Wednesday, June 2, 2021

"ইয়াবাহার', কী বাহার!" ~ ভূমধ্য সাগরের এস্রাজ

মহাকাশ। অনন্ত শূন্য। গ্রহপুঞ্জের সমষ্টি। ছায়াপথে মিশে থাকা নক্ষত্ররাজি। তারও ঊর্ধ্বে, অপার শূন্য ও স্তব্ধতার স্তব। শব্দ নেই, প্রাণ নেই, নেই স্পন্দন। অথচ তারও কী কোনও নিজস্ব সুর থাকে? 

মাটি। মাটির গভীরে মাটি। তারও গভীরে ক্লেদজল, শিকড়, খনিজ স্তর, সালফার, উত্তাপ। আর তারও গভীরে নেমে গেলে অন্ধকার। যেন সেই 'ইনফার্নো', 'পুর্গাতরি' ও 'পারাদিসো'র মধ্যবর্তী শূন্যতায় মিশে থাকা রিরংসার ধ্বনি আলেখ্য৷ 

অথবা সসাগরা পৃথিবী। অবিরত ভেঙে পড়া ঢেউ, বালিয়াড়ি, সরীসৃপ আর শৈবালের মধ্যে খুঁজে দেখা ফাঁপা শঙ্খ। যার গায়ে কান পাতলে সমুদ্রের মূর্চ্ছনা শোনা যায়৷ 

যেন কোনও দাবানল শেষ হওয়ার পর পুড়ে কালো, চিড়ে দু'ফাঁক যাওয়া কাঠের মধ্যে দিয়ে এক চিলতে হাওয়া খেলা করে ভস্মাধারে। লেলিহান অগ্নিশিখার ধ্বনিকল্পের সুরে সুরে। 

ক্ষিতি,অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। এই সেই অনাদি পঞ্চরহস্য। 

পঞ্চভূত, পঞ্চতত্ত্ব  বা পঞ্চ আঙ্গিকের সমাহারে গড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এই পঞ্চতত্ত্বেই সৃষ্টি ও লয়ের বিন্যাস। পৃথিবী জলে, জল সূর্যে, সূর্য বায়ুতে তথা বায়ু অনন্ত আকাশে লীন হয়। আর এর ঊর্ধ্বে? এর ঊর্ধ্বে কী?


তুরস্কে ভূমধ্যসাগরের তীরে, এক পরিত্যক্ত লাইট হাউসের মধ্যে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এই কথা ভাবছিল বছর পঁচিশের এক যুবক। 

গোর্কেম সেন, জন্ম ১৯৮২, ইস্তানবুল। ছোটবেলায় প্রকৃতিই ছিল তাঁর একমাত্র বন্ধু। প্রকৃতিকে নিজস্ব ছন্দে অনুভব করতো সংগীতের সুরে। যন্ত্রসংগীতে সিদ্ধহস্ত গোর্কেম চিনেছিল, তাঁর অনন্ত আশ্রয়, সুর ও ধ্বনিকল্পের জগৎ'কে।

একাকীত্ব পছন্দ করতো গোর্কেম। অবসরে বেরিয়ে পড়তো পাহাড়ে, জঙ্গলে, সমুদ্রে। সঙ্গী বলতে শুধুই 'নেহ' (তুর্কিদেশীয় বাঁশী), 'বালমা' (তুর্কিশ স্ট্রিং) বা 'খামাঞ্চে'। এই প্রাচীন যন্ত্রেই সে পেয়েছিল প্রকৃতির ছোঁয়া। কিন্তু তাতেও আসেনি সন্তুষ্টি। 

গোর্কেম মনে করতো, পঞ্চতত্ত্বের আধার বা তারও ঊর্ধ্বে থাকা অন্য কোনও তত্ত্ব (ষষ্ঠ তত্ত্ব বা সিক্সথ এলিমেন্ট) কে কী ভাবে স্পর্শ করা যায়! দার্শনিক ব্যাখায় তা সম্ভব হলেও, বাস্তবিক অর্থে তা আদৌ সম্ভব কী? হয়তো নতুন কোনও শব্দকল্পদ্রুম তার চিরকাঙ্ক্ষিত সেই খোঁজ'কে সম্পূর্ণতা দিতে পারে৷ 

গোর্কেম বিশ্বাস করেছিলেন, সাঙ্গীতিক প্রয়োগ বা ধ্বনিতত্ত্বের সূত্রে সেই 'সিক্সথ এলিমেন্ট'কে স্পর্শ করা সম্ভব। তার জন্য দরকার নতুন চিন্তা-ভাবনা, নতুন সৃষ্টি, নতুন শব্দব্রহ্ম গঠন। 

সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গোর্কেম। সুদীর্ঘ আট বছরের পরিশ্রম ও অগনিত ব্যর্থতার পর তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেই অদ্ভুত সুন্দর যন্ত্র। ইয়াবাহার। 

২০০৯ সালে তৈরি হল এক সম্পূর্ণ অন্য ধারার যন্ত্র। অবৈদ্যুতিন, কাঠ ও মেটালনির্মিত, চেলোর মত ছড় টানা, দুটি 'থাণ্ডার ড্রামে' তারের শব্দে প্রতিধ্বনি ও অস্ট্রেলিয়ার 'অ্যাবরিজিনাল'-দের বাঁশীর আদলে অতিকায় কাঠামো। এই বহুমাত্রিক সম্মেলনে উঠে এল 'ইয়াবাহারে'র বাস্তবিক রূপ। আর শব্দ? 

গোর্কেম নিজেই বলেন, প্রথম প্রথম এর শব্দ ছিল কর্কশ৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন সূক্ষ্ম 'এক্সপেরিমেন্টে'র ফলে যে শব্দটি পাওয়া গেল, তা আক্ষরিক অর্থেই 'মহাজাগতিক'। সে শব্দ এক পরাবাস্তব, অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার প্রকাশ। অন্য পৃথিবীর সুর। যা পঞ্চতত্ত্বের সম্মিলনে ষষ্ঠ তত্ত্বের আভাস। এককথায় অভূতপূর্ব  সাঙ্গীতিক 'স্পেস ওডিসি' যাকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। 

তুর্কিতে 'ইয়া' শব্দের অর্থ তার, 'বাহার' বসন্ত। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ও রাগবিন্যাসে (মাকাম) গোর্কেম সত্যি সত্যিই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন পঞ্চতত্ত্বের নেপথ্যে থাকা আরেক জগৎ'কে। সে জগৎ'কে তিনি তাঁরই সৃষ্টির হাত ধরে দিলেন বসন্তের ছোঁয়া। ২০১১ সালে গোর্কেমের 'ইয়াবাহার'-কে শতাব্দীর অন্যতম সেরা আবিষ্কারের তকমা দিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা। 

আজও গ্রীসে ও তুরস্কের সমুদ্রের ধারে গ্রামে বসে নিত্যনতুন যন্ত্র বানিয়ে চলেছেন গোর্কেম। ইয়াবাহার পেয়েছে তার দোসর - শানবাহার ও দার্ববাহার। তাঁর সৃজনশীলতা অনন্য দর্শনের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।

পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চভূত যে সৃষ্টির আধার, তার মাধ্যমে এক সম্পূর্ণ অন্যধারার তত্ত্ব এবং জগতের পরিচয় করিয়েছেন তুরস্কের এই অজানা সঙ্গীতজ্ঞ। গোর্কেম ও তাঁর 'ইয়াবাহার' এক অনন্য সুরলোকের সন্ধান দিয়েছেন, নিঃশব্দে। নিজের কথায়, যদি তিনটি শব্দে তাঁর সৃষ্টির ব্যাখা করা যায়, তবে তা হল - 

'ইনার - স্পেস - শিপ' 

সুরমূর্চ্ছনার 'অলৌকিক' মহাকাশ সফর অক্ষয় হোক। 
www.gorkemsen.com

No comments:

Post a Comment