Showing posts with label personal prose. Show all posts
Showing posts with label personal prose. Show all posts

Thursday, June 3, 2021

'তবু প্রাণ নিত্যধারা' ~ এক অলীক কথোপকথন ২


রাত্রি গভীর হলে এ শহরে বিষাদ নেমে আসে। 

তোমরা তাকে চিনতে পারো না। তোমরা জানো না তাকে। একা একা পথ হাঁটে সে এ গলি-সে গলি। মাথা ঢাকা টুপি তার। গায়ে আলখাল্লা। হাতে বুঝি লাঠি থাকে। মৃদু ঠকঠক। 

রাত্রি গভীর হলে শহরে নামে বিষাদ প্রহরী। নিজস্ব কোনও নাম নেই তার। যে নামেই ডাকো, সে সাড়া দেবে না। শুধু অন্ধকার ছেঁনে হাওয়ায় ভেসে দাঁড়ায় কোনও বন্ধ দরজায়৷ অদৃশ্য নখর দিয়ে চিহ্ন আঁকে। যেন পুরনো জোব্বা থেকে এক চিমটে বিষাদ, লেপে দেয় ঘরে৷ তারপর এগিয়ে যায় অন্য দরজার দিকে৷

'নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে
বিকশিবে প্রাণ তাঁর গুণগানে...'

ধরা যাক, বিষাদের নাম 'যোগিয়া'। 'ভৈরবপুরে' তার বাড়ি৷ তার হাতে ধরা যে লাঠি, রাস্তায় মৃদু ঠকঠকে ছিটকে পড়ে কোমল রেখাব, কোমল ধৈবত নামের দুই জিন। আর থাকে এক অদৃশ্য এক মায়া, গান্ধার যার নাম। মধ্যম, বিষাদের কাঁধে বসা নীলরঙা পাখি তাকে আলতো ঠেলে দেয়। অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে৷

রাত্রি ঘন হলে বিষাদ প্রহরী গুনগুনিয়ে ওঠে। যেন পুরনো জানলার কাঁচে কাঁপন ধরায় কোনো অতন্দ্র রেলগাড়ি। বা পরিত্যক্ত গির্জার পাশে বসে থাকা উন্মাদ পাদরির প্রলাপ। আমি শুনতে পাই সেই সুর।

'তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে...'

প্রহরী জানে বিষাদের তল কোথায়। সে জানে কোন রঙে রাঙানো মন-খারাপ। তাই বারবার ফিরে আসে সুর। ঘুমন্ত শহরের অলিগলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তার মূর্চ্ছনা। 

'বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল,   
কে আর রহিল এ বনে...' 

এ বনে সত্যি আজ আর কেউ নেই। জনমানবশূন্য। একাকি রয়ে গেছে প্রহরী৷ তার কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ ভোর হয়ে আসার আগে শেষ পরিক্রমণ। দেখে নেওয়া মেপে মেপে, বিষাদ কিছু কম পড়লো কিনা! সে জানে তাড়াতাড়ি সাঙ্গ হবে কাজ। একটু পরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে সকাল। তার সাথে ফিরবে বুলেটের আওয়াজ, চাপ চাপ রক্ত, রাজনৈতিক হিংসার ভোর...

তার আগে শেষবার, শহরের পথেপথে রাত্রি গভীর হলে তার মৌরসীপাট্টা। অন্ধকার অন্ধ নয়। তারও নিজস্ব আছে চোখ, দেখার৷ অথচ তোমরা দেখতে পাও না৷ তোমরা আজও অন্ধ হয়েই আছে৷ বিষাদ তোমাদের অন্ধত্ব জানে৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে তোমার চোখের পাতা ছুঁইয়ে দেয়৷ তলিয়ে যাওয়ার আগে সে টুপি নামায়, মাথা ঝুঁকিয়ে করে সালাম। তারপর পায়ে-পায়ে হেঁটে যায় দিকচক্রবালে। 

রাত্রি গভীর হলে এ শহরের প্রতিটি দরজায় জেগে থাকে তার নখের দাগ। জন্মদাগের মত জেগে থাকা সেই আঁচড়ের নাম - 'যোগিয়া'। তার ক্ষয় নেই। 

'নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   
নাহি নাহি দৈন্যলেশ -
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে...'

* Picture. Varanasi by Donell Gumiran