বছর সাত-আটেক আগের কথা। মুম্বাইয়ের নেহরু সেন্টারে ভেঙে পড়েছে মানুষের ঢল। একসাথে মঞ্চ ভাগ করে নেবেন দুই কিংবদন্তি শিল্পী গিরিজা দেবী ও বিরজু মহারাজ। শাস্ত্রীয় গায়ন এবং নৃত্যের এক অসাধারণ যুগলবন্দীর সাক্ষী হতে উদগ্রীব সকলে।
যথাসময়ে মঞ্চে এলেন তাঁরা। বসলেন পাশাপাশি৷ গিরিজা দেবীর এক শিষ্যার হাতে তানপুরা, অন্য দিকে তবলায় অনুরাধা পাল। উস্তাদ আল্লারাখা ও জাকির হুসেইনের প্রিয় ছাত্রী অনুরাধা বেনারস ও পঞ্জাব ঘরানার সুযোগ্য উত্তরসূরী। দেশের অন্যতম প্রথিতযশা মহিলা তবলাবাদক।
শুরু হল গান। বেনারস ঘরানার অজস্র রত্নসম্ভার সেদিন শ্রোতা, দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন গিরিজা দেবী। তাঁর কণ্ঠে সাক্ষাৎ সরস্বতীর কৃপা। বেনারস ঘরানার দুর্লভ সব ঠুমরী, দাদরা, কাজরি, চৈতী পেশ করেছিলেন গিরিজা। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন বিরজু মহারাজ'জি। গিরিজা দেবীর পাশে বসেই তিনি দেখিয়েছিলেন অভিনয় আর অভিব্যক্তি, ভঙ্গিমার মাধ্যমে অনবদ্য নৃত্যশৈলীকে কোন স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ক্ষণজন্মা সেই দুই ব্যক্তিত্বের জাদু স্পর্শে সেদিন ম্যহফিলে 'চার-চাঁদ' লেগেছিল।
অনুষ্ঠান মাঝে একসময় গিরিজা বললেন, "অব এক হোরি সুনাতি হুঁ। রঙ্গো কা তেওহার আ রহী হ্যায়।" অর্থাৎ হোলি আসছে। তাই এবার একটা 'হোরি' শুনুন! সাথেসাথে যেন উল্লাসে ফেটে পড়ে নেহরু সেন্টার। গিরিজা দেবী লাগালেন সুর মিশ্র কাফি রাগে -
"রঙ ডারুঙ্গি নন্দ কে লালন পে
সাঁবর রঙ লাল কর দইয়ো -
মল গুলাল দৌ গলান পে
নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো
ঢপ মৃদঙ্গ তালন পে!"
তন্ময় হয়ে 'রাধিকা হোরি' গাইছেন গিরিজা৷ তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে মহারাজ'জির সেই অনন্যসাধারণ 'এক্সপ্রেশন', অভিনয়, হাতের মুদ্রা, ভ্রুভঙ্গিমা, চলন যেন সত্যি সত্যিই রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা নামিয়ে এনেছেন সভাগৃহে। দর্শকেরা সুরে, ছন্দে, তালে বুঁদ।
মনে হচ্ছে কেউ যেন একমুঠো আবীর ছুঁড়ে দিয়েছে আকাশে। অদৃশ্য পিচকারি থেকে উড়ে আসছে রঙ। সেই রঙ যতটা না শরীরের, তার চেয়ে ঢের বেশি মন জুড়ে।
গানের চলনে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে কথাগুলি৷ 'নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো'...রাধিকা যে শুধু কৃষ্ণের সাথে হোলি খেলে সন্তুষ্ট নন। মাধবের শ্যামবর্ণ ত্বক তিনি আজ লাল করে ছাড়বেন। শুধু তাই নয়। তাঁকে নারীর বেশে সাজিয়ে, মৃদঙ্গের তালেতালে নাচাবেন।
অবাক হয়ে ভাবি, রঙের কী অদ্ভুত মহিমা। মুহূর্তের মধ্যে কোথায় ভেসে গেল লিঙ্গ বিভাজন, পুরুষালি দম্ভ, কতৃত্ব, পেশীসঞ্চার। শতেক দাবিদাওয়া, যতেক মৌরসীপাট্টা। 'গুলালে'র গুণে তখন সবই হাওয়ায় লীন৷ রাধিকা তখন কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-ই রাধিকা। শতাব্দী প্রাচীন সেই 'প্রচলিত' ব্রজভাষ্য নিঃশব্দে শিখিয়েছে সমবোধ, সমচেতনা ও সমানাধিকারের তত্ত্বজ্ঞান।
রঙের উৎসবে যেদিন সত্যি সত্যিই এই তথাকথিত লিঙ্গ-বিধিবদ্ধতা ঘুচে যাবে, সেদিন হয়তো সকলের মধ্যেই ফুটে উঠবে সমলিঙ্গ, সমতত্ত্বের মিশ্র রাগ। যেদিন সমস্ত রঙ মিলেমিশে এক হয়ে, একে অন্যের মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে রঙের অন্তর্নিহিত আলো। চিরায়ত, চিরকাঙ্ক্ষিত সেই দোল পূর্ণিমার অপেক্ষায় রয়েছি আজও।
"আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধন ছেড়া প্রাণ"।
* ঋণঃ থ্রি সং'স ফর হোলি, ২০১৯
No comments:
Post a Comment