Wednesday, June 9, 2021

ব্যোমকেশ ধ্বনিঃ এক অপার্থিব যুগলবন্দী


'I have had a dream to try to combine Western and Indian music into a new form, a music which has no particular name but is melodious and touching...' 

- Ananda Shankar, Sitar Virtuoso 

সেলুলয়েডে যে কোন চরিত্র, প্লট বা বিষয়কেন্দ্রীক রূপায়নে 'থিম' বা আবহ সঙ্গীতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রথমসারির চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সঙ্গীত পরিচালকেরা দীর্ঘদিন ধরে থিম নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এসেছেন। রেখেছেন 'থিম' নির্মাণে নিজস্ব মুনশিয়ানার স্বতন্ত্র ছাপ। 

উদাহরণ স্বরূপ প্রথমেই যার নাম মনে আসে তিনি সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের ফেলুদা থিম আমাদের অতি পরিচিত, রোমাঞ্চ ও ভালোলাগার বিষয়। এই থিমটিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা 'থিম' সংগীত রূপেও মনে করা হয়। ম্যোৎসার্টের সিম্ফনি নং ২৫ এর বিস্তর প্রভাব পাওয়া যায় মানিকবাবুর রচনায়। সঙ্গীতজ্ঞ'দের একাংশ মনে করে থাকেন, প্রাশ্চাত্য সঙ্গীতের উচ্চমানের সমঝদার ছিলেন মানিকবাবু। তাঁর 'কম্পোজিশনে' বারংবার ঘুরে ফিরে এসেছে বাখ, ম্যোৎসার্ট, বিঠোফেনের ছায়া। এসেছে লোক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রয়োগও। থিম মিউজিক কিম্বা আবহ নিয়ে সত্যজিতের চিন্তাভাবনা, প্রয়োগ এবং দর্শন যে কোন মার্গে উন্নীত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।  

১৯৬৭ তে প্রকাশ্যে আসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের প্রথম ও উত্তম কুমার অভিনীত সত্যজিৎ রায়ের 'চিড়িয়াখানা'।  ১৯৭৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিতের 'সোনার কেল্লা'। সেই একই সালে মুক্তি পেয়েছিল মঞ্জু দে অভিনীত ও পরিচালিত 'শজারুর কাঁটা'। সতীন্দ্র ভট্টাচার্য হয়েছিলেন ব্যোমকেশ, অজিত শৈলেন মুখার্জি যিনি 'চিড়িয়াখানা'তেও অজিত হয়েছেন। পাঁচ বছর পর ৭৯' সালে তার সিক্যুয়ল 'জয়বাবা ফেলুনাথ'। এর পাক্কা ১৪ বছর পর ৯৩' সালে দূরদর্শনে প্রচারিত হয় সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জি'র এপিক হিন্দি সিরিয়াল - 'ব্যোমকেশ বক্সী'। কথা-সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্রটিকে প্রথম প্রাদেশিকতার গণ্ডী উত্তীর্ণ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। ১৯৯৩-৯৭ সালের মধ্যে দূরদর্শনের হাত ধরে বাংলা  তথা বাংলার বাইরে তথাকথিত গোয়েন্দা চরিত্রটি তুলে ধরা সহজসাধ্য ছিল না। সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন বাসু চ্যাটার্জি। তাঁর হাত ধরেই প্রথম ব্যোমকেশ বক্সীকে চিনেছিল গোটা দেশ। বাংলা সহ অবাঙালি মহলে কি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায় বাসুবাবুর 'ব্যোমকেশ বক্সী', তা সর্বজনবিদিত। ব্যোমকেশের চরিত্রে রজিত কাপুর, অজিত কে কে রায়না ও সত্যবতীর চরিত্রে সুকন্যা কুলকার্নির সে অসাধারণ অভিনয়, গল্পের পাতা থেকে যেন উঠে এসে চরিত্রগুলির সার্থকতা লিখে দিয়ে গেছিল। পাশাপাশি উৎপল দত্ত (সীমন্ত হীরা) এবং রবি ঘোষের (অমৃতের মৃত্যু) মত বরেন্য অভিনেতাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল এই সিরিজ। 


এরপর আদিগঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে বহু জল। মুড়ি মুরকির মত নির্মিত হয়েছে ব্যোমকেশ-কে নিয়ে অগুনতি সিনেমা, সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ তথা রেডিও ড্রামা ইত্যাদি ইত্যাদি। গুণগত মানে তার অনেকগুলি খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পেলেও, নয়ের দশকে নির্মিত সেই হিন্দি টেলি-সিরিজের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, সবদিক মিলিয়েই। হিন্দি বলয়ে 'ব্যোমকেশ বক্সী'কে নিয়ে চর্চা করার আর একবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন আরেক তরুণ বাঙালি পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জি তাঁর নির্মিত 'ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী' (২০১৫) সিনেমাটির মাধ্যমে। সিনেমাটি তেমন না চললেও গবেষক ও বিদ্দ্বজ্জন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। হিন্দি বলয়ে বাঙালি ডিটেকটিভ ফেলুদা চরিত্র'টিকে প্রতিষ্ঠিত করার দুঃসাহসিক চেষ্টা করেছিলেন সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়। শশী কাপুর ও মোহন আগাশে'কে নিয়ে হিন্দি টেলি সিরিয়াল 'কিসসা কাটমান্ডু কা', আশির দশকের শেষার্ধে। অবাঙালি মহল তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও, বাঙালি দর্শক তা খারিজ করে দিয়েছিল একেবারেই। 

ফিরে আসি 'থিমে'র প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রে গোয়েন্দা কাহিনিতে 'থিমে'র একটি বিশেষ অবস্থান আছে বলে আমার মনে হয়। সত্যজিতের ফেলুদা থিমের সূত্র ধরে যদি আমরা দেখি, তবে কিন্তু উঠে আসবে বহু দৃষ্টান্ত। হলিউডে 'জেমস বন্ড' মুভিজে ব্যবহৃত বিখ্যাত সেই 'থিমে'র কথা মনে করুন। পাঁচ পাঁচটি অস্কার জয়ী বিখ্যাত মার্কিন কম্পোজার জন ব্যারি (১৯৩৩-২০১১) ছিলেন তার সুর রচয়িতা। পরবর্তী কালে ডেভিড আর্নল্ড, জর্জ মার্টিন সহ থমাস এম নিউম্যান, মাইকেল কামেন বা হ্যান্স জিমারের মত প্রথিতযশা সুরকারেরা ব্যারির সেই 'ঐতিহ্য'ই বহন করে চলেছেন। 

আশির দশকের শেষে আগাথা ক্রিস্টির এরক্যুল পয়রো টেলি সিরিজের সেই অসামান্য মেলোডিক স্যাক্সোফনিক 'থিম' আমরা কেউই ভুলিনি। ব্রিটিশ কম্পোজার ক্রিস্টোফার গানিং ছিলেন তার অমর স্রষ্টা। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অমর সৃষ্টি শার্লক হোমস সিরিজের সেই 'থিম' বানিয়ে তাকে রাতারাতি দর্শকের মনের কাছাকাছি এনে ছিলেন ডেভিড আর্নল্ড, মাইকেল প্রাইস ও পরবর্তী কালে হ্যান্স জিমার। এই তালিকা যথেষ্ট দীর্ঘায়িত। 

মজার বিষয়, আজ যখন পিছনে ফিরে অসামান্য এই ডিটেকটিভস 'থিম'গুলিকে শুনি, অদ্ভুতভাবে চোখে পড়ে ব্যোমকেশ বক্সীর সেই অনন্যসাধারণ থিম মিউজিক বা সিগনেচার টিউন'টির কথা। যার কথা নিয়ে তেমন আলোচনা চোখেই পড়েনা। বাসু চ্যাটার্জি'র হিন্দি টেলি সিরিয়ল ব্যোমকেশ বক্সীর সেই 'থিম' উৎকর্ষতার নিরিখে অনায়াসেই কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাতে পারে ফেলুদা, হোমস, বণ্ড বা পয়রো সিরিজের বিখ্যাত সেই সিগনেচার টিউন বা থিম গুলিকে। 'ব্যোমকেশ বক্সী-র সেই অসাধারণ থিম'টি বানিয়েছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক আনন্দশঙ্কর। ভারতীয় টেলি সোপ ইতিহাসে অন্যতম সেরা 'সিগনেচার টিউন'টি আজও বিশেষ  সমাদৃত। 

১১ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে আলমোড়ায় জন্ম নেন আনন্দ শঙ্কর। বাবা-মা কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর ও অমলা শঙ্কর। কাকা আরেক কিংবদন্তি সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ছোটবেলা থেকেই সেতারের প্রতি ঝোঁক থাকলেও, মজার ব্যাপার, বিশ্ববিখ্যাত কাকার কাছে কখনো তালিম নেননি আনন্দ। পরবর্তী কালে সম্ভাবনা থাকলেও যাননি কোন অযাচিত প্রতিযোগীতায়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মহাপণ্ডিত, শিক্ষক, সেতারি এবং বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ডিন ও অধ্যাপক গুরু লালমনি মিশ্রের কাছে তালিম নেন আনন্দ। মার্গ সঙ্গীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্য সঙ্গীত, বিশেষ করে ক্ল্যাসিকল ও আধুনিক রকের প্রতি সমান আকৃষ্ট হন তিনি। 'ফিউশনে'র প্রতি বরাবর ছিল তাঁর মুনশিয়ানা। সেই আগ্রহ যথার্থ রূপ পায় ষাটের দশকে আনন্দ শঙ্করের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জিমি হেন্ড্রিক্স সহ বহু প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে তিনি পারফর্ম করেন। শুরু হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়ে তাঁর অসাধারণ সব 'এক্সপেরিমেন্ট'। উঠে আসে 'Jumping Jack Flash' বা 'Light my Fire' এর মত কম্পোজিশন। ১৯৭৫'র মাঝামাঝি দেশে ফিরে নতুন করে গবেষণায় মাতেন আনন্দ।  সেতারের মূর্চ্ছনার সঙ্গে অবলীলায় মিশতে থাকে ওয়েস্টার্ন রক গিটার, স্যাক্সোফোন, ড্রামস, বাঁশী, সিন্থেসাইজার। ১৯৭৮-৯৮ সাল, কুড়ি বছরের মধ্যে 'ফিউশন মিউজিকে'র নয়া দিগন্ত খুলে দিয়েছেন আনন্দ। ফলস্বরূপ, সৃষ্টি হয় 'India Remembers Elvis', 'A Musical Discovery of India', 'Missing You' বা 'Sa Re Ga Machan' এর মত অসাধারণ সব কম্পোজিশন। পরবর্তী কালে 'Streets of Calcutta', 'Indra Sabha', 'The River', 'Snow Flower', 'Dancing Drums' বা 'Walking On'-র মত রচনা তাকে খ্যাতির শীর্ষে তোলে। ১৯৯৯-এর ২৬ মার্চ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত তাঁর নির্দেশিত পথে বিশ্ব সঙ্গীতকে আরও কতভাবে সমৃদ্ধ করতো তা সত্যি কল্পনাতীত। 


নয়ের দশকে বাসু চ্যাটার্জির অনুরোধে 'ব্যোমকেশ বক্সী'র টাইটেল ট্র‍্যাকের জন্য সুর দেন তিনি। বাসু চেয়েছিলেন সেই সুরে যেন আধুনিকতার ছোঁয়া ও টানটান রোমাঞ্চের সাথে মিশে থাকে বাঙালিয়ানা। তাই করেছিলেন আনন্দ। ব্যোমকেশ বক্সীর ট্র‍্যাকে সেতারের মূর্চ্ছনা, সরোদের রহস্যাবৃত মন্দ্র স্বরের পাশাপাশি শ্রীখোলের অসাধারণ ট্রিটমেন্ট আজও অবিস্মরণীয়। পাশাপাশি ব্যবহার হয় সিন্থ-ডেলিক টিউন। তৈরি হয় ইতিহাস। সত্যজিতের ফেলুদার থিমের পাশাপাশি আনন্দ শঙ্করের ব্যোমকেশ ধ্বনি সিগনেচার টিউন বা থিম মিউজিকে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সোয়া এক মিনিটের সেই টাইটেল ট্যাক আজকের ভারতীয় দর্শকদের এক নিমেষে মথিত, রোমাঞ্চিত, নস্ট্যালজিক করে তোলে। 

সদ্যপ্রয়াত নির্দেশক বাসু চ্যাটার্জির স্মৃতির পথে হেঁটে আরও এক প্রথিতযশা সুরকার, সেতারবাদক ও বিশ্ব সঙ্গীতের কীর্তিমান সাধক আনন্দ শঙ্করের সাঙ্গীতিক অবদানের কথা তুলে ধরার একটাই উদ্দেশ্য - আমরা যেন সেই সব অতুলনীয় কীর্তির কথা বিস্মৃত না হই। সেই 'আনন্দ' ধ্বনি দশকের পর দশক এভাবেই আমাদের অনুপ্রাণিত করুক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে উঠে আসা অনাবিল সুরের ঝরনাধারায়... 

No comments:

Post a Comment