Tuesday, June 1, 2021

ছায়া মূর্চ্ছনাঃ 'শ্যাডোগ্রাফি'র অন্দরমহল


'ছায়ার সাথে কুস্তি করে' আজ পর্যন্ত কার গাত্রে ব্যাথা হয়েছে? এক সুকুমার রায় ছাড়া! 

তিনি শুধু কুস্তি করেই ক্ষান্ত হননি, ফলাও করে ছায়া নিয়ে ব্যবসাও করেছেন। সুকুমার রায় বলেই হয়তো এমন অদ্ভুত ভাবনার 'ছায়াবাজি' - 

"ছায়া ধরার ব্যবসা করি তাও জানো না বুঝি,
রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি!"

পরে বুঝতে পেরেছি, অল্পবিস্তর সেই ছায়ার পুঁজি কমবেশি আমাদের সকলের। আমরা ছায়ায় ঘেরা এক অলীক পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে আমাদের সঙ্গে ছায়া নয়, ছায়ার সঙ্গে আমরা পথ হাঁটি। 

ছোটবেলা কেটেছে মফঃস্বলে। লোডশেডিং সেখানে সর্বক্ষণের সঙ্গী। সন্ধ্যেবেলায় আলো চলে গেলে, মা সামনে রাখতেন হ্যারিকেন বা মোমবাতি। তিরতিরে সেই গা ছমছমে ভুতুড়ে আলোয়, দেওয়ালে নিজের ছায়া দেখে চমকে উঠেছি কতবার।

যখন ধাতস্থ হওয়া শিখেছি, তখন দেওয়াল জুড়ে শুরু হতো আঙুলের কারুকাজ। আটের নামতা মুখস্ত করা শিকেয় তুলে ভেসে গেছি ছায়া সমুদ্রে। অজান্তেই হাতের ছায়ায় দেওয়ালে ভেসে উঠেছে হরিণ, বাঘ, কুকুর, বুড়োর মুখ, টুপি-পড়া সাহেব, আর পাখি...অগুনতি পাখি উড়ে বেড়াতো ঘরের রঙচটা দেওয়ালে। 

পরবর্তী কালে মহাজাতি সদন কিম্বা রবীন্দ্র মঞ্চে অবাক হয়ে দেখেছি পি সি সরকারের 'ছায়াবাজি'। ছায়ারা যেন কথা বলতো, নাচত, খেলত তার সঙ্গে। কী অদ্ভুত রহস্যময় সব ছায়ার খেলা! 

বড় হয়ে জেনেছি 'শ্যাডোগ্রাফি' কাকে বলে। অবাক হয়ে বুঝতে শেখা এই 'আর্ট' বহু বছর আগে, সপ্তম শতাব্দীর গোড়ায় মিশর, ইন্দোনেশিয়া, চিনে চর্চা করা হতো। রাজ দরবারে পুরোহিত, জাদুকরেরা সেই সব খেলা দেখাতেন। পুতুল খেলার মধ্যে দিয়ে ছায়ার সাথে যুদ্ধ জারি করা হতো। 

১৭৭৬ সালে ডমিনিক সেরাফিন ইউরোপে প্রথম দেখালেন ছায়াপুতুলের কারসাজি৷ দেখালেন হাত কী অদ্ভুত ছায়া অবয়ব গড়তে পারে৷ তাজ্জব বনে গেছিল প্যারিসের জনতা সেই খেলা দেখে। দ্রুত ছড়ায় তার জনপ্রিয়তা। 

১৮৭৫ সালে ফেলিসিয়ন ট্রিওয়ে এই 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি'কে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। একে একে উঠে আসেন আলেক্সান্ডার হারম্যান, ডেভিড ডেভাণ্ট, এডওয়ার্ড ভিক্টর বা ডেভিড ব্যামবার্গের মতো সব প্রথমসারির কিংবদন্তি 'শ্যাডোগ্রাফার'রা। ১৮৫৯ এ বেরোয় শ্যাডোগ্রাফি নিয়ে প্রথম বই "হ্যাণ্ড শ্যাডোজ টুবি থ্রোন আপন দ্য ওয়াল", লেখক হেনরি বার্সিল। 

ভারতেও প্রাচীন জাদুকরেরা এর চর্চা করেছেন। গণপতি চক্রবর্তী থেকে গোপীনাথ মুথুকার, পি সি সরকার থেকে প্রহ্লাদ আচার্য, মায় পি লাল পর্যন্ত কমবেশি তাঁদের জাদুকীর্তি'তে 'শ্যাডোগ্রাফি'র চর্চা রেখেছেন। আজ সেই 'ছায়াবাজি'কেই অভাবনীয় শিল্পের স্তরে নিয়ে গেছেন কিছু অখ্যাত মানুষ। সেই 'ট্যাডিশন সমানে চলিয়াছে', নিঃশব্দে।

সৃজিত মুখার্জির 'নির্বাক' (২০১৫) সিনেমা হিসেবে যতটা না স্পর্শ করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছুঁয়ে গিয়েছিল তার গল্প বলার গভীরতায়। বিস্মিত হয়েছিলাম অঞ্জন দত্ত বা ঋত্বিক চক্রবর্তীর ছায়া ঘেরা অভিনয়ে। সেই স্তরের পর স্তর খুলে বেরিয়ে আসা কাহিনি ও চরিত্রের অবয়ব, কী অসাধারণ ছায়া-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল স্তব্ধতার সম্মোহনে। 

আর সম্মোহিত করেছিলেন দুজন - অমর সেন ও সব্যসাচী সেন। সিনেমার ওপেনিং ক্রেডিটে তাদের 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি' অকল্পনীয়। তার সাথে অঞ্জন পুত্র নীল দত্তের অভাবনীয় 'ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর' কী ছায়ামেদুর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল, তা ভাবলে আজও সত্যি রোমাঞ্চ লাগে। 

'সেন জুটি' এই মুহূর্তে শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অন্যতম সেরা ছায়াশিল্পী৷ শুধু মাত্র হাতের 'মুভমেন্ট' কতটা নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে তা দেখিয়েছেন তাঁরা। এও এক অলৌকিক ছায়া চরাচর, যেখানে শরীরী ভাষ্য ও ছায়াভাষ্য কখন যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়। 

নিঃশব্দে সৃষ্টি হয় ছায়া মূর্চ্ছনা। সেই মূর্চ্ছনা সকলে শুনতে পান না। তাকে অনুভব করার আলাদা চোখ প্রয়োজন। তাকে বোঝা এত সহজ নয়। 

সুকুমার রায় ভোররাতে, সন্তর্পণে এসে জানিয়ে দিয়ে যান  - 

"কেউ জানেনা এ-সব কথা কেউ বোঝে না কিছু,
কেউ ঘোরে না আমার মত ছায়ার পিছুপিছু।"

বিরাজ সত্যসুন্দরঃ 'আনন্দলোকে'র উৎস সন্ধানে


আমার শেখা প্রথম রবীন্দ্রসংগীত। সেই প্রথম পরিচয় রবি ঠাকুরের সঙ্গে। তখনও রবীন্দ্রনাথ কে, ভালো করে জানতাম না। বুঝতাম না। বোঝার বয়সও ছিল না। অবশ্য এখনও যে কতটা জেনে বা বুঝে উঠতে পেরেছি, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। 

'তিনি' এক মহাসমুদ্র, তারও ঊর্ধ্বে সসাগরা পৃথিবী। যার আদি নেই, নেই অন্ত। শুধু রয়েছে অনন্তের এক রহস্যময় আলোর হাতছানি। একজীবনে বোঝা যা সতত দুঃসাধ্য।

তবু গান'টা ছিল। রয়েই গেছে, আজও। না জেনে না বুঝেই শেখা প্রথম রবি-বন্দনা। হয়তো আমার মতো আরও অনেকের'ই। 

আজও এই গান শুনলে নিমেষেই 'ফ্ল্যাশব্যাক' হয়। চোখ বুজে দেখতে পাই নিবারনচন্দ্র নার্সারি স্কুলের সেই একচিলতে মাঠ। কেজি ওয়ান। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার লাইনে। সামনে টেবিলের উপর হারমনিয়াম হাতে হেডস্যার দেবদাস মণ্ডল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কালো ছিপছিপে চেহারা৷ জলদগম্ভীর কণ্ঠে গাইছেন - "গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে..." প্রেয়ারের লাইনে হাত জোড় করে আমরা। না বুঝে, না জেনেই গলা মেলাতাম।

নার্সারির পাঠ চুকে গেছে কবেই। হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে, গানটি  রয়ে গেছে ধ্রুবতারার মতো, অবিচল, নিস্পন্দ, অক্ষয়চিহ্ন স্বরূপ। 

বহু পরে অবশ্য জেনেছি গানটির অশ্রুত ইতিহাস। 


১৮৮১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত মাইসোর বা মহীশূরের মহারাজা দশম চমরাজেন্দ্র ওয়াড়িয়র (১৮৬৪-১৮৯৪) তাঁর রাজ্যের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র এক 'জাতীয় সংগীতে'র কথা ভেবেছিলেন। অতি অল্পবয়সে রাজপাট শাসনের অসামান্য নজির রেখেছিলেন মহারাজ দশম চমরাজেন্দ্র। তিনি স্বয়ং ছিলেন সাহিত্য কলা সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। ছিলেন সুকবি ও কর্ণাটকি বেহালায় সিদ্ধহস্ত। ১৮৯৪ সালে শহর কলকাতায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই রাজা। তাঁকে নিয়ে 'প্রহরে' চমৎকার এক নিবন্ধ লিখেছিলেন অরিত্র সোম। 

মনে রাখতে হবে এই গানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যখন, সেই মুহূর্তে ভারতে পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। 'গড সেভ দ্য কিং'ই তখন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় সংগীত। তা সত্ত্বেও নিজ রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার উদ্যোগে পৃথক 'রাজ্য সংগীত' সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন মাইসোর রাজ। তাঁর উৎসাহে তৈরি হয় "কায়ু শ্রী গৌরী, করুণা লহরী, থয়া যক্ষী শঙ্করেশ্বরী"।


কর্ণাটকি রাগ ধীরাশঙ্করভরনমে (বিলাবল) নিবদ্ধ এই মহীশূরী ভজন লিখেছিলেন সভাকবি বাসাপ্পা বা বাসভাপা শাস্ত্রী। সুর দিয়েছিলেন ওয়াড়িয়রের সভাগায়ক ও যন্ত্রীরা যাদের মধ্যে বীণা সুবন্ন, বীণা শেষান্ন, কে বাসুদেবাচার্য ও বীণা পদ্মনাভাইয়ার মতো কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালেরা। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস।

মনে করা হয়, ঋক বৈদিক গান "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং রো মনাংসি জানতাম" ছিল এই গানের মূল প্রেরণা। এই গানের অনুপ্রেরণাতেই রবি ঠাকুর লিখেছিলেন "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ"। সাল ১৮৯২ তে। বদল এসেছিল রাগের চলনেও। "কায়ু শ্রী গৌরী" বাধা হয়েছিল বিলাবলে, "আনন্দলোকে" এবার নিবদ্ধ হল রাগ ঝিঁঝিটে, ঠাট খাম্বাজ। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন মাইসোরের দিওয়ান স্যার এম কণ্ঠরাজ উরসের অধীন প্রথম কাউন্সিলর স্যার অ্যালবিওন ব্যানার্জির আমন্ত্রণে ব্যাঙ্গালোর যান, তাঁর সম্মানে বাজানো হয়েছিল এই 'মাইসোর অ্যান্থেম'। 

"আনন্দলোকে" গানটি নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সংসদে। ২৩ জুলাই ২০১৭ সালে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে যৌথ কক্ষের অধিবেশনে সেই দিন শেষবারের মতো এক অসামান্য, আমেগঘন ভাষণ রেখেছিলেন প্রণব বাবু। অনুষ্ঠানের শেষে, যখন সকলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাচ্ছেন, মিলিটারি ব্যাণ্ডে বেজে উঠেছিল "আনন্দলোকে" গানটি। সেই গানের তালে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সংসদ ভবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। 

এই গানের সঙ্গে আজও, ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে নস্ট্যালজিয়া। জড়িয়ে আছে এমন বহু মুহূর্ত, যা চির অমলিন। কতো জনের গলায় এই গান শুনে আপ্লুত হয়েছি। শ্রীকান্ত আচার্য, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর সেন, বা ক্যালকাটা কয়ার। আরও না জানি কতজনের কণ্ঠে সমৃদ্ধ এই গান। তবু দক্ষিণী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ ড. এম বালামুরলী কৃষ্ণের কণ্ঠে এই রবীন্দ্রসংগীত এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠমাধূর্যে যেন বারবার উঁকি দিয়ে যায় 'মাইসোর অ্যান্থেম' - 'কায়ু শ্রী গৌরী'র ছায়া।

"আনন্দলোকে" আজও আমার কাছে ফেলে আসা একখণ্ড ছেলেবেলা। যার পরতে পরতে লেগে আছে আমার শৈশব, প্রথম রবীন্দ্র সান্নিধ্য আর কতকটা বোঝা না বোঝায় মেশা এক আলোর সন্ধান। যার পথ বেয়ে দীর্ঘকাল হেঁটে এসেও আবারও সূচনায় ফিরে আসা যায়। এই আমার আত্মানুসন্ধান, সত্য চিন্তন ও প্রজ্ঞার অতীন্দ্রিয় পুণ্যশ্লোক। গানের সূত্র ধরে যা যুগে যুগে মিশে রয়েছে - 

"শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে..."

বুদ্ধ হেসেছেঃ 'ট্রাইবাল রেইন' ও রাহুল রাই


১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ সাল। নামচি, সিকিম। 

সেদিন ভ্যালেন্টাইন। দিনভর বৃষ্টি হয়েছিল পাহাড়ে। বছর সাতাশের তরুণ'টি সন্ধ্যে নামার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিল। 

এমন অসময়ে তাকে বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হয়েছিল সবাই। এই সময়ে, হয় তাঁর প্র‍্যাকটিশ, না হয় কোনো পারফরম্যান্স থাকে। কিন্তু মুখচোরা ছেলেটি কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। 

সে বরাবর এমনই। ভিতরে শত সহস্র ঝড় উঠলেও মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। তাকে আড়াল করে দিত তাঁর শিশুসুলভ হাসি৷ যেন কোনো পাহাড়ি ঝর্না নেমে আসতো রুক্ষ পাথরের ভাঁজে। 

সবার সঙ্গে সে রাতে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল, হেসেছিল, গল্প করেছিল, খেয়েছিল রাতের খাবার৷ তারপর ঢুকে গিয়েছিল নিঃশব্দে নিজের ঘরে। আস্তে করে বন্ধ করে দিয়েছিল দরজা। অনেক রাত পর্যন্ত তাঁর ঘর থেকে পাওয়া গেছিল গিটারের আওয়াজ। 

পরদিন সকালে পুলিশ এসে উদ্ধার করেছিল তাঁর নিথর, নিস্পন্দ দেহ। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, সে আত্মহত্যা করেছে। অথচ পাওয়া যায়নি কোনো সুইসাইড নোট। থাকার বলতে, গান লেখার কিছু আঁকিবুঁকি চেষ্টা, ঘুমের ওষুধ আর তাঁর গিটার। প্রাণের চাইতেও যাকে ভালোবাসতো ছেলেটি৷ 

শুধু তাঁর বোজা চোখ দুটি, মনে হয়, শেষবারের মতো কিছু একটা খুঁজছিল। কী, তা কেউ জানে না। বইয়ের তাকের উপর রাখা 'লাফিং বুদ্ধা' শুধু নীরবে হেসেছিল, দু'হাত মাথার উপর তুলে। 

পরদিন "দার্জিলিং ক্রনিকল"-এ লেখা হয়েছিল - "Rahul Rai, the lead singer of Tribal Rain, has been found dead in an apparent suicide. The talented artist from Sikim reportedly committed suicide at his own residence in Namchi on Tuesday night." 

কেন? কী ভাবে? কিসের জন্য? সে কি কোনো মানসিক অবসাদে ভুগছিল? কোনও প্রেমঘটিত সম্পর্ক? বিচ্ছেদ? টানাপোড়েন? প্রতারণা? সে কী নেশা করতো? ড্রাগস? কোকেইন, চরস, গাঁজা? 

কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি সেদিন, আজও না। শুধু পাহাড় চিরতরে হারিয়েছিল তার প্রিয়বন্ধুকে। শান্ত, সৌম্য, ভদ্র চেহারার সেই ছোট্টখাটো অত্যন্ত গুণী মানুষটিকে। লোকে তাকে "রাহুল দাজু" বলে ডাকতো। 

সে রাহুল রাই, আধুনিক নেপালি সংগীতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা, 'ট্রাইবাল রেইন' ব্যাণ্ডের জনক, কম্পোজার, লিরিসিস্ট, লিড গিটারিস্ট৷ এককথায় রীতিমতো - 'ওয়ান ম্যান ব্যাণ্ড'।


১৯৮৯ সালের ১৪ অক্টোবর। কলকাতায় জন্মেছিল রাহুল। পদ্মা ও নয়ন কুমার রাইয়ের প্রথম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই গান অন্তপ্রাণ রাহুল, ভালোবেসে ছিল গিটারকে। 

১৯৯২ সালে নামচির মাউন্ট কারমেলে ভর্তি হয় সে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্যাঙ্গালোরে, তাঁর এক মামার কাছে। বাবা, মা'র থেকে দূরে। পাহাড় থেকে দূরে।

ছোট্ট ছেলেটা একা, বড়ো একা হয়ে পড়েছিল। এই সময়ে স্কুলের বন্ধুদের সাথে সংগীতচর্চা নিয়ে মেতে উঠেছিল সে৷ যেন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে খুঁজে পেয়েছিল আলোর সন্ধান। স্কুলে একটা ছোট ব্যাণ্ড খুলেছিল সে ও তাঁর বন্ধুরা। পড়াশোনার পাশাপাশি চলতো প্রাকটিস, স্টেজ পারফরম্যান্স। এই ভাবেই একটু একটু করে বড়ো হয়ে ওঠে ছেলেটি। তখন তাঁর দোসর বলতে, পকেটমানির টাকা বাঁচিয়ে কেনা সেই গিটার। নিজের সংগীতচর্চা নিয়ে সে খোলাখুলি বলতো - "We are not born with passion, we are develop it as we grow."

অবশ্য গানবাজনা ছিল তাঁর রক্তে, হাড়ে-মজ্জায়। দাদুকে দেখেছিল সে, ছোটবেলায়, হারমনিয়াম ও বেহালা বাজাতে, গান করতে। সেই শুরু৷ ছেলেটি বুঝতে পারে সংগীতের তালিম তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া৷ দাদুই তাঁকে দেখিয়েছিলেন পথ। 

কয়েক বছর পর, ফের নামচি ফেরে ছেলেটি। শুরু হয় নতুন করে পড়াশোনা। এই সময়েই নতুন একটি হেভি মেটাল ব্যাণ্ড খোলে সে, নাম দিয়েছিল "ড্রিম ডায়বলিক"। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে ২০০৯ এ আইআইটি গুয়াহাটি আয়োজিত "রক-ও-ফনিক" টাইটেল জিতে নেয় "ড্রিম ডায়বলিক"। জিতেছিল আরও একাধিক পুরষ্কার ও সম্মান৷ 

নামচির গভর্মেন্ট কলেজে পড়ার সময় পাকাপাকি মিউজিশিয়ান হবে বলে ঠিক করে সে। শুরু হয় নতুন পথচলা। সিকিম ইউনিভার্সিটি-তে মিউজিক নিয়ে পড়ার সময় সে শুরু করা সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার এক্সপেরিমেন্ট। ইংরাজি নয়, মাতৃভাষা নেপালিতে গান লেখা, সুর দেওয়া শুরু করে সে। এই সময়ই তাঁর হাত ধরে তৈরি হয় নতুন ব্যাণ্ড 'ট্রাইবাল রেইন'। 

২০১৪ তে তৈরি হয় ব্যাণ্ড। ২০১৬ সালে কাঠমান্ডুতে রিলিজ করে 'ট্রাইবাল রেইন'র প্রথম অ্যালবাম - "রোকো ইয়ো সময়"। অ্যালবামে মাত্র তিনটি গান - "চিন্তা", " নারিসানা" ও "ভানাই"। সিকিম, দার্জিলিং ও নেপালের পাহাড়ে আগুন জ্বলে ওঠে। ফ্রি স্টাইল সিংগিং-র নতুন ইতিহাস গড়েছিল "ট্রাইবাল রেইন"। তিনটি গানই, লেখা সুর ও কণ্ঠ ছিল রাহুলেরই। রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায় রাহুল রাই ও তাঁর বন্ধুরা। বহু পুরস্কারও পেয়েছিল অ্যালবামটি। 

*

কিন্তু এর মধ্যেই ইন্দ্রপতন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অজ্ঞাতকারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয় রাহুল রাই। শান্ত, নরম লম্বাচুলো, হাসিমাখা মুখের সেই লাজুক ছেলেটি যে এমন কাণ্ড বাঁধাবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। 

অনেকে বলে, সে রাতে 'ড্রাগ ওভারডোজে' কেড়ে নিয়েছিল রাহুল রাই-র প্রাণ। অনেকে বলে, কোনো একটি ব্যক্তিগত বিষয়ে মর্মাহত ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েই এই চরম পদক্ষেপ৷ কিন্তু কেন ২৭ বছরের তরতাজা, প্রতিভাবান একটি ছেলে এমন অকালে ঝরে গেল, আজও তা কেউ জানে না। 

তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে রিলিজ হয় "ভানাই"-র এই মিউজিক ভিডিও'টি। আজও পাহাড়ি ধুনে গাঁথা এই গানে রাহুলের কণ্ঠে "হেরা, তিমরো লাগি তারা তোড়ি দিনছু" (দেখো, তোমার জন্য আকাশের তারা নিয়ে এসেছি) শুনলে মনে হয়...প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ে ঝিকিয়ে উঠেছে রোদ, একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মেঘ আর সোনালী আভায় ঢেকে যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখর। 

না জানি অব্যক্ত কতো কথা মিশে আছে এই গানে। যার পরতে পরতে খেলা করে পাহাড়ি কুয়াশা, হাল্কা বৃষ্টি আর সেই সদাহাস্যজ্বল বুদ্ধমূর্তির করুণাঘন ছায়া।

যার 'অবাঙমনসোগোচর' হাসির আভা কেউ কখনো বোঝেনি। 

রাহুল ছাড়া আর কেউ বুঝবেও না। 


রঞ্জিশ হি সহিঃ চলমান ইতিহাসের জন্মবৃত্তান্ত


সত্তরের দশক, লাহোর। 

'আজরা মুভিস'-র ব্যানারে এক নতুন উর্দু চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাত দিয়েছেন সৈয়দ সুলেমান। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার হায়দ্রাবাদে জন্ম এস সুলেমান (জ.১৯৩৮) পাকিস্তানি ফিল্ম জগতে 'স্বর্ণযুগে'র অন্যতম সেরা পরিচালক, তখন যথেষ্টই প্রতিষ্ঠিত নাম। 

পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের মধ্যেই উর্দু ও পঞ্জাবি মিলিয়ে তৈরি করেছেন এক ডজনেরও বেশি সিনেমা। অধিকাংশই হিট মিউজিক্যাল। ৬৩'তে তাঁরই পরিচালনায় 'বাজি' ভেঙে দিয়েছিল 'বক্স অফিসে'র যাবতীয় রেকর্ড। পেয়েছিল একাধিক সম্মান। সুলেমানের দুই ভাই সৈয়দ দর্পণ ও সন্তোষ কুমার ছিলেন বিখ্যাত ফিল্ম অভিনেতা। স্ত্রী জাইরিন সুলেমান 'পান্না'ও ছিলেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। 

নয়-নয় করে এ যাবত ১৮-টি সিনেমা পরিচালনার কাজ সামলেছেন সুলেমান। তাঁর এবারের 'প্রজেক্ট'   সাহিত্যিক হামিদা জাবিনের বহুচর্চিত উপন্যাস 'তামান্না' অবলম্বনে ফ্যামিলি ও সোশ্যাল ড্রামা - 'মহব্বত'। অভিনয় করেছিলেন মহম্মদ আলী, জেবা, সাবিহা খানুম, রেনুকা দেবী এবং সন্তোষ রাসেলের মত ললিউডের বাঘা-বাঘা অভিনেতারা। 

'মহব্বতে'র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন প্রবাদপ্রতিম সুরকার নিসার বাজমি। সেই বাজমি, যার সাঙ্গীতিক চিন্তা ভাবনার কথা বলতে গিয়ে বারবার কানে হাত ছোঁয়াতেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ফেটে পড়তেন আহমেদ রুশদী থেকে রুণা লায়লা, রফি থেকে মুকেশ। মহম্মদ রফি এতটাই শ্রদ্ধা করতেন বাজমি'কে যে একবার তাঁর সুরে গাওয়ার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নিতে চাননি। বাজমি'র জোরাজোরিতে মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে রফি বলেছিলেন, ওই টাকা তিনি কোনদিন খরচা করবেন না। 

১৯২৪ সালে মহারাষ্ট্রের জলগাঁওতে জন্ম নিসার বাজমি'র। আসল নাম সৈয়দ নিসার আহমেদ। খুব গরীব পরিবারে মানুষ। বাবা সৈয়দ কুদরত আলী ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। অভাবের সংসারে ছিলনা বিন্দুমাত্র গান-বাজনার পরিবেশ। কিন্তু অল্প বয়স থেকেই গান বাজনার প্রতি তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ। গানের টানে পড়াশোনা শিকেয় তুলে যোগ দেন উস্তাদ ইয়াসিন খান 'কাওয়ালে'র দলে। বাজমির সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আলাদা করে তালিম দেন সেই সময়কার বিখ্যাত খেয়ালিয়া উস্তাদ আমিন আলী খান। খান সাহেবের শাগির্দ হয়ে মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তথা নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন বাজমি। 

চল্লিশের দশকে যোগ দেন বম্বের অল ইণ্ডিয়া রেডিও'তে। ৪৬'এ পান প্রথম ব্রেক, এ আর জামিনদার পরিচালিত হিন্দি ছবি 'যমুনা পার'-এর সুরকার রূপে। প্রায় ৪০'টিরও বেশি বলিউড সিনেমায় সঙ্গীত দেন তিনি। এরপর ৬২'তে তাঁর পাকিস্তান যাত্রা ও সঙ্গীত পরিচালনার জন্য সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস। 

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে পেলেন প্রথম ব্রেক, পরিচালক ফৈজল করিম ফজলির 'অ্যায়সা ভি হোতা হ্যায়' তে। ছবি হিট হয়, হিট হয় গানগুলিও। নিসার বাজমির সুরে আহমেদ রুশদী ও গায়িকা নূরজাহানের কন্ঠে 'মহব্বত মে তেরে' গানটি সাড়া ফেলেছিল গোটা পাকিস্তানে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি বাজমি'কে। দিয়েছেন একের পর এক হিট 'মিউজিক্যাল'। তাঁর সুরে বহু কালজয়ী গান গেয়েছেন আহমেদ রুশদী, মেহদি হাসান, রুণা লায়লা, আলমগীর, নায়রা নূরের মত শিল্পীরা। 


কিন্তু ইতিহাস গড়া তখনও বাকি ছিল বাজমির। এবার এস সুলেমানের 'মহব্বতে'র (১৯৭২) সুরকার রূপে ডাক পেলেন তিনি। ছবির গান লিখলেন তিন প্রথিতযশা শায়ের কাতিল সিঁফাই, হাবিল জলিব ও আহমেদ ফরাজ। গান গাইলেন নূরজাহান, তাহিরা সাঈদ, আহমেদ রুশদী, রুণা লায়লা ও মেহদি হাসানের মত শিল্পীরা। প্রাণ ঢেলে সুর দিলেন বাজমি। সাতটি গান ছিল ছবিতে, সাতটিই সুপারহিট। কিন্তু তার মধ্যে একটি গান রাতারাতি গড়েছিল ইতিহাস। ছবির নায়ক মহম্মদ আলীর লিপে ছিল সেই গান। আক্ষরিক অর্থে সেটি 'স্যাড সং'।

আহমেদ ফরাজের কথায়, নিসার বাজমির সুরে ও মেহদি হাসানের কন্ঠে ইমন রাগে সেই কালোত্তীর্ণ গানটি হল - 

"রঞ্জিশ হি সহি দিল ইয়ে দুখানে কে লিয়ে আ
আ ফিরসে মুঝে ছোড় কে জানে কে লিয়ে আ।"

সেই গান নিয়ে ঝড় উঠেছিল তামাম পাকিস্তানে। ঝড় ওঠে সরহদ পার হিন্দুস্তানেও। নতুন করে আবিস্কৃত হন নিসার বাজমি, আহমেদ ফরাজ ও মেহদি হাসান, এই গানের রেশ ধরে। 

'নতুন' করে বলার কারণ, মেহদি হাসানের গাওয়ার অনেক আগেই ষাটের দশকে গজলটি গেয়েছিলেন 'হাম দেখেঙ্গে' খ্যাত ইকবাল বানু। ফরাজ আগেই লিখেছিলেন এই গজল। খুব সম্ভবত 'প্রথম' সুর দিয়েছিলেন সুরকার খাঁজা খুরশিদ আনোয়ার (১৯১২-১৯৮৪)। সেই গান গেয়েছিলেন ইকবাল বানু। ছায়ানট রাগে সেই গানের সঙ্গে মেহদি হাসানের গাওয়া ইমন রাগে, বাজমির সুরে তেমন মিল নেই বললেই চলে। 

কিন্তু সেই গানের সুরে, কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বাজমি। তাই 'মহব্বতে'র সুররোপনের সময় আহমেদ ফরাজের কাছে বিশেষ করে চেয়ে নেন 'নজম'টি। চান নতুন করে সুর দিতে। রাজি হন ফরাজ। 'নজমে'র কথায় সামান্য হেরফের করে সেটি তুলে দেন বাজমির হাতে। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস। ইকবাল বানুর 'ভার্সান'ও পেয়েছিল অসাধারণ জনপ্রিয়তা। কিন্তু মেহদি হাসানের কন্ঠে সেই গজল নতুন ইতিহাস রচনা করে। হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থে কালোত্তীর্ণ। পরবর্তী কালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধাঁচে গানটি গেয়ে গোটা উপমহাদেশে অবিশ্বাস্য খ্যাতি কুড়োন হাসান। 'রঞ্জিস হি সহি' আর মেহদি হাসান হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ। পরবর্তী সময়ে, বহু মানুষ এই গজল গেয়েছেন। এখনও গাইছেন। কিন্তু 'রঞ্জিস হি সহি' থেকে মেহদি হাসানকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। তারা হয়ে ওঠেন একে ওপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। 

প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হতে চললো, 'রঞ্জিস হি সহি'র জয়যাত্রা অব্যাহত। 'আফতাব এ গজল' মেহদি হাসান ও কবি আহমেদ ফরাজ সেই অবিস্মরণীয় গজলের হাত ধরে পেয়েছেন 'চির অমরত্ব'। কিন্তু বাজমি? কে মনে রেখেছে বিখ্যাত এই গজলটির সুরকার নিসার বাজমি'র কথা? ২২ মার্চ ২০০৭ সালে করাচি'তে দীর্ঘ রোগভোগের পর ৮২ বছর বয়সে যখন প্রয়াত হলেন বাজমি 'ডন' সংবাদপত্র লিখেছিল - 

Nisar Bazmi, one of the most iconic musicians of the country died after a long illness here at Thursday night. He was 82. Responsible for the success of many a star singer, Bazmi’s numbers had an uncanny knack of catching the imagination of the public.

'রঞ্জিস হি সহি'র সঙ্গে জড়িত মানুষগুলি আজ আর কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু এই গানের পরতে পরতে আজও তাঁদের অবস্থান। বাজমি, ফরাজ, হাসানের এই ত্রয়ী মেলবন্ধনের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাজমির একদা 'শিষ্য', বলিউডের জনপ্রিয় জুটি 'লক্ষীকান্ত-প্যারেলালে'র অন্যতম সদস্য প্যারেলাল বলেছিলেন, "আজও যখনই এই গজল শুনি, বাজমি সাহেবের কথা মনে পড়ে। তাঁর কথা লোকে ভুলে গেলেও এই গজলের মধ্যেই নিহিত আছে তাঁর রূহ...তাঁকে বাদ দিয়ে এই গান অসম্পূর্ণ।" প্যারেলাল বলেছিলেন - সঙ্গীতের সুরে সেই শক্তি আছে যা 'অনহোনি' কে 'হোনি' করে তুলতে পারে। প্রার্থনা করি এই গানের কথার পিঠে ভর করে নিসার বাজমি ফিরে আসুন। আমরা যেন বলতে পারি - 

 "কিস কিস কো বতাঁয়েঙ্গে জুদাই কা সবব হম
তু মুঝসে খফা হ্যায় তো জমানে কে লিয়ে আ -

রঞ্জিস হি সহি!"

*ছবি (বাঁ দিক থেকে) - নিসার বাজমি, মেহদি হাসান, আহমেদ ফরাজ।

নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়োঃ হোরির মাধূর্য, মাধূর্যের হোরি


বছর সাত-আটেক আগের কথা। মুম্বাইয়ের নেহরু সেন্টারে ভেঙে পড়েছে মানুষের ঢল। একসাথে মঞ্চ ভাগ করে নেবেন দুই কিংবদন্তি শিল্পী গিরিজা দেবী ও বিরজু মহারাজ। শাস্ত্রীয় গায়ন এবং নৃত্যের এক অসাধারণ যুগলবন্দীর সাক্ষী হতে উদগ্রীব সকলে। 

যথাসময়ে মঞ্চে এলেন তাঁরা। বসলেন পাশাপাশি৷ গিরিজা দেবীর এক শিষ্যার হাতে তানপুরা, অন্য দিকে তবলায় অনুরাধা পাল। উস্তাদ আল্লারাখা ও জাকির হুসেইনের প্রিয় ছাত্রী অনুরাধা বেনারস ও পঞ্জাব ঘরানার সুযোগ্য উত্তরসূরী। দেশের অন্যতম প্রথিতযশা মহিলা তবলাবাদক।

শুরু হল গান। বেনারস ঘরানার অজস্র রত্নসম্ভার সেদিন শ্রোতা, দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন গিরিজা দেবী। তাঁর কণ্ঠে সাক্ষাৎ সরস্বতীর কৃপা। বেনারস ঘরানার দুর্লভ সব ঠুমরী, দাদরা, কাজরি, চৈতী পেশ করেছিলেন গিরিজা। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন বিরজু মহারাজ'জি। গিরিজা দেবীর পাশে বসেই তিনি দেখিয়েছিলেন অভিনয় আর অভিব্যক্তি, ভঙ্গিমার মাধ্যমে অনবদ্য নৃত্যশৈলীকে কোন স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ক্ষণজন্মা সেই দুই ব্যক্তিত্বের জাদু স্পর্শে সেদিন ম্যহফিলে 'চার-চাঁদ' লেগেছিল।

অনুষ্ঠান মাঝে একসময় গিরিজা বললেন, "অব এক হোরি সুনাতি হুঁ। রঙ্গো কা তেওহার আ রহী হ্যায়।" অর্থাৎ হোলি আসছে। তাই এবার একটা 'হোরি' শুনুন! সাথেসাথে যেন উল্লাসে ফেটে পড়ে নেহরু সেন্টার। গিরিজা দেবী লাগালেন সুর মিশ্র কাফি রাগে -

"রঙ ডারুঙ্গি নন্দ কে লালন পে
সাঁবর রঙ লাল কর দইয়ো - 
মল গুলাল দৌ গলান পে
নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো
ঢপ মৃদঙ্গ তালন পে!" 

তন্ময় হয়ে 'রাধিকা হোরি' গাইছেন গিরিজা৷ তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে মহারাজ'জির সেই অনন্যসাধারণ 'এক্সপ্রেশন', অভিনয়, হাতের মুদ্রা, ভ্রুভঙ্গিমা, চলন যেন সত্যি সত্যিই রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা নামিয়ে এনেছেন সভাগৃহে। দর্শকেরা সুরে, ছন্দে, তালে বুঁদ।

মনে হচ্ছে কেউ যেন একমুঠো আবীর ছুঁড়ে দিয়েছে আকাশে। অদৃশ্য পিচকারি থেকে উড়ে আসছে রঙ। সেই রঙ যতটা না শরীরের, তার চেয়ে ঢের বেশি মন জুড়ে। 

গানের চলনে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে কথাগুলি৷ 'নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো'...রাধিকা যে শুধু কৃষ্ণের সাথে হোলি খেলে সন্তুষ্ট নন। মাধবের শ্যামবর্ণ ত্বক তিনি আজ লাল করে ছাড়বেন। শুধু তাই নয়। তাঁকে নারীর বেশে সাজিয়ে, মৃদঙ্গের তালেতালে নাচাবেন। 

অবাক হয়ে ভাবি, রঙের কী অদ্ভুত মহিমা। মুহূর্তের মধ্যে কোথায় ভেসে গেল লিঙ্গ বিভাজন, পুরুষালি দম্ভ, কতৃত্ব, পেশীসঞ্চার। শতেক দাবিদাওয়া, যতেক মৌরসীপাট্টা। 'গুলালে'র গুণে তখন সবই হাওয়ায় লীন৷ রাধিকা তখন কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-ই রাধিকা। শতাব্দী প্রাচীন সেই 'প্রচলিত' ব্রজভাষ্য নিঃশব্দে শিখিয়েছে সমবোধ, সমচেতনা ও সমানাধিকারের তত্ত্বজ্ঞান। 

রঙের উৎসবে যেদিন সত্যি সত্যিই এই তথাকথিত লিঙ্গ-বিধিবদ্ধতা ঘুচে যাবে, সেদিন হয়তো সকলের মধ্যেই ফুটে উঠবে সমলিঙ্গ, সমতত্ত্বের মিশ্র রাগ। যেদিন সমস্ত রঙ মিলেমিশে এক হয়ে, একে অন্যের মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে রঙের অন্তর্নিহিত আলো। চিরায়ত, চিরকাঙ্ক্ষিত সেই দোল পূর্ণিমার অপেক্ষায় রয়েছি আজও। 

"আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধন ছেড়া প্রাণ"।
* ঋণঃ থ্রি সং'স ফর হোলি, ২০১৯

পিনাজ মাসানিঃ গজলের এক বিস্মৃত অধ্যায়


সে এক দাউদাউ সময়। প্রতি রবিবার নিয়ম করে দাবানল লাগে। দুরদর্শনে। গীত গজলের অনুষ্ঠানে। সেই আগুনে একটু হলেও পুড়েছি আমি। 

কতই বা বয়স তখন। নয়ের দশক। একটু একটু করে পেরিয়ে আসছি রামানন্দ সাগরের 'রামায়ণ', বি আর চোপড়া-দের 'মহাভারত'...

পা টিপে টিপে উঠে এসেছে 'নুক্কর', 'ওয়াগলে কী দুনিয়া', 'সার্কাস', 'বুনিয়াদ', 'গুল গুলশন গুলফাম', 'করমচাঁদ জাসুস' বা 'মুঙ্গেরীলাল...' এসবের গন্ধ মেখেই একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা। 

সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি 'চিত্রহার' বা 'সুপারহিট মুকাবলা'র চাইতেও তখন বেশি টানছে 'গীত গজল সন্ধ্যা'৷ সেখানে তখন চাঁদের হাট। কে নেই সেখানে? গুলাম আলী, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ, জগজিৎ-চিত্রা, উদিত নারায়ণ, কুমার শানু আর...আর সেই মেয়েটি...পিনাজ মাসানি। 

'লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট' বলে কথা। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই শাড়ি পড়া লম্বা চেহারা, কোঁকড়াচুলো রোগা-পাতলা মেয়েটিকে। মাইক হাতে আদুরে গলায় মিষ্টি হেসে গান গাইছে৷ 

তাঁর চোখ কথা বলে। কথা বলে তাঁর শরীর। যার ঠোঁটে সবসময় লেগে আছে হাসি। চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলছে। ঠিক যেমন খেলত তাঁর কণ্ঠের সুর মাধুর্যে, গজলের অন্তঃস্থলে। 

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, প্রেমে পড়েছিলাম...হ্যাঁ, ঘোরতর প্রেমে পড়েছিলাম আমি। দাউদাউ করে দাবানল জ্বলেছিল কোথাও৷ সেই আগুনের ধোঁয়া দেখা যায় না। শুধু টের পাওয়া যায় উত্তাপ।

এক সময়ে গজল সাম্রাজ্যের 'শাহজাদি' বলা হতো যাকে, তাঁর কথা আজ আর কেই বা মনে রেখেছে? 

*

ষাটের দশকে (আনুমানিক ১৯৬৭) গুজরাটের নভসারি'তে এক পার্সি পরিবারে জন্ম পিনাজ মাসানির। গান ছিল তাঁর রক্তে। বাবা ডলি মাসানি ছিলেন সুগায়ক, শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় সমঝদার। 'আফতাব ই মৌসিকী' উস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের শাগির্দ৷ বাবার কাছেই গানের প্রথম তালিম পেয়েছে পিনাজ৷ পরে উস্তাদ আমানত হুসেইন খানের কাছে পেয়েছেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম। 

অল্প বয়সেই স্টেজ শো শুরু করেন পিনাজ। শুধু গান নয়, লেখাপড়া খেলাধুলাতেও ছিলেন সমান কৃতি। বরাবর ফার্স্ট হয়ে এসেছেন ক্লাসে৷ হয়েছেন ইউনিভার্সিটি টপার। চেয়েছিলেন অধ্যাপনা, কিন্তু বেছে নিয়েছেন গানের জগৎ। মুনশিয়ানা পান লঘু শাস্ত্রীয় সংগীত ও গজলে। এই তাঁর একটু একটু করে বড় হওয়া। একইসাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠাও। 

আটের দশক, যখন গীত গজল সার্কিটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মেহেদী হাসান, গুলাম আলী, জগজিৎ সিং, চিত্রা, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ-রা; ঠিক তখনই হ্যালির ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব পিনাজ মাসানির। কলেজে থাকতে মিউজিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট হওয়া ছিল তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস। এভাবেই একদিন পিনাজ নজরে পড়ে যান বিখ্যাত সুরকার জয়দেব-এর। 


সুরকার জয়দেব-ই তাঁকে গজল চর্চার পথে এগিয়ে দেন। বিশেষ তালিম নিতে পাঠান স্বর্ণযুগের বিখ্যাত গজল গায়িকা মধুরানীর কাছে৷ নাম না জানা এক অখ্যাত পার্সি মেয়ে'কে নিজের শাগির্দ করতে চাননি মধুরানী৷ কিন্তু পিনাজের গায়কী'তে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তালিম দেওয়ার মনস্থ করেন তিনি৷ মধুরানীর কাছে নতুন করে গজলের অ আ ক খ তথা উর্দুও শেখেন পিনাজ। এবার সুরের সাম্রাজ্য বিস্তার অনেকটাই সুবিধে হয়ে যায় তাঁর। 

১৯৮১ সালে চোদ্দ পনের বছর বয়সে তাঁর প্রথম অ্যালবাম - "আপ কি বাজম মে"। আট-দশটি গজলের সমাহার৷ প্রথম রেকর্ডেই বাজিমাৎ। পান তুমুল জনপ্রিয়তা। ৮১'র অন্যতম সেরা আবিষ্কার হয়ে ওঠেন পিনাজ। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাননি পিনাজ। আগামী দশ বছরে বেরিয়েছে তাঁর ডজন খানেক অ্যালবাম যার প্রতিটিই হিট। 

শুধু গজল নয়, হিন্দি ফিল্মে প্লে ব্যাকও করেন তিনি। জয়দেব, ও পি নাইয়ার, বাপি লাহিড়ী, আর ডি বর্মনের মতো প্রথিতযশা সুরকারদের সুরে বহু হিট গান গেয়েছেন পিনাজ। ১৯৮২ তে 'হামারি বহু অলকা' ছবি দিয়ে শুরু তাঁর প্লে ব্যাকের সফর। সে ছবিতে অলকা ইয়াগনিকের সাথে ডুয়েট গান তিনি। গজলের পাশাপাশি ইন্ডি-পপ'ও গান পিনাজ। 'তু দিল দে দে' আজও আমরা ভুলিনি। গালিব, ফৈজ আহমেদ ফৈজ, শাকিল বদাউনি, নিদা ফজলির মতো কিংবদন্তি 'শায়ের'দের রচনাতে সুরও দেন পিনাজ৷ হিন্দি বা উর্দুর পাশাপাশি রাশিয়ান, ফিজি, জাপানিজ, ভিয়েতনামি, ইংরেজি ভাষাতেও গান গেয়েছেন তিনি৷ 

সঙ্গীতের জগতে অবদানের জন্য পেয়েছেন বহু সম্মান। ১৯৯৬ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাকে 'শাহজাদি তরান্নুম' উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০২ সালে 'কলাকার অ্যাওয়ার্ড' ও ২০০৯ সালে সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য পান 'পদ্মশ্রী'। 

* 

আজ দীর্ঘদিন সংগীতের জগতে তিনি 'অনুপস্থিত'। ব্যাঙ্গালোরে অজ্ঞাতবাসে আছেন। সে ভাবে আর পেশাদারি গানের দুনিয়ায় দেখা যায় না পিনাজ-কে। লোকে বলে, তিনি 'নিভৃতচারিনী', একাকিনী। একাধিক পোষ্য নিয়ে থাকেন ও হাতে গোনা কিছু ছাত্রছাত্রীদের গজলের পাঠ পড়ান। নিজের সম্পর্কে গোপনীয়তা রাখতে পছন্দ করেন তিনি। প্রিয়বন্ধু বলতে তালাত আজিজ ও প্রয়াত অভিনেতা টম অল্টার। 

তবুও সঙ্গীত ছেড়ে একেবারে সরে আসেননি এই অসামান্য গায়িকা। আজও গজলের দুনিয়ায় তাঁর নাম 'আদবে'র সাথে নেয়া হয়ে থাকে। আজও তাঁর সেই ট্রেণ্ড সেটিং অ্যাপিয়ারেন্স, সেই মোহময়ী হাসি আর ততোধিক মোহময় গায়কী ভারতীয় গজলের স্বর্ণালী অধ্যায়'কে আচ্ছন্ন, মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। 

তিনি পিনাজ মাসানি। আমার একান্ত নিজস্ব গজল। 

Monday, May 31, 2021

বেগম পারভিন সুলতানাঃ ৭০ বছরে সুরের 'সুলতানী' শাসন


 
আশীর দশক। বম্বের ফিল্মিস্তান স্টুডিও। 

পরিচালক চেতন আনন্দে'র 'কুদরত' সিনেমার মিউজিক রেকর্ডিং'র কাজ চলছে। স্টুডিও-তে উপস্থিত ছবির সঙ্গীত পরিচালক আর ডি বর্মন, গায়ক কিশোর কুমার, গীতিকার-শায়ের মজরুহ সুলতানপুরী ও আরও অনেকে। 

চমৎকার গান লিখেছেন মজরুহ। সিনেমায় ৭টি গানের মধ্যে ৬টি তাঁর লেখা, অন্য একটি গান - "দুখ সুখ কী হর এক মালা' লিখেছিলেন কাতিল শিঁফাই। তবে সিনেমার একটি গান নিয়ে সকলে আশাবাদী৷ 'হমে তুম সে প্যায়ার কিতনা'। রাহুল দেব বর্মণ অসাধারণ সুর দিয়েছেন তাতে। তবে গানটি পুরুষ এবং নারী, দুই কন্ঠেই শোনা যাবে। কিশোর কুমার ইতিমধ্যে স্থান দখল করেছেন। কিন্তু মহিলা কন্ঠটি কার হবে, সে নিয়ে চলছে জল্পনা। 

এমন সময়ে স্টুডিও'য় পা রাখলেন তিনি। বছর তিরিশের এক যুবতী। ঢলঢলে মুখ, লম্বা বেনী, গায়ে অসম সিল্কের শাড়ি, চোখ দুটি অবিশ্বাস্য রকমের সপ্রতিভ। তাঁকে দেখেই হেসে এগিয়ে গেলেন আরডি। নারীকন্ঠে সেই গান'টি গাইবেন তিনি-ই। মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলো কিশোরের। জহুরি ঠিকই জহর চেনে। উচিত লোক'কেই এই গান'টির জন্য বেছেছেন 'আরডি'। সাথে সাথেই শুরু হল রিহার্সাল। গানের সুর'টি শুনিয়ে দিলেন শচীন পুত্র। এক মনে চোখ বুঁজে গানটি শোনে সেই যুবতী। অদ্ভুত তার সুর, আশ্চর্য সুন্দর তার চলন। গান শেষ হতেই অস্ফুট স্বরে বলে ওঠেন তিনি - " মিশ্র ভৈরবী!"    

রাহুলের মুখে হাসি। বললেন, এই গানটি তাকে গাইতে হবে। অস্বস্তিতে পড়েন মহিলা। বলিউডে খুব কমই প্লে ব্যাক করেছেন তিনি। হিন্দুস্তানী ক্লাসিকাল নিয়ে তার কাজ-কারবার। সিনেমার জন্য প্লে ব্যাকে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন তিনি। অভিজ্ঞ সঙ্গীত পরিচালক তা আঁচ করতে পেরে ছিলেন। তার মুখে বরাভয়ের হাসি। জানালেন, গানটি গায়িকা তাঁর নিজস্ব স্টাইলেই গাইবেন, ঠুমরী অঙ্গে৷ এবার মুখে হাসি ফোঁটে তার। আধ ঘন্টার মধ্যে তুলে নিলেন গান। তারপর উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে নিজস্ব আঙ্গিকে গাইলেন গান'টি। রেকর্ডিং শুনে সবাই মন্ত্রমুগ্ধ। এমনই অসাধারণ গেয়েছিলেন তিনি। সুলতানপুরী দু' হাত তুলে জানিয়েছিলেন সাধুবাদ। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন কিশোর কুমার। বলেন, এই গানটি গেয়েছেন তিনিও। কিন্তু অমরত্ব পাবে শাস্ত্রীয় অঙ্গে গাওয়া সেই গানটি'ই। ইতিহাস সৃষ্টি করবে এই গান। 

কিশোর কুমারের ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছিল অক্ষরে অক্ষরে৷ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল 'হমে তুমসে প্যায়ার কিতনা'। পরের বছর সেই অসাধারণ রাগাশ্রয়ী গানটির জন্য প্রথমবার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন মহিলা'টি। একসুরে সকলে জেনেছিল তাঁর নাম। তিনি বিদূষী পরভীন সুলতানা। 

* 

১০ জুলাই ১৯৫০ সালে অসমের নওগাঁও'র পুরানীগুদাম গ্রামে জন্ম পরভীনের। 'ওয়ালিদ' ইকরামুল মাজিদ, 'ওয়ালিদা' মারুফা বেগম। ছোটবেলা থেকেই গানের শখ পরভীনের। ছোট্ট মেয়েকে একদিন বাপের কোলে বসে গুণগুণ করে অদ্ভুত সুন্দর সুরে গান গাইতে শুনে চমকে যান মারুফা। ঠিক করেন মেয়ে'কে গান শেখাতে হবে। ঠিক হয় বাপের কাছেই গান শিখবেন ছোট্ট পরভীন।  

ইকরামুল নিজে ছিলেন সুগায়ক ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় সমঝদার। মেয়ের কিন্নর কন্ঠ শুনে নিজে'ই তাঁঁকে তালিম দেওয়া শুরু করেন। তিনি-ই ছিলেন পারভীন সুলতানার প্রথম গুরু। গুরু হিসেবে অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন ইকরামুল। বংশসূত্রে আফগানী ইকরামুল কড়া নিয়মকানুনে বেঁধে রেখেছিলেন তাঁর মেয়ে'কে। সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে রেওয়াজে বসা, লাগাতার চার-পাঁচ ঘন্টার স্বর সাধনা, পালটা, সরগম ছিল রোজকার বিষয়। একচুল নিয়মের এদিক-ওদিক হলেই জুটতো কড়া শাস্তি। পরভীনের জীবনে তখন পড়াশোনা আর রেওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু ছিল না। ইকরামুল সিনেমার গান বা সংস্কৃতি কোনটাই পছন্দ করতেন না। মেয়েকেও বেঁধে রেখেছিলেন সেই ছকে। শুধু ছাড় ছিল লতা মঙ্গেশকরের গানে। ইকরামুল-মারুফা দুজনেই ছিলেন লতা-ভক্ত। প্রতিদিন নিয়ম করে রেডিওতে তাঁর মেয়েকে শোনাতেন লতার গান। লতা ছাড়া অন্য কোনো গান শোনা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া শোনার ছাড়পত্র ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেকর্ডিং অথবা আসরের গান। বাপের নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে চলতো পরভীন। 

এভাবেই একটু একটু করে বড় হয় সে। এবার তালিম পান তাঁর ঠাকুর্দা মহম্মদ নাজিফ খানের কাছে। পরে আরেকটু বড় হলে অসমের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ বীরেন্দ্র কুমার ফুকন ও হীরেন শর্মার কাছে তালিম পান পরভীন। যার কাছেই তিনি শিখেছেন, পেয়েছেন গুরুর অকুন্ঠ ভালোবাসা ও আশীর্বাদ৷ এই অসামান্য প্রতিভাধর ছাত্রীকে সর্বস্ব উজার করে শেখাতেন তাঁরা। এরপর বাবা ইকরামুলের সাথে পরভীন পাড়ি দেন কলকাতা শহরে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম পান ফৈয়াজ খান ও পণ্ডিত ভাতখণ্ডের অন্যতম প্রিয়-শিষ্য শ্রীকৃষ্ণ নারায়ণ রতনঝনকারের সেরা 'গাণ্ডা বন্ধ শাগীর্দ', শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিরল প্রতিভা আচার্য চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে। পরভীনের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হন চিন্ময়। শুরু হয় মার্গসংগীতের নয়া তালিম। পরভীন সুলতানা জানিয়েছেন, অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন চিন্ময়। ভীষণ পছন্দ করতেন নিয়মানুবর্তিতা। তান তুলতে না পারলে রেগে যেতেন। তাঁর 'পেটেন্ট ডায়লগ' ছিল 'করো না'হয় মরো'। অন্যান্য ছাত্ররা তাকে বাঘের মত ভয় পেলেও পরভীন'কে বিশেষ স্নেহের নজরে দেখতেন 'ত্রিবেনী তীর্থপথে কে গাহিল গানে'র অমর স্রষ্টা।         


এরই মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে করেন তাঁর প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স। ১৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ডিং। অসম সহ গোটা পূর্বাঞ্চল জুড়ে তাঁর নাম। পরিচালক আব্দুল মজিদের "মরম তৃষ্ণা" ছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক করেন পরভীন। সেই সময় পরভীনের একটি অনুষ্ঠান শুনতে আসেন বিখ্যাত সঙ্গীতকার নৌশাদ। বলা বাহুল্য পরভীনের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। সাথে সাথে দেন বলিউডে প্লে ব্যাকের অফার। কিন্তু বেঁকে বসেন তাঁর বাবা ইকরামুল। তিনি মনে করতেন একবার বলিউডে পা রাখলে নিত্য রেওয়াজ বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দফারফা হবে। তিনি মত দেননি। নৌশাদ নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন। বলেন, একটা নতুন প্রজেক্টে গান গাওয়াতে চান পরভীনকে দিয়ে। বিখ্যাত প্রজেক্ট'টি হল কমল আমরহির ম্যাগনাম ওপাস "পাকিজা"। কে নেই সেই প্রজেক্টে? নৌশাদের সুরে গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, বাণী জয়রাম, মহ রফি, সুমন কল্যাণপুর, শামসাদ বেগমের মত শিল্পীরা। মীনা কুমারী, রাজকুমার অভিনীত সেই ছবিতে একটি গান গাইবার জন্য পরভীন সুলতানাকে বাছেন নৌশাদ। লতার কথা শুনে অবশেষে রাজী হন ইকরামুল। বাবার সাথে বম্বেতে পা রাখেন বছর পনেরোর পরভীন সুলতানা। গেয়েছিলেন সেই গান, কাইফি আজমির কথায় নৌশাদের সুরে মিশ্র খাম্বাজ রাগে "কৌন গলি গয়ো শ্যাম"। লতা নিজে উচ্চকন্ঠে তাঁর গানের প্রশংসা করেন। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি পরভীনকে। 

তবে বলিউডের গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে যাননি তিনি। দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি লম্বা তাঁর কেরিয়ারে হাতেগোনা কিছু প্লে ব্যাক তিনি করেছেন। বেশির ভাগ সময়ই থেকেছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা, অধ্যাবসায় ও অনুষ্ঠান নিয়ে। তা সত্ত্বেও সেলুলয়েডের রঙিন পর্দায় যখনই ভেসে উঠেছে তাঁর গান, মুগ্ধ হয়েছিলেন দর্শকেরা। বহু মানুষ এও বলেছেন, বলিউডে থাকলে নিজস্ব স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারতেন পরভীন সুলতানা। গেয়েছেন একাধিক গানও। মদন মোহনের সুরে "পরওয়ানা" (অমিতাভ বচ্চন এই সিনেমায় ছিলেন ভিলেনের ভূমিকায়) ছবিতে আশা ভোঁসলের সঙ্গে মিশ্র কাফি রাগে বিখ্যাত ডুয়েটে 'পিয়া কী গলি',  "দো বুঁদ পানি" তে লঘু শাস্ত্রীয় ঠুমরী 'পিতল কী মেরি গগরি', কমল আমরহির "রাজিয়া সুলতানা"য় খৈয়ামের সুরে ইমন রাগে বৃন্দগানে 'শুভ ঘরি আয়ি রে' বা উষা খান্নার সুরে "খোঁজ" সিনেমায় সুমন কল্যাণপুর ও তাঁর ডুয়েটে 'রাম করে মোরা সইয়া'র মতন বিখ্যাত সব গান গেয়েছেন তিনি। আমরহি তাঁকে 'সুরো কা রাজিয়া সুলতানা' বলে ডাকতেন। 

১৯৮০ সালে বাংলা ছায়াছবি "কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী" সিনেমায় আরডি বর্মণের সুরে রাগ শঙ্করায় (মতান্তরে মিয়া মলহার) তাঁর গাওয়া 'বেঁধেছি বীণা গান শোনাবো তোমায়' আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পরে একই সুরে লতা মঙ্গেশকর এই গান গেয়েছেন 'এইরি পবন ঢুঙ্গে কিসে তেরা মন', "বেমিসাল" সিনেমায়। কে ভুলতে পেরেছে "গদর-এক প্রেম কথা" য় পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর সাথে মিশ্র খাম্বাজে পরভীন সুলতানার সেই অসাধারণ ডুয়েট গান - "আন মিলো সজনা"! সুরের জাদু ও কন্ঠ মাধুর্যে বলিউডে সত্যিই অলিখিত সুলতানী আমল গড়েছিলেন পরভীন সুলতানা। গড়ে তুলে ছিলেন, কিন্তু ইচ্ছা করেই ধরে রাখেননি। 

*

গত ১০ জুলাই সত্তর'টি বসন্ত পার করে এলেন বেগম পারভিন সুলতানা। এই ৭০ বছরে জীবন বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছে। তাঁর স্বামী ও একদা গুরু উস্তাদ দিলশাদ (বিখ্যাত সরোদিয়া বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভাই অরবিন্দ দাশগুপ্ত) খান কে সর্বদা পেয়েছেন তাঁর পাশে। একসময় এই সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক বেঁধেছিল বঙ্গসমাজ দর্পণে। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করেই এগিয়েছেন তাঁরা সদর্পে। তাঁদের যুগলবন্দীই সেই ভালবাসা ও সম্ভ্রমের বোঝাপড়ার অনবদ্য সাক্ষী। আজও আমাদের দিন শুরু হয় ভৈরবীর বিখ্যাত বন্দিশ 'ভবানী দয়ানী' দিয়ে তাঁকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন পরভীন। তিনি ও 'ভবানী দয়ানী' আজ একে অন্যের পরিপূরক। আজ আর বলিউডে ফিরে যেতে তিনি নারাজ। তাঁর মতে সেটি "একটি সোনার খাঁচা যেখানে সুরের পাখি উড়তে পারেনা।" অজস্র রেকর্ড, অগনিত সম্মান, 'পদ্মশ্রী' 'পদ্মভূষন' বা 'সঙ্গীত নাটক আকাদেমী'-র মত বিরল পুরস্কার পেয়েও আজও তিনি তাঁর রেয়াজ ভোলেননি, ভোলেননি স্বাভাবিক জীবন যাপন। বিরাট একটি আয়নার সামনে তানপুরা হাতে আজও চলে ঘন্টার পর ঘন্টা রেওয়াজ। তাঁর কণ্ঠধ্বনির সুরে উঠে আসে পাতিয়ালা, আগ্রা ও লখনৌ ঘরানার অসামান্য সব সম্পদ। আজও তিনি ভোলেননি সাধারণ শ্রোতাদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ। তালিম দিয়ে গেছেন নিরলস ভাবে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের। 

এখানেই তিনি স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমী, অতুলনীয়। ৭০ বছর পেরিয়ে আজও সমুজ্জ্বল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের 'রাজিয়া সুলতানা', অবিংসবাদী সুর সাধিকা বেগম পারভিন সুলতানা।