২০০৮-০৯ সাল৷ তখন যাদবপুরে৷ ওয়ার্ল্ডভিউ'তে।
কাজ বলতে সপ্তাহের পাঁচদিন বুকস্টোর সামলানো। আর সপ্তাহান্তে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া অজানা কোনো গ্রাম, নাম না জনপদে লোকগানের সন্ধানে৷
সাথে থাকতো ডায়েরি, কলম, রেকর্ডার, ক্যামেরা, জলের বোতল এবং সুধীর বাবু বা শক্তিনাথ বাবুর লেখা কোনো বই। অব্যর্থ গাইডবুক হিসেবে।
সেবার এসেছি কৃষ্ণনগর। আমি আর সাথে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সোহম, সোহম দাশগুপ্ত। আমার সব গবেষণার বিষয়ে সঙ্গী, ভ্রাতৃপ্রতিম সুজন চাটুজ্যের বাড়ি ওখানে। ওখানেই বাড়ি বন্ধু অভিনন্দনদত্ত, অয়ন দত্তের। তাঁরাও সবাই জুটলো একে একে।
আমাদের গন্তব্য চাপড়া। পবিত্র বড়দিন উপলক্ষে খ্রীষ্ট-বাউলদের জমায়েত ও আখড়ায়। সুধীর বাবুর একটি লেখা থেকেই হদিশ পাওয়া। এমন একটি সম্প্রদায় যে আছে, তাই জানতাম না। তাঁদের ধর্ম, জীবনদর্শন, সংগীত, তথাকথিত বাউলদের সাথে তাঁদের মিল-অমিল ও লোকায়ত ভাবধারা তখন আমাদের গবেষণার বিষয়। তাই কৃষ্ণনগর...
কলকাতা ছাড়ার আগেই ওঁনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। এক নয়, একাধিক বার৷ যেদিন আসব, তার আগের দিন - "আসছো? বাহহ, ভালো কথা। দেখা করো।" সে আর বলতে! কৃষ্ণনগর যাচ্ছি আর সুধীরবাবুর সাথে দেখা করবো না, তা কী হয়? সে ভাবেই হল সব বন্দোবস্ত।
যথা সময়ে পৌঁছলাম কৃষ্ণনগর। জলঙ্গীর ধারে পানুবাবুর লজে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুজন, অয়ন। অয়নের বাবা অঞ্চলের শ্রদ্ধেয় নেতা গৌরীশঙ্কর (দত্ত) কাকুর লাইব্রেরি এখনো ভুলিনি৷ ভুলিনি আমার এই দুই বন্ধুর বাড়িতে কাটানো কিছু অসাধারণ মুহূর্ত। সেই আন্তরিকতা, ভালোবাসা ভোলার নয়৷
চাপড়ায় রওনা হওয়ার আগের দিন রাতে চার মক্কেল হাজির হয়েছিলাম সুধীরবাবুর বাড়ি৷ সেই সুধীরবাবু, শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তী। এতদিন শুধুই তাঁর লেখাই পড়েছি, হয়েছে ফোনে কথা। এবার মুখোমুখি হওয়া "বাংলার গৌণধর্ম", "দেহতত্ত্বের গান", "জনপদাবলি", "গভীর নির্জন পথে" তথা "বাউল ফকির কথা" র লেখকের সঙ্গে।
সেই রাতটি আজও ভুলিনি। মোটা ফ্রেমের, ফর্সা, রাশভারি চেহারার মহাপণ্ডিত মানুষটির মুখোমুখি আমরা চার নভিশ। অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছিলেন গবেষণার কথা, লোকায়ত দর্শন, সংগীত নিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত চর্চার কথা। দিয়েছিলেন পথের হদিশ৷ বলেছিলেন - "সব রেকর্ড করে নিও। ভালো ভাবে কাজ করো।"
পরের দিন হাজির হয়েছিলাম চাপড়ায়। সাক্ষী থেকেছিলাম খ্রীষ্ট মেলা ও খ্রীষ্ট বাউলদের সংগীত যাপনের। অবাক হয়েছিলাম চাপড়ার প্রাচীন চার্চ ও গোরস্থান দেখে। সুধীরবাবুর নির্দেশ মেনেই দেখা করেছিলাম খ্রীষ্ট বাউল সম্প্রদায়ের অন্যতম বাউল স্যামুয়েল মণ্ডলের সাথে৷ শুনেছিলাম গান ও তাঁদের জীবন যাপনের অলৌকিক আখ্যান। সুধীরবাবু পথ না দেখালে তা কতটা সম্ভব হতো জানা নেই।
পরবর্তী কালে বেশ কয়েকবার কথাও হয় সুধীর বাবুর সঙ্গে। খ্রীষ্ট-বাউলদের নিয়ে আমার আর্টিকেল পড়ে খুশি হয়েছিলেন। চেস্টারে পিএইচডি-র জন্য বাংলার খ্রীস্ট বাউল'দের গবেষণার কাজ হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা শুনে, মনে আছে ফোনে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন - "ভালো করে কাজ করো৷ কিছু দরকার হলে বলো।" আজ সে সব অতীত।
সুধীর চক্রবর্তীর প্রয়াণের সাথেসাথে বাংলার গান ও লোকায়ত সংগীত বিষয়ক গবেষণার জগতে নিঃসন্দেহে এক যুগের অবসান হল। সংগীত সহ লোকধর্ম, নিম্নবর্গের সংস্কৃতি, দেশজ শিল্পকলা ও সাহিত্য-শিক্ষা জগতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। শুধু পাণ্ডিত্যের প্রতিফলনই নয়, আমাদের মতো বর্তমান প্রজন্মের কাছে যথাযথ 'মাস্টারমশাই' হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷ চিনিয়ে ছিলেন প্রত্ন সংগীতের লোকজ রূপ, মাটির সুরে মিশে থাকা গ্রাম্য জীবন দর্শনের অপাপবিদ্ধ আলো।
সেদিন কৃষ্ণনগর যাওয়ার সময়ে ব্যাগে ছিল তাঁরই লেখা বই। "ব্রাত্য লোকায়ত লালন"। ভেবে ছিলাম যদি একটা অটোগ্রাফ দেন...কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। কথায় মাঝে হারিয়ে গেছিল সময়। আজ তাঁরই সেই বইয়ের পাতা ওল্টাতে গিয়ে চোখ পড়ে গেল উৎসর্গ পত্রে লেখা দুটি লাইন -
"যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে
তখন ভাবের খেলা ভেঙে যাবে।"
শব্দ-নৈঃশব্দ্যের পাড়ে যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন 'মাস্টারমশাই'!
No comments:
Post a Comment