সত্তরের দশক, লাহোর।
'আজরা মুভিস'-র ব্যানারে এক নতুন উর্দু চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাত দিয়েছেন সৈয়দ সুলেমান। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার হায়দ্রাবাদে জন্ম এস সুলেমান (জ.১৯৩৮) পাকিস্তানি ফিল্ম জগতে 'স্বর্ণযুগে'র অন্যতম সেরা পরিচালক, তখন যথেষ্টই প্রতিষ্ঠিত নাম।
পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের মধ্যেই উর্দু ও পঞ্জাবি মিলিয়ে তৈরি করেছেন এক ডজনেরও বেশি সিনেমা। অধিকাংশই হিট মিউজিক্যাল। ৬৩'তে তাঁরই পরিচালনায় 'বাজি' ভেঙে দিয়েছিল 'বক্স অফিসে'র যাবতীয় রেকর্ড। পেয়েছিল একাধিক সম্মান। সুলেমানের দুই ভাই সৈয়দ দর্পণ ও সন্তোষ কুমার ছিলেন বিখ্যাত ফিল্ম অভিনেতা। স্ত্রী জাইরিন সুলেমান 'পান্না'ও ছিলেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী।
নয়-নয় করে এ যাবত ১৮-টি সিনেমা পরিচালনার কাজ সামলেছেন সুলেমান। তাঁর এবারের 'প্রজেক্ট' সাহিত্যিক হামিদা জাবিনের বহুচর্চিত উপন্যাস 'তামান্না' অবলম্বনে ফ্যামিলি ও সোশ্যাল ড্রামা - 'মহব্বত'। অভিনয় করেছিলেন মহম্মদ আলী, জেবা, সাবিহা খানুম, রেনুকা দেবী এবং সন্তোষ রাসেলের মত ললিউডের বাঘা-বাঘা অভিনেতারা।
'মহব্বতে'র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন প্রবাদপ্রতিম সুরকার নিসার বাজমি। সেই বাজমি, যার সাঙ্গীতিক চিন্তা ভাবনার কথা বলতে গিয়ে বারবার কানে হাত ছোঁয়াতেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ফেটে পড়তেন আহমেদ রুশদী থেকে রুণা লায়লা, রফি থেকে মুকেশ। মহম্মদ রফি এতটাই শ্রদ্ধা করতেন বাজমি'কে যে একবার তাঁর সুরে গাওয়ার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নিতে চাননি। বাজমি'র জোরাজোরিতে মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে রফি বলেছিলেন, ওই টাকা তিনি কোনদিন খরচা করবেন না।
১৯২৪ সালে মহারাষ্ট্রের জলগাঁওতে জন্ম নিসার বাজমি'র। আসল নাম সৈয়দ নিসার আহমেদ। খুব গরীব পরিবারে মানুষ। বাবা সৈয়দ কুদরত আলী ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। অভাবের সংসারে ছিলনা বিন্দুমাত্র গান-বাজনার পরিবেশ। কিন্তু অল্প বয়স থেকেই গান বাজনার প্রতি তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ। গানের টানে পড়াশোনা শিকেয় তুলে যোগ দেন উস্তাদ ইয়াসিন খান 'কাওয়ালে'র দলে। বাজমির সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আলাদা করে তালিম দেন সেই সময়কার বিখ্যাত খেয়ালিয়া উস্তাদ আমিন আলী খান। খান সাহেবের শাগির্দ হয়ে মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তথা নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন বাজমি।
চল্লিশের দশকে যোগ দেন বম্বের অল ইণ্ডিয়া রেডিও'তে। ৪৬'এ পান প্রথম ব্রেক, এ আর জামিনদার পরিচালিত হিন্দি ছবি 'যমুনা পার'-এর সুরকার রূপে। প্রায় ৪০'টিরও বেশি বলিউড সিনেমায় সঙ্গীত দেন তিনি। এরপর ৬২'তে তাঁর পাকিস্তান যাত্রা ও সঙ্গীত পরিচালনার জন্য সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস।
১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে পেলেন প্রথম ব্রেক, পরিচালক ফৈজল করিম ফজলির 'অ্যায়সা ভি হোতা হ্যায়' তে। ছবি হিট হয়, হিট হয় গানগুলিও। নিসার বাজমির সুরে আহমেদ রুশদী ও গায়িকা নূরজাহানের কন্ঠে 'মহব্বত মে তেরে' গানটি সাড়া ফেলেছিল গোটা পাকিস্তানে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি বাজমি'কে। দিয়েছেন একের পর এক হিট 'মিউজিক্যাল'। তাঁর সুরে বহু কালজয়ী গান গেয়েছেন আহমেদ রুশদী, মেহদি হাসান, রুণা লায়লা, আলমগীর, নায়রা নূরের মত শিল্পীরা।
কিন্তু ইতিহাস গড়া তখনও বাকি ছিল বাজমির। এবার এস সুলেমানের 'মহব্বতে'র (১৯৭২) সুরকার রূপে ডাক পেলেন তিনি। ছবির গান লিখলেন তিন প্রথিতযশা শায়ের কাতিল সিঁফাই, হাবিল জলিব ও আহমেদ ফরাজ। গান গাইলেন নূরজাহান, তাহিরা সাঈদ, আহমেদ রুশদী, রুণা লায়লা ও মেহদি হাসানের মত শিল্পীরা। প্রাণ ঢেলে সুর দিলেন বাজমি। সাতটি গান ছিল ছবিতে, সাতটিই সুপারহিট। কিন্তু তার মধ্যে একটি গান রাতারাতি গড়েছিল ইতিহাস। ছবির নায়ক মহম্মদ আলীর লিপে ছিল সেই গান। আক্ষরিক অর্থে সেটি 'স্যাড সং'।
আহমেদ ফরাজের কথায়, নিসার বাজমির সুরে ও মেহদি হাসানের কন্ঠে ইমন রাগে সেই কালোত্তীর্ণ গানটি হল -
"রঞ্জিশ হি সহি দিল ইয়ে দুখানে কে লিয়ে আ
আ ফিরসে মুঝে ছোড় কে জানে কে লিয়ে আ।"
সেই গান নিয়ে ঝড় উঠেছিল তামাম পাকিস্তানে। ঝড় ওঠে সরহদ পার হিন্দুস্তানেও। নতুন করে আবিস্কৃত হন নিসার বাজমি, আহমেদ ফরাজ ও মেহদি হাসান, এই গানের রেশ ধরে।
'নতুন' করে বলার কারণ, মেহদি হাসানের গাওয়ার অনেক আগেই ষাটের দশকে গজলটি গেয়েছিলেন 'হাম দেখেঙ্গে' খ্যাত ইকবাল বানু। ফরাজ আগেই লিখেছিলেন এই গজল। খুব সম্ভবত 'প্রথম' সুর দিয়েছিলেন সুরকার খাঁজা খুরশিদ আনোয়ার (১৯১২-১৯৮৪)। সেই গান গেয়েছিলেন ইকবাল বানু। ছায়ানট রাগে সেই গানের সঙ্গে মেহদি হাসানের গাওয়া ইমন রাগে, বাজমির সুরে তেমন মিল নেই বললেই চলে।
কিন্তু সেই গানের সুরে, কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বাজমি। তাই 'মহব্বতে'র সুররোপনের সময় আহমেদ ফরাজের কাছে বিশেষ করে চেয়ে নেন 'নজম'টি। চান নতুন করে সুর দিতে। রাজি হন ফরাজ। 'নজমে'র কথায় সামান্য হেরফের করে সেটি তুলে দেন বাজমির হাতে। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস। ইকবাল বানুর 'ভার্সান'ও পেয়েছিল অসাধারণ জনপ্রিয়তা। কিন্তু মেহদি হাসানের কন্ঠে সেই গজল নতুন ইতিহাস রচনা করে। হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থে কালোত্তীর্ণ। পরবর্তী কালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধাঁচে গানটি গেয়ে গোটা উপমহাদেশে অবিশ্বাস্য খ্যাতি কুড়োন হাসান। 'রঞ্জিস হি সহি' আর মেহদি হাসান হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ। পরবর্তী সময়ে, বহু মানুষ এই গজল গেয়েছেন। এখনও গাইছেন। কিন্তু 'রঞ্জিস হি সহি' থেকে মেহদি হাসানকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। তারা হয়ে ওঠেন একে ওপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হতে চললো, 'রঞ্জিস হি সহি'র জয়যাত্রা অব্যাহত। 'আফতাব এ গজল' মেহদি হাসান ও কবি আহমেদ ফরাজ সেই অবিস্মরণীয় গজলের হাত ধরে পেয়েছেন 'চির অমরত্ব'। কিন্তু বাজমি? কে মনে রেখেছে বিখ্যাত এই গজলটির সুরকার নিসার বাজমি'র কথা? ২২ মার্চ ২০০৭ সালে করাচি'তে দীর্ঘ রোগভোগের পর ৮২ বছর বয়সে যখন প্রয়াত হলেন বাজমি 'ডন' সংবাদপত্র লিখেছিল -
Nisar Bazmi, one of the most iconic musicians of the country died after a long illness here at Thursday night. He was 82. Responsible for the success of many a star singer, Bazmi’s numbers had an uncanny knack of catching the imagination of the public.
'রঞ্জিস হি সহি'র সঙ্গে জড়িত মানুষগুলি আজ আর কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু এই গানের পরতে পরতে আজও তাঁদের অবস্থান। বাজমি, ফরাজ, হাসানের এই ত্রয়ী মেলবন্ধনের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাজমির একদা 'শিষ্য', বলিউডের জনপ্রিয় জুটি 'লক্ষীকান্ত-প্যারেলালে'র অন্যতম সদস্য প্যারেলাল বলেছিলেন, "আজও যখনই এই গজল শুনি, বাজমি সাহেবের কথা মনে পড়ে। তাঁর কথা লোকে ভুলে গেলেও এই গজলের মধ্যেই নিহিত আছে তাঁর রূহ...তাঁকে বাদ দিয়ে এই গান অসম্পূর্ণ।" প্যারেলাল বলেছিলেন - সঙ্গীতের সুরে সেই শক্তি আছে যা 'অনহোনি' কে 'হোনি' করে তুলতে পারে। প্রার্থনা করি এই গানের কথার পিঠে ভর করে নিসার বাজমি ফিরে আসুন। আমরা যেন বলতে পারি -
"কিস কিস কো বতাঁয়েঙ্গে জুদাই কা সবব হম
তু মুঝসে খফা হ্যায় তো জমানে কে লিয়ে আ -
রঞ্জিস হি সহি!"
*ছবি (বাঁ দিক থেকে) - নিসার বাজমি, মেহদি হাসান, আহমেদ ফরাজ।
ঋদ্ধ হলাম। আগে পড়েছিলাম মনে হয়। এই গানটা সত্যিই অসাধারণ
ReplyDelete