Showing posts with label essay. Show all posts
Showing posts with label essay. Show all posts

Wednesday, June 2, 2021

এই বুড়ো পুরনো গিটারঃ না-বলা কিছু কথা


যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি। 
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই আজ। সত্যিই করি। 

আমি গিটার বাজাতে পারি না। অথচ সেতার বা সরোদ শেখার বহু আগে গিটার চিনেছিলাম। মনে মনে ফেলেছিলাম, ভালোবেসে। দু'একবার যে চেষ্টা করিনি, এমন নয়৷ কিন্ত ওই, শেষমেশ হয়ে ওঠেনি। 

গিটারে প্রথম হাতেখড়ি শিবুদার। মফস্বলি পাড়ার 'রেবেল', 'হাইপার ইন্টেলেকচুয়াল', কোঁকড়াচুলো, কানে দুল, গলায় অদ্ভুত সব মালা, হাতে 'জয়েন্ট'। শিবুদার ঘরের দেওয়ালে জিমি হেন্ড্রিক্স, বব মার্লে, ম্যাডোনার ছবি ছাড়াও বিস্তর আঁকিবুঁকি, গ্রাফিত্তি। 

শিবুদা গিটার অন্তপ্রাণ। তাঁর ঘরভর্তি ক্যাসেট, কী নেই সেখানে...'মাইলস', 'এলআরবি', 'ভূমি', 'মহীন', 'ক্যাকটাস', 'চন্দ্রবিন্দু', 'ফসিলস' আর অপ্রতিরোধ্য সুমন-অঞ্জন-নচিকেতার ত্রয়ী সঙ্গম। তারও আগে 'বিটলস', 'রোলিং স্টোন', এরিক ক্ল্যাপটন, ডিলান, বায়েজ, প্রিস্টলে...ছিল বব মার্লে, সান্তানা, জনসন, কোবেন, লেনন, ম্যাকললিন। আজও 'ঈগলসে'র 'হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া'র সেই পৌঁনে দু মিনিটের 'প্রিলিউড' ভুলতে পারিনি। 

শিবুদা বলতো - "গিটার শেখ!" মাঝেমাঝে জোর করে বসাতো তাঁর অ্যাকুইস্টিক নিয়ে। চিনিয়ে দিত কর্ড, প্লেকট্রাম ধরতে শেখা, স্ট্যাকাটো, বসা নোভা আরও কত কী...সেই প্রথম জানতে পারি অষ্টম শতাব্দীতে গ্রীস ও এশিয়া মাইনরে 'কিথারা' বা দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের 'গিথারা'র কথা। এরাই গিটারের বাপ-ঠাকুর্দা, আদিরূপ। 

আয়োজন কম ছিল না। অথচ জানি না কেন শিখে উঠতে পারিনি। এর পর নিঃশব্দে গিটারের জায়গা দখল করে নিয়েছে সেতার, পরে সরোদও। শুরু হয় অন্যধারার পঠনপাঠন। শাস্ত্রীয় সংগীতের কড়াক্কড় বাঁধনে৷ কিন্তু গিটার হারিয়ে যায়নি। অলিখিত রয়ে গিয়েছিল কোথাও। 

তারপর দেখি, হঠাৎ একদিন আমার পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছেন ব্রিজভূষণ কাবরা, কমলাশঙ্কর, বিশ্বমোহন ভাট, পলি ভার্গিস, দেবাশিষ ভট্টাচার্য'রা। ক্লাসিকাল গিটারের সাম্রাজ্য দখল করছে ক্লাসিকাল স্লাইড গিটার। পাশাপাশি উঠে আসছেন গোরক্ষ শর্মা, চিন্টু সিং, রমেশ আইয়ার বা ভুপেন্দ্র। সে এক অবাক পৃথিবী। 

কলেজ-ইউনিভার্সিটির 'ফেস্টে' মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াত গিটারের তরুণ তুর্কিরা। 'হার্ড রক', 'ডেথ মেটালে'র মৌরসীপাট্টা। ইলেকট্রিক গিটারে কর্কশতা ছাপিয়ে অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার 'কনানড্রাম'। আমি অবাক চোখে দেখতাম সেই মাদকতা, 'ইউটোপিয়ান টেরিটোরি'র হাতছানি। হিংসা, দুঃখ, ভালোলাগা সব মিলিয়ে সে এক অনির্বচনীয় 'সাইকডেলিক ট্রান্স'...

মাথার মধ্যে অন্ধকার এক স্টেজে কে যেন সশব্দে আছাড় মেরে ভাঙতো গিটার। ছিঁড়ে ফেলতো তার, আগুন ধরিয়ে দিত ভাঙা কাঠের শরীরে। 

একসময় ঝড় থামে। স্তব্ধতা মেখে রাত্রি নামে বোবা পৃথিবীর বুকে৷ আমি জেগে থাকি। আমার সঙ্গে রাত জাগেন অঞ্জন দত্ত। 'পুরনো গিটারে'। তিনি গাইছেন -

"ফেলে আসা কত মুখ, কত নাম ঠিকানা 
বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে
নানা কথা, নানা সুরে গান নিয়ে ঘুরে ঘুরে 
সুমনের কাছে এনে দিয়েছে
এই বুড়ো পুরনো গিটার..." 

আর সুমন! তিনি আদ্যোপান্ত মজে 'বিভূতিভূষণে'। 

"তখন বিকেল দেয় সন্ধের আল ধরে হানা
গোধুলি আঙুল রাখে আলগোছে পথের ধুলিতে..."

আমি দেখি, মানুষ নয়, দুটো গিটার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আদি অনন্তের কথোপকথন উঠে আসছে চরাচর জুড়ে। সত্যি সত্যিই, দিনের যাবতীয় আওয়াজ, কোলাহল ঝিঁঝিঁর কোরাসে মিশে যায়। 

গান নয়, কথা নয়, দুটো গিটার একে অন্যের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের তীব্র সূচক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আলতো স্পর্শ রেখে যেতে যেতে মিলিয়ে যায় শূন্যে। 

যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি খুব। 
আজও। এখনও। চিরকাল-ই।