'ছায়ার সাথে কুস্তি করে' আজ পর্যন্ত কার গাত্রে ব্যাথা হয়েছে? এক সুকুমার রায় ছাড়া!
তিনি শুধু কুস্তি করেই ক্ষান্ত হননি, ফলাও করে ছায়া নিয়ে ব্যবসাও করেছেন। সুকুমার রায় বলেই হয়তো এমন অদ্ভুত ভাবনার 'ছায়াবাজি' -
"ছায়া ধরার ব্যবসা করি তাও জানো না বুঝি,
রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি!"
পরে বুঝতে পেরেছি, অল্পবিস্তর সেই ছায়ার পুঁজি কমবেশি আমাদের সকলের। আমরা ছায়ায় ঘেরা এক অলীক পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে আমাদের সঙ্গে ছায়া নয়, ছায়ার সঙ্গে আমরা পথ হাঁটি।
ছোটবেলা কেটেছে মফঃস্বলে। লোডশেডিং সেখানে সর্বক্ষণের সঙ্গী। সন্ধ্যেবেলায় আলো চলে গেলে, মা সামনে রাখতেন হ্যারিকেন বা মোমবাতি। তিরতিরে সেই গা ছমছমে ভুতুড়ে আলোয়, দেওয়ালে নিজের ছায়া দেখে চমকে উঠেছি কতবার।
যখন ধাতস্থ হওয়া শিখেছি, তখন দেওয়াল জুড়ে শুরু হতো আঙুলের কারুকাজ। আটের নামতা মুখস্ত করা শিকেয় তুলে ভেসে গেছি ছায়া সমুদ্রে। অজান্তেই হাতের ছায়ায় দেওয়ালে ভেসে উঠেছে হরিণ, বাঘ, কুকুর, বুড়োর মুখ, টুপি-পড়া সাহেব, আর পাখি...অগুনতি পাখি উড়ে বেড়াতো ঘরের রঙচটা দেওয়ালে।
পরবর্তী কালে মহাজাতি সদন কিম্বা রবীন্দ্র মঞ্চে অবাক হয়ে দেখেছি পি সি সরকারের 'ছায়াবাজি'। ছায়ারা যেন কথা বলতো, নাচত, খেলত তার সঙ্গে। কী অদ্ভুত রহস্যময় সব ছায়ার খেলা!
বড় হয়ে জেনেছি 'শ্যাডোগ্রাফি' কাকে বলে। অবাক হয়ে বুঝতে শেখা এই 'আর্ট' বহু বছর আগে, সপ্তম শতাব্দীর গোড়ায় মিশর, ইন্দোনেশিয়া, চিনে চর্চা করা হতো। রাজ দরবারে পুরোহিত, জাদুকরেরা সেই সব খেলা দেখাতেন। পুতুল খেলার মধ্যে দিয়ে ছায়ার সাথে যুদ্ধ জারি করা হতো।
১৭৭৬ সালে ডমিনিক সেরাফিন ইউরোপে প্রথম দেখালেন ছায়াপুতুলের কারসাজি৷ দেখালেন হাত কী অদ্ভুত ছায়া অবয়ব গড়তে পারে৷ তাজ্জব বনে গেছিল প্যারিসের জনতা সেই খেলা দেখে। দ্রুত ছড়ায় তার জনপ্রিয়তা।
১৮৭৫ সালে ফেলিসিয়ন ট্রিওয়ে এই 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি'কে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। একে একে উঠে আসেন আলেক্সান্ডার হারম্যান, ডেভিড ডেভাণ্ট, এডওয়ার্ড ভিক্টর বা ডেভিড ব্যামবার্গের মতো সব প্রথমসারির কিংবদন্তি 'শ্যাডোগ্রাফার'রা। ১৮৫৯ এ বেরোয় শ্যাডোগ্রাফি নিয়ে প্রথম বই "হ্যাণ্ড শ্যাডোজ টুবি থ্রোন আপন দ্য ওয়াল", লেখক হেনরি বার্সিল।
ভারতেও প্রাচীন জাদুকরেরা এর চর্চা করেছেন। গণপতি চক্রবর্তী থেকে গোপীনাথ মুথুকার, পি সি সরকার থেকে প্রহ্লাদ আচার্য, মায় পি লাল পর্যন্ত কমবেশি তাঁদের জাদুকীর্তি'তে 'শ্যাডোগ্রাফি'র চর্চা রেখেছেন। আজ সেই 'ছায়াবাজি'কেই অভাবনীয় শিল্পের স্তরে নিয়ে গেছেন কিছু অখ্যাত মানুষ। সেই 'ট্যাডিশন সমানে চলিয়াছে', নিঃশব্দে।
সৃজিত মুখার্জির 'নির্বাক' (২০১৫) সিনেমা হিসেবে যতটা না স্পর্শ করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছুঁয়ে গিয়েছিল তার গল্প বলার গভীরতায়। বিস্মিত হয়েছিলাম অঞ্জন দত্ত বা ঋত্বিক চক্রবর্তীর ছায়া ঘেরা অভিনয়ে। সেই স্তরের পর স্তর খুলে বেরিয়ে আসা কাহিনি ও চরিত্রের অবয়ব, কী অসাধারণ ছায়া-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল স্তব্ধতার সম্মোহনে।
আর সম্মোহিত করেছিলেন দুজন - অমর সেন ও সব্যসাচী সেন। সিনেমার ওপেনিং ক্রেডিটে তাদের 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি' অকল্পনীয়। তার সাথে অঞ্জন পুত্র নীল দত্তের অভাবনীয় 'ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর' কী ছায়ামেদুর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল, তা ভাবলে আজও সত্যি রোমাঞ্চ লাগে।
'সেন জুটি' এই মুহূর্তে শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অন্যতম সেরা ছায়াশিল্পী৷ শুধু মাত্র হাতের 'মুভমেন্ট' কতটা নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে তা দেখিয়েছেন তাঁরা। এও এক অলৌকিক ছায়া চরাচর, যেখানে শরীরী ভাষ্য ও ছায়াভাষ্য কখন যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
নিঃশব্দে সৃষ্টি হয় ছায়া মূর্চ্ছনা। সেই মূর্চ্ছনা সকলে শুনতে পান না। তাকে অনুভব করার আলাদা চোখ প্রয়োজন। তাকে বোঝা এত সহজ নয়।
সুকুমার রায় ভোররাতে, সন্তর্পণে এসে জানিয়ে দিয়ে যান -
"কেউ জানেনা এ-সব কথা কেউ বোঝে না কিছু,
কেউ ঘোরে না আমার মত ছায়ার পিছুপিছু।"
No comments:
Post a Comment