাঙালির একান্ত, প্রেমতীর্থ মীরা। আধ্যাত্মিক, সাঙ্গীতিক সাধনসঙ্গী। 

'গীতশ্রী'র কণ্ঠে মাথুর, মহানাম সংকীর্তন, পদাবলী আমাদের মীরাভাব ঘটিয়েছে। মধ্যবিত্তের পরিধিতে জাগিয়েছে কৃষ্ণনাম, লীলাময় অতীন্দ্রিয় ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ। তিনি ব্যতিত বাংলার সাধনমার্গ অসম্পূর্ণ। 

দোল পূর্ণিমার শেষলগ্নে তাই 'গীতশ্রী'-ই পরমাশ্রয়। তাঁর সুরের পথ ধরে বৃন্দাবনের ফাগুয়া ভেসে আসে বাংলার আকাশে৷ গভীর রাতে সেই লীলাক্ষেত্র যেন হয়ে ওঠে সুরের মায়াবী মথুরা৷ পদাবলী কীর্তন শুধু একা রাত জাগে গৃহস্থালি চৌকাঠে৷ 

দূর বহুদূর হতে ভেসে আসে রাতের গাড়ির হুইসিল। পদাবলী কীর্তনের ঘোরে আমরা ভাবি কানুর বাঁশি বেজে উঠেছে মফস্বলি দৈনন্দিনতায়। এমন রঙের উৎসবের কী আদৌ শেষ বলে কিছু আছে? 

আমি দেখতে পাই ছোট্ট মফস্বল। চাপ চাপ কুয়াশা নেমেছে রেললাইনে। ছোট ছোট শামিয়ানা। প্রবীণ, প্রবীণা-দের ভিড়। কীর্তন হচ্ছে সেখানে। ঘুরে ঘুরে গান গাইছেন এক মহিলা। গলায় গেঁদাফুলের মালা, কপালে রসকলি। দূরে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, পায়েস, পাঁচ মেশালি, নিরামিষাশী। কীর্তনীয়া শ্রীখোল হাতে তালে তালে নাচছেন। বাজছে হারমনিয়াম, বেহালা, মঞ্জিরা৷ দূরে ফুলে ফুলে সুসজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাধামাধব। আহা, শ্রীমুখে তাঁর অলৌকিক আঁধারবিনাশী আলো। সে আমার একান্ত নিজস্ব, অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তণ। 

'সখী রে, সে আনন্দ রসোঘন বিগ্রহ...'