Sunday, June 6, 2021

আল্লাহ তেরো নামঃ হারানো সুরের রেশ ধরে



লতা মঙ্গেশকরের নাম শুনিনি তখনো। জয়দেব নামে বুঝি কোনও সংগীত পরিচালক আছেন, তাও জানা ছিল না। শাহীর লুধিয়ানভি অজ্ঞাত কোনও এক সমুদ্রের নাম। জানতাম না তাও। নিতান্তই কাঁচা বয়সে শোনা এই গান। অনেক কিছু না জেনেও কেমন যেন চেনা হয়ে গিয়েছিল সেই প্রার্থনার সুর। অদ্ভুত সেই মোহ মায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল সেই না-জানা'র 'দাস্তান'।

কিন্তু গানটা জানতাম। মা গাইতেন৷ অদ্ভুত তার সুর। ছোটবেলায় শোনা। মা আজও এই গান-টি না গেয়ে থাকতে পারেন না। স্নানঘরে, ঠাকুরঘরে বা রান্নাঘরে চা বানাতে বানাতে শুনতাম ভেসে আসছে "ও সারে জগ কে রখওয়ালে/ নির্বল কো বল দেনেওয়ালে"... 
কী অদ্ভুত বুক মোচরানো সুর৷ যেন পাঁচ আঙুলের অদৃশ্য দাগ বসে গেছে গভীর অন্তঃস্থলে৷ 

অনেক পরে, আব্বার কাছে তখন সরোদ শিখি৷ সে দিন উস্তাদজি বললেন - "গৌড় সারঙ্গ শেখো।" দুপুর বেলার রাগ, কল্যাণ ঠাট। আমি কাঁচুমাচু মুখে ঘাড় নাড়ি। আব্বা আলাপ শুরু করেন। 'আওচার' সেরে বিস্তারে ঢুকতেই চমকে উঠি৷ এত সেই সুর। আমার ফেলে আসা ছোটবেলার গান। মায়ের গন্ধ জড়ানো আষ্টেপৃষ্টে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করেছিল। 

কলেজে পড়ার সময় প্রথম জেনেছি 'হাম দোনো'র কথা। আমার জন্মের বিশ বছর আগে, ১৯৬১ সালে দেব আনন্দ, নন্দা, লীলা চিটনিস, সাধনা অভিনীত 'এটারনাল ক্লাসিকস' -- 'হাম দোনো'র কথা৷ 


কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উত্তরায়ণ' অবলম্বনে নির্মিত দেব আনন্দের অসাধারণ সৃষ্টি। সংগীত পরিচালনায় উস্তাদ আলী আকবর খানের সুযোগ্য শিষ্য জয়দেব ভার্মা ও গীত রচনায় শাহীর লুধিয়ানভি। লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফির স্বর্ণালী কণ্ঠে কালজয়ী সব 'কম্পোজিশন'। 

প্রায় প্রত্যেকটি গান'ই মনের খুব কাছাকাছি। কিন্তু 'আল্লাহ তেরো নাম' আজও কেমন যেন মোহাবিষ্ট করে রাখে৷ শুনলে মনে হয়, এক্ষুনি যেন ঘন্টা বেজে উঠবে মন্দিরে, শুরু হবে আরতি। একটু দূরে ঈদগাহ থেকে ভেসে ওঠে 'মগরিবে'র আজান। প্রার্থনা ঘন্টা বেজে চলে রুক্ষ প্রান্তরের এক কোনায় থাকা ছোট এক চিলতে গির্জায়। এ সময় ঈশ্বর লাঠি হাতে যেন সান্ধ্যভ্রমণে বেরোন। গরীব চাষার দাওয়ার সামনে এসে বলেন, "কই গো, হারাণের মা! একটু জল দাও দিকি। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে!" 

আমার কাছে এই গান আজও যেন এক অনাবিল ঈশ্বরীয় আহবান৷ যার পরতে পরতে লেগে আছে, অন্য কিছু নয়, আমার মায়ের গন্ধ৷ চোখ বুঁজলে আমি টের পাই৷ চন্দনের হালকা গন্ধ ভেসে বেড়ায় আকাশে। ঠিক যেমন মন্দির প্রান্তে ভেসে বেড়ানো অনির্বচনীয় নাম না জানা কোনও ফুলের গন্ধ৷ যা ভোরে তুলে দেওয়া হবে রাধামাধবের পায়ে। শান্তি জলের মত অলক্ষ্যে। নেমে আসে বৃষ্টিধারা। আমি ভিজতে থাকি।

কাল মায়ের জন্মদিন ছিল। আজ এই গান শুধু তাঁর জন্য৷ আমার নিজস্ব মন্দিরে একান্ত নৈবেদ্য ডালা। আমার ফেলে আসা ছোটবেলার মায়াতীর্থ, স্বপ্নের 'গৌড় সারঙ্গ'। 

1 comment: