Thursday, June 3, 2021

ইশরাত-এ-কাতরাঃ একটি ভুলে যাওয়া গজল


অবিশ্বাস্য মুহূর্ত এক। খুব সম্ভবত ছয়ের দশকের প্রথম ভাগ। দক্ষিণ ভারতের লবনাক্ত বাতাসে ভাগ বসিয়েছে বসন্তকালীন হাওয়া।

মাদ্রাজের (অধুনা চেন্নাই) কিলপকে ২০ গুরুস্বামী মুদলিয়র রোডে 'কল্কি গার্ডেনে'র বাড়িতে মুখোমুখি বসে দুই নারী। সেই সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও লঘু সংগীত জগতে অবিংসবাদি যাদের আধিপত্য। না জানি সে কোন পুণ্যতিথি'তে তাঁরা প্রথম ও শেষবার মুখোমুখি বসেছেন, কালের অভূতপূর্ব, মহার্ঘ্য চক্রান্তে।

তাঁরা কোন সামান্য মানুষ নন। পরম করুণাময় ঈশ্বরের অধিষ্ঠান তাঁদের কণ্ঠে। সমসাময়িক হয়েও তবু তাঁরা দুই ভিনগ্রহের বাসিন্দা। একজনের চারণ ভূমি গজল, লঘু শাস্ত্রীয়, ঠুমরী, রাগাশ্রয়ী গান। অন্য জন আদি-অকৃত্রিম দক্ষিণ ভারতীয় মার্গ সংগীতের 'সুরলক্ষ্মী'র মহাসাধিকা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মহাজাগতিক মেলবন্ধন।

ভারিক্কি চেহারা, গলায় সোনার হার, জারদৌসির আড়ালে সপ্রতিভ চাহুনির মহিলাটির হাতে তানপুরা খেলা করে। তিনি বলেন, "আও বহেন, গাও মেরে সাথ!" অন্যদিকে একটু যেন জড়োসড়ো দ্বিতীয় জন। নীল রঙা কাঞ্জিভরমের আঁচল টেনে বললেন, "আমি কী পারব? এমন গান তো কখনো আগে গাইনি!" 

হেসে ওঠেন সেই সুন্দরী। তামাম হিন্দুস্তান যাকে 'মল্লিকা ই গজল' নামে চেনে। তিনি বলে ওঠেন - "পারবে বোন, শুধু তুমিই পারবে। কতদিনের শখ ছিল তোমায় নিজের হাতে এই গান শেখাব। আল্লা রহমত, আজ সেই সুযোগ এসেছে। তুমি তোমার মত করে গাও। তাহলেই হবে।" 

এবার যেন একটু ভরসা পেলেন শান্ত চোখের সেই নারী৷ একটু আগেই আখতারি বাঈ-র অনুরোধে তাঁকে শুনিয়েছেন মীরার ভজন 'মোহে চাকর রাখো জি'। সেই ভজন শুনে চোখের জলে ভেসে ছিলেন বেগম সাহিবা৷ জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর থেকে বছর দুয়েকের ছোট 'কুঞ্জাম্মা'কে। আর সময় নষ্ট না করে না জানি কী তাড়নায় দ্রুত হাতে তুলে নিয়েছিলেন তানপুরা৷ দিয়ে যেতে চেয়েছেন তাঁর 'রত্নখনি' থেকে সামান্য কিছু উপহার। 

সুব্বুলক্ষ্মীর কাছে অনেক আগেই আসতে চেয়েছেন আখতারি বাঈ। একসাথে কাটাতে চেয়েছেন সময়৷ করতে চেয়েছেন নিবিড় চর্চা সংগীতের অতীন্দ্রিয় জগৎ নিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা এসেছে৷ বাতিল হয়েছে মাদ্রাজ সফর।

এই তো সেবার, আখতারি বাঈয়ের মাদ্রাজ আসা প্রায় নিশ্চিত। হঠাৎ শুনলেন সুব্বুলক্ষ্মীর বাড়িতে হাজির হয়েছেন সিদ্ধেশ্বরী দেবী৷ সরস্বতীর আরেক অবতার। ছ মাস 'কল্কি গার্ডেনে' ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী৷ সে ছ'মাসে সুব্বুলক্ষ্মী পেয়েছিলেন বিশেষ তালিম। নিজের ভাণ্ডার উপুড় করে দিয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। দু'হাতে শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে তা কুড়িয়েছেন সুব্বুলক্ষ্মী।

অবশেষে এসেছে বহু প্রতিক্ষিত সময়'টি। মুখোমুখি বসেছেন দুই বিরল ব্যক্তিত্ব। বেগম আখতার ও এম এস সুব্বুলক্ষ্মী। আখতারি তাঁকে গজলের নজরানা দিতে চান৷ এমনি সেমনি 'নজম' তা নয়। খোদ মির্জা  আসাদৌলা বেগ গালিবের 'দিবান'। 

"ইশরাত-এ-কাতরা হ্যায় দরিয়া মে ফনা হো জানা
দর্দ কা হদ সে গুজারনা হ্যায় দবা হো জানা..." 

পিলু রাগের (দক্ষিণে কাপি রাগম) সেই অসাধারণ গজল আত্মস্থ করেছিলেন সুব্বুলক্ষ্মী। যেন যমুনার জল এসে মিশে গেল ভারত মহাসাগরে। সৃষ্টি হল এক অভূতপূর্ব সুরেলা জলোচ্ছ্বাস৷ বড়ে গোলাম আলী খানের ভাই বরকত আলী খানও গেয়েছেন এই গজল। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠে গালিবের যেন পুনর্জন্ম হয়েছিল সেদিন৷ 

এতদিন যে কণ্ঠে পরম শ্রদ্ধায় 'ভজ গোবিন্দম' বা 'শ্রী ভেঙ্কটেশ সুপ্রভাতম' ধ্বনিত হয়েছে, সেই কণ্ঠেই কী পরম আকুতিতে ধ্বনিত হল - 'আল্লাহ'! যেন এক আলোকিত ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য এক আলোকিত ঘরে মিশে গেল সুরকল্প। ছোট ছোট মুরকি, গমক ও মীরখণ্ড তাকে দিল এক অকল্পনীয় উচ্চতা যাকে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। রূপকথা বুঝি এভাবেই সৃষ্টি হয়৷ 

আজ বেগম আখতার বা এম এস সুব্বুলক্ষ্মী কেউই ধরাধামে নেই৷ শুধু রয়ে গেছে সে গজলটি। অসংখ্য অজানা, অশ্রুত কিংবদন্তির সাক্ষী হয়ে। ভারতীয় সংগীতের দুই কিংবদন্তি মহাসাধিকার মহাসাধনার যৌথ স্বাক্ষর স্বরূপ। 


No comments:

Post a Comment