Showing posts with label khayal. Show all posts
Showing posts with label khayal. Show all posts

Monday, May 31, 2021

বেগম পারভিন সুলতানাঃ ৭০ বছরে সুরের 'সুলতানী' শাসন


 
আশীর দশক। বম্বের ফিল্মিস্তান স্টুডিও। 

পরিচালক চেতন আনন্দে'র 'কুদরত' সিনেমার মিউজিক রেকর্ডিং'র কাজ চলছে। স্টুডিও-তে উপস্থিত ছবির সঙ্গীত পরিচালক আর ডি বর্মন, গায়ক কিশোর কুমার, গীতিকার-শায়ের মজরুহ সুলতানপুরী ও আরও অনেকে। 

চমৎকার গান লিখেছেন মজরুহ। সিনেমায় ৭টি গানের মধ্যে ৬টি তাঁর লেখা, অন্য একটি গান - "দুখ সুখ কী হর এক মালা' লিখেছিলেন কাতিল শিঁফাই। তবে সিনেমার একটি গান নিয়ে সকলে আশাবাদী৷ 'হমে তুম সে প্যায়ার কিতনা'। রাহুল দেব বর্মণ অসাধারণ সুর দিয়েছেন তাতে। তবে গানটি পুরুষ এবং নারী, দুই কন্ঠেই শোনা যাবে। কিশোর কুমার ইতিমধ্যে স্থান দখল করেছেন। কিন্তু মহিলা কন্ঠটি কার হবে, সে নিয়ে চলছে জল্পনা। 

এমন সময়ে স্টুডিও'য় পা রাখলেন তিনি। বছর তিরিশের এক যুবতী। ঢলঢলে মুখ, লম্বা বেনী, গায়ে অসম সিল্কের শাড়ি, চোখ দুটি অবিশ্বাস্য রকমের সপ্রতিভ। তাঁকে দেখেই হেসে এগিয়ে গেলেন আরডি। নারীকন্ঠে সেই গান'টি গাইবেন তিনি-ই। মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলো কিশোরের। জহুরি ঠিকই জহর চেনে। উচিত লোক'কেই এই গান'টির জন্য বেছেছেন 'আরডি'। সাথে সাথেই শুরু হল রিহার্সাল। গানের সুর'টি শুনিয়ে দিলেন শচীন পুত্র। এক মনে চোখ বুঁজে গানটি শোনে সেই যুবতী। অদ্ভুত তার সুর, আশ্চর্য সুন্দর তার চলন। গান শেষ হতেই অস্ফুট স্বরে বলে ওঠেন তিনি - " মিশ্র ভৈরবী!"    

রাহুলের মুখে হাসি। বললেন, এই গানটি তাকে গাইতে হবে। অস্বস্তিতে পড়েন মহিলা। বলিউডে খুব কমই প্লে ব্যাক করেছেন তিনি। হিন্দুস্তানী ক্লাসিকাল নিয়ে তার কাজ-কারবার। সিনেমার জন্য প্লে ব্যাকে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন তিনি। অভিজ্ঞ সঙ্গীত পরিচালক তা আঁচ করতে পেরে ছিলেন। তার মুখে বরাভয়ের হাসি। জানালেন, গানটি গায়িকা তাঁর নিজস্ব স্টাইলেই গাইবেন, ঠুমরী অঙ্গে৷ এবার মুখে হাসি ফোঁটে তার। আধ ঘন্টার মধ্যে তুলে নিলেন গান। তারপর উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে নিজস্ব আঙ্গিকে গাইলেন গান'টি। রেকর্ডিং শুনে সবাই মন্ত্রমুগ্ধ। এমনই অসাধারণ গেয়েছিলেন তিনি। সুলতানপুরী দু' হাত তুলে জানিয়েছিলেন সাধুবাদ। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন কিশোর কুমার। বলেন, এই গানটি গেয়েছেন তিনিও। কিন্তু অমরত্ব পাবে শাস্ত্রীয় অঙ্গে গাওয়া সেই গানটি'ই। ইতিহাস সৃষ্টি করবে এই গান। 

কিশোর কুমারের ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছিল অক্ষরে অক্ষরে৷ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল 'হমে তুমসে প্যায়ার কিতনা'। পরের বছর সেই অসাধারণ রাগাশ্রয়ী গানটির জন্য প্রথমবার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন মহিলা'টি। একসুরে সকলে জেনেছিল তাঁর নাম। তিনি বিদূষী পরভীন সুলতানা। 

* 

১০ জুলাই ১৯৫০ সালে অসমের নওগাঁও'র পুরানীগুদাম গ্রামে জন্ম পরভীনের। 'ওয়ালিদ' ইকরামুল মাজিদ, 'ওয়ালিদা' মারুফা বেগম। ছোটবেলা থেকেই গানের শখ পরভীনের। ছোট্ট মেয়েকে একদিন বাপের কোলে বসে গুণগুণ করে অদ্ভুত সুন্দর সুরে গান গাইতে শুনে চমকে যান মারুফা। ঠিক করেন মেয়ে'কে গান শেখাতে হবে। ঠিক হয় বাপের কাছেই গান শিখবেন ছোট্ট পরভীন।  

ইকরামুল নিজে ছিলেন সুগায়ক ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় সমঝদার। মেয়ের কিন্নর কন্ঠ শুনে নিজে'ই তাঁঁকে তালিম দেওয়া শুরু করেন। তিনি-ই ছিলেন পারভীন সুলতানার প্রথম গুরু। গুরু হিসেবে অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন ইকরামুল। বংশসূত্রে আফগানী ইকরামুল কড়া নিয়মকানুনে বেঁধে রেখেছিলেন তাঁর মেয়ে'কে। সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে রেওয়াজে বসা, লাগাতার চার-পাঁচ ঘন্টার স্বর সাধনা, পালটা, সরগম ছিল রোজকার বিষয়। একচুল নিয়মের এদিক-ওদিক হলেই জুটতো কড়া শাস্তি। পরভীনের জীবনে তখন পড়াশোনা আর রেওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু ছিল না। ইকরামুল সিনেমার গান বা সংস্কৃতি কোনটাই পছন্দ করতেন না। মেয়েকেও বেঁধে রেখেছিলেন সেই ছকে। শুধু ছাড় ছিল লতা মঙ্গেশকরের গানে। ইকরামুল-মারুফা দুজনেই ছিলেন লতা-ভক্ত। প্রতিদিন নিয়ম করে রেডিওতে তাঁর মেয়েকে শোনাতেন লতার গান। লতা ছাড়া অন্য কোনো গান শোনা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া শোনার ছাড়পত্র ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেকর্ডিং অথবা আসরের গান। বাপের নির্দেশ বিনাবাক্যে মেনে চলতো পরভীন। 

এভাবেই একটু একটু করে বড় হয় সে। এবার তালিম পান তাঁর ঠাকুর্দা মহম্মদ নাজিফ খানের কাছে। পরে আরেকটু বড় হলে অসমের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ বীরেন্দ্র কুমার ফুকন ও হীরেন শর্মার কাছে তালিম পান পরভীন। যার কাছেই তিনি শিখেছেন, পেয়েছেন গুরুর অকুন্ঠ ভালোবাসা ও আশীর্বাদ৷ এই অসামান্য প্রতিভাধর ছাত্রীকে সর্বস্ব উজার করে শেখাতেন তাঁরা। এরপর বাবা ইকরামুলের সাথে পরভীন পাড়ি দেন কলকাতা শহরে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম পান ফৈয়াজ খান ও পণ্ডিত ভাতখণ্ডের অন্যতম প্রিয়-শিষ্য শ্রীকৃষ্ণ নারায়ণ রতনঝনকারের সেরা 'গাণ্ডা বন্ধ শাগীর্দ', শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিরল প্রতিভা আচার্য চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে। পরভীনের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হন চিন্ময়। শুরু হয় মার্গসংগীতের নয়া তালিম। পরভীন সুলতানা জানিয়েছেন, অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন চিন্ময়। ভীষণ পছন্দ করতেন নিয়মানুবর্তিতা। তান তুলতে না পারলে রেগে যেতেন। তাঁর 'পেটেন্ট ডায়লগ' ছিল 'করো না'হয় মরো'। অন্যান্য ছাত্ররা তাকে বাঘের মত ভয় পেলেও পরভীন'কে বিশেষ স্নেহের নজরে দেখতেন 'ত্রিবেনী তীর্থপথে কে গাহিল গানে'র অমর স্রষ্টা।         


এরই মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে করেন তাঁর প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স। ১৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ডিং। অসম সহ গোটা পূর্বাঞ্চল জুড়ে তাঁর নাম। পরিচালক আব্দুল মজিদের "মরম তৃষ্ণা" ছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক করেন পরভীন। সেই সময় পরভীনের একটি অনুষ্ঠান শুনতে আসেন বিখ্যাত সঙ্গীতকার নৌশাদ। বলা বাহুল্য পরভীনের গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। সাথে সাথে দেন বলিউডে প্লে ব্যাকের অফার। কিন্তু বেঁকে বসেন তাঁর বাবা ইকরামুল। তিনি মনে করতেন একবার বলিউডে পা রাখলে নিত্য রেওয়াজ বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দফারফা হবে। তিনি মত দেননি। নৌশাদ নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন। বলেন, একটা নতুন প্রজেক্টে গান গাওয়াতে চান পরভীনকে দিয়ে। বিখ্যাত প্রজেক্ট'টি হল কমল আমরহির ম্যাগনাম ওপাস "পাকিজা"। কে নেই সেই প্রজেক্টে? নৌশাদের সুরে গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, বাণী জয়রাম, মহ রফি, সুমন কল্যাণপুর, শামসাদ বেগমের মত শিল্পীরা। মীনা কুমারী, রাজকুমার অভিনীত সেই ছবিতে একটি গান গাইবার জন্য পরভীন সুলতানাকে বাছেন নৌশাদ। লতার কথা শুনে অবশেষে রাজী হন ইকরামুল। বাবার সাথে বম্বেতে পা রাখেন বছর পনেরোর পরভীন সুলতানা। গেয়েছিলেন সেই গান, কাইফি আজমির কথায় নৌশাদের সুরে মিশ্র খাম্বাজ রাগে "কৌন গলি গয়ো শ্যাম"। লতা নিজে উচ্চকন্ঠে তাঁর গানের প্রশংসা করেন। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি পরভীনকে। 

তবে বলিউডের গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে যাননি তিনি। দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি লম্বা তাঁর কেরিয়ারে হাতেগোনা কিছু প্লে ব্যাক তিনি করেছেন। বেশির ভাগ সময়ই থেকেছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা, অধ্যাবসায় ও অনুষ্ঠান নিয়ে। তা সত্ত্বেও সেলুলয়েডের রঙিন পর্দায় যখনই ভেসে উঠেছে তাঁর গান, মুগ্ধ হয়েছিলেন দর্শকেরা। বহু মানুষ এও বলেছেন, বলিউডে থাকলে নিজস্ব স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারতেন পরভীন সুলতানা। গেয়েছেন একাধিক গানও। মদন মোহনের সুরে "পরওয়ানা" (অমিতাভ বচ্চন এই সিনেমায় ছিলেন ভিলেনের ভূমিকায়) ছবিতে আশা ভোঁসলের সঙ্গে মিশ্র কাফি রাগে বিখ্যাত ডুয়েটে 'পিয়া কী গলি',  "দো বুঁদ পানি" তে লঘু শাস্ত্রীয় ঠুমরী 'পিতল কী মেরি গগরি', কমল আমরহির "রাজিয়া সুলতানা"য় খৈয়ামের সুরে ইমন রাগে বৃন্দগানে 'শুভ ঘরি আয়ি রে' বা উষা খান্নার সুরে "খোঁজ" সিনেমায় সুমন কল্যাণপুর ও তাঁর ডুয়েটে 'রাম করে মোরা সইয়া'র মতন বিখ্যাত সব গান গেয়েছেন তিনি। আমরহি তাঁকে 'সুরো কা রাজিয়া সুলতানা' বলে ডাকতেন। 

১৯৮০ সালে বাংলা ছায়াছবি "কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী" সিনেমায় আরডি বর্মণের সুরে রাগ শঙ্করায় (মতান্তরে মিয়া মলহার) তাঁর গাওয়া 'বেঁধেছি বীণা গান শোনাবো তোমায়' আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পরে একই সুরে লতা মঙ্গেশকর এই গান গেয়েছেন 'এইরি পবন ঢুঙ্গে কিসে তেরা মন', "বেমিসাল" সিনেমায়। কে ভুলতে পেরেছে "গদর-এক প্রেম কথা" য় পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর সাথে মিশ্র খাম্বাজে পরভীন সুলতানার সেই অসাধারণ ডুয়েট গান - "আন মিলো সজনা"! সুরের জাদু ও কন্ঠ মাধুর্যে বলিউডে সত্যিই অলিখিত সুলতানী আমল গড়েছিলেন পরভীন সুলতানা। গড়ে তুলে ছিলেন, কিন্তু ইচ্ছা করেই ধরে রাখেননি। 

*

গত ১০ জুলাই সত্তর'টি বসন্ত পার করে এলেন বেগম পারভিন সুলতানা। এই ৭০ বছরে জীবন বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছে। তাঁর স্বামী ও একদা গুরু উস্তাদ দিলশাদ (বিখ্যাত সরোদিয়া বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভাই অরবিন্দ দাশগুপ্ত) খান কে সর্বদা পেয়েছেন তাঁর পাশে। একসময় এই সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক বেঁধেছিল বঙ্গসমাজ দর্পণে। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করেই এগিয়েছেন তাঁরা সদর্পে। তাঁদের যুগলবন্দীই সেই ভালবাসা ও সম্ভ্রমের বোঝাপড়ার অনবদ্য সাক্ষী। আজও আমাদের দিন শুরু হয় ভৈরবীর বিখ্যাত বন্দিশ 'ভবানী দয়ানী' দিয়ে তাঁকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন পরভীন। তিনি ও 'ভবানী দয়ানী' আজ একে অন্যের পরিপূরক। আজ আর বলিউডে ফিরে যেতে তিনি নারাজ। তাঁর মতে সেটি "একটি সোনার খাঁচা যেখানে সুরের পাখি উড়তে পারেনা।" অজস্র রেকর্ড, অগনিত সম্মান, 'পদ্মশ্রী' 'পদ্মভূষন' বা 'সঙ্গীত নাটক আকাদেমী'-র মত বিরল পুরস্কার পেয়েও আজও তিনি তাঁর রেয়াজ ভোলেননি, ভোলেননি স্বাভাবিক জীবন যাপন। বিরাট একটি আয়নার সামনে তানপুরা হাতে আজও চলে ঘন্টার পর ঘন্টা রেওয়াজ। তাঁর কণ্ঠধ্বনির সুরে উঠে আসে পাতিয়ালা, আগ্রা ও লখনৌ ঘরানার অসামান্য সব সম্পদ। আজও তিনি ভোলেননি সাধারণ শ্রোতাদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ। তালিম দিয়ে গেছেন নিরলস ভাবে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের। 

এখানেই তিনি স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমী, অতুলনীয়। ৭০ বছর পেরিয়ে আজও সমুজ্জ্বল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের 'রাজিয়া সুলতানা', অবিংসবাদী সুর সাধিকা বেগম পারভিন সুলতানা।