Monday, May 31, 2021

বেগম পারভিন সুলতানাঃ ৭০ বছরে সুরের 'সুলতানী' শাসন


 
আশীর দশক। বম্বের ফিল্মিস্তান স্টুডিও। 

পরিচালক চেতন আনন্দে'র 'কুদরত' সিনেমার মিউজিক রেকর্ডিং'র কাজ চলছে। স্টুডিও-তে উপস্থিত ছবির সঙ্গীত পরিচালক আর ডি বর্মন, গায়ক কিশোর কুমার, গীতিকার-শায়ের মজরুহ সুলতানপুরী ও আরও অনেকে। 

চমৎকার গান লিখেছেন মজরুহ। সিনেমায় ৭টি গানের মধ্যে ৬টি তাঁর লেখা, অন্য একটি গান - "দুখ সুখ কী হর এক মালা' লিখেছিলেন কাতিল শিঁফাই। তবে সিনেমার একটি গান নিয়ে সকলে আশাবাদী৷ 'হমে তুম সে প্যায়ার কিতনা'। রাহুল দেব বর্মণ অসাধারণ সুর দিয়েছেন তাতে। তবে গানটি পুরুষ এবং নারী, দুই কন্ঠেই শোনা যাবে। কিশোর কুমার ইতিমধ্যে স্থান দখল করেছেন। কিন্তু মহিলা কন্ঠটি কার হবে, সে নিয়ে চলছে জল্পনা। 

এমন সময়ে স্টুডিও'য় পা রাখলেন তিনি। বছর তিরিশের এক যুবতী। ঢলঢলে মুখ, লম্বা বেনী, গায়ে অসম সিল্কের শাড়ি, চোখ দুটি অবিশ্বাস্য রকমের সপ্রতিভ। তাঁকে দেখেই হেসে এগিয়ে গেলেন আরডি। নারীকন্ঠে সেই গান'টি গাইবেন তিনি-ই। মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলো কিশোরের। জহুরি ঠিকই জহর চেনে। উচিত লোক'কেই এই গান'টির জন্য বেছেছেন 'আরডি'। সাথে সাথেই শুরু হল রিহার্সাল। গানের সুর'টি শুনিয়ে দিলেন শচীন পুত্র। এক মনে চোখ বুঁজে গানটি শোনে সেই যুবতী। অদ্ভুত তার সুর, আশ্চর্য সুন্দর তার চলন। গান শেষ হতেই অস্ফুট স্বরে বলে ওঠেন তিনি - " মিশ্র ভৈরবী!"    

রাহুলের মুখে হাসি। বললেন, এই গানটি তাকে গাইতে হবে। অস্বস্তিতে পড়েন মহিলা। বলিউডে খুব কমই প্লে ব্যাক করেছেন তিনি। হিন্দুস্তানী ক্লাসিকাল নিয়ে তার কাজ-কারবার। সিনেমার জন্য প্লে ব্যাকে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন তিনি। অভিজ্ঞ সঙ্গীত পরিচালক তা আঁচ করতে পেরে ছিলেন। তার মুখে বরাভয়ের হাসি। জানালেন, গানটি গায়িকা তাঁর নিজস্ব স্টাইলেই গাইবেন, ঠুমরী অঙ্গে৷ এবার মুখে হাসি ফোঁটে তার। আধ ঘন্টার মধ্যে তুলে নিলেন গান। তারপর উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে নিজস্ব আঙ্গিকে গাইলেন গান'টি। রেকর্ডিং শুনে সবাই মন্ত্রমুগ্ধ। এমনই অসাধারণ গেয়েছিলেন তিনি। সুলতানপুরী দু' হাত তুলে জানিয়েছিলেন সাধুবাদ। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন কিশোর কুমার। বলেন, এই গানটি গেয়েছেন তিনিও। কিন্তু অমরত্ব পাবে শাস্ত্রীয় অঙ্গে গাওয়া সেই গানটি'ই। ইতিহাস সৃষ্টি করবে এই গান। 

কিশোর কুমারের ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছিল অক্ষরে অক্ষরে৷ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল 'হমে তুমসে প্যায়ার কিতনা'। পরের বছর সেই অসাধারণ রাগাশ্রয়ী গানটির জন্য প্রথমবার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন মহিলা'টি। একসুরে সকলে জেনেছিল তাঁর নাম। তিনি বিদূষী পরভীন সুলতানা। 

* 

১০ জুলাই ১৯৫০ সালে অসমের নওগাঁও'র পুরানীগুদাম গ্রামে জন্ম পরভীনের। 'ওয়ালিদ' ইকরামুল মাজিদ, 'ওয়ালিদা' মারুফা বেগম। ছোটবেলা থেকেই গানের শখ পরভীনের। ছোট্ট মেয়েকে একদিন বাপের কোলে বসে গুণগুণ করে অদ্ভুত সুন্দর সুরে গান গাইতে শুনে চমকে যান মারুফা। ঠিক করেন মেয়ে'কে গান শেখাতে হবে। ঠিক হয় বাপের কাছেই গান শিখবেন ছোট্ট পরভীন।  

ইকরামুল নিজে ছিলেন সুগায়ক ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় সমঝদার। মেয়ের কিন্নর কন্ঠ শুনে নিজে'ই তাঁঁকে তালিম দেওয়া শুরু করেন। তিনি-ই ছিলেন পারভীন সুলতানার প্রথম গুরু। গুরু হিসেবে অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন ইকরামুল। বংশসূত্রে আফগানী ইকরামুল কড়া নিয়মকানুনে বেঁধে রেখেছিলেন তাঁর মেয়ে'কে। সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে রেওয়াজে বসা, লাগাতার চার-পাঁচ ঘন্টার স্বর সাধনা, পালটা, সরগম ছিল রোজকার বিষয়। একচুল নিয়মের এদিক-ওদিক হলেই জুটতো কড়া শাস্তি। পরভীনের জীবনে তখন পড়াশোনা আর রেওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু ছিল না। ইকরামুল সিনেমার গান বা সংস্কৃতি কোনটাই পছন্দ করতেন না। মেয়েকেও বেঁধে রেখেছিলেন সেই ছকে। শুধু ছাড় ছিল লতা মঙ্গেশকরের গানে। ইকরামুল-মারুফা দুজনেই ছিলেন লতা-ভক্ত। প্রতিদিন নিয়ম করে রেডিওতে তাঁর মেয়েকে শোনাতেন লতার গান। লতা ছাড়া অন্য কোনো গান শোনা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া শোনার ছাড়পত্র ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেকর্ডিং অথবা আসরের গান। বাপের নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে চলতো পরভীন। 

এভাবেই একটু একটু করে বড় হয় সে। এবার তালিম পান তাঁর ঠাকুর্দা মহম্মদ নাজিফ খানের কাছে। পরে আরেকটু বড় হলে অসমের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ বীরেন্দ্র কুমার ফুকন ও হীরেন শর্মার কাছে তালিম পান পরভীন। যার কাছেই তিনি শিখেছেন, পেয়েছেন গুরুর অকুন্ঠ ভালোবাসা ও আশীর্বাদ৷ এই অসামান্য প্রতিভাধর ছাত্রীকে সর্বস্ব উজার করে শেখাতেন তাঁরা। এরপর বাবা ইকরামুলের সাথে পরভীন পাড়ি দেন কলকাতা শহরে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম পান ফৈয়াজ খান ও পণ্ডিত ভাতখণ্ডের অন্যতম প্রিয়-শিষ্য শ্রীকৃষ্ণ নারায়ণ রতনঝনকারের সেরা 'গাণ্ডা বন্ধ শাগীর্দ', শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিরল প্রতিভা আচার্য চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে। পরভীনের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হন চিন্ময়। শুরু হয় মার্গসংগীতের নয়া তালিম। পরভীন সুলতানা জানিয়েছেন, অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন চিন্ময়। ভীষণ পছন্দ করতেন নিয়মানুবর্তিতা। তান তুলতে না পারলে রেগে যেতেন। তাঁর 'পেটেন্ট ডায়লগ' ছিল 'করো না'হয় মরো'। অন্যান্য ছাত্ররা তাকে বাঘের মত ভয় পেলেও পরভীন'কে বিশেষ স্নেহের নজরে দেখতেন 'ত্রিবেনী তীর্থপথে কে গাহিল গানে'র অমর স্রষ্টা।         


এরই মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে করেন তাঁর প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স। ১৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ডিং। অসম সহ গোটা পূর্বাঞ্চল জুড়ে তাঁর নাম। পরিচালক আব্দুল মজিদের "মরম তৃষ্ণা" ছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক করেন পরভীন। সেই সময় পরভীনের একটি অনুষ্ঠান শুনতে আসেন বিখ্যাত সঙ্গীতকার নৌশাদ। বলা বাহুল্য পরভীনের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। সাথে সাথে দেন বলিউডে প্লে ব্যাকের অফার। কিন্তু বেঁকে বসেন তাঁর বাবা ইকরামুল। তিনি মনে করতেন একবার বলিউডে পা রাখলে নিত্য রেওয়াজ বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দফারফা হবে। তিনি মত দেননি। নৌশাদ নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন। বলেন, একটা নতুন প্রজেক্টে গান গাওয়াতে চান পরভীনকে দিয়ে। বিখ্যাত প্রজেক্ট'টি হল কমল আমরহির ম্যাগনাম ওপাস "পাকিজা"। কে নেই সেই প্রজেক্টে? নৌশাদের সুরে গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, বাণী জয়রাম, মহ রফি, সুমন কল্যাণপুর, শামসাদ বেগমের মত শিল্পীরা। মীনা কুমারী, রাজকুমার অভিনীত সেই ছবিতে একটি গান গাইবার জন্য পরভীন সুলতানাকে বাছেন নৌশাদ। লতার কথা শুনে অবশেষে রাজী হন ইকরামুল। বাবার সাথে বম্বেতে পা রাখেন বছর পনেরোর পরভীন সুলতানা। গেয়েছিলেন সেই গান, কাইফি আজমির কথায় নৌশাদের সুরে মিশ্র খাম্বাজ রাগে "কৌন গলি গয়ো শ্যাম"। লতা নিজে উচ্চকন্ঠে তাঁর গানের প্রশংসা করেন। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি পরভীনকে। 

তবে বলিউডের গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে যাননি তিনি। দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি লম্বা তাঁর কেরিয়ারে হাতেগোনা কিছু প্লে ব্যাক তিনি করেছেন। বেশির ভাগ সময়ই থেকেছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা, অধ্যাবসায় ও অনুষ্ঠান নিয়ে। তা সত্ত্বেও সেলুলয়েডের রঙিন পর্দায় যখনই ভেসে উঠেছে তাঁর গান, মুগ্ধ হয়েছিলেন দর্শকেরা। বহু মানুষ এও বলেছেন, বলিউডে থাকলে নিজস্ব স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারতেন পরভীন সুলতানা। গেয়েছেন একাধিক গানও। মদন মোহনের সুরে "পরওয়ানা" (অমিতাভ বচ্চন এই সিনেমায় ছিলেন ভিলেনের ভূমিকায়) ছবিতে আশা ভোঁসলের সঙ্গে মিশ্র কাফি রাগে বিখ্যাত ডুয়েটে 'পিয়া কী গলি',  "দো বুঁদ পানি" তে লঘু শাস্ত্রীয় ঠুমরী 'পিতল কী মেরি গগরি', কমল আমরহির "রাজিয়া সুলতানা"য় খৈয়ামের সুরে ইমন রাগে বৃন্দগানে 'শুভ ঘরি আয়ি রে' বা উষা খান্নার সুরে "খোঁজ" সিনেমায় সুমন কল্যাণপুর ও তাঁর ডুয়েটে 'রাম করে মোরা সইয়া'র মতন বিখ্যাত সব গান গেয়েছেন তিনি। আমরহি তাঁকে 'সুরো কা রাজিয়া সুলতানা' বলে ডাকতেন। 

১৯৮০ সালে বাংলা ছায়াছবি "কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী" সিনেমায় আরডি বর্মণের সুরে রাগ শঙ্করায় (মতান্তরে মিয়া মলহার) তাঁর গাওয়া 'বেঁধেছি বীণা গান শোনাবো তোমায়' আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পরে একই সুরে লতা মঙ্গেশকর এই গান গেয়েছেন 'এইরি পবন ঢুঙ্গে কিসে তেরা মন', "বেমিসাল" সিনেমায়। কে ভুলতে পেরেছে "গদর-এক প্রেম কথা" য় পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর সাথে মিশ্র খাম্বাজে পরভীন সুলতানার সেই অসাধারণ ডুয়েট গান - "আন মিলো সজনা"! সুরের জাদু ও কন্ঠ মাধুর্যে বলিউডে সত্যিই অলিখিত সুলতানী আমল গড়েছিলেন পরভীন সুলতানা। গড়ে তুলে ছিলেন, কিন্তু ইচ্ছা করেই ধরে রাখেননি। 

*

গত ১০ জুলাই সত্তর'টি বসন্ত পার করে এলেন বেগম পারভিন সুলতানা। এই ৭০ বছরে জীবন বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছে। তাঁর স্বামী ও একদা গুরু উস্তাদ দিলশাদ (বিখ্যাত সরোদিয়া বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভাই অরবিন্দ দাশগুপ্ত) খান কে সর্বদা পেয়েছেন তাঁর পাশে। একসময় এই সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক বেঁধেছিল বঙ্গসমাজ দর্পণে। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করেই এগিয়েছেন তাঁরা সদর্পে। তাঁদের যুগলবন্দীই সেই ভালবাসা ও সম্ভ্রমের বোঝাপড়ার অনবদ্য সাক্ষী। আজও আমাদের দিন শুরু হয় ভৈরবীর বিখ্যাত বন্দিশ 'ভবানী দয়ানী' দিয়ে তাঁকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন পরভীন। তিনি ও 'ভবানী দয়ানী' আজ একে অন্যের পরিপূরক। আজ আর বলিউডে ফিরে যেতে তিনি নারাজ। তাঁর মতে সেটি "একটি সোনার খাঁচা যেখানে সুরের পাখি উড়তে পারেনা।" অজস্র রেকর্ড, অগনিত সম্মান, 'পদ্মশ্রী' 'পদ্মভূষন' বা 'সঙ্গীত নাটক আকাদেমী'-র মত বিরল পুরস্কার পেয়েও আজও তিনি তাঁর রেয়াজ ভোলেননি, ভোলেননি স্বাভাবিক জীবন যাপন। বিরাট একটি আয়নার সামনে তানপুরা হাতে আজও চলে ঘন্টার পর ঘন্টা রেওয়াজ। তাঁর কণ্ঠধ্বনির সুরে উঠে আসে পাতিয়ালা, আগ্রা ও লখনৌ ঘরানার অসামান্য সব সম্পদ। আজও তিনি ভোলেননি সাধারণ শ্রোতাদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ। তালিম দিয়ে গেছেন নিরলস ভাবে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের। 

এখানেই তিনি স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমী, অতুলনীয়। ৭০ বছর পেরিয়ে আজও সমুজ্জ্বল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের 'রাজিয়া সুলতানা', অবিংসবাদী সুর সাধিকা বেগম পারভিন সুলতানা।                                

Sunday, May 30, 2021

গোরক্ষগীতি ও দিব্যোন্মাদ এক গায়ক





সে এক অলৌকিক, অতীন্দ্রিয় সময়। 

আনুমানিক পঞ্চদশ খ্রীস্টাব্দ। কিংবদন্তি অনুসারে, মহাতীর্থ কাশী'তে পা রেখেছেন নাথপন্থী কুলশ্রেষ্ট, মহাযোগী, জ্ঞানতাপস, সাক্ষাৎ রুদ্রাবতার মহাগুরু গোরক্ষনাথ। 

লোকে বলে শিবের অংশ তিনি। হাবেভাবে সাক্ষাৎ মহাদেব। তাঁর একহাতে ত্রিশূল, অন্যহাতে বরাভয়। চোখা মেজাজ, চওড়া কপাল, পরনে বাঘছাল ... বহুদূর থেকে এসেছেন তিনি। এসেছেন শাস্ত্রচর্চার জন্য। 

গুরু গোরক্ষনাথ নিজে সর্বজ্ঞ। তিনি শুনেছেন পরমপুরুষ, মহাসাধক স্বামী রামানন্দের কথা। তাঁর সাথে শাস্ত্রাভ্যাস করতেই গোরক্ষনাথের কাশীতে আগমন। 

-------
"योगी गोरखनाथ प्रतापी, तासो तेज पृथ्वी कांपी।
काशी नगर में सो पग परहीं, रामानन्द से चर्चा करहीं।"
-------

রামানন্দ পরম বৈষ্ণব। ভক্তি আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ।  ধীর স্থির সৌম্য শান্ত স্বভাবের মানুষ। অদ্বৈত বেদান্ত যার করায়ত্ত। মহাপণ্ডিত অথচ অনাড়ম্বর জীবন যাপন তাঁর চর্চাগত। লোকে বলে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। 

গোরক্ষনাথ দেখলেন একটি উঁচু পাথরের উপর ধ্যানস্থ রামানন্দ। হাতের ত্রিশূল শানিয়ে হুঙ্কার দিলেন তিনি - "ওহে রামানন্দ, চোখ খোলো। আমি গোরক্ষনাথ। তোমার সাথে শাস্ত্রচর্চা করতে এসেছি। আজ দেখি, তুমি কত বড় পণ্ডিত!" 

রামানন্দ চোখ খোলেন। স্মিত হেসে মোহান্ত গোরক্ষনাথকে শ্রদ্ধাপূর্বক প্রনাম করে বলেন, "আমি সামান্য মানুষ। ভাগবত চর্চা করে দিন কাটাই। শ্রীহরির চরনদাস আমি। কিই বা জানি শাস্ত্রের যে আপনার মুখোমুখি হবো?" তিনি বলেন - "অনেক দূর হতে এসেছেন। কুটিরে বিশ্রাম নিন, আহারাদি করুন। শাস্ত্রচর্চা পরে হবে না'হয়।" 

গোরক্ষনাথ এত সহজে ভোলার পাত্র নন। "সে কী হে! এত বড় পণ্ডিত তুমি! এতেই ভয় পেয়ে গেলে! লোকে বলে তুমি মায়াবী শক্তির অধিকারী, বেদজ্ঞ, ত্রিলোকদর্শী। তা দেখি তোমার শাস্ত্রজ্ঞান কতখানি!" 

"নাথ'জি! আগে আমার সাথে শাস্ত্রচর্চা করুন। সন্তুষ্ট না হলে আমার গুরুর সঙ্গে শাস্ত্রচর্চা না হয় করবেন।" - আচমকা বালক কণ্ঠ শুনে চমকে যান গোরক্ষনাথ। অবাক হয়ে দেখেন গুরু রামানন্দের পায়ের কাছে করজোড়ে বসে আছে তাঁরই কনিষ্ঠতম শিষ্য - কবীর দাস। তাঁর মুখে দিব্য আভা, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি। সেই বালক কবীর দাস-ই কিনা মহাযোগী গোরক্ষনাথকে ছুঁড়ে দিয়েছেন খোলা 'চ্যালেঞ্জ'! এ যে অভাবনীয়!  

-----
"कह कबीर सुन गोरखनाथा, चर्चा करो हमारे साथा।
प्रथम चर्चा करो संग मेरे, पीछे मेरे गुरु को टेरे।"
-----

হোহো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন গোরক্ষনাথ৷ বলেন, "তোমার আস্পর্ধা তো কম নয় হে! তুমি কী জানো কার সাথে কথা বলছো? কালকের ছোকরা বলে কিনা আমার সাথে শাস্ত্রাভ্যাস করবে? বয়স কতো তোমার? আর কবেই বা তুমি যোগী হলে?" 

------
"बालक रूप कबीर निहारी, तब गोरख ताहि वचन उचारी।
कबके भए वैरागी कबीर जी, कबसे भए वैरागी?"
------


স্মিত হাসেন কবীর। তাঁর কপালে চন্দনপ্রলেপ ও টিকা। কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, মাথায় বৈষ্ণবীয় টুপি, কবীর দাসজি বলেন, "যখন এই সৃষ্টি ছিল না, যখন ছিল না কোনো শব্দ কল্প দ্রুম, ছিল না স্থিতি লয় মন্ত্র তখন হয়েছে জন্ম আমার। আমারই ধ্বনি থেকে প্রকৃতি পেয়েছে তার বাক। আমার বয়স ততটাই যতটা এই কালাকাল। জন্মাবধি শুরু এই সাধনা। জন্মাবধি শুরু এই বৈরাগ্য। সেই মুহূর্ত থেকে আমি যোগী।" কবীর বলেন, আমিই সেই সদপুরুষ যার সম্মুখ দিয়ে পার হয়েছে চারটি যুগ। গুরুর সান্নিধ্যে প্রাপ্ত হয়েছে অপার পূর্ণতা। আমার মধ্যেই সত্যের প্রকাশ, আমি তত্ত্ব, আমিই জ্ঞান। আমিই অজ্ঞান, নির্গুণ ও সদজ্ঞানের আকার। আমার সামনে সহস্য ব্রহ্মের প্রয়ান, লক্ষ বিষ্ণুর গমন আর কোটি মহেশ্বরের নিদান তবু আমার এক মুহুর্তেরও ক্ষয় নেই, কারণ আমি জন্ম আর আমিই মৃত্যু। আমিই শুরু আর আমি শেষ। আমার বয়েস এতটাই।

-----
अरबों तो ब्रह्मा गए, उनन्चास कोटि कन्हैया।
सात कोटि शम्भू गए, मोर एक नहीं पलैया।।
कोटिन नारद हो गए, मुहम्मद से चारी।
देवतन की गिनती नहीं है, क्या सृष्टि विचारी।।
नहीं बुढ़ा नहीं बालक, नाहीं कोई भाट भिखारी।
कहैं कबीर सुन हो गोरख, यह है उम्र हमारी।।
-----

উদ্ভাসিত হন গোরক্ষনাথ। বলে ওঠেন, "সাধু সাধু! তোমার বয়েস এতটা অথচ তোমায় দেখে তো শিশু বলে মনে হয়।" কিন্তু তিনিও যে স্বামী গোরক্ষনাথ। মহাযোগী, মহাভাগ, মহাতাপস। এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। 

আচমকা সশব্দে হেসে উঠে তিনি তাঁর হাতের সাত ফুট লম্বা ত্রিশূলটিকে মাটির মধ্যে গেঁথে দিলেন। তার পর অজানা মন্ত্রবলে শূন্যে ভেসে উঠে সেই ত্রিশূলের মাথায় চড়ে বসলেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ত্রিশূলের মাথায় তিনি বসে, অথচ ত্রিশূলের সূচালো ফলা তাঁর শরীর স্পর্শ করেনি, হয়নি কোন রক্তপাত। ত্রিশূলাগ্র থেকে গোরক্ষনাথ রাখলেন, "ওহে কবীর দাস! তোমার ভাষণ তো শুনলাম। দেখি তোমার অলৌকিক গুণপনা। আমার সাথে শাস্ত্রালোচনা করতে হলে আমার সমান আসনে বসে দেখাও।" 

এবার কবীর দাস অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, "নাথ জি! এ আপনার কেমন খেলা? আমরা শাস্ত্রাভ্যাস করতে এসেছি। এসব নাটক করতে নয়। দয়া করে নীচে নেমে আসুন ও ভক্তিমার্গ বর্ণনা করুন।" কিন্তু গোরক্ষনাথ অবিচল। মাটি থেকে সাত ফুট উপরে বসে তিনি এবার কবীর দাস ও তাঁর গুরু আচার্য রামানন্দকে নানাবিধ ভৎসনা শুরু করলেন। বাধ্য হয়ে এবার কবীর এগিয়ে এলেন। 

ঝোলা থেকে বের করলেন একটি লম্বা সুতলি। সে সুতোর একপ্রান্ত হাতে ধরে, অপর প্রান্ত তিনি ছুঁড়ে দিলেন আকাশে। আর কী আশ্চর্য! কোন জাদুবলে সেই ১৫০ ফুট লম্বা সুতো, লাঠির ন্যায় শক্ত হয়ে শূন্যে ভেসে উঠলো। আর দেখতে দেখতে কবীর জি নিজেও ভেসে উঠলেন শূন্যে। ভাসতে ভাসতে গিয়ে বসলেন সুতোর অগ্রভাগে। গোরখনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, "আসুন নাথ'জি! এই উচ্চতায় বসে এবার তবে শাস্ত্রচর্চা করা যাক। এই শূন্যের ঘর আমাদের জ্যোতির্চচার আশ্রয়৷" 

এই দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন গোরক্ষনাথ। সেই ত্রিশূল শীর্ষ থেকে নেমে এলেন মাটিতে৷ করজোড়ে কবীরকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে আপনি হে বালক মহাত্মা? আপনি তো সাধারণ মানুষ নন। দয়া করে বলুন কে আপনি? কোন লোক থেকে এসেছেন তা বলুন? আপনার প্রকৃত পরিচয় দিন?" গোরক্ষনাথ কাতর কণ্ঠে আর্জি রাখেন কবীরের সামনে৷ হেসে ওঠেন কবীর। শূন্য থেকে ভূমিতে নেমে এসে তিনি আসেন। বলেন, "শূন্য দিয়ে রচিত যে ঘর আমাদের সেই ঘরের মর্ম অনুধাবন করুন নাথ'জি।" 

বালক কবীরের মুখে সেই অদ্ভুত বাণী শুনে যেন নতুন দর্শনের আলো দেখতে পান গোরক্ষনাথ। "এ কী গভীর বাণী এলো ঘন মেঘের আড়াল থেকে"! নিমেষে দূর হল শতেক অহংকার, সহস্র মোহ। সে অপার্থিব মূহুর্তে তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল সেই কালোত্তীর্ণ রচনা - 

"শূন্য গড় শহর / শহর ঘর বসতি
কৌন সুতা কৌন জাগে হ্যায় 
লাল হামরে / হাম লালন কে
তন সুতা ব্রহ্ম জাগে হ্যায়।" 

--------
"शून्य गढ शहर शहर घर बस्ती कौन सूता कौन जागे है
लाल हमरे हम लालान के तन सोता ब्रह्म जागे है"
-------

[In the empty fort, a city, In the city, a settlement; Who sleeps? Who wakes?
My Love is mine, I am my Love; The body sleeps, the Spirit wakes.]

* 
 
ছয়ের দশক, মহারাষ্ট্র। কোলাবার গুণীজন সভায় গান গাইতে এসেছেন এক গায়ক। দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা কাটিয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর নাম কুমার গন্ধর্ব। ১৯২৪ সালের ৮ এপ্রিল কর্ণাটক, বেলগামে সুলাভাবি গ্রামে তাঁর জন্ম। 

তিনি 'চাইল্ড প্রডিজি'। বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ বি আর দেওধরের ছাত্র'টি মাত্র ৫ বছর বয়সে দেখিয়েছেন তাঁর অসামান্য প্রতিভা। আব্দুল করিম খান হোক, বা 'আফতাব এ মৌসিকী' উস্তাদ ফৈয়াজ খান - তামাম ফনকার'দের গায়কী হুবহু নকল করে গেয়ে শোনাবার ক্ষমতা রাখতেন তিনি। মাত্র ১০ বছর বয়সে যার প্রথম 'স্টেজ পারফরম্যান্স' দেখে তাক লেগেছিল সমস্ত শ্রোতাদের। অসাধারণ ব্যতিক্রমী তাঁর গায়কী৷ ২০ বছর বয়স ছুঁতে না ছুঁতেই সবাই কায়মনোবাক্যে ধরেই নিয়েছেন হিন্দুস্তানী মার্গ সংগীতের 'নকশা' পাল্টাতে অবতীর্ণ হয়েছে এই 'বিস্ময় বালক'। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে গন্ধর্বের খ্যাতি।

কিন্তু 'চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়'। খুব অল্প বয়সে টিউবারকিউলোসিসে আক্রান্ত হন গন্ধর্ব। এতটাই মারাত্মক সেই 'ক্ষয়রোগ' যে চিকিৎসক'রা বলে দেন, আর কোনও দিন গান গাইতে পারবেন না তিনি। জলহাওয়া বদলের জন্য চিকিৎসক-রা তাঁকে মধ্যপ্রদেশের দেবসে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মতো স্ত্রী ভানুমতীকে নিয়ে দেবস যাত্রা করেন কুমার গন্ধর্ব।


এরপর অসহ্য কয়েকটি বছর। টানা সাত বছরের বেশি সময় ঘরবন্দী হয়ে কাটালেন তিনি। রেওয়াজ করতে পারতেন না অসুস্থতার জেরে। বনজঙ্গল, পাহাড়নদী ঘেরা সেই জায়গায় ছোট্ট ঘরের বাইরে খাটিয়া পেতে শুয়ে শুয়ে পাখির ডাক, প্রকৃতির ডাক শুনতেন তিনি। আত্মস্থ হতেন তাদের সাথে। এই সময়েই নির্গুণি সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সন্ত কবীর হয়ে ওঠেন তাঁর আরাধ্য। নির্গুণী ভজন গেয়ে গেয়েই আস্তে আস্তে ফিরে পাব ফের গাইবার ক্ষমতা। 

১৯৫৩ সালে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও মঞ্চে উঠে আসেন গন্ধর্ব। তাঁর ওজস্বী কণ্ঠ, আর সাধুসুলভ বেশভূষা দেখে চমকে যান সকলে। তাঁর কণ্ঠে অবলীলায় খেলা করছেন নানক, কবীর, দুদ্দু শাহ, গোরখনাথেরা। অপ্রচলিত দোঁহায় রাগ-সংগীতের আকার দিয়ে এক নতুন মায়ালোকের রচনা করেন কুমার গন্ধর্ব। এ এক 'অন্য' গন্ধর্ব, যিনি ভক্তিমার্গে সম্পৃক্ত, খুঁজে পেয়েছেন এক অনন্ত জীবনদর্শন।

ষাটের দশকে কোলাবায় স্ত্রী (দ্বিতীয় পক্ষ) বসুন্ধরা কোমকলির সঙ্গে কুমার গন্ধর্বের সেই 'কামব্যাক' সেকেন্ড পারফরম্যান্সের প্রায় গোটা'টাই ছিল সন্ত কবীর ও গোরক্ষনাথের দোঁহা নির্ভর। গন্ধর্ব তাঁর খেয়াল গানের পাশাপাশি নির্গুণী ভজন পরিবেশন করেন। সেই অলৌকিক ভজন যারা শুনেছেন তারা জানিয়েছিলেন, ঈশ্বরিক কৃপা না থাকলে ওই গান ও তার অনবদ্য ব্যাখা কোনও সাধারণ মানুষের মুখ দিয়ে বেরোয় না। তিনি গাইতে গাইতে কাঁদছেন কাঁদতে কাঁদতে হাসছেন...মঞ্চে যেন কুমার গন্ধর্ব নন, স্বয়ং কবীরদাস নেমে এসেছেন সারস্বতচর্চায়।

নয়ের দশকে গন্ধর্বের শেষ অনুষ্ঠানেও ধ্বনিত হয়েছিল এই অলৌকিক গান...গাইতে গাইতে যেন ভাবসমাধি প্রাপ্ত হন তিনি...গোরক্ষনাথের সেই গান আজও ভারতীয় দর্শনে অদ্বৈতবাদী ভাবধারা ও ব্রহ্মচর্চার আধার রূপে পরিগণিত। যাকে সার্থক রূপ দিয়েছিলেন আরেক দিব্যোন্মাদ শিল্পী - পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব।  

সাগর বীণার সম্রাজ্ঞীঃ নূর জ্যেহরা কাজিম



'You can find me where the music meets the ocean.' - Rumi  


সাল ১৯৭২। লণ্ডনে বসন্তকাল। 

স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এণ্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (SOAS) সাউথ এশিয়ান সেকশনের ইণ্ডিয়ান ডিপার্টমেন্ট। পড়ন্ত বিকেলের রোদ একটু একটু করে তখন পিছু হটছে কনসার্ভেটরির দেয়াল থেকে। 

ছোট্ট হলঘরে মুখোমুখি বসে দুই নারী, গুরু ও শিষ্যা। তাঁরা গল্প করছেন চোস্ত পঞ্জাবী ভাষায়, হাসছেন, মাঝেমধ্যে গাইছেন গান। ছোটচুলের সপ্রতিভ চেহারা ও মোটা পাওয়ারের চশমার আড়ালে দুটি উজ্জ্বল চোখের বয়স্ক মহিলাটি তাঁর বড় হয়ে ওঠা, গান শেখা, সূদূর পঞ্জাব থেকে শান্তিনিকেতন আসা, বিশ্বভারতী'তে তাঁর পড়াশোনা, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শ পাওয়ার গল্প শোনাচ্ছেন। তিনি রাজেশ্বরী 'বাসুদেব' দত্ত। রবীন্দ্রসংগীতের সেই বিখ্যাত 'পঞ্চকন্যা'র অন্যতম। সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় বান্ধবী। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বিদূষী স্ত্রী। SOAS এর 'লেকচারার অফ ইন্ডিয়ান মিউজিক'।    

উল্টোদিকে বসে সেই মেয়েটি। নূর জ্যহরা কাজিম। অবাক চোখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর 'ম্যাডামে'র গল্প শুনছে বছর একুশের তরুণী। সূদুর পাকিস্তান থেকে সে মিউজিক নিয়ে পড়তে এসেছে SOAS-এ। তাঁর রক্তে গান, প্রাণে রবি ঠাকুর, ইকবাল আর গালিব। গবেষণার বিষয় ভারতীয় যন্ত্রসংগীত, বিশেষ করে প্রাচীন তারের যন্ত্র 'বীণা' নিয়ে তাঁর কাজ। সুন্দরী, সোনালি চুলের মেধাবী মেয়েটি লাহোর থেকে লণ্ডনে আসার আগেই শুনেছিল তাঁর 'দত্তা ম্যাডামে'র কথা, তাঁর গায়কী, পাণ্ডিত্য আর সর্বোপরি 'নিঃসঙ্গতা'র কথা। মেয়েটির বাবা বলেছিলেন, উঁনি সাক্ষাৎ সরস্বতীর মানসকন্যা। যা পারো, যতটা পারো শিখে নাও। এই সুযোগ আর হবে না। বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল মেয়েটি। 

- 'নূর, একটা গান শুনবে?' বলে ওঠেন রাজেশ্বরী।

- 'বেশক! কেন নয়!' ঝলমলিয়ে ওঠে তরুণীটি। 

'দত্ত ম্যাডাম' গান ধরেন। রবীন্দ্রসংগীত। 'এ মোহ-আবরণ খুলে দাও, দাও হে'। ইমন রাগে, খেয়ালাঙ্গ। রবি ঠাকুরের ভাঙা গানগুলির মধ্যে অন্যতম। রাজেশ্বরী অসামান্য গায়কীতে যেন পড়ন্ত বিকেলের আলো উপচে পড়লো ঘরে। আর হবে নাই বা কেন! শুধু রবীন্দ্রসংগীতই না, একসময় কলকাতায় (১৯৪৫-৫৪) সঙ্গীতাচার্য গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, উস্তাদ দবীর খাঁ'র ছাত্র যামিনীনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে রাজেশ্বরী শিখেছেন ঠুমরি ও টপ্পা। পরবর্তী কিছু বছর বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপ্রতিম গোপেশ্বর বাড়ুজ্জ্যের পুত্র রমেশচন্দ্র ব্যানার্জির কাছে খেয়াল শিখেছেন নিষ্ঠাভরে। তাঁর গলায় এমন গান কী যে অদ্ভুত মাধুর্য ফোঁটায়...     

মেয়েটির মুখে ভাষা নেই। তাঁর চোখে জল। গান শেষ হতে অস্ফুটে বলে ওঠে - 'মাশা আল্লাহ'! রাজেশ্বরী জানান, গুরুদেব নিজে শিখিয়েছেন এই গান। নূর কী বলবে! সে তখন আপ্লুত। আনন্দে, অপার মুগ্ধতায় তাঁর মুখে কথা সরছে না। রাজেশ্বরী তাঁর দিকে তাকান। মেয়েটি বলে, 'ম্যাডাম যেদিন আমার বাবা তাঁর স্বপ্নের বীণাটি তৈরি করতে পারবেন, এই গান আমি বাজাব।' সেই গান যাতে মেয়েটি খুঁজে পেয়েছিল পঞ্জাবী টপ্পার প্রভাব। 'বেশ তো!' - হাসিমুখে সম্মতি জানিয়েছিলেন রাজেশ্বরী। 

বিলেতে পড়াশোনা শেষ করে লাহোরে ফিরে সেই কথা রেখেছিল মেয়েটি। বাবার তৈরি সাগর বীণায় প্রথম বাজিয়েছিল সেই সুর। 'ডন' পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী কালে গোটা উপমহাদেশ যাকে চিনবে পাকিস্তানের একমাত্র মহিলা বীণাবাদক রূপে। তিনি নূর জ্যহরা কাজিম। যন্ত্রসঙ্গীতের এক অপার বিস্ময়, অসামান্য প্রতিভা। 

*

The concept and the image of musical sound having such abilities is basically a product of a serious inquiry into the fundamentals of music and musical sound in Indian Classical Music, and the effects they evoke within the artist and the listener.


১৯৫১ সালে পাকিস্তানের লাহোরে জন্ম নূর জ্যহরা কাজিমের। বাবা রেজা কাজিম ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী, চিন্তাবিদ ও সঙ্গীতজ্ঞ। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ায় জন্ম তাঁর।   

আপাদমস্তক কমিউনিস্ট চিন্তাধারার মানুষ রেজা শুধু উচ্চশিক্ষিতই ছিলেন না, ছিলেন বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিত, মুক্তমনা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশারদ। মাত্র ১২ বছর বয়সে জড়িয়ে পড়েন 'ভারত ছাড়ো আন্দোলনে'। যোগ দেন কংগ্রেসে। পরে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তানে (সিপিপি)। পরে ১৯৫১ সালে সিপিপি ত্যাগ করে ওকালতি'তে মনঃনিবেশ করেন। নব্য পাকিস্তানে গনজাগরণ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে বহুবছর জেলও খাটেন রেজা। তাঁর এমনই ছিল প্রভাব যে আয়ুব খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর জমানায় সরকারি মন্ত্রীত্বের অফার পান তিনি। কিন্তু শাসনতন্ত্রে আস্থাভাজন না হওয়ায় সেই পদ প্রত্যাহার করেন তিনি। জিয়াউল হকের জমানায় সরকারি উপদেষ্টার পদ পান তিনি। কিন্তু তাও প্রত্যাহার করেন তিনি। ফল স্বরূপ দীর্ঘ সময় জেল খাটতে হয় তাঁকে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবনে ইতি টেনে ওকালতি ও সঙ্গীতচর্চায় মেতে ওঠেন রেজা। হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশারদ রেজা পছন্দ করতেন তারের যন্ত্র। নিজে ভালো রবাব ও বীণা বাজাতে পারতেন। দীর্ঘ দশ বছরের চেষ্টায়, ১৯৭১ সালে বানাতে সক্ষম হন তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি 'সাগর বীণা'। দক্ষিণ ভারতীয় প্রাচীন চিত্র ও বিচিত্রবীণার যুগলবন্দীতে সৃষ্টি এই বীণার। সুরবাহারের আঙ্গিকে তৈরি করেছিলেন আরেকটি তারযন্ত্র 'শ্রুতিবাহার'।  

'সাগর বীণা' সৃষ্টির বহু আগেই বিবাহ করেন তিনি। তাঁর দুই মেয়ে - নূর জ্যহরা কাজিম ও বেলা রেজা জামিল। মেয়েদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিমও দেন তিনি। নূর সঙ্গীত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন আর বেলা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যান। দুই কৃতি মেয়ের বাবা, রেজা কাজিম ১৯৯৫ সালে লাহোরে গঠন করেন 'সঞ্জননগর ইন্সটিটিউট অফ ফিলজফি এণ্ড আর্ট'। শুরু করেন পঠনপাঠন ও সংগীত বিষয়ক গবেষণা নিয়ে নিরন্তর ও অন্তরঙ্গ চর্চা। নিজের মেয়েদের মধ্যেও নিয়ে আসেন সেই চর্চার ইতিকথা। 

* 

বাবার দেখানো পথ ধরেই হেঁটেছেন নূর। ছাত্রী হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে ঢেলেছেন সুরের সাম্রাজ্যে। শিখেছেন গান, সেতার, সুরবাহার। তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন রেজা। মেয়েকে আরও বেশি করে নিজের হাতে গড়েপিঠে নেন তিনি। পঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে ৭১'এ পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। ভর্তি হন SOAS এ। প্রিয় ছাত্রী হয়ে ওঠেন তৎকালীন শিক্ষিকা রাজেশ্বরী দত্তের। একদা রাজেশ্বরী নিজেও ছিলেন পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী৷ সংস্কৃত ও ফার্সিতে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন তিনি। হয়েছিলেন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। পরে চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। বাকিটা ইতিহাস।  

নূর'কে নিজের হাতে গড়েছিলেন রাজেশ্বরী। কণ্ঠসংগীতের পাশাপাশি চলে যন্ত্রসঙ্গীতের তালিম। বহুদিন SOAS এ ছিলেন নূর। এবার পাড়ি দেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে, ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে আলী আকবর কলেজ অফ মিউজিকে ভর্তি হন তিনি। উস্তাদ আলী আকবর খানের কাছে বীণা ও সেতারে দীর্ঘদিন তালিম নেন নূর। সাতের দশকের শেষে দেশে ফিরে আসেন নূর। সেতার ও রুদ্রবীণার তালিম নেন এটাওয়া ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী উস্তাদ শরীফ খান পুঞ্চওয়ালের কাছে। শরীফ তাঁর 'ওয়ালিদ' উস্তাদ রহীম বখশ খানের কাছে প্রথম নেন ধ্রুপদী সংগীতের তালিম। এই রহিম ছিলেন স্বয়ং কিংবদন্তি সেতারি ইমদাদ খানের প্রিয় শিষ্য ও পুঞ্চের মহারাজার দরবারি শিল্পী। অর্থাৎ যন্ত্রসঙ্গীতে একাধারে 'বাবা' আলাউদ্দিন খানের সেনিয়া মাইহার ঘরানা, এবং অন্যদিকে ইমদাদ খান, এনায়েত খানের এটাওয়া ঘরানার 'বাজে' সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন নূর জ্যহরা কাজিম। আটের দশক থেকে হাতে তুলে নেন তাঁর বাবা রেজা কাজিমের 'সাগর বীণা'। 

*

দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে সাগর বীণা বাজাচ্ছেন নূর। পাকিস্তানে তিনিই একমাত্র শিল্পী যিনি এই বিরল যন্ত্রটি বাজান। সাগর বীণা সম্পর্কে তাঁর মত - 

”The prime objective behind the Sagar Veena was to provide the artist with a rich and extensive palette of musical sounds and timbres evoking different kinds and degrees of pleasure.” 

পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত সহ সারাবিশ্বে এই মুহুর্তে সাগর বীণার মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন রাজেশ্বরী দত্তের এই অজানা ছাত্রী। বীণাবাদ্যে তৈরি করেছেন নয়া "সজ্জন সংগীত" অঙ্গ। পাল্লা দিয়ে সামলাচ্ছেন তাঁর বাবার তৈরি 'সঞ্জননগর ইন্সটিটিউট অফ ফিলজফি এণ্ড আর্ট'র দায়িত্ব। সাগর বীণার তালিম দিচ্ছেন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের। তাঁর স্বামী আলি কাজিম ও দুই সন্তান তাঁরই সাথে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সাগর বীণার সুরেলা আহবান। 

সমুদ্রের ধ্বনি যেখানে মিশে আছে সুরের ছোঁয়ায়, সেখানে দাঁড়িয়ে বীণা হাতে এক নতুন পৃথিবীর ছবি আঁকছেন নূর, নূর জ্যহরা কাজিম। সাগর বীণার একচ্ছত্র সুরসম্রাজ্ঞী। 

                                                                      
* ছবিঃ দ্য ইনার ম্যাগাজিনের সৌজন্যে।        

জড়িয়ে ধরার গানঃ চিপকো আন্দোলন, বহুগুণা ও ঘনশ্যাম রতুরি সেলানী


১১ ডিসেম্বর, সাল ১৯৭২। 

গোটা উত্তরাখণ্ড জুড়ে তখন দাবাগ্নি। একটু একটু করে দেবভূমিতে ছড়িয়ে পড়ছে বন আন্দোলনের আগুন। ধিকিধিকি করে বাড়ছে উত্তাপ।

গড়োয়ালের তিলারি'তে গ্রামবাসীদের উপর চলেছে গুলি। সেই ক্ষত, রক্তের দাগ ক্রমশ বিদ্রোহের রঙ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরকাশী, টেহরি, চামোলিতে। 

রক্ত লেগেছে অরন্যে, গাছের গুড়িতে, পাতায়, শুষ্ক বল্কলে। মাথা দোলাচ্ছে প্রপিতামহের মতো প্রাচীন বনরাজি। ক্ষোভে, বিক্ষোভে, বিদ্রোহে। 

বিদ্রোহ ছড়াচ্ছে গ্রামে গ্রামে। 'বনদেবতা'কে বাঁচাতে জোট বাঁধছে গরীব, হতদরিদ্র মানুষগুলো৷ এই বন, জঙ্গল, পাহাড় তাঁদের জীবন, তাঁদের আশ্রয়, বেঁচে থাকার সম্বল, পিতৃ-পুরুষের আশীর্বাদ স্বরূপ। তাকে ধ্বংস করতে, কেটে ফেলতে দেবে না কেউ। 

কিন্তু রাষ্ট্রতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই চাট্টিখানি কথা নয়৷ কী করবে গরীব মানুষগুলো? লাঠি-বন্দুক, বুলডোজার কাঁদানে গ্যাস আর টাকার ফাঁদ কী ভাবে অতিক্রম করবে তারা? কী ভাবে রক্ষা করবে নিজেদের? কী ভাবেই বা রক্ষা করবে এই আদিম মহাদ্রুম? 

রাতের অন্ধকার চিড়ে ছুটে চলেছে বাস। উত্তরকাশী থেকে চামোলি। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। বন্ধ জানলার কাঁচ ভেদ করে ঢুকছে হিমেল হাওয়া। রাত নটা দশ। 

সপ্রতিভ চেহারার মানুষটির চোখে ঘুম নেই। ইদানীং চোখ বুজলেই সে যেন দেখতে পায় আগ্রাসী করাত, উদ্যত কুঠার, শুনতে পায় ভারি বুটের শব্দ। কিই বা করতে পারে সে! তাঁর নিজস্ব অস্ত্র বলতে একখানি কলম। সে কবি, গীতিকার। শুনেছে, কলমের তেজ তরবারিকেও হার মানায়। কিন্তু তা কতটা সত্যি? 

রাতজাগা মানুষটি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে বাইরে৷ অন্ধকার, ছুটে চলা রাস্তা ভেদ করে, পাহাড় আর বন জঙ্গলের দিকে। হঠাৎ-ই ভিতরে ভিতরে যেন ডিনামাইট ফাটে। চমকে ওঠে সে। ব্যস্ত হাতে টেনে বের করে ডায়েরি, কলম। ঘসঘস করে চলে ব্যস্ত হাত৷ ফুটে ওঠে কয়েকটা লাইন। 

"চিপক যাও প্যের পর
কাটনে মৎ দো! 
বনসম্পদা লুটনে মৎ দো..." 

সেই রাতে 'জড়িয়ে ধরার গান' লিখেছিলেন ঘনশ্যাম রতুরি 'সেলানি'। কবি, লেখক, সমাজসেবী, সুরকার ঘনশ্যাম 'সেলানি'। সেই গান যা নিয়ে, পরবর্তী কালে তিনি ছুটে যাবেন টেহরি গারোয়ালে, সুন্দরলাল 'বাবাজি' বহুগুণার ছবির মতো সুন্দর সিলইয়ারা আশ্রমে। 

বহুগুণা'কে সামনে বসিয়ে, ঘনশ্যাম'জি ভাঙা ভাঙা গলায় শুনিয়ে ছিলেন সেই গারোয়ালি ধুন। আনন্দে আপ্লুত বহুগুণা তাঁকে টেনে নিয়েছিলেন বুকে। স্ত্রী বিমলা নটিয়্যাল বহুগুণা বলেছিলেন, "ইয়ে গানা স্যুন কে প্যের ভি রো পড়েগা"। বহুগুণা ঊর্ধ্ববাহু হয়ে তাকে ঘিরে শিশুর মতো নেচে উঠেছিলেন। বলে ওঠেন - "চিপকো, চিপকো প্যের সে চিপকো।" 

আন্দোলনের অন্যতম কর্মী রাজেন টোগড়িয়া লিখে ছিলেন, "চারদিন পর, ১৫ ডিসেম্বর, গোপেশ্বরে এক বিরাট জনসভায় গাওয়া হয় এই গান। তিন হাজার পাহাড়ি মানুষ তাতে গলা মিলিয়ে ছিলেন। চিপকো আন্দোলনের থিম সং হয়ে ওঠে ঘনশ্যামজির রচনা। সে গানের রেশ ধরেই শুরু হয় চিপকো আন্দোলন"। 

'চিপকো আন্দোলনে'র প্রাণপুরুষ সুন্দরলাল বহুগুণার প্রিয়পাত্র, উত্তরাখণ্ডের বিদ্রোহী কবি, সাহিত্যিক ঘনশ্যাম রতুরি 'সেলানি'র জন্ম ১৮ মে, ১৯৩৪ সালে। টেহরির চড়িগাড় গ্রামে, এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। 

মূলতঃ যজমানি ছিল তাঁদের পারিবারিক পেশা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ব্রাহ্মণ্য পেশা বা মতবাদের বিরোধী ছিলেন ঘনশ্যাম। মেধাবী ছাত্র, তার্কিক ও সাহিত্যানুরাগী ঘনশ্যাম অল্পবয়সেই অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়ান, পরিবার এবং সমাজের আপত্তি উপেক্ষা করেই। 

এমনকি সে সময় এক হরিজনের বাড়িতে গিয়ে সত্যনারায়ণ পাঠ করে রক্ষণশীল সমাজের বিষ নজরে পড়েন। পড়াশোনা চালাতে চলে আসেন হরিদ্বারে৷ সংস্কৃত ও জ্যোতিষচর্চা শুরু করেন৷ এর সাথেই চলতে থাকে কাব্যচর্চা। বয়স বাড়ার সাথে গোটা উত্তরাখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে তার লেখনির খ্যাতি। দেবভূমির প্রথমসারির কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হন তিনি। 

ঘনশ্যাম সেলানী এমনই একজন কবি, গীতিকার ও সুরকার যার রচনা আজও সমাদৃত পার্বত্য অঞ্চলে। যখনই কোথাও কোনও অবিচার চলছে, গলায় হারমনিয়াম ঝুলিয়ে, কবিতায় বিদ্রোহী সুর চড়িয়ে সেখানে পৌঁছে গেছেন তিনি৷ মথিত হয়েছে সাধারণ মানুষ তাঁর গান শুনে। 

চিপকো আন্দোলন থেকে টেহরি বাঁধ প্রকল্প, মোষ বলির বিরোধিতা থেকে মদ নিষিদ্ধকরণ - সবেতেই শোনা গেছে ঘনশ্যাম সেলানীর বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। মেগাফোনের দৌলতে সেই গান গোটা উত্তরাখণ্ডে ছড়ায়। আন্দোলনকারীরা উদাও, সম্মিলিত কণ্ঠে ঘনশ্যামের লেখা গান গাইতে গাইতে অকুতোভয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনে৷ ক্রমশ কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন তিনি নিজ প্রতিভায়। 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর প্রয়াত হন সুন্দরলাল বহুগুণার প্রাণের বন্ধু, উত্তরাখণ্ডের লোককবি ও চিপকো আন্দোলনের অজানা, অশ্রুত সুরেলা অধ্যায়ের প্রণেতা - ঘনশ্যাম রতুরি সেলানী। 

রতুরি চলে গেছেন আগেই। সম্প্রতি চলে গেলেন চিপকো আন্দোলনের প্রাণপুরুষ সুন্দরলাল-জি বহুগুণা'ও। ভারতবর্ষের মাটিতে সবুজ বিপ্লব ঘিরে এক যুগের অবসান। কিন্তু 'চিপকো' মানে কী শুধুই বহুগুণা? তার পাশাপাশি 'চিপকো'র মাস্টারমাইন্ড বহুগুণার স্ত্রী বিমলা ন্যটিয়াল বহুগুণা, গৌরা দেবী, সুবেদার দেবী, বাচ্চিনী দেবী, চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট, গোবিন্দ সিং রাওয়াত, ধুম সিং নেগি, শমসের সিং, কবি ঘনশ্যাম রতুরি, সেই অসংখ্য গ্রামবাসী মহিলারা...তাঁদের কথা বলবে কে? 

কে বলবে অমৃতা দেবীর কথা? ১৭৩০ সালে হওয়া প্রথম 'চিপকো'র অগ্নিকন্যা, তিন সন্তানের জননী, রাজস্থানের মেওয়ারের খেজরিলি গ্রামের অমৃতা দেবী, খেজরি গাছ কেটে রাণা অভয় সিং-র বিলাস বহুল রাজপ্রাসাদ গড়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামে সবুজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইতে ৩৬৩ জন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ দিয়েছিলেন আত্মবলিদান। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে গ্রামের খেজরি গাছগুলিকে। তাই গাছগুলিকে বাঁচাতে তাদের জড়িয়ে ধরে লড়াই করে প্রাণত্যাগ করেন অমৃতা দেবী ও বিষ্ণোইরা। 

২৪০ বছর পর, সাতের দশকে উত্তরাখণ্ডের সবুজ বিপ্লবের প্রাক্কালে অমৃতা দেবী ও বিষ্ণোই সমাজের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের সেই ঘটনা স্বামী সুন্দরলাল বহুগুণাকে শুনিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী বিমলা। তা নিয়ে একাধিক গান লিখে সাথসঙ্গত করেছিলেন ঘনশ্যাম রতুরি সেলানীর মতো মানুষেরা। বাকিটা ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস-ই বা কতটা মনে রেখেছে তাঁদের? 

আমাদের সবার ভিতরেই রয়েছে একটা গাছ। সবার নিজস্ব বোধিদ্রুম। সে বড়ো একলা, অসহায়, সরল। সেও আমাদের স্পর্শ চায়। চায় আদর, ভালোবাসা, সহমর্মিতার ছোঁয়া। 

সময় এসেছে সব কিছু ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরার। 

সেই আমাদের একান্ত আত্মোপলব্ধির 'চিপকো'...

দর্দ সে মেরা দামন ভর দেঃ একটি গানের জন্ম ও মৃত্যু


"ম্যয়নে তুঝসে চাঁদ সিঁতারে কব মাঙ্গে
রোশন দিল, বেদার নজর দে, ইয়া আল্লাহ..."

*

জুলাই, ১৯৯০ সাল। মুম্বই। অভিনেত্রী অঞ্জু মহেন্দ্রর বাসভবনে এক গজল সন্ধ্যা তখন ক্রমশ শেষের মুখে। গান গাইছেন গজল সম্রাট জগজিৎ সিং। উপস্থিত রয়েছেন বলিউডের বহু খ্যাতনামা ব্যাক্তিত্ব। জগজিৎ'র গানে অতিথি-অভ্যাগতরা মন্ত্রমুগ্ধ। একের পর এক গজলে শ্রোতাদের বেঁধে রেখেছেন জগজিৎ, এমনই তার কন্ঠের জাদু। তামাম হিন্দুস্তান কেন তাকে গজল সম্রাট বলে ডাকে তা সেদিন বুঝেছিলেন সবাই।

জগজিৎ গাইছেন, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাত। সময় কোথা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। গালিবের একটি গজল গেয়ে হারমোনিয়াম বন্ধ করলেন জগজিৎ। সাথে সাথে দ্রুত এগিয়ে এলেন অঞ্জু। "একটা শেষগান হয়ে যাক"। হেসে ফেলেন জগজিৎ - "এখনও আশ মেটেনি! আচ্ছা, বলুন কি গান শুনবেন?" অঞ্জু কুন্ঠা ভরে জানালেন - "দর্দ সে মেরা দামন ভর দে ইয়া আল্লাহ।" চমকে উঠলেন জগজিৎ। হঠাৎ এই গান? নাহ, তিনি এই গান কিছুতেই গাইবেন না। এ বড় বিষাদের গান। কেমন যেন মৃত্যুর ছোঁয়া, স্বজন হারানোর শোক লেগে আছে এই গানের সুরে। এমন আনন্দমুখর পরিবেশে তা বড় বেমানান। নাহ, এই গান কিছুতে গাইবেন না তিনি। কিন্তু অঞ্জু নাছোড়। তার সঙ্গে পাল্লা দেন অতিথিরা। তারাও সেই গানই শুনতে চান। সম্মিলিত অনুরোধের কাছে হার মানেন জগজিৎ। এবার আর মানা করতে পারেন নি তিনি। স্মিত হেসে টেনে নেন হারমোনিয়াম। শুরু হয় আসরের শেষ গান। 

"ইয়া ধরতি কে জখম পর মরহম রাখ দে
ইয়া মেরা দিল পাত্থর কর দে, ইয়া আল্লাহ!"

*

বড় অলৌকিক সে গান। বড় মায়াবী, আর্তি মাখা তার কথা যা কিনা লিখেছিলেন বিখ্যাত শায়ের কাতিল সিঁফাই (১৯১৯-২০০১)। এও শোনা যায়, একমাত্র মেয়ের অকালপ্রয়াণে এই গজল লিখে ছিলেন সিঁফাই। পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে এক পিতার নিবিড় আর্তি, বুকের গহীন অন্তঃস্থল থেকে বেরিয়ে আসা অতৃপ্তির আভাস, অনুযোগের এক মরমি দাস্তান। জগজিৎ'র নিজেরও বড় প্রিয়গান এটি। নতুন করে সুর দিয়েছেন তিনিই। রাগ আহীর ভৈঁরোর ছোঁয়ার সেই গানের পরিপূর্ণতা। বড় প্রিয় রাগ। সে রাগের সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ নিংড়ে গাইছেন জগজিৎ। গাইছেন নাকি ধ্যানস্থ? ভোরবেলার রাগে বুঝি এতো বিষাদ থাকে? তার চোখ উপচে নেমে এসেছে জল। জগজিৎ কাঁদতে কাঁদতে গাইছেন, গাইতে গাইতে কাঁদছেন। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। প্রতিটি কথা, সুর নিংড়ে উঠে আসছে লোনা জল। জগজিৎ একা নন, সেই অদ্ভুত গান শুনে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন শ্রোতারাও। তাদের হাতে থমকে আছে পেয়ালা। আত্মস্থ, ধ্যানস্থ জগজিৎ সিং'র সেদিকে হুঁশ নেই। তিনি শেষ করছেন - "ইয়া মেরা দিল পাত্থর কর দে, ইয়া আল্লাহ।" 

গান শেষ হল। গোটা বাড়ি থমথমে। কারুর মুখে কোন কথা নেই। কথা নেই জগজিৎ'র মুখেও। মাথা নিচু, একটা হাত হারমোনিয়ামে এলিয়ে বসে থাকেন তিনি। কেটে যায় কয়েক মূহুর্ত। স্তব্ধতায়। এক বৃদ্ধ ওয়েটার এগিয়ে আসেন। সিং সাহেবের পায়ের কাছে বসে হাতজোড় করে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি। জানান, সদ্য তার নাতি মারা গেছে চারদিনের জ্বরে। এই গান শুনলে শিশুটির আত্মা শান্তি পেতো। জগজিৎ তার হাত জড়িয়ে ধরেন। সান্ত্বনা দেন। এগিয়ে আসেন অঞ্জু মহেন্দ্র সহ অন্যান্য অতিথিরা। তাদের মুখেও ভাষা নেই। সেই দুকূল ছাপানো নীরবতা অনেক কিছু বলে দেয়। এক পৃথিবী বিষাদ নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য প্রস্তুত হন সকলে। ঠিক এমন সময়...

বেজে ওঠে টেলিফোন। সেই ফোন জগজিৎ সিং'র জন্য। ফোন এসেছে মেরিন ড্রাইভ পুলিশ স্টেশন থেকে। সাথেসাথে এক চাপা উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এরপরেই আসে সেই নিদারুণ সংবাদ। সেই রাতে মেরিন ড্রাইভে ঘটে গেছে এক ভয়ঙ্কর কার এক্সিডেন্ট। গাড়িতে ছিলেন জগজিৎ-চিত্রা সিং'র একমাত্র পুত্র, ১৯ বর্ষীয় বিবেক জগজিৎ সিং। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। পুলিশ রিপোর্ট জানায়, মেরিন ড্রাইভের ঝাঁ চকচকে রাস্তায় প্রবল গতিতে চলছিল সেই গাড়ি। বরাবর গতি পছন্দ করতেন সপ্রতিভ চেহারার, প্রতিভাবান ছেলেটি। মা চিত্রা সিং'র কাছে শিখেছিলেন গানও। কিন্তু পছন্দের ছিল হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটানো। মা চাননি ছেলে ড্রাইভিং শিখুক। কিন্তু বিবেক পছন্দ করতেন গতি। আর সেটাই কাল হয়েছিল তার। সে রাতে তিনি ড্রাইভ করছিলেন, না তার বন্ধু সেটা জানা যায়নি। কিন্তু গাড়িতে ছিলেন তিনি। হঠাৎই সামনে চলে আসে একটি ট্রাক। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাতেই ধাক্কা মারে গাড়িটি। পুলিশ চেষ্টা করেছিল, গুরুতর রূপে আহত বিবেক ও তার এক বন্ধুকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তার আগেই প্রাণ হারান জগজিৎ পুত্র। 

"সূরজ সি এক চিজ তো হমসব দেখ চুকে
সচমুচ কি অব কোই স্যহর দে, ইয়া আল্লাহ..."

*
ছেলের এই অকাল মৃত্যুর খবরে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে যান গজল সম্রাট। সত্যি সত্যি পাথর হয়ে গেছিলেন স্ত্রী চিত্রাও। জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল গান, সুর, লয়, ছন্দ। দীর্ঘদিন বেছে নিয়েছিলেন 'স্বেচ্ছা নির্বাসন'। প্রায় দশমাস পর, আবারও গানে ফেরেন জগজিৎ। স্ত্রী, বিখ্যাত গজল গায়িকা চিত্রা সিং আর কোনদিন ফেরেননি গানের জগতে। ঘরে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী করে ফেলেছিলেন তিনি নিজেকে। তবে ফিরে ছিলেন জগজিৎ সিং। পরের বছর, ১৯৯১ সালে মুক্তি পায় 'সাজদা'। লতা মঙ্গেশকরের সাথে গলা মিলিয়ে উঠে আসে হৃদয়ের অন্তঃস্থল নিকানো ১৪টি গজল। কাতিল সিঁফাইয়ের "দর্দ সে মেরা দামন" গজলটিও ছিল সেখানে। বাকিটা ইতিহাস। 

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বরাবরই ব্যতিক্রমী ছাপ রেখেছিলেন জগজিৎ ও চিত্রা সিং। গজল সঙ্গীতকে অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন এই দুই শিল্পী। সম্মান খ্যাতি পেয়েছেন যতটা, আঘাত ও শোক পেয়েছেন ঠিক ততটাই। অথচ ভারতীয় লঘু ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অলিন্দে এই প্রথিতযশা দম্পতির উত্থান ও জীবন যাপন রূপকথাকেও হার মানায়। আঘাত বারবার এসেছে তাদের জীবনে। জীবন সায়াহ্ন স্বস্তি দেয়নি সিং দম্পতিকে। একমাত্র পুত্র বিবেক জগজিৎ সিং'র মৃত্যুর পর, ২০০৯ সালে আত্মঘাতী হন চিত্রা সিং'র প্রথম পক্ষের কন্যা মণিকা চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে বৈবাহিক সম্পর্কে জটিলতার জেরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। বিবাহ বিচ্ছিন্না চিত্রাকে যখন বিয়ে করেন জগজিৎ, মণিকার বয়স মাত্র ছয়। মণিকাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন জগজিৎ। মণিকা ও বিবেক দুজনেই ছিলেন তাদের 'পাপা'র চোখের মণি। কিন্তু জীবদ্দশায় দুই সন্তানকেই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন জগজিৎ। চিত্রা অনেক আগেই সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। শান্তির খোঁজে আধ্যাত্মিক জগতে মনোনিবেশ করে ছিলেন তিনি। জগজিৎ তাতে কখনও বাধা দেননি। অবশেষে মেয়ের মৃত্যুর দুবছরের মাথায় ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর মুম্বইতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গজল সম্রাট জগজিৎ সিং। দু'দিন পরেই লণ্ডনে বিখ্যাত গজল শিল্পী গুলাম আলীর সঙ্গে তার একটি প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল। এই দুঃসংবাদ পেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেন গুলাম আলী। চোখের জলে ভেসে জানিয়েছিলেন - "মেহদি হাসান যখন মারা যান গজলের আত্মাও তার সাথে চলে গিয়েছিল। যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা এবার জগজিৎ নিয়ে গেলেন।" 

"দর্দ সে মেরা দামন ভর দে ইয়া আল্লাহ
ফির চাহে দিওয়ানা কর দে, ইয়া আল্লাহ..." 

*

প্রায় এক দশক হতে চললো বন্ধ হয়ে গেছে হারমোনিয়াম। বান্দ্রা ওয়েস্টের পেরি ক্রস রোডের সেই বাড়ি থেকে আর শোনা যায় না গজলের সুর। শোনা যায় না জলদগম্ভীর কন্ঠের রেওয়াজ। এখন শুধু সেখানে স্মৃতির পাহাড় আঁকড়ে বেঁচে আছেন পঁচাত্তর বর্ষীয়া চিত্রা সিং। বহুদিন হল সঙ্গীতকে তিনি বলে দিয়েছেন 'আলভিদা'। 

শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল ২০১৭ সালে বেনারসে সঙ্কটমোচন সঙ্গীত সমারোহে অংশ নিতে। রাজকীয় সম্বর্ধনা দেয়া হয় তাকে। মন্দিরের কর্মকর্তারা অনেক করে সাধাসাধি করেছিলেন তাকে অন্তত একটা গান শোনানোর জন্য। মাইক হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন চিত্রা সিং। বলেছিলেন - "সব সুর মরে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব। আমাকে ক্ষমা করবেন।" দুদিন কাশীতে ছিলেন চিত্রা। স্বামী, পুত্র, কন্যার স্মৃতিতে দিয়েছিলেন পুজো। একা একা ঘুরে বেড়াতেন এ ঘাট থেকে সে ঘাট। আক্ষেপ করে বলেছিলেন "যদি আজ উনি (জগজিৎ) থাকতেন, এখানেই এই ঘাটেই বসে যেত ম্যহফিল। ঈশ্বরের অদ্ভুত বিচার।" ঠিক যেমনটি বলেছিলেন জগজিৎ তার পুত্রের অন্ত্যেষ্টিতে। বিখ্যাত কবি গীতিকার গুলজার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুত্র বিবেকের শেষ যাত্রায় জগজিৎ সিং'র উদাস মুখে এক চিলতে হাসি দেখে অবাক হয়েছিলেন তিনি। জগজিৎ জানিয়েছিলেন, "সেই রাতে সত্যি সত্যি আমার প্রার্থনা কবুল করেছিলেন ঈশ্বর। দর্দ সে সহী মে উন হো নে ভর দিয়া থা মেরা দামন। কী অদ্ভুত তার বিচার।" 

গুলজার বলেছিলেন, পুত্রশোকে উন্মাদ ভারতের গজল সম্রাটের ঠোঁটে সেই অদ্ভুত এক ফালি হাসি, ভাগ্যের প্রতি তার পরিহাস ও সব হারিয়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করার চিহ্ন। কোন মানুষ শোকে ভেঙে পড়লে বুঝি এমন সর্বহারা হাসি হাসে? গুলজার বলেন - "এর উত্তর তো জগজিৎই তার গানে দিয়ে গেছেন। শাবানা আজমী, স্মিতা পাটিল অভিনীত 'অর্থ' সিনেমার সেই কালজয়ী গানেই লুকিয়ে আছে উত্তর।"

"তুম ইতনা যো মুস্কুরা রহে হো 
কেয়া গম হে জিস কো ছুপা রহে হো..."


* মূল রচনাঃ আহীর ভৈঁরো 

'রাজন' আব তু আঃ পণ্ডিত রাজন মিশ্র স্মরণে



২৫ মে, ১৯৯৮। মুম্বইয়ের নানাবতী হাসপাতাল। 
ভিড় থেকে দূরে, বাইরে একটি গাছের তলায় একা চুপ করে বসেছিলেন প্যারেলাল রামপ্রসাদ শর্মা। একটু আগেই এসেছে দুঃসংবাদ। প্রয়াত হয়েছেন তাঁর বন্ধু, ভাতৃসম, দীর্ঘদিনের সঙ্গী লক্ষ্মীকান্ত শান্তারাম কুডালকর। এক নিমেষে একা, সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছেন প্যারেলাল। 

অবশ্য এই নামে তাঁরা পরিচিত নন। গোটা দেশ তাঁদের চেনে হিন্দি সিনেমার সংগীত পরিচালনার হিট জুটি 'লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল' নামেই। একজন ম্যাণ্ডলিনের জাদুকর, অন্যজন বেহালা। তিন দশকের সফর, অজস্র ছবি, অজস্র হিট গান, পুরষ্কার, সম্মাননা তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন দশকের পর দশক। আজ যেন সেই সফর শেষ হল। লিভার সিরোসিস, সাথে রেনাল ফেলিওর। "কিঁউ ইতনা পিতে হো?" বহুবার এই প্রশ্ন করেছেন প্যারেলাল। জবাবে হাসতে হাসতে লক্ষ্মীকান্ত বলেছেন, "ইয়ার, মরনা তো সভি কো হ্যায়, কাহে পিনা ছোঁড়ে!" 

সেই সব কথাই মনে পড়ছিল প্যারেলালের। কষ্টে, চোখের জলে, বুঁজে যাচ্ছিল গলা। কিন্তু রেহাই নেই। পরলোকগত ভাতৃসম, প্রিয়বন্ধুর কথা মনে করে নিঃশব্দে, একাকিত্বে একটু চোখের জল ফেলবেন, সেখানেও হাজির সাংবাদিকেরা। "এবার আপনি কী করবেন, প্যারেলালজি?" প্রশ্নটা চাবুকের মতো এল। চমকে ওঠেন প্যারেলাল৷ ঘোলাটে চোখে এক মুহূর্ত কী যেন ভাবেন। তারপর বলেন, "জিনা পড়েগা... মজবুরি হ্যায়। দোস্ত কে খাতির জিনা পড়েগা।" 

আজ রাজন'জির মৃত্যু সংবাদে যতটা না তাঁর কথা, তাঁর অসামান্য গায়কী, পাণ্ডিত্য, মজলিশি মেজাজ আর দিলখোলা হাসির কথা মনে পড়ছিল, বারবার মনে পড়ছিল সাজন'জির কথা। একমুহূর্তে করোনা কেড়ে নিয়েছে অগ্রজ'কে। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে হরিহর আত্মা। রাজন'জির নিজেরই কথায় - "আপ মানো ইয়া না মানো, হাম দো জিসম, এক জান। কভি কই জুদা নহি কর সকতা!" সাজন'জি বলতেন, "জিসম যব তক হ্যায়, সুর হ্যায়। জিসম নহি তব ভি সঙ্গীত রহেগা।" মনে পড়ছিল, কী করছেন এখন অনুজ'টি। প্যারেলাল'জির মতো তিনিও বুঝি এখন একা একা চোখের জল ফেলছেন, স্মৃতিমন্থন করছেন তাঁর প্রিয় 'ভাইসাহেব'-র! অভ্যাস করছেন একা একা বেঁচে থাকার কঠিন পাঠক্রম। 

পণ্ডিত রাজন বা সাজন মিশ্র কখনও পৃথক সত্ত্বায় বিশ্বাস করতেন না। তাঁদের নাম একই সাথে, একই সুরে উচ্চারিত হতো৷ পণ্ডিতজি'দের বাবা বেনারস ঘরানার অন্যতম পথিকৃৎ হনুমান প্রসাদ ও কাকা, প্রখ্যাত সারেঙ্গীবাদক গোপাল প্রসাদ মিশ্রের কড়া নির্দেশ ছিল, একসাথে গাইবেন তাঁরা৷ একসাথে পা মেলাবেন মার্গ সংগীতের পথে। সুরের বিস্তার কিম্বা রাগদারি'তে সমান অংশীদার হবেন দুই ভাই। সেই আজ্ঞা শেষদিন পর্যন্ত বহন করেছেন তাঁরা। কাশীর সঙ্কটমোচন মন্দির থেকে দিল্লির কামানি, সওয়াই গন্ধর্ব ফেস্টিভ্যাল থেকে ইউরোপ, গোটা পৃথিবী তাঁদের জেনেছে 'এক নামে'। আজ সেই নাম থেকে একটি নাম মুছে গেল। ২৫ এপ্রিলের সন্ধ্যা কেড়ে নিল বড়ে মিশ্র'জিকে৷ সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে নেমে এল অতিমারী। 

বেনারস মানে শুধুই কাশী বিশ্বনাথ নয়, বেনারস ঘরানাও। তালবাদ্য হোক বা খেয়াল-ধ্রুপদ, কাশীর বিখ্যাত চন্দনকাঠের সুগন্ধ লেগে আছে এই ঘরে। আনোখেলাল, সামতা প্রসাদ, কণ্ঠে মহারাজ, রাম দাস মিশ্র, কিষেণ মহারাজ, মহাপুরুষ মিশ্র, গিরিজা দেবী, বড়ি মোতিবাঈ, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, মহাদেব প্রসাদ, দীনানাথ মিশ্র, চুন্নুলাল মিশ্র...এই তালিকা ফুরোবার নয়। বরুণা ও অসির সঙ্গমে যে খেয়ালের উদ্ভাস, তার'ই মাধূর্য কণ্ঠে তুলেছিলেন 'মিশ্র বন্ধু'রা। 

কাশীর আকাশে বাতাসে যে সুর, তাতে স্বয়ং স্বয়ম্ভু পিনাকপাণির অধিষ্ঠান। শিববন্দনা এখানে, অলি- গলিতে কান পাতলে শোনা যায়৷ সেই সুরে মথিত হয়েছিল 'মহল্লা কবীর চৌরাহা'-র মিশ্র খানদানও৷ পাঁচের দশকে এই মহল্লা থেকেই দুই ভাই বিশ্বজয়ে বেরিয়ে ছিলেন। যেখানেই গেছেন কুড়িয়েছেন শ্রদ্ধা, খ্যাতি, প্রশংসা। সাজন'জি এক সাক্ষাৎকারে বলে ছিলেন, দাদা 'পথ' দেখান, তিনি সেই পথে 'নিশান' আঁকেন। রাজন'জির মতে, 'ভাইস-ই-ভার্সা'। অথচ প্রকৃতির নিয়মে শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনার এই পথে ধরা দিয়েছে সংসার, গার্হস্থ্য যাপন। সোশিওলজি নিয়ে এমএ করে চাকরিতে মন দিয়েছিলেন রাজন মিশ্র'জি। তখনই আলাপ নামধারী শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পণ্ডিত জগজিৎ সিং-র সাথে৷ 'নকরি ছোড় দো। ইয়ে তুমহারা কাম নেহি'-বলেছিলেন জগজিৎ 'মহারাজ'জি। পত্রপাঠ চাকরি ছেড়ে ফের সঙ্গীতের দুনিয়ায় ফেরেন রাজন। বাকিটা ইতিহাস। 


বেনারস ছেড়ে উঠে আসেন দুই ভাই দিল্লিতে৷ রমেশ নগরে। নতুন করে শুরু হয় পথচলা৷ অল ইন্ডিয়া রেডিও'তে তখন প্রতি সন্ধ্যায় আছড়ে পড়ছে 'মিশ্র ব্রাদার্স'দের সুরের ঝড়। দীর্ঘদিন গ্রেড 'এ' আর্টিস্ট রূপে কাজ করেছেন দু'জনেই। ১৯৭৮ সালে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, শ্রীলঙ্কায়। মে দিবসের অনুষ্ঠানে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি'তে সংগীত পরিবেশন। তারপর ইউরোপ জয়৷ কতই না সম্মান, পুরষ্কারাদি। 

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সে সব স্মৃতি তুলে ধরেন তাঁরা। হল্যাণ্ডে হয়েছিল এক অদ্ভুত ঘটনা৷ পৃথিবীর যে যে প্রান্তেই তাঁরা গেছেন, উপচে পড়েছে মানুষের ভিড়। হাততালি, সাধুবাদে ভরিয়ে দিয়েছেন দুই ভাই'কে৷ তাঁদের মন্দ্র সপ্তকের জাদু'তে মাত গোটা ইউরোপ। সব জায়গায় পেয়েছেন 'স্ট্যাণ্ডিং অভেশন'। উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস ও হাততালির ঝড়ে ফেটে পড়েছে তাবড় অডিটোরিয়াম৷ অথচ ব্যতিক্রম হল্যান্ড। সেখানে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সমবেত জনতা নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি, দেয়নি হাততালি। অলীক স্তব্ধতা ভর করে সভাগৃহে৷ মিশ্র'জি ভাবেন, শ্রোতাদের বুঝি একটুও ভালো লাগেনি তাঁদের গান। মনের দুঃখে দুজন বসে থাকেন গ্রীনরুমে৷ এমন সময় কয়েকজন দর্শক আসেন। তাঁরা বলেন, হাততালি দিয়ে ওই অপার্থিব সুরমণ্ডলের গভীরতা ও প্রভাব নষ্ট করতে চাননি কেউ। অনেকে বলেন, আজ তাঁদের ঈশ্বর দর্শন হল৷ এর পর থেকে কোনও অনুষ্ঠানে গেলে, তাঁরা আর্জি দিতেন, গানের শেষে যেন হাততালি না দেওয়া হয়। 

১৯৮৫ সালে 'সুর সঙ্গম' পরিচালনা করেন দক্ষিণের পরিচালক কে বিশ্বনাথ৷ বিখ্যাত 'শঙ্করভরনম'-র হিন্দি রিমেক। সেই প্রথম বলিউডে মুখ দেখালেন রাজন-সাজন। সুরকার লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের সঙ্গীতে ১৩ টি রাগাশ্রয়ী গান গেয়েছিলেন দুই ভাই৷ গিরিশ কারনাডের লিপে জাদু ছড়িয়েছিলেন রাজন মিশ্র। ডুয়েট গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকরের সাথে। বিপুল জনপ্রিয়তা পায় তাঁদের গান। কিন্তু সেই প্রথম ও শেষ। আর বলিউডে পা রাখেননি তাঁরা। 

জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উত্তরসূরী গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হয়েছেন দুই ভাই। এক মুহূর্তের জন্য কখনও আলাদা হননি। পঞ্চাশ বছরের সাঙ্গীতিক সফরে উপহার দিয়েছেন প্রায় ১৫৬ টি প্রচলিত, অপ্রচলিত, কূট, অতিকূট, বক্র, সুগম ও অগম রাগ। এক জীবনে এতো রাগ গাইলেন কী ভাবে, আজও তা রহস্য। দেরাদুন 'গুরুকুল' গড়ে তোলার পাশাপাশি সংরক্ষণ করেছেন সেই সব অজানা, অশ্রুত রাগের কাঠামো। অবসরে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে ছুটে গেছেন অরন্যে, পাহাড়ে। কখনো করবেট কখনো কেদারনাথে৷ শিষ্য শিষ্যাদের নিয়ে মেতে উঠেছেন চড়ুইভাতি বা ক্রিকেট খেলায়। কখনো আবার সিনেমায়। সাজন মিশ্র জানিয়েছেন, "দাদা, গান না গাইলে ভালো ক্রিকেটার হতেন। স্কুল টিমে দাপুটে ক্যাপ্টেন ছিলেন রাজন ভাইয়া।" 

আজ জীবনের ২২ গজে সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারলেন না পণ্ডিত রাজন মিশ্র। মাত্র ৭০ রানেই থেমে গেল ইনিংস। বেনারসের মহল্লা কবীর চৌরাহা থেকে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হল দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কেয়ার হাসপাতালে। তবে এই সত্তরে সাত জন্মের অনাবিল সুরমূর্চ্ছনা শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন পণ্ডিতজি। আগামী একশো বছরেও তার অপার্থিব, অলৌকিক মাধূর্য হারাবার নয়৷ ১৫৬ রাগের পরতে পরতে মিশে আছেন তিনি, তাঁর ঐতিহ্য, গায়ণশৈলী৷ তার ক্ষয় নেই৷ 

চাইলে রাজন'জির পৃথক ছবি দেওয়া বা আলোচনা করা যেত৷ কিন্তু তাতে তাঁর সামগ্রিকতা তুলে ধরার প্রতি করা হতো অবিচার৷ রাজন-সাজন অবিচ্ছেদ্য এক নাম, এক যুগ, কালোত্তীর্ণ এক অভিজ্ঞতা যার পৃথককরণ অসম্ভব৷ আজ একটি নাম যেন 'অদৃশ্য' হয়েও, তার দৃশ্যমান্যতা আরও গভীর হয়ে ফুটিয়ে তুললো। একটি নাম বেঁচে রইলো, অন্য আরেকটি নামের সন্নিবেশে, সম্মোহিত, সমাহিত হয়ে। 

রাজন'জির অনুজ পণ্ডিত সাজন মিশ্র'জির কথাই তাহলে সত্যি প্রমাণিত হল - "ইয়ে জিসম যব তক হ্যায়, সুর হ্যায়। জিসম নহি, তব ভি সঙ্গীত রহেগা।" সংগীতের সেই আলোকিত দরবারে, দরবারির রাজকীয়তায় চিরদিন বেঁচে থাকবেন পণ্ডিত রাজন মিশ্র। 

Saturday, May 29, 2021

প্রলয়, তাণ্ডব ও উস্তাদ আমন আলী খান



চারের দশকের শেষার্ধ। দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে। বিহারে এক নেটিভ রাজার আমন্ত্রণে গান গাইতে এসেছেন উস্তাদ আমন আলী খান।

আমন আলী মস্ত বড় গায়ক। বম্বের ভেণ্ডিবাজার ঘরানার প্রবাদপুরুষ উস্তাদ ছজ্জু খাঁ সাহেবের সুপুত্র ও তুখোড় খেয়ালিয়া। একইসাথে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপাল। মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বেজায় শিবভক্ত, রাগ হংসধ্বনিতে বিখ্যাত বন্দিশ 'লাগি লগন সতী পতি সঙ্গ'-র রচয়িতা।

ভেণ্ডিবাজার নাম শুনে মুচকি হাসার কিছু নেই। যদি ভেবে থাকেন, ঢ্যাঁড়স বা ভিণ্ডির নামে ঘরানার এমন আজব নামকরণ, তা হলে ভুল করছেন।

বম্বের নাল বাজার ও ইমামবাড়ার পাশে ক্রফোর্ড মার্কেটের পিছনের অঞ্চল'কে তখন সাহেব-সুবোরা 'বিহাইণ্ড দ্য বাজার' বলে ডাকতেন। 'ভেণ্ডিবাজার' তারই অপভ্রংশ। বম্বের কুখ্যাত লাল বাতি অঞ্চল কামাথিপুরা, এর থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত।

ফিরে আসি আমন আলীর কথায়। পুনে থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পটনা এসেছেন তিনি। অতিথি শালায় বিশ্রাম নিয়ে, সামান্য নাস্তা করে পৌঁছলেন আসরে। বিরাট শামিয়ানার নীচে হচ্ছে অনুষ্ঠান।

যথা সময়ে ডাক এল তাঁর। সামনে বসে বিহারের তাবড় তাবড় রইস ও রসিকজনেরা। শাগির্দ'দের নিয়ে মঞ্চে ওঠেন উস্তাদ। সালাম-সৌজন্য ইত্যাদি শেষ হলে তানপুরা বেঁধে গান শুরু করেন আমন। রাগ শুদ্ধ সারঙ।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি চেপে ধরে তাঁকে। তন্ময় হয়ে গান গাইতে গাইতে হঠাৎই খেয়াল করলেন, একটু দূরে জটলা করে বসে কিছু লোক। হতদরিদ্র, জীর্ণশীর্ণ ও কঙ্কালসার চেহারা। গায়ে নোংরা জামাকাপড়, যা ম্যহফিলের পরিবেশে একেবারেই বেমানান।

কারা এরা? কোত্থেকে এল? এরাও কী তাঁর গান শুনতে এসেছে? বিহারের গরীব-গুর্বোরাও বুঝি গান ভালোবাসে? নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে তাঁর মনে। তিনি দেখছেন, সেই ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। প্রহরীরা তাঁদের শামিয়ানার অনেকটা বাইরে, এককোনায় বসিয়ে রেখেছে৷

অস্বস্তি বাড়তে থাকে উস্তাদের। তিনি বুঝতে পারেন মানুষগুলি তাঁর দিকেই তাকিয়ে। বারবার মনোযোগ ঘুরিয়েও লাভ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, অসংখ্য ক্ষুধার্ত চোখ-গুলি কিছু বলতে চাইছে তাঁকে। দুটি খেয়াল পরিবেশনের পর সামান্য বিরতি নেন আমন আলী।

মঞ্চ থেকে নেমে সরাসরি এগিয়ে আসেন সেই মানুষ গুলোর কাছে। হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ায় সকলে। "কঁউন হ্যায় আপলোগ? কঁহা সে আয়ে হ্যায়? কেয়া চাহিয়ে?" প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আমন আলী খাঁ। ততক্ষণে নেটিভ স্টেটের রাজাও এসে পৌঁছেছেন সেখানে।

দেহাতি মানুষগুলি বলেন, বিহারের গ্রামীণ অঞ্চল, বাঢ়, বক্তিয়ারপুর, ফতওয়া থেকে তারা এসেছেন। সেবার বিহারে নেমে এসেছে সাক্ষাৎ প্রলয়। ভয়াবহ ঝড়বৃষ্টিতে ধ্বংস হয়ে গেছে ঘরবাড়ি৷ ফুঁসে উঠেছে গঙ্গা। গোটা অঞ্চল ডুবে গেছে বন্যার জলে। মারা গেছে, নিখোঁজ হয়েছে বহু মানুষ। সহায়সম্বলহীন হয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজ্যের এ মাথা-ও মাথা। নেটিভ স্টেটের রাজাও তাঁদের এহেন পরিণতি'তে দুঃখপ্রকাশ করেন। বলে ওঠেন, "শিব-জি কী ক্যহর সে কৌঁন বচায়ে?"


গরীব মানুষ-গুলি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভুক্ত তারা। খাবার জোটেনি একরত্তি। এমন সময় খবর পেয়েছেন, কোনও এক বড় গাওয়াইয়া এসেছেন রাজ্যে। গান-বাজনা হবে, সাথে হবে নরনারায়ণ সেবা। তাই একটু খিচুড়ির জন্য তারা এসে ভিড় করেছেন অনুষ্ঠানের বাইরে। অপেক্ষা করছেন গান শেষ হওয়ার। শেষ হলে খিচুড়ি পাবে তারা। লোটা, বর্তনে নিয়ে যাবে পরিবারের জন্য। হাতজোড় করে তারা আর্জি রাখেন, অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটাতে তারা চাননি। তবু অজান্তে 'তকলিফ' দিয়ে থাকলে তারা ক্ষমাপ্রার্থী।

কথা শেষ হতে দেখেন, চোখে একসমুদ্র জল নিয়ে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আমন আলী। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। আবেগতাড়িত কণ্ঠে উস্তাদজি রাজামশাই-কে বলেন, তাঁর পারিশ্রমিকের টাকা'টি যেন এই গরীব অসহায় মানুষগুলিকে দেওয়া হয়। সেই টাকায় এদের যেন এদের কল্যাণ হয়। হতদরিদ্র মানুষগুলি বিস্ময়ে, কৃতজ্ঞতায়, আবেগে বাকরুদ্ধ। দু পক্ষই করজোড়ে, নতমস্তকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। নিঃশব্দে, সময় বয়ে যায়।

একসময়, তাঁদেরই অনুরোধে আবারও মঞ্চে ফেরেন আমন আলী। অনুষ্ঠান 'অধুরা' রাখতে নেই যে। তাই এবার আসরের শেষ গান ধরেন রাগ শঙ্করায়। "জয় শিবশঙ্কর, জয় গঙ্গাধর"।

দু'দিন পর বন্যার জল নেমে যায়। শান্ত হয় প্রকৃতি।