২৫ শে বৈশাখ অতিক্রান্ত। পায়ে পায়ে আমরা পেরিয়ে এসেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী।
অতিমারীর প্রকোপে যখন পর্যুদস্ত ভারত সহ গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে অনাড়ম্বর হলেও রাবীন্দ্রিক উৎসব, চর্চার মেজাজে মেতেছিল দুই বাংলা।
রবি ঠাকুরের অখণ্ড বিশ্বজনীনতা শুধু দুই বাংলা বা বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যাপ্তি অপার, অভাবনীয়। বিশ্বের কমবেশি প্রায় সব দেশেই দিনটি পালিত হয়ে এসেছে৷ কোভিড আবহে সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনায় এসেছে ভাটা; তবুও বিশ্বকবির আত্মিক আরাধনায় পিছিয়ে ছিলেন না রবিভক্তরা। তা সে ভারত, বাংলাদেশ হোক বা পাকিস্তান৷
হ্যাঁ পাকিস্তানও৷ শুনতে আশ্চর্য লাগলেও তা সত্যি৷ খুব কম লোক জানেন, পাকিস্তানের একটি প্রাচীন সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও, ছোট আকারে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। অবশ্য তা কিন্তু অন্যান্য দেশের মতো ইংরেজি ক্যালেন্ডার মেনে। ১২৬৮ সন ২৫ বৈশাখের মাহাত্ম্য বোধকরি শুধু এপার-ওপার বাংলার মানুষ'ই কেবল বোঝে।
১৮৬৪ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রাচীন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র তিন বছর ৷ কলেজ-টির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ড. চার্লস উইলিয়াম ফর্ম্যান (১৮২১-১৮৯৪)। ১৮৪৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের দশ বছর আগে অবিভক্ত ভারতে, কলকাতায় প্রথম পা রাখেন ড. ফর্ম্যান। ১৮৪৯ এ তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাহোরে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পঞ্জাব প্রদেশে গড়ে তোলেন রঙ মহল স্কুল। এই স্কুলের লাগোয়া অঞ্চলে লাহোর ক্যানেলের ধারে একটি কলেজ গড়ে তোলেব ফর্ম্যান। প্রথমে তার নাম ছিল 'লাহোর মিশন কলেজ'।
শোনা যায় সম্রাট শাহজাহানের এক ওয়াজিরের বংশধর জায়গাটি ফর্ম্যানকে মিশনের কাজকর্মের জন্য 'লিজ' দেন। এখানেই ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে মিশন কলেজ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কলেজের পরিচালনা কমিটির শীর্ষ পদে থেকেছেন ড. চার্লস ফর্ম্যান। তাঁর উদ্যোগেই ওই অঞ্চলে ছড়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও ভাবনা। ১৮৯৪ সালে লাহোরেই প্রয়াত হন পাকিস্তানী শিক্ষাজগতের প্রবাদ পুরুষ ড. ফর্ম্যান। আজও লাহোরের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান সিমেট্রি'তে (গোরা কবরিস্তান) চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন তিনি৷ ফর্ম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মিশন কলেজের নতুন নাম রাখা হয় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপ্রাচীন কলেজটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত৷ দেশভাগের পর তা চলে আসে লাহোরের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ২০০৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
১৫৭ বছরের ইতিহাসে এ কলেজ বহু নজিরবিহীন কৃতিত্ব গড়েছে। দিয়েছে অসাধারণ কিছু শিক্ষার্ত্রী, পরবর্তী কালে যারা আধুনিক পাকিস্তান ও ভারতে শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাজনীতির জগতের বহু স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেন। এই কলেজের প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুরেন্দ্র কুমার দত্ত, গণিতজ্ঞ আলমা মাশরিকি, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল, পঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল, মুসলিম লীগের নেতা মিঁয়া বরকত আলী, পঞ্জাবের সাংসদ বলরাম জাখর, প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ শরিফ, পাক সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুল রশিদ, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র, সাংবাদিক ও লেখক কুলদীপ নায়ার, সাহিত্যিক কৃষন চন্দ ও প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশারফ৷ নোবেলজয়ী বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার কম্পটন'ও এই কলেজে গবেষণা করেছেন, করেছেন শিক্ষকতা। আজও পাকিস্তানের আধুনিক শিক্ষাঙ্গনে গৌরবময় অধ্যায়ের নাম ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ।
কথিত আছে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে এ কলেজে একটি শোকসভা আয়োজিত হয়, তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রকুমার দত্তের উদ্যোগে। ২০ বছর পর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গড়া হয় একটি কমিটি৷ কিন্তু '৬৭ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যাবতীয় রবীন্দ্রচর্চায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন জেনারেল আয়ুব খান সরকার। বন্ধ হয়ে যায় রবীন্দ্রচর্চা। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় কবি আলমা ইকবালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা টেনে এনে কবিগুরুর সাহিত্য প্রতিভাকে কখনই সম্মান দিতে চায়নি কট্টরপন্থী পাক সরকার। পরে নয়ের দশকের প্রথম ভাগে পরিস্থিতি শান্ত হলে আবারও নতুন করে পাকিস্তানে শুরু হয় রবীন্দ্র চর্চা। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তাতে নিয়েছিল অগ্রনী ভূমিকা। নয়ের দশকের মাঝামাঝি কলেজের ইতিহাস ও সাহিত্য বিভাগ যুগ্ম ভাবে পালন করা শুরু করে রবীন্দ্র জয়ন্তী৷ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকেরা একসাথে অংশ নেন তাতে। 'সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলেছে'।
২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিখ্যাত 'ডন' পত্রিকায় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে বছর কলেজে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের শতবর্ষ পালিত হয়। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সাথে এউইং লিটারারি সোসাইটি যৌথ ভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে৷ রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্র রচনা পাঠ ও সত্যজিৎ রায়ের ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সে উপলক্ষে।
কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান ড. ইয়াকুব বাঙ্গাশ বলেছিলেন, "অবিভক্ত ভারত হোক বা বর্তমান সময়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রবাদ ও সমাজচেতনা চির অক্ষয়, অমলিন। কোনও দেশকালের গণ্ডি দিয়ে তাকে মাপা সম্ভব নয়।" কলেজের আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ড. ওয়াসিম আনওয়ার জানান, "একসময় রবীন্দ্র ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু খ্যাতনামা পড়ুয়ারা শান্তিনিকেতন পাড়ি দিয়েছেন। রাজেশ্বরী বাসুদেব (কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত) তার অন্যতম। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, চিন্তা ও মননের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে দেখছে। তাঁর ভাবধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছ।" আনওয়ার বলেন, "ভুললে চলবে না পাকিস্তানের রাষ্ট্রপিতা মহম্মদ আলী জিন্না নিজে রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। আজও আমাদের কাছে বিশ্ব সাহিত্যের ত্রয়ী সাধক নমস্য। এঁনারা হলেন আলমা ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং রবীন্দ্রনাথ।"
২০২০ সালে গোটা বিশ্ব জুড়ে আছড়ে পড়েছে কোভিড ঢেউ৷ ২০২১ এ এসেছে দ্বিতীয় তরঙ্গ। সেই মারণ হিল্লোলে লণ্ডভণ্ড ভারত, পাকিস্তানও। তবু দু'দেশের সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতিমনস্ক উদারমনা মানুষ আজও রবীন্দ্রচর্চা থেকে সরে আসেননি। সরে আসেনি ১৫৭ বছরের ঐতিহ্যশালী লাহোরের ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। নিঃশব্দে, নিভৃতে রবীন্দ্র সাধনা করে চলেছেন তারা। অতিমারীর সঙ্কটকালে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের কাছে আজও সমান ভাবে গৃহীত রবি ঠাকুরের সেই বাণী - "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত..."
রবীন্দ্র প্রদর্শিত সেই মুক্তির আলোয় ভেসে, আজও দেশকালের বিরোধ ভুলে রবীন্দ্র আরাধনায় নিমগ্ন লাহোরের 'প্রেসিডেন্সি' - ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ।
---------------------
তথ্যসূত্র. 'দ্য ডন' সংবাদপত্র, 'ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্র, ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, দিল্লি, উর্দু আকাদেমি - লাহোর ও দিল্লি, জার্নাল অফ রিসার্চ ইন হিউম্যানিটিজ এবং হিস্টরিকাল সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি অফ পঞ্জাব, লাহোর এবং নিউজলেটার, ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ, লাহোর।
ছবি. ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ গ্যালারি।
No comments:
Post a Comment