Showing posts with label tagore. Show all posts
Showing posts with label tagore. Show all posts

Thursday, June 3, 2021

'তবু প্রাণ নিত্যধারা' ~ এক অলীক কথোপকথন ২


রাত্রি গভীর হলে এ শহরে বিষাদ নেমে আসে। 

তোমরা তাকে চিনতে পারো না। তোমরা জানো না তাকে। একা একা পথ হাঁটে সে এ গলি-সে গলি। মাথা ঢাকা টুপি তার। গায়ে আলখাল্লা। হাতে বুঝি লাঠি থাকে। মৃদু ঠকঠক। 

রাত্রি গভীর হলে শহরে নামে বিষাদ প্রহরী। নিজস্ব কোনও নাম নেই তার। যে নামেই ডাকো, সে সাড়া দেবে না। শুধু অন্ধকার ছেঁনে হাওয়ায় ভেসে দাঁড়ায় কোনও বন্ধ দরজায়৷ অদৃশ্য নখর দিয়ে চিহ্ন আঁকে। যেন পুরনো জোব্বা থেকে এক চিমটে বিষাদ, লেপে দেয় ঘরে৷ তারপর এগিয়ে যায় অন্য দরজার দিকে৷

'নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে
বিকশিবে প্রাণ তাঁর গুণগানে...'

ধরা যাক, বিষাদের নাম 'যোগিয়া'। 'ভৈরবপুরে' তার বাড়ি৷ তার হাতে ধরা যে লাঠি, রাস্তায় মৃদু ঠকঠকে ছিটকে পড়ে কোমল রেখাব, কোমল ধৈবত নামের দুই জিন। আর থাকে এক অদৃশ্য এক মায়া, গান্ধার যার নাম। মধ্যম, বিষাদের কাঁধে বসা নীলরঙা পাখি তাকে আলতো ঠেলে দেয়। অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে৷

রাত্রি ঘন হলে বিষাদ প্রহরী গুনগুনিয়ে ওঠে। যেন পুরনো জানলার কাঁচে কাঁপন ধরায় কোনো অতন্দ্র রেলগাড়ি। বা পরিত্যক্ত গির্জার পাশে বসে থাকা উন্মাদ পাদরির প্রলাপ। আমি শুনতে পাই সেই সুর।

'তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে...'

প্রহরী জানে বিষাদের তল কোথায়। সে জানে কোন রঙে রাঙানো মন-খারাপ। তাই বারবার ফিরে আসে সুর। ঘুমন্ত শহরের অলিগলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তার মূর্চ্ছনা। 

'বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল,   
কে আর রহিল এ বনে...' 

এ বনে সত্যি আজ আর কেউ নেই। জনমানবশূন্য। একাকি রয়ে গেছে প্রহরী৷ তার কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ ভোর হয়ে আসার আগে শেষ পরিক্রমণ। দেখে নেওয়া মেপে মেপে, বিষাদ কিছু কম পড়লো কিনা! সে জানে তাড়াতাড়ি সাঙ্গ হবে কাজ। একটু পরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে সকাল। তার সাথে ফিরবে বুলেটের আওয়াজ, চাপ চাপ রক্ত, রাজনৈতিক হিংসার ভোর...

তার আগে শেষবার, শহরের পথেপথে রাত্রি গভীর হলে তার মৌরসীপাট্টা। অন্ধকার অন্ধ নয়। তারও নিজস্ব আছে চোখ, দেখার৷ অথচ তোমরা দেখতে পাও না৷ তোমরা আজও অন্ধ হয়েই আছে৷ বিষাদ তোমাদের অন্ধত্ব জানে৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে তোমার চোখের পাতা ছুঁইয়ে দেয়৷ তলিয়ে যাওয়ার আগে সে টুপি নামায়, মাথা ঝুঁকিয়ে করে সালাম। তারপর পায়ে-পায়ে হেঁটে যায় দিকচক্রবালে। 

রাত্রি গভীর হলে এ শহরের প্রতিটি দরজায় জেগে থাকে তার নখের দাগ। জন্মদাগের মত জেগে থাকা সেই আঁচড়ের নাম - 'যোগিয়া'। তার ক্ষয় নেই। 

'নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   
নাহি নাহি দৈন্যলেশ -
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে...'

* Picture. Varanasi by Donell Gumiran 

Wednesday, June 2, 2021

"যদি থাকি কাছাকাছি দেখিতে না পাও" ~ স্মরণে বিক্রম সিং খাঙ্গুরা


ফেরার কথা ছিল যাদের, ফেরেনি তাঁরা৷ কথা ছিল সন্ধ্যে নামার আগে জ্বলবে প্রদীপ তুলসি তলায়। তা জ্বলেনি আজও। অন্ধকার, দরজায় কড়া নাড়ে।

বহুদূর কোনো শহরতলি, মফস্বলি রাস্তায় পাক খায় ওয়াগন ভাঙার শব্দ। একলা পথের বাঁকে সে কোন অজানা সুরে কেঁদে ওঠে এস্রাজ, পিলু-বাঁরোয়ায়...

সেই পথে তুমি হাঁটোনি কোনোদিন। সে পথের ধূলো মাটিতে মিশে থাকে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা। কী হবে ঘরে ফিরে এতো তাড়াতাড়ি, ভেবে সেই রাস্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যারা ঘাঁই মেরেছিল...আজও তারা ঘরে ফেরেনি৷ কুয়াশার মতো লকডাউন নামে শহরে। 

কী হবে তাঁদের কথা ভেবে? কী-ই বা হবে যদি দেখা না মেলে এই দুঃখরাতে? এস্রাজে জমে থাকা অতৃপ্ত শীতকাল...ধুলো ঝেড়ে ফেলে রজন ঘষে নিই ছড়ে।

এ পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে যারা, তাঁদের পায়ের ছাপ আজও বৃষ্টি মুছে দিতে পারেনি। আর তুমি আবারও সেই জলছাপ ধরে হেঁটে গেছ উধাও, দিকচক্রবালে। 

ফেরার কথা ছিল যাদের, ঘরে ফেরেনি তাঁরা। আজ রাতে আমায় তাঁদের গল্প বলো...

'খুশ আমদিদ, টেগোর সাব!' পাকিস্তানে রবীন্দ্র জয়ন্তী


২৫ শে বৈশাখ অতিক্রান্ত। পায়ে পায়ে আমরা পেরিয়ে এসেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী।

অতিমারীর প্রকোপে যখন পর্যুদস্ত ভারত সহ গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে অনাড়ম্বর হলেও রাবীন্দ্রিক উৎসব, চর্চার মেজাজে মেতেছিল দুই বাংলা। 

রবি ঠাকুরের অখণ্ড বিশ্বজনীনতা শুধু দুই বাংলা বা বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যাপ্তি অপার, অভাবনীয়। বিশ্বের কমবেশি প্রায় সব দেশেই দিনটি পালিত হয়ে এসেছে৷ কোভিড আবহে সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনায় এসেছে ভাটা; তবুও বিশ্বকবির আত্মিক আরাধনায় পিছিয়ে ছিলেন না রবিভক্তরা। তা সে ভারত, বাংলাদেশ হোক বা পাকিস্তান৷ 

হ্যাঁ পাকিস্তানও৷ শুনতে আশ্চর্য লাগলেও তা সত্যি৷ খুব কম লোক জানেন, পাকিস্তানের একটি প্রাচীন সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও, ছোট আকারে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। অবশ্য তা কিন্তু অন্যান্য দেশের মতো ইংরেজি ক্যালেন্ডার মেনে। ১২৬৮ সন ২৫ বৈশাখের মাহাত্ম্য বোধকরি শুধু এপার-ওপার বাংলার মানুষ'ই কেবল বোঝে।

১৮৬৪ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রাচীন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র তিন বছর ৷ কলেজ-টির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ড. চার্লস উইলিয়াম ফর্ম্যান (১৮২১-১৮৯৪)। ১৮৪৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের দশ বছর আগে অবিভক্ত ভারতে, কলকাতায় প্রথম পা রাখেন ড. ফর্ম্যান। ১৮৪৯ এ তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাহোরে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পঞ্জাব প্রদেশে গড়ে তোলেন রঙ মহল স্কুল। এই স্কুলের লাগোয়া অঞ্চলে লাহোর ক্যানেলের ধারে একটি কলেজ গড়ে তোলেব ফর্ম্যান। প্রথমে তার নাম ছিল 'লাহোর মিশন কলেজ'। 


শোনা যায় সম্রাট শাহজাহানের এক ওয়াজিরের বংশধর জায়গাটি ফর্ম্যানকে মিশনের কাজকর্মের জন্য 'লিজ' দেন। এখানেই ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে মিশন কলেজ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কলেজের পরিচালনা কমিটির শীর্ষ পদে থেকেছেন ড. চার্লস ফর্ম্যান। তাঁর উদ্যোগেই ওই অঞ্চলে ছড়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও ভাবনা। ১৮৯৪ সালে লাহোরেই প্রয়াত হন পাকিস্তানী শিক্ষাজগতের প্রবাদ পুরুষ ড. ফর্ম্যান। আজও লাহোরের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান সিমেট্রি'তে (গোরা কবরিস্তান) চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন তিনি৷ ফর্ম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মিশন কলেজের নতুন নাম রাখা হয় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপ্রাচীন কলেজটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত৷ দেশভাগের পর তা চলে আসে লাহোরের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ২০০৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

১৫৭ বছরের ইতিহাসে এ কলেজ বহু নজিরবিহীন কৃতিত্ব গড়েছে। দিয়েছে অসাধারণ কিছু শিক্ষার্ত্রী, পরবর্তী কালে যারা আধুনিক পাকিস্তান ও ভারতে শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাজনীতির জগতের বহু স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেন। এই কলেজের প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুরেন্দ্র কুমার দত্ত, গণিতজ্ঞ আলমা মাশরিকি, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল, পঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল, মুসলিম লীগের নেতা মিঁয়া বরকত আলী, পঞ্জাবের সাংসদ বলরাম জাখর, প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ শরিফ, পাক সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুল রশিদ, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র, সাংবাদিক ও লেখক কুলদীপ নায়ার, সাহিত্যিক কৃষন চন্দ ও প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশারফ৷ নোবেলজয়ী বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার কম্পটন'ও এই কলেজে গবেষণা করেছেন, করেছেন শিক্ষকতা। আজও পাকিস্তানের আধুনিক শিক্ষাঙ্গনে গৌরবময় অধ্যায়ের নাম ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

কথিত আছে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে এ কলেজে একটি শোকসভা আয়োজিত হয়, তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রকুমার দত্তের উদ্যোগে। ২০ বছর পর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গড়া হয় একটি কমিটি৷ কিন্তু '৬৭ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যাবতীয় রবীন্দ্রচর্চায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন জেনারেল আয়ুব খান সরকার। বন্ধ হয়ে যায় রবীন্দ্রচর্চা। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় কবি আলমা ইকবালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা টেনে এনে কবিগুরুর সাহিত্য প্রতিভাকে কখনই সম্মান দিতে চায়নি কট্টরপন্থী পাক সরকার। পরে নয়ের দশকের প্রথম ভাগে পরিস্থিতি শান্ত হলে আবারও নতুন করে পাকিস্তানে শুরু হয় রবীন্দ্র চর্চা। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তাতে নিয়েছিল অগ্রনী ভূমিকা। নয়ের দশকের মাঝামাঝি কলেজের ইতিহাস ও সাহিত্য বিভাগ যুগ্ম ভাবে পালন করা শুরু করে রবীন্দ্র জয়ন্তী৷ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকেরা একসাথে অংশ নেন তাতে। 'সেই ট্র‍্যাডিশন আজও সমানে চলেছে'। 

২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিখ্যাত 'ডন' পত্রিকায় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে বছর কলেজে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের শতবর্ষ পালিত হয়। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সাথে এউইং লিটারারি সোসাইটি যৌথ ভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে৷ রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্র রচনা পাঠ ও সত্যজিৎ রায়ের ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সে উপলক্ষে। 

কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান ড. ইয়াকুব বাঙ্গাশ বলেছিলেন, "অবিভক্ত ভারত হোক বা বর্তমান সময়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রবাদ ও সমাজচেতনা চির অক্ষয়, অমলিন। কোনও দেশকালের গণ্ডি দিয়ে তাকে মাপা সম্ভব নয়।" কলেজের আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ড. ওয়াসিম আনওয়ার জানান, "একসময় রবীন্দ্র ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু খ্যাতনামা পড়ুয়ারা শান্তিনিকেতন পাড়ি দিয়েছেন। রাজেশ্বরী বাসুদেব (কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত) তার অন্যতম। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, চিন্তা ও মননের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে দেখছে। তাঁর ভাবধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছ।" আনওয়ার বলেন, "ভুললে চলবে না পাকিস্তানের রাষ্ট্রপিতা মহম্মদ আলী জিন্না নিজে রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। আজও আমাদের কাছে বিশ্ব সাহিত্যের ত্রয়ী সাধক নমস্য। এঁনারা হলেন আলমা ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং রবীন্দ্রনাথ।" 

২০২০ সালে গোটা বিশ্ব জুড়ে আছড়ে পড়েছে কোভিড ঢেউ৷ ২০২১ এ এসেছে দ্বিতীয় তরঙ্গ। সেই মারণ হিল্লোলে লণ্ডভণ্ড ভারত, পাকিস্তানও। তবু দু'দেশের সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতিমনস্ক উদারমনা মানুষ আজও রবীন্দ্রচর্চা থেকে সরে আসেননি। সরে আসেনি ১৫৭ বছরের ঐতিহ্যশালী লাহোরের ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। নিঃশব্দে, নিভৃতে রবীন্দ্র সাধনা করে চলেছেন তারা। অতিমারীর সঙ্কটকালে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের কাছে আজও সমান ভাবে গৃহীত রবি ঠাকুরের সেই বাণী - "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত..." 

রবীন্দ্র প্রদর্শিত সেই মুক্তির আলোয় ভেসে, আজও দেশকালের বিরোধ ভুলে রবীন্দ্র আরাধনায় নিমগ্ন লাহোরের 'প্রেসিডেন্সি' - ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

---------------------
তথ্যসূত্র. 'দ্য ডন' সংবাদপত্র, 'ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্র, ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, দিল্লি, উর্দু আকাদেমি - লাহোর ও দিল্লি, জার্নাল অফ রিসার্চ ইন হিউম্যানিটিজ এবং হিস্টরিকাল সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি অফ পঞ্জাব, লাহোর এবং নিউজলেটার, ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ, লাহোর। 


ছবি. ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ গ্যালারি।

Tuesday, June 1, 2021

বিরাজ সত্যসুন্দরঃ 'আনন্দলোকে'র উৎস সন্ধানে


আমার শেখা প্রথম রবীন্দ্রসংগীত। সেই প্রথম পরিচয় রবি ঠাকুরের সঙ্গে। তখনও রবীন্দ্রনাথ কে, ভালো করে জানতাম না। বুঝতাম না। বোঝার বয়সও ছিল না। অবশ্য এখনও যে কতটা জেনে বা বুঝে উঠতে পেরেছি, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। 

'তিনি' এক মহাসমুদ্র, তারও ঊর্ধ্বে সসাগরা পৃথিবী। যার আদি নেই, নেই অন্ত। শুধু রয়েছে অনন্তের এক রহস্যময় আলোর হাতছানি। একজীবনে বোঝা যা সতত দুঃসাধ্য।

তবু গান'টা ছিল। রয়েই গেছে, আজও। না জেনে না বুঝেই শেখা প্রথম রবি-বন্দনা। হয়তো আমার মতো আরও অনেকের'ই। 

আজও এই গান শুনলে নিমেষেই 'ফ্ল্যাশব্যাক' হয়। চোখ বুজে দেখতে পাই নিবারনচন্দ্র নার্সারি স্কুলের সেই একচিলতে মাঠ। কেজি ওয়ান। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার লাইনে। সামনে টেবিলের উপর হারমনিয়াম হাতে হেডস্যার দেবদাস মণ্ডল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কালো ছিপছিপে চেহারা৷ জলদগম্ভীর কণ্ঠে গাইছেন - "গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে..." প্রেয়ারের লাইনে হাত জোড় করে আমরা। না বুঝে, না জেনেই গলা মেলাতাম।

নার্সারির পাঠ চুকে গেছে কবেই। হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে, গানটি  রয়ে গেছে ধ্রুবতারার মতো, অবিচল, নিস্পন্দ, অক্ষয়চিহ্ন স্বরূপ। 

বহু পরে অবশ্য জেনেছি গানটির অশ্রুত ইতিহাস। 


১৮৮১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত মাইসোর বা মহীশূরের মহারাজা দশম চমরাজেন্দ্র ওয়াড়িয়র (১৮৬৪-১৮৯৪) তাঁর রাজ্যের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র এক 'জাতীয় সংগীতে'র কথা ভেবেছিলেন। অতি অল্পবয়সে রাজপাট শাসনের অসামান্য নজির রেখেছিলেন মহারাজ দশম চমরাজেন্দ্র। তিনি স্বয়ং ছিলেন সাহিত্য কলা সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। ছিলেন সুকবি ও কর্ণাটকি বেহালায় সিদ্ধহস্ত। ১৮৯৪ সালে শহর কলকাতায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই রাজা। তাঁকে নিয়ে 'প্রহরে' চমৎকার এক নিবন্ধ লিখেছিলেন অরিত্র সোম। 

মনে রাখতে হবে এই গানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যখন, সেই মুহূর্তে ভারতে পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। 'গড সেভ দ্য কিং'ই তখন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় সংগীত। তা সত্ত্বেও নিজ রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার উদ্যোগে পৃথক 'রাজ্য সংগীত' সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন মাইসোর রাজ। তাঁর উৎসাহে তৈরি হয় "কায়ু শ্রী গৌরী, করুণা লহরী, থয়া যক্ষী শঙ্করেশ্বরী"।


কর্ণাটকি রাগ ধীরাশঙ্করভরনমে (বিলাবল) নিবদ্ধ এই মহীশূরী ভজন লিখেছিলেন সভাকবি বাসাপ্পা বা বাসভাপা শাস্ত্রী। সুর দিয়েছিলেন ওয়াড়িয়রের সভাগায়ক ও যন্ত্রীরা যাদের মধ্যে বীণা সুবন্ন, বীণা শেষান্ন, কে বাসুদেবাচার্য ও বীণা পদ্মনাভাইয়ার মতো কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালেরা। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস।

মনে করা হয়, ঋক বৈদিক গান "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং রো মনাংসি জানতাম" ছিল এই গানের মূল প্রেরণা। এই গানের অনুপ্রেরণাতেই রবি ঠাকুর লিখেছিলেন "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ"। সাল ১৮৯২ তে। বদল এসেছিল রাগের চলনেও। "কায়ু শ্রী গৌরী" বাধা হয়েছিল বিলাবলে, "আনন্দলোকে" এবার নিবদ্ধ হল রাগ ঝিঁঝিটে, ঠাট খাম্বাজ। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন মাইসোরের দিওয়ান স্যার এম কণ্ঠরাজ উরসের অধীন প্রথম কাউন্সিলর স্যার অ্যালবিওন ব্যানার্জির আমন্ত্রণে ব্যাঙ্গালোর যান, তাঁর সম্মানে বাজানো হয়েছিল এই 'মাইসোর অ্যান্থেম'। 

"আনন্দলোকে" গানটি নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সংসদে। ২৩ জুলাই ২০১৭ সালে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে যৌথ কক্ষের অধিবেশনে সেই দিন শেষবারের মতো এক অসামান্য, আমেগঘন ভাষণ রেখেছিলেন প্রণব বাবু। অনুষ্ঠানের শেষে, যখন সকলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাচ্ছেন, মিলিটারি ব্যাণ্ডে বেজে উঠেছিল "আনন্দলোকে" গানটি। সেই গানের তালে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সংসদ ভবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। 

এই গানের সঙ্গে আজও, ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে নস্ট্যালজিয়া। জড়িয়ে আছে এমন বহু মুহূর্ত, যা চির অমলিন। কতো জনের গলায় এই গান শুনে আপ্লুত হয়েছি। শ্রীকান্ত আচার্য, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর সেন, বা ক্যালকাটা কয়ার। আরও না জানি কতজনের কণ্ঠে সমৃদ্ধ এই গান। তবু দক্ষিণী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ ড. এম বালামুরলী কৃষ্ণের কণ্ঠে এই রবীন্দ্রসংগীত এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠমাধূর্যে যেন বারবার উঁকি দিয়ে যায় 'মাইসোর অ্যান্থেম' - 'কায়ু শ্রী গৌরী'র ছায়া।

"আনন্দলোকে" আজও আমার কাছে ফেলে আসা একখণ্ড ছেলেবেলা। যার পরতে পরতে লেগে আছে আমার শৈশব, প্রথম রবীন্দ্র সান্নিধ্য আর কতকটা বোঝা না বোঝায় মেশা এক আলোর সন্ধান। যার পথ বেয়ে দীর্ঘকাল হেঁটে এসেও আবারও সূচনায় ফিরে আসা যায়। এই আমার আত্মানুসন্ধান, সত্য চিন্তন ও প্রজ্ঞার অতীন্দ্রিয় পুণ্যশ্লোক। গানের সূত্র ধরে যা যুগে যুগে মিশে রয়েছে - 

"শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে..."