আমার শেখা প্রথম রবীন্দ্রসংগীত। সেই প্রথম পরিচয় রবি ঠাকুরের সঙ্গে। তখনও রবীন্দ্রনাথ কে, ভালো করে জানতাম না। বুঝতাম না। বোঝার বয়সও ছিল না। অবশ্য এখনও যে কতটা জেনে বা বুঝে উঠতে পেরেছি, তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
'তিনি' এক মহাসমুদ্র, তারও ঊর্ধ্বে সসাগরা পৃথিবী। যার আদি নেই, নেই অন্ত। শুধু রয়েছে অনন্তের এক রহস্যময় আলোর হাতছানি। একজীবনে বোঝা যা সতত দুঃসাধ্য।
তবু গান'টা ছিল। রয়েই গেছে, আজও। না জেনে না বুঝেই শেখা প্রথম রবি-বন্দনা। হয়তো আমার মতো আরও অনেকের'ই।
আজও এই গান শুনলে নিমেষেই 'ফ্ল্যাশব্যাক' হয়। চোখ বুজে দেখতে পাই নিবারনচন্দ্র নার্সারি স্কুলের সেই একচিলতে মাঠ। কেজি ওয়ান। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার লাইনে। সামনে টেবিলের উপর হারমনিয়াম হাতে হেডস্যার দেবদাস মণ্ডল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কালো ছিপছিপে চেহারা৷ জলদগম্ভীর কণ্ঠে গাইছেন - "গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে..." প্রেয়ারের লাইনে হাত জোড় করে আমরা। না বুঝে, না জেনেই গলা মেলাতাম।
নার্সারির পাঠ চুকে গেছে কবেই। হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে, গানটি রয়ে গেছে ধ্রুবতারার মতো, অবিচল, নিস্পন্দ, অক্ষয়চিহ্ন স্বরূপ।
বহু পরে অবশ্য জেনেছি গানটির অশ্রুত ইতিহাস।
১৮৮১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত মাইসোর বা মহীশূরের মহারাজা দশম চমরাজেন্দ্র ওয়াড়িয়র (১৮৬৪-১৮৯৪) তাঁর রাজ্যের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র এক 'জাতীয় সংগীতে'র কথা ভেবেছিলেন। অতি অল্পবয়সে রাজপাট শাসনের অসামান্য নজির রেখেছিলেন মহারাজ দশম চমরাজেন্দ্র। তিনি স্বয়ং ছিলেন সাহিত্য কলা সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। ছিলেন সুকবি ও কর্ণাটকি বেহালায় সিদ্ধহস্ত। ১৮৯৪ সালে শহর কলকাতায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই রাজা। তাঁকে নিয়ে 'প্রহরে' চমৎকার এক নিবন্ধ লিখেছিলেন অরিত্র সোম।
মনে রাখতে হবে এই গানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যখন, সেই মুহূর্তে ভারতে পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। 'গড সেভ দ্য কিং'ই তখন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় সংগীত। তা সত্ত্বেও নিজ রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার উদ্যোগে পৃথক 'রাজ্য সংগীত' সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন মাইসোর রাজ। তাঁর উৎসাহে তৈরি হয় "কায়ু শ্রী গৌরী, করুণা লহরী, থয়া যক্ষী শঙ্করেশ্বরী"।
কর্ণাটকি রাগ ধীরাশঙ্করভরনমে (বিলাবল) নিবদ্ধ এই মহীশূরী ভজন লিখেছিলেন সভাকবি বাসাপ্পা বা বাসভাপা শাস্ত্রী। সুর দিয়েছিলেন ওয়াড়িয়রের সভাগায়ক ও যন্ত্রীরা যাদের মধ্যে বীণা সুবন্ন, বীণা শেষান্ন, কে বাসুদেবাচার্য ও বীণা পদ্মনাভাইয়ার মতো কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালেরা। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস।
মনে করা হয়, ঋক বৈদিক গান "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং রো মনাংসি জানতাম" ছিল এই গানের মূল প্রেরণা। এই গানের অনুপ্রেরণাতেই রবি ঠাকুর লিখেছিলেন "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ"। সাল ১৮৯২ তে। বদল এসেছিল রাগের চলনেও। "কায়ু শ্রী গৌরী" বাধা হয়েছিল বিলাবলে, "আনন্দলোকে" এবার নিবদ্ধ হল রাগ ঝিঁঝিটে, ঠাট খাম্বাজ। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন মাইসোরের দিওয়ান স্যার এম কণ্ঠরাজ উরসের অধীন প্রথম কাউন্সিলর স্যার অ্যালবিওন ব্যানার্জির আমন্ত্রণে ব্যাঙ্গালোর যান, তাঁর সম্মানে বাজানো হয়েছিল এই 'মাইসোর অ্যান্থেম'।
"আনন্দলোকে" গানটি নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সংসদে। ২৩ জুলাই ২০১৭ সালে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে যৌথ কক্ষের অধিবেশনে সেই দিন শেষবারের মতো এক অসামান্য, আমেগঘন ভাষণ রেখেছিলেন প্রণব বাবু। অনুষ্ঠানের শেষে, যখন সকলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাচ্ছেন, মিলিটারি ব্যাণ্ডে বেজে উঠেছিল "আনন্দলোকে" গানটি। সেই গানের তালে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সংসদ ভবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
এই গানের সঙ্গে আজও, ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে নস্ট্যালজিয়া। জড়িয়ে আছে এমন বহু মুহূর্ত, যা চির অমলিন। কতো জনের গলায় এই গান শুনে আপ্লুত হয়েছি। শ্রীকান্ত আচার্য, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর সেন, বা ক্যালকাটা কয়ার। আরও না জানি কতজনের কণ্ঠে সমৃদ্ধ এই গান। তবু দক্ষিণী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ ড. এম বালামুরলী কৃষ্ণের কণ্ঠে এই রবীন্দ্রসংগীত এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠমাধূর্যে যেন বারবার উঁকি দিয়ে যায় 'মাইসোর অ্যান্থেম' - 'কায়ু শ্রী গৌরী'র ছায়া।
"আনন্দলোকে" আজও আমার কাছে ফেলে আসা একখণ্ড ছেলেবেলা। যার পরতে পরতে লেগে আছে আমার শৈশব, প্রথম রবীন্দ্র সান্নিধ্য আর কতকটা বোঝা না বোঝায় মেশা এক আলোর সন্ধান। যার পথ বেয়ে দীর্ঘকাল হেঁটে এসেও আবারও সূচনায় ফিরে আসা যায়। এই আমার আত্মানুসন্ধান, সত্য চিন্তন ও প্রজ্ঞার অতীন্দ্রিয় পুণ্যশ্লোক। গানের সূত্র ধরে যা যুগে যুগে মিশে রয়েছে -
"শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে..."