ভোর হয়ে এলো। পাখি ডাকছে। একটু একটু করে সরছে রাত। চারপাশ যদিও এখনো শুনশান। একটু পরেই অবশ্য জেগে উঠবে শহর৷ শুরু হবে ব্যস্ততা। অথচ আমি কিনা এখনও...এখনও হাবুডুবু খাচ্ছি এই গান'টির স্থায়ী, অন্তরার সন্ধিক্ষণে।
সুখবিন্দর বড় পছন্দের গায়ক। যেমন তাঁর গায়কী, কণ্ঠ, ভোকাল রেঞ্জ ও ডেপথ্, তেমনই সুরের দখল। তাঁর গায়কী'তে মিরাসির ছোঁয়ায় মাটির গন্ধ লেগে থাকে। কখনো সেই মাটি কচ্ছের 'বঞ্জর' রণের মত, কখনো বা হিমাচলের পাহাড়িয়া মেঠোপথের ধুলো মাখা।
সুখবিন্দর সুর লাগালেই যেন একসাথে তরবারির ঝনঝনানি আর বিদ্যুতের চমক ঝলসায়। তার পর অঝোরে নামে বৃষ্টি। যেন হার্ড রক, মেটালের তালে কী অদ্ভুত ভাবে উঠে আসে পঞ্জাবের নামধারী'দের কীর্তন, 'গুরুবাণী'র সাথ-সঙ্গত। এতক্ষণ যা মনে হয়েছিল 'সাইকডেলিক', পরক্ষণেই তাতে সাক্ষাৎ পেলাম ওয়ারিস শাহ, বাবা ফরিদ, বুল্লেহ শাহের। সুখবিন্দর আমার কাছে আজও এক রহস্য।
অন্যান্য সকলের মত আমিও তাঁর 'হাইপিচে'র ভক্ত। ভালোবাসি 'ছইয়া ছইয়া', 'জয় হো', 'ওমকারা', 'দুয়া' বা 'বিসমিল', 'লগন লগি', 'চিন্নাম্মা'র মত ফাস্ট ট্র্যক গুলি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি টানে তাঁর 'হীর', 'রব্বা', 'ন্যয়না', 'মিট্টি তেরি'র মত স্লো ট্র্যাক-গুলি। মনে হয় এক অন্য সুখবিন্দরকে খুঁজে পাই সেখানে।
তবে 'গায়ক' সুখবিন্দরের পাশাপাশি কিন্ত 'সুরকার' সুখবিন্দর ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দি, তামিল, কন্নড়, তেলেগু, মারাঠি, উর্দু (কেন যে বাংলায় গান না) তে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি গান গাইলেও বেশ কিছু ছায়াছবিতে তিনি সংগীত পরিচালনার কাজও দক্ষ হাতে সামলেছেন। 'অস্তিত্ব', 'ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট' বা 'হাল্লা বোল' তার অন্যতম।
'মারাঠি মানহুস' মহেশ মঞ্জরেকরের 'অস্তিত্ব' আমার খুব ভালোলাগা একটি অভিজ্ঞতা। যারা দেখেছেন তারা নিঃসন্দেহে ভুলতে পারেননি। প্রায় একুশ বছর আগে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে ছিল কিছু অসাধারণ গান। সুখবিন্দর সিং ছিলেন সংগীত পরিচালনায়। 'চল চল মেরে সঙ্গ সঙ্গ' নিজের সুরে তাঁরই গাওয়া।
লঘু শাস্ত্রীয় অঙ্গের অদ্ভুত সুন্দর সেই গানে চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন 'সুখি'। আহীর ভৈঁরো ও ভাটিয়ার - দুটি ভোরের রাগ'কে পাশাপাশি মিশিয়ে দিয়েছিলেন অসামান্য দক্ষতায়। আলাপে যেখানে আহীর ভৈঁরোর সরগম উঠে আসে, স্থায়ী-অন্তরায় তাকেই ঢেকে দিচ্ছে, অন্য মার্গে যেন উত্তীর্ণ করছে ভাটিয়ার। দুই মিলেমিশে এক অতি-প্রাকৃত মুর্চ্ছনা। এমন 'কম্পোজিশন' রাতের সুখনিদ্রা কেড়ে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী।
ভোরের আলো ফুটলো। এক অস্তিত্ব মিললো অন্য 'অস্তিত্বে'। আঁধারের পর যেমন আলো। রাতের পর যেমন সকাল। শব্দহীনতার ভেতর যেমন ধ্বনিকল্প। জীবনের পর আরেক অনন্ত জীবন৷ এটাই সুর, কল্প, সংগীত, মূর্চ্ছনা ও ভাবের 'অস্তিত্ব'।
আসুন, কিছুটা পথ না হয় হাঁটা যাক একসাথে...