Tuesday, June 1, 2021

বুদ্ধ হেসেছেঃ 'ট্রাইবাল রেইন' ও রাহুল রাই


১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ সাল। নামচি, সিকিম। 

সেদিন ভ্যালেন্টাইন। দিনভর বৃষ্টি হয়েছিল পাহাড়ে। বছর সাতাশের তরুণ'টি সন্ধ্যে নামার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিল। 

এমন অসময়ে তাকে বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হয়েছিল সবাই। এই সময়ে, হয় তাঁর প্র‍্যাকটিশ, না হয় কোনো পারফরম্যান্স থাকে। কিন্তু মুখচোরা ছেলেটি কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। 

সে বরাবর এমনই। ভিতরে শত সহস্র ঝড় উঠলেও মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। তাকে আড়াল করে দিত তাঁর শিশুসুলভ হাসি৷ যেন কোনো পাহাড়ি ঝর্না নেমে আসতো রুক্ষ পাথরের ভাঁজে। 

সবার সঙ্গে সে রাতে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল, হেসেছিল, গল্প করেছিল, খেয়েছিল রাতের খাবার৷ তারপর ঢুকে গিয়েছিল নিঃশব্দে নিজের ঘরে। আস্তে করে বন্ধ করে দিয়েছিল দরজা। অনেক রাত পর্যন্ত তাঁর ঘর থেকে পাওয়া গেছিল গিটারের আওয়াজ। 

পরদিন সকালে পুলিশ এসে উদ্ধার করেছিল তাঁর নিথর, নিস্পন্দ দেহ। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, সে আত্মহত্যা করেছে। অথচ পাওয়া যায়নি কোনো সুইসাইড নোট। থাকার বলতে, গান লেখার কিছু আঁকিবুঁকি চেষ্টা, ঘুমের ওষুধ আর তাঁর গিটার। প্রাণের চাইতেও যাকে ভালোবাসতো ছেলেটি৷ 

শুধু তাঁর বোজা চোখ দুটি, মনে হয়, শেষবারের মতো কিছু একটা খুঁজছিল। কী, তা কেউ জানে না। বইয়ের তাকের উপর রাখা 'লাফিং বুদ্ধা' শুধু নীরবে হেসেছিল, দু'হাত মাথার উপর তুলে। 

পরদিন "দার্জিলিং ক্রনিকল"-এ লেখা হয়েছিল - "Rahul Rai, the lead singer of Tribal Rain, has been found dead in an apparent suicide. The talented artist from Sikim reportedly committed suicide at his own residence in Namchi on Tuesday night." 

কেন? কী ভাবে? কিসের জন্য? সে কি কোনো মানসিক অবসাদে ভুগছিল? কোনও প্রেমঘটিত সম্পর্ক? বিচ্ছেদ? টানাপোড়েন? প্রতারণা? সে কী নেশা করতো? ড্রাগস? কোকেইন, চরস, গাঁজা? 

কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি সেদিন, আজও না। শুধু পাহাড় চিরতরে হারিয়েছিল তার প্রিয়বন্ধুকে। শান্ত, সৌম্য, ভদ্র চেহারার সেই ছোট্টখাটো অত্যন্ত গুণী মানুষটিকে। লোকে তাকে "রাহুল দাজু" বলে ডাকতো। 

সে রাহুল রাই, আধুনিক নেপালি সংগীতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা, 'ট্রাইবাল রেইন' ব্যাণ্ডের জনক, কম্পোজার, লিরিসিস্ট, লিড গিটারিস্ট৷ এককথায় রীতিমতো - 'ওয়ান ম্যান ব্যাণ্ড'।


১৯৮৯ সালের ১৪ অক্টোবর। কলকাতায় জন্মেছিল রাহুল। পদ্মা ও নয়ন কুমার রাইয়ের প্রথম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই গান অন্তপ্রাণ রাহুল, ভালোবেসে ছিল গিটারকে। 

১৯৯২ সালে নামচির মাউন্ট কারমেলে ভর্তি হয় সে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্যাঙ্গালোরে, তাঁর এক মামার কাছে। বাবা, মা'র থেকে দূরে। পাহাড় থেকে দূরে।

ছোট্ট ছেলেটা একা, বড়ো একা হয়ে পড়েছিল। এই সময়ে স্কুলের বন্ধুদের সাথে সংগীতচর্চা নিয়ে মেতে উঠেছিল সে৷ যেন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে খুঁজে পেয়েছিল আলোর সন্ধান। স্কুলে একটা ছোট ব্যাণ্ড খুলেছিল সে ও তাঁর বন্ধুরা। পড়াশোনার পাশাপাশি চলতো প্রাকটিস, স্টেজ পারফরম্যান্স। এই ভাবেই একটু একটু করে বড়ো হয়ে ওঠে ছেলেটি। তখন তাঁর দোসর বলতে, পকেটমানির টাকা বাঁচিয়ে কেনা সেই গিটার। নিজের সংগীতচর্চা নিয়ে সে খোলাখুলি বলতো - "We are not born with passion, we are develop it as we grow."

অবশ্য গানবাজনা ছিল তাঁর রক্তে, হাড়ে-মজ্জায়। দাদুকে দেখেছিল সে, ছোটবেলায়, হারমনিয়াম ও বেহালা বাজাতে, গান করতে। সেই শুরু৷ ছেলেটি বুঝতে পারে সংগীতের তালিম তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া৷ দাদুই তাঁকে দেখিয়েছিলেন পথ। 

কয়েক বছর পর, ফের নামচি ফেরে ছেলেটি। শুরু হয় নতুন করে পড়াশোনা। এই সময়েই নতুন একটি হেভি মেটাল ব্যাণ্ড খোলে সে, নাম দিয়েছিল "ড্রিম ডায়বলিক"। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে ২০০৯ এ আইআইটি গুয়াহাটি আয়োজিত "রক-ও-ফনিক" টাইটেল জিতে নেয় "ড্রিম ডায়বলিক"। জিতেছিল আরও একাধিক পুরষ্কার ও সম্মান৷ 

নামচির গভর্মেন্ট কলেজে পড়ার সময় পাকাপাকি মিউজিশিয়ান হবে বলে ঠিক করে সে। শুরু হয় নতুন পথচলা। সিকিম ইউনিভার্সিটি-তে মিউজিক নিয়ে পড়ার সময় সে শুরু করা সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার এক্সপেরিমেন্ট। ইংরাজি নয়, মাতৃভাষা নেপালিতে গান লেখা, সুর দেওয়া শুরু করে সে। এই সময়ই তাঁর হাত ধরে তৈরি হয় নতুন ব্যাণ্ড 'ট্রাইবাল রেইন'। 

২০১৪ তে তৈরি হয় ব্যাণ্ড। ২০১৬ সালে কাঠমান্ডুতে রিলিজ করে 'ট্রাইবাল রেইন'র প্রথম অ্যালবাম - "রোকো ইয়ো সময়"। অ্যালবামে মাত্র তিনটি গান - "চিন্তা", " নারিসানা" ও "ভানাই"। সিকিম, দার্জিলিং ও নেপালের পাহাড়ে আগুন জ্বলে ওঠে। ফ্রি স্টাইল সিংগিং-র নতুন ইতিহাস গড়েছিল "ট্রাইবাল রেইন"। তিনটি গানই, লেখা সুর ও কণ্ঠ ছিল রাহুলেরই। রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায় রাহুল রাই ও তাঁর বন্ধুরা। বহু পুরস্কারও পেয়েছিল অ্যালবামটি। 

*

কিন্তু এর মধ্যেই ইন্দ্রপতন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অজ্ঞাতকারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয় রাহুল রাই। শান্ত, নরম লম্বাচুলো, হাসিমাখা মুখের সেই লাজুক ছেলেটি যে এমন কাণ্ড বাঁধাবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। 

অনেকে বলে, সে রাতে 'ড্রাগ ওভারডোজে' কেড়ে নিয়েছিল রাহুল রাই-র প্রাণ। অনেকে বলে, কোনো একটি ব্যক্তিগত বিষয়ে মর্মাহত ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েই এই চরম পদক্ষেপ৷ কিন্তু কেন ২৭ বছরের তরতাজা, প্রতিভাবান একটি ছেলে এমন অকালে ঝরে গেল, আজও তা কেউ জানে না। 

তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে রিলিজ হয় "ভানাই"-র এই মিউজিক ভিডিও'টি। আজও পাহাড়ি ধুনে গাঁথা এই গানে রাহুলের কণ্ঠে "হেরা, তিমরো লাগি তারা তোড়ি দিনছু" (দেখো, তোমার জন্য আকাশের তারা নিয়ে এসেছি) শুনলে মনে হয়...প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ে ঝিকিয়ে উঠেছে রোদ, একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মেঘ আর সোনালী আভায় ঢেকে যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখর। 

না জানি অব্যক্ত কতো কথা মিশে আছে এই গানে। যার পরতে পরতে খেলা করে পাহাড়ি কুয়াশা, হাল্কা বৃষ্টি আর সেই সদাহাস্যজ্বল বুদ্ধমূর্তির করুণাঘন ছায়া।

যার 'অবাঙমনসোগোচর' হাসির আভা কেউ কখনো বোঝেনি। 

রাহুল ছাড়া আর কেউ বুঝবেও না। 


No comments:

Post a Comment