Showing posts with label penaaz masani. Show all posts
Showing posts with label penaaz masani. Show all posts

Tuesday, June 1, 2021

পিনাজ মাসানিঃ গজলের এক বিস্মৃত অধ্যায়


সে এক দাউদাউ সময়। প্রতি রবিবার নিয়ম করে দাবানল লাগে। দুরদর্শনে। গীত গজলের অনুষ্ঠানে। সেই আগুনে একটু হলেও পুড়েছি আমি। 

কতই বা বয়স তখন। নয়ের দশক। একটু একটু করে পেরিয়ে আসছি রামানন্দ সাগরের 'রামায়ণ', বি আর চোপড়া-দের 'মহাভারত'...

পা টিপে টিপে উঠে এসেছে 'নুক্কর', 'ওয়াগলে কী দুনিয়া', 'সার্কাস', 'বুনিয়াদ', 'গুল গুলশন গুলফাম', 'করমচাঁদ জাসুস' বা 'মুঙ্গেরীলাল...' এসবের গন্ধ মেখেই একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা। 

সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি 'চিত্রহার' বা 'সুপারহিট মুকাবলা'র চাইতেও তখন বেশি টানছে 'গীত গজল সন্ধ্যা'৷ সেখানে তখন চাঁদের হাট। কে নেই সেখানে? গুলাম আলী, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ, জগজিৎ-চিত্রা, উদিত নারায়ণ, কুমার শানু আর...আর সেই মেয়েটি...পিনাজ মাসানি। 

'লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট' বলে কথা। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই শাড়ি পড়া লম্বা চেহারা, কোঁকড়াচুলো রোগা-পাতলা মেয়েটিকে। মাইক হাতে আদুরে গলায় মিষ্টি হেসে গান গাইছে৷ 

তাঁর চোখ কথা বলে। কথা বলে তাঁর শরীর। যার ঠোঁটে সবসময় লেগে আছে হাসি। চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলছে। ঠিক যেমন খেলত তাঁর কণ্ঠের সুর মাধুর্যে, গজলের অন্তঃস্থলে। 

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, প্রেমে পড়েছিলাম...হ্যাঁ, ঘোরতর প্রেমে পড়েছিলাম আমি। দাউদাউ করে দাবানল জ্বলেছিল কোথাও৷ সেই আগুনের ধোঁয়া দেখা যায় না। শুধু টের পাওয়া যায় উত্তাপ।

এক সময়ে গজল সাম্রাজ্যের 'শাহজাদি' বলা হতো যাকে, তাঁর কথা আজ আর কেই বা মনে রেখেছে? 

*

ষাটের দশকে (আনুমানিক ১৯৬৭) গুজরাটের নভসারি'তে এক পার্সি পরিবারে জন্ম পিনাজ মাসানির। গান ছিল তাঁর রক্তে। বাবা ডলি মাসানি ছিলেন সুগায়ক, শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় সমঝদার। 'আফতাব ই মৌসিকী' উস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের শাগির্দ৷ বাবার কাছেই গানের প্রথম তালিম পেয়েছে পিনাজ৷ পরে উস্তাদ আমানত হুসেইন খানের কাছে পেয়েছেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম। 

অল্প বয়সেই স্টেজ শো শুরু করেন পিনাজ। শুধু গান নয়, লেখাপড়া খেলাধুলাতেও ছিলেন সমান কৃতি। বরাবর ফার্স্ট হয়ে এসেছেন ক্লাসে৷ হয়েছেন ইউনিভার্সিটি টপার। চেয়েছিলেন অধ্যাপনা, কিন্তু বেছে নিয়েছেন গানের জগৎ। মুনশিয়ানা পান লঘু শাস্ত্রীয় সংগীত ও গজলে। এই তাঁর একটু একটু করে বড় হওয়া। একইসাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠাও। 

আটের দশক, যখন গীত গজল সার্কিটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মেহেদী হাসান, গুলাম আলী, জগজিৎ সিং, চিত্রা, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ-রা; ঠিক তখনই হ্যালির ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব পিনাজ মাসানির। কলেজে থাকতে মিউজিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট হওয়া ছিল তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস। এভাবেই একদিন পিনাজ নজরে পড়ে যান বিখ্যাত সুরকার জয়দেব-এর। 


সুরকার জয়দেব-ই তাঁকে গজল চর্চার পথে এগিয়ে দেন। বিশেষ তালিম নিতে পাঠান স্বর্ণযুগের বিখ্যাত গজল গায়িকা মধুরানীর কাছে৷ নাম না জানা এক অখ্যাত পার্সি মেয়ে'কে নিজের শাগির্দ করতে চাননি মধুরানী৷ কিন্তু পিনাজের গায়কী'তে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তালিম দেওয়ার মনস্থ করেন তিনি৷ মধুরানীর কাছে নতুন করে গজলের অ আ ক খ তথা উর্দুও শেখেন পিনাজ। এবার সুরের সাম্রাজ্য বিস্তার অনেকটাই সুবিধে হয়ে যায় তাঁর। 

১৯৮১ সালে চোদ্দ পনের বছর বয়সে তাঁর প্রথম অ্যালবাম - "আপ কি বাজম মে"। আট-দশটি গজলের সমাহার৷ প্রথম রেকর্ডেই বাজিমাৎ। পান তুমুল জনপ্রিয়তা। ৮১'র অন্যতম সেরা আবিষ্কার হয়ে ওঠেন পিনাজ। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাননি পিনাজ। আগামী দশ বছরে বেরিয়েছে তাঁর ডজন খানেক অ্যালবাম যার প্রতিটিই হিট। 

শুধু গজল নয়, হিন্দি ফিল্মে প্লে ব্যাকও করেন তিনি। জয়দেব, ও পি নাইয়ার, বাপি লাহিড়ী, আর ডি বর্মনের মতো প্রথিতযশা সুরকারদের সুরে বহু হিট গান গেয়েছেন পিনাজ। ১৯৮২ তে 'হামারি বহু অলকা' ছবি দিয়ে শুরু তাঁর প্লে ব্যাকের সফর। সে ছবিতে অলকা ইয়াগনিকের সাথে ডুয়েট গান তিনি। গজলের পাশাপাশি ইন্ডি-পপ'ও গান পিনাজ। 'তু দিল দে দে' আজও আমরা ভুলিনি। গালিব, ফৈজ আহমেদ ফৈজ, শাকিল বদাউনি, নিদা ফজলির মতো কিংবদন্তি 'শায়ের'দের রচনাতে সুরও দেন পিনাজ৷ হিন্দি বা উর্দুর পাশাপাশি রাশিয়ান, ফিজি, জাপানিজ, ভিয়েতনামি, ইংরেজি ভাষাতেও গান গেয়েছেন তিনি৷ 

সঙ্গীতের জগতে অবদানের জন্য পেয়েছেন বহু সম্মান। ১৯৯৬ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাকে 'শাহজাদি তরান্নুম' উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০২ সালে 'কলাকার অ্যাওয়ার্ড' ও ২০০৯ সালে সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য পান 'পদ্মশ্রী'। 

* 

আজ দীর্ঘদিন সংগীতের জগতে তিনি 'অনুপস্থিত'। ব্যাঙ্গালোরে অজ্ঞাতবাসে আছেন। সে ভাবে আর পেশাদারি গানের দুনিয়ায় দেখা যায় না পিনাজ-কে। লোকে বলে, তিনি 'নিভৃতচারিনী', একাকিনী। একাধিক পোষ্য নিয়ে থাকেন ও হাতে গোনা কিছু ছাত্রছাত্রীদের গজলের পাঠ পড়ান। নিজের সম্পর্কে গোপনীয়তা রাখতে পছন্দ করেন তিনি। প্রিয়বন্ধু বলতে তালাত আজিজ ও প্রয়াত অভিনেতা টম অল্টার। 

তবুও সঙ্গীত ছেড়ে একেবারে সরে আসেননি এই অসামান্য গায়িকা। আজও গজলের দুনিয়ায় তাঁর নাম 'আদবে'র সাথে নেয়া হয়ে থাকে। আজও তাঁর সেই ট্রেণ্ড সেটিং অ্যাপিয়ারেন্স, সেই মোহময়ী হাসি আর ততোধিক মোহময় গায়কী ভারতীয় গজলের স্বর্ণালী অধ্যায়'কে আচ্ছন্ন, মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। 

তিনি পিনাজ মাসানি। আমার একান্ত নিজস্ব গজল।