দিন দুয়েক আগের খবর।
নিউজে শুনলাম রাহুল রয়, নয়ের দশকে বলিউডের ডাকসাইটে অভিনেতা কার্গিলে শুটিং করতে গিয়ে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। নানাবতী'তে ভর্তি, আইসিইউ-তে।
রীতিমতো মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই অভিশপ্ত বছর, ভারি অলুক্ষুনে সময়। কতশত প্রিয় মানুষ অসময়ে পাড়ি দিচ্ছেন না-ফেরার দেশে। সেই তালিকায় বুঝি যুক্ত হলেন রাহুলও। আমার একলা দোকলা ছেলেবেলার একসময়ের প্রিয় নায়ক তিনি।
রাহুল মানেই আমার কাছে 'জুনুন' (১৯৯২) 'ফির তেরি কহানী ইয়াদ আয়ি' (১৯৯৩) বা 'প্যায়ার কা সায়া' (১৯৯১) আর অতি অবশ্যই মহেশ ভাটের 'আশিকী'র মত সিনেমাগুলি। অদ্ভুত ভালো লাগতো তাঁর হেয়ার স্টাইল। রবিবার প্রভাত'দার দোকানে চুল কাঁটতে গিয়ে বলেছি "আশিকী কাট করে দাও"। প্রভাত'দা হাসতে হাসতে বাটি ছাঁট মেরে ছেড়ে দিয়েছে।
কী অসাধারণ ছিল 'আশিকী'র (১৯৯০) গানগুলি। আহা, নাদিম-শ্রবণের সুরে সমীরের লেখা অসামান্য সব গানগুলি গেয়ে ইতিহাস রচেছিলেন কেদারনাথ ভট্টাচার্য ওরফে কুমার শানু। তার 'ফিমেল ভার্সানে' কোনও অংশে কম যাননি অনুরাধা পোড়ওয়াল'ও।
'আশিকী'র একডজন গানের মধ্যে প্রায় সবকটিই হিট। প্রতিটি গানই সুরে, কথায়, গায়নে অনবদ্য। তিরিশ বছর পেরিয়ে এসে আজও তার রেশ রয়ে গেছে। বলিউডের অন্যতম সেরা কম্পোজিশন। ২ কোটির উপর 'আশিকী'র ক্যাসেট বিক্রি হয়েছিল সেই সময়। আজও সেই রেকর্ড অক্ষত।
অথচ খুব কম মানুষই জানেন যে এর অধিকাংশ গান-ই ছিল সাতের দশকের পাকিস্তানি গজল ও কাওয়ালি অনুপ্রাণিত। ইচ্ছে করেই 'কপি' শব্দটি উল্লেখ করলাম না৷ কারণ মূল গানের সুর ও কথার বিস্তর প্রভাব থাকলেও, এর রিমেক ভার্সানগুলিও গুণগত মানে কোনো অংশে কম ছিল না।
তেমনই একটি অত্যন্ত প্রিয় গান ছিল "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"। সত্তরের দশকে অপূর্ব এই গজলটি গেয়েছিলেন বিখ্যাত পাকিস্তানি গায়িকা তসাওয়ার খানুম। মূল গানটির রচনাকার তসলিম ফজলি ও সুর দেন ললিউডের কিংবদন্তি সুরকার নাসাদ।
তসাওয়ার খানুমের জন্ম পাক গুজরাটে, ১৯৫০ সালে। তসাওয়ারের তালিম বিখ্যাত গায়ক পরভেজ মেহেদীর কাছে। পরে প্রথিতযশা সারেঙ্গী বাদক উস্তাদ বুটা আলী খানের কাছেও তালিম নেন তিনি। অল্প বয়সেই পাক টেলিভিশন ও রেডিও'তে গজল গাওয়া শুরু করেন তসাওয়ার। এরপর সরাসরি নেমে পড়েন প্লে ব্যাকে।
পঞ্চাশ বছরের কেরিয়ারে অসংখ্য হিট গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর নাম চিরতরে জুড়ে যায় "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়"-র সাথে। ১৯৭৭ এ আমীর আলী শাহ নির্দেশিত "মহব্বত মর নেহি সকতি" সিনেমাটি'তে পুনরায় এই গানটি শোনা যায় মেহেদি হাসান, নূরজাহানের কণ্ঠে। কিন্তু তসাওয়ারের 'উচ্চতা' অন্তত এই গানে স্পর্শ করতে পারেননি তাঁরা, এমনটাই মনে করে থাকেন গুণীজনেরা।
১৯৯০ তে সেই বিখ্যাত গজলটিকেই নতুন আঙ্গিকে নিয়ে এলেন নাদিম-শ্রবণ। নতুন করে তাকে শব্দের মোড়কে মুড়লেন গীতিকার সমীর। বাকি ইতিহাস গড়ে দিলেন কুমার শানু। রাহুল রয় অভিনীত "আশিকী"কে নতুন উচ্চতা দিয়েছিল কাওয়ালী অঙ্গের এই গানটি।
খবর পেলাম সুস্থ হয়ে উঠছেন রাহুল। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। তিনি দ্রুত আরোগ্য লাভ করুন এই প্রার্থনা করি। আর একই সাথে আবারও ফিরে যাই কিন্নরকণ্ঠি তসাওয়ার খানুমের কাছে।
কুমার শানু এই গানটি যতই অসাধারণ গান না কেন, কিন্তু তসাওয়ারের কণ্ঠমাধুর্য ও অভাবনীয় সেই স্বর্গীয় আকুতির তল পাওয়া দুস্কর। কারণ আজও তামাম সঙ্গীতরসিক মানুষের কাছে "তু মেরি জিন্দেগী হ্যায়" মানেই তসাওয়ার খানুম।
গান ও গায়িকা, এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে একে অন্যের সাথে...আজও তা অবিচ্ছেদ্য!
"মেরি দিল মে তু হি তু হ্যায় / তেরি রোশনী হ্যায়..."
No comments:
Post a Comment