Friday, June 4, 2021

'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' ~ এক বিরল ব্যাধি ও গানের গল্প


মেলোফবিয়া। সনোফবিয়া। ফোনোফবিয়া। 

একটি বিরল মানসিক রোগ। নাম অনেক। 'ভয়'টা একটাই। সঙ্গীত, সুর বা সুরেলা শব্দের ভয়। অদ্ভুত এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন ম্যহলার, স্ট্রস, ক্যারেন এন বা স্ত্রকোভিচের মত 'কম্পোজার'রা। 

এই রোগেই আক্রান্ত হয়েছিল গানপাগল ছেলেটি। গিটার ধরতে ভয় পেত সে। ভয় পেত গান গাইতে। অথচ এমনও ছিল না তার জীবন। 

গানপাগল ছেলেটি ভালবাসতো সুর, পায়ের ছন্দে খুঁজে পেত বেঁচে থাকবার আনন্দ। 'স্ট্রিট সিঙ্গার' থেকে 'ডিস্কো ড্যান্সারে'র দুর্লঙ্ঘ পথ অতিক্রম করার সাহস দেখিয়েছিল সে। সাধাসিধে অনিল থেকে হয়ে উঠেছিল 'জিমি'- দ্য ডিস্কো ড্যান্সার। 

কিন্তু প্রত্যেক গল্পেই ভালো লোকেদের পাশাপাশি যেমন কিছু 'মন্দলোক' থাকে, এখানেও যথারীতি ছিল তারা। তারা জিমির ক্ষতি চায়। চায় সে যাতে আর কোনদিন গান না গাইতে পারে। আর সে জন্য চক্রান্ত করে ছেলেটির সাধের 'ইলেক্ট্রিক গিটারে' জড়িয়ে দেয় বিদ্যুতের তার। ছুঁলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু।

স্টেজে পারফর্ম করতে গিয়ে 'ইলেক্ট্রকিউটেড' হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। লেসলি হার্ভে, কেথ রেল্ফ, অগাস্টিন ব্রিওলিনি, বারবারা ওয়েল্ডেন মত শিল্পীরা 'তড়িতাহত' হয়ে মারা যান। 'রক লিজেন্ড' কেথ রিচার্ডস, ব্রিটিশ গিটারিস্ট নিয়াল হোরা, পপ গায়িকা ক্যেশা, এমনকি 'বিটলস'-র বিখ্যাত জর্জ হ্যারিসনের মত শিল্পীরা ইলেক্ট্রকিউটেড হয়ে মরতে মরতে প্রাণে বাঁচেন। 

সেই দলেই নাম লেখাতে পারত জিমি। কিন্তু গিটার ছুঁয়ে ফেলেন তার মা। চোখের সামনে তার মা'কে 'বিদ্যুৎস্পৃষ্ট' হয়ে মরতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। 'মেলোফবিয়া'র শিকার হয় জিমি। যদিও সে ভেঙে পড়েনি। আরেক 'স্ট্রিট সিঙ্গার' রাজু চাচার উৎসাহে সেই গিটারই হাতে তুলে নেয়। যে গিটার কেড়ে ছিল তার মায়ের প্রাণ, সেই গিটার বাজিয়ে সে গেয়েছিল - 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায় তেরা পেয়ার'। 


১৯৮২ সালে মুক্তি পেয়েছিল মিঠুন চক্রবর্তীর ডান্স ড্রামা 'ডিস্কো ড্যান্সার'। ভারতীয় সিনেমা সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা মিউজিক্যাল'টি নির্দেশনা করেন বি সুভাষ। কাহিনি লিখেছিলেন 'মহাভারত' খ্যাত ড. রাহী মাসুম রেজা। গীতিকার ছিলেন সেই সময়কার দুই প্রথমসারির লিরিসিস্ট অঞ্জন এবং ফারুক কাইজার। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী অপরেশ ও বাঁশরী লাহিড়ীর ছেলে অলকেশ, বলিউড ইন্ডাস্ট্রি যাকে চেনে বাপি লাহিড়ীর নামে। 

সাতের দশকের মাঝামাঝি ভারতে ছড়ায় ডিস্কোর উন্মাদনা। ভারতে তখন একটু একটু করে ছড়াচ্ছে 'হিপি' সংস্কৃতি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী আন্দোলনের যে ঢেউ আছড়ে পড়ে ছিল, পরবর্তী কালে তাই রূপ নেয় যাযাবর জীবন এবং আধ্যাত্মিকতার এক অন্য দিগ-দর্শনের অন্বেষণে। উত্তর আধুনিক সমাজচেতনা, গৃহযুদ্ধ, ভিয়েতনাম ওয়ার, আফগানিস্তানে গণ অভ্যুত্থান, ইওম কিপুর যুদ্ধ তথা ইরান-ইরাক সংঘর্ষের নেপথ্যে নতুন করে 'ইউটোপিয়ান' চিন্তাধারা সমৃদ্ধ করেছিল হিপি ও জিপসী জীবনধারাকে। হিপিদের সেই বিশ্ব পর্যটন নতুন সংজ্ঞা পায় ভারতে এসে। গান্ধীবাদী দর্শনের আলোয় প্রতিফলিত হয় আধ্যাত্মিক চেতনাবিকাশ ও বিনির্মানের সংস্কৃতি। উঠে আসে 'মোক্ষলাভে'র নয়া মার্গ, গঞ্জিকাসেবন, নেশান্মক্ততা সহ যৌনতা, গিটার বাজিয়ে উচ্চৈঃস্বরে গান, অদ্ভুত পোশাক, নাচ ও যোগের মাধ্যমে। অনেকে এও মনে করেন ভারতে ডিস্কো সংস্কৃতির পুরোধা হিপি'রাই। সাতের দশকের মধ্যভাগ পেরিয়ে ভারতই সে সময় বিশ্বের হিপি'দের কাছে নয়া তীর্থক্ষেত্র। 

স্বাভাবিকভাবেই বলিউড সেই প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেনি। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ফিরোজ খান পরিচালিত ও অভিনীত 'কুরবানী'তে প্রথম শোনা গেছিল সেই ডিস্কো ট্র‍্যাক 'আপ জ্যায়সা কই মেরে জিন্দেগী মে আয়ে'র মত গান। জন্মসূত্রে ভারতীয় অথচ ব্রিটিশ সুরকার বিড্ডুর সুরে গান গেয়ে মাত করেছিলেন ১৫ বর্ষীয় পাক-তরুনী নাজিয়া হাসান।  
হাসানের গাওয়া 'ডিস্কো দিওয়ানে'ও প্রবল সাড়া ফেলেছিল ভারত ও পাকিস্তানে। আরাবিয়ান ফক এসে মিশেছিল ডিস্কোতে, সৃষ্টি হয়েছিল 'লায়লা ও লায়লা'র মত গানও। এরপর বলিউডে ছেয়ে পড়ে ডিস্কো ঝড়। উঠে আসে সালমা আগার 'ঝুম ঝুম ঝুম বাবা', 'ডিস্কো স্টেশন', ঊষা উত্থুপের 'রাম্বা হো হো' কিম্বা আশা ভোঁসলের কন্ঠে 'প্যার করনে ওয়ালে'র মত একাধিক অবিস্মরণীয় সব ট্র‍্যাক। গানের কথাতেও আসে বিরাট 'পরিবর্তন'। আজও মানুষ সেই সব ব্যতিক্রমী সৃষ্টি ভোলেনি। 

সেই ডিস্কো জোয়ারে নয়া ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে মিঠুন চক্রবর্তীর 'ডিস্কো ড্যান্সার'। 'মেলোফবিয়া' আক্রান্ত এক নাচিয়ের গল্প। গল্প তার সংগ্রামের, ডিস্কোর প্রতি তার উন্মাদনা। গল্পের সাথেই তাল মিলিয়ে উঠে আসে এর গান। আজও সেই কাজ বাপি লাহিড়ীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ রূপে চিহ্নিত। 'কুরবানী'র দু'বছর পর '৮২ সালে মুক্তি পাওয়া 'ডিস্কো ড্যান্সার' ভেঙে দিয়েছিল সব রেকর্ড। এই সিনেমায় শোনা যায় ৮ টি গান। যার মধ্যে বিজয় বেনেডিক্ট'র 'আই এম আ ডিস্কো ড্যান্সার', 'জিমি জিমি আজা আজা' গেয়ে ঝড় তোলা পার্বতী খান, বাপি ও ঊষা উত্থুপের ডুয়েটে 'আউব্বা আউব্বা' বা নন্দু ভিণ্ডের 'কৃষ্ণা ধরতি পে আ যা তু' ছিল ১০০% ডিস্কো ট্র‍্যাক। অধিকাংশ গানগুলিই ছিল পাশ্চাত্য ডিস্কো, রক, সফট মেটাল ও 'সিন্থপপ' অনুপ্রাণিত। সাথে ছিল সুরেশ ওয়াদেকরের কন্ঠে 'গোরো কি না কালো কি' বা কিশোর কুমারের গলায় 'এ ওহ আহ'র মত সফট স্কোর ও 'ফাঙ্ক'ও। তবে সে সব ছাপিয়ে যায় অঞ্জনের কথায় ও বাপি লাহিড়ীর নিজস্ব গায়কীতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' গানটি। সৃষ্টি হয়েছিল এক নয়া ইতিহাস। 


বহু সঙ্গীতজ্ঞের মতে 'ইঁয়াদ আ রহা হ্যায়' ছিল সে সময়কার 'ডিস্কো আন্থেম'। বলিউডে এর আগে এমন হার্ডট্র‍্যাক, হাই-টেম্পোর, ইলেকট্রনিক ডিস্কো আগে কেউ শোনেননি। যার সাথে অদ্ভুত দক্ষতায় ভারতীয় রাগ সঙ্গীতকে মিশিয়ে ছিলেন লাহিড়ী। হার্ডকোর ডিস্কোর সঙ্গে গানের স্থায়ী ও অন্তরায় ঝিঁঝোটি'র হালকা টাচ-আপ এক অনন্যসাধারণ উচ্চতা দিয়েছিল গানটিকে। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন নিজে ছিলেন এই গানের মুগ্ধ প্রশংসক। কি অসাধারণ সেই কালজয়ী কম্পোজিশন। স্কুল জীবনের অবিস্মরণীয় মুগ্ধতা আজও অক্ষুন্ন। 

প্রায় চল্লিশ বছর ছুঁয়ে ফেলা, আজও ডিস্কো ঘরানার এক পথিকৃৎ হয়ে আছে বাপি লাহিড়ির গাওয়া এই গানটি। তার সুর, ছন্দের মাদকতা ও সর্বোপরি মিঠুন চক্রবর্তীর পারফরম্যান্স গানটিকে করে তুলে ছিল সর্বকালের সেরা 'ডিস্কো নাম্বার'। ইলেক্ট্রিক গিটার হাতে, হাত কাটা সাদা ঝকমকে টাইট পোশাকে মিঠুনের লিপে সেই গান, গায়ের চাদর ছুঁড়ে দেয়া ও গিটার আঁকড়ে নিজের ভয় ও বাঁধা পেরিয়ে সুরেলা তীর্থে ঐকান্তিক সমর্পণ এই গানটিকেই শুধু নয়, গোটা প্রজেক্ট'টিকে বেঁধে দিয়েছে অপার্থিব, প্রাণবন্ত এক অনন্য সুরেলা নস্ট্যালজিয়ায়...

সেই নস্ট্যালজিয়া যা আজও আমরা বহন করে চলেছি 'ডিস্কো'র উন্মাদনা ও অনাবিল মূর্চ্ছনায় ঝংকৃত অবিনাশী আলোর উদ্ভাসে। 


* গ্রাফিক্সঃ সোহম সেন, দ্য প্রিন্ট 

Thursday, June 3, 2021

ইশরাত-এ-কাতরাঃ একটি ভুলে যাওয়া গজল


অবিশ্বাস্য মুহূর্ত এক। খুব সম্ভবত ছয়ের দশকের প্রথম ভাগ। দক্ষিণ ভারতের লবনাক্ত বাতাসে ভাগ বসিয়েছে বসন্তকালীন হাওয়া।

মাদ্রাজের (অধুনা চেন্নাই) কিলপকে ২০ গুরুস্বামী মুদলিয়র রোডে 'কল্কি গার্ডেনে'র বাড়িতে মুখোমুখি বসে দুই নারী। সেই সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও লঘু সংগীত জগতে অবিংসবাদি যাদের আধিপত্য। না জানি সে কোন পুণ্যতিথি'তে তাঁরা প্রথম ও শেষবার মুখোমুখি বসেছেন, কালের অভূতপূর্ব, মহার্ঘ্য চক্রান্তে।

তাঁরা কোন সামান্য মানুষ নন। পরম করুণাময় ঈশ্বরের অধিষ্ঠান তাঁদের কণ্ঠে। সমসাময়িক হয়েও তবু তাঁরা দুই ভিনগ্রহের বাসিন্দা। একজনের চারণ ভূমি গজল, লঘু শাস্ত্রীয়, ঠুমরী, রাগাশ্রয়ী গান। অন্য জন আদি-অকৃত্রিম দক্ষিণ ভারতীয় মার্গ সংগীতের 'সুরলক্ষ্মী'র মহাসাধিকা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মহাজাগতিক মেলবন্ধন।

ভারিক্কি চেহারা, গলায় সোনার হার, জারদৌসির আড়ালে সপ্রতিভ চাহুনির মহিলাটির হাতে তানপুরা খেলা করে। তিনি বলেন, "আও বহেন, গাও মেরে সাথ!" অন্যদিকে একটু যেন জড়োসড়ো দ্বিতীয় জন। নীল রঙা কাঞ্জিভরমের আঁচল টেনে বললেন, "আমি কী পারব? এমন গান তো কখনো আগে গাইনি!" 

হেসে ওঠেন সেই সুন্দরী। তামাম হিন্দুস্তান যাকে 'মল্লিকা ই গজল' নামে চেনে। তিনি বলে ওঠেন - "পারবে বোন, শুধু তুমিই পারবে। কতদিনের শখ ছিল তোমায় নিজের হাতে এই গান শেখাব। আল্লা রহমত, আজ সেই সুযোগ এসেছে। তুমি তোমার মত করে গাও। তাহলেই হবে।" 

এবার যেন একটু ভরসা পেলেন শান্ত চোখের সেই নারী৷ একটু আগেই আখতারি বাঈ-র অনুরোধে তাঁকে শুনিয়েছেন মীরার ভজন 'মোহে চাকর রাখো জি'। সেই ভজন শুনে চোখের জলে ভেসে ছিলেন বেগম সাহিবা৷ জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর থেকে বছর দুয়েকের ছোট 'কুঞ্জাম্মা'কে। আর সময় নষ্ট না করে না জানি কী তাড়নায় দ্রুত হাতে তুলে নিয়েছিলেন তানপুরা৷ দিয়ে যেতে চেয়েছেন তাঁর 'রত্নখনি' থেকে সামান্য কিছু উপহার। 

সুব্বুলক্ষ্মীর কাছে অনেক আগেই আসতে চেয়েছেন আখতারি বাঈ। একসাথে কাটাতে চেয়েছেন সময়৷ করতে চেয়েছেন নিবিড় চর্চা সংগীতের অতীন্দ্রিয় জগৎ নিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা এসেছে৷ বাতিল হয়েছে মাদ্রাজ সফর।

এই তো সেবার, আখতারি বাঈয়ের মাদ্রাজ আসা প্রায় নিশ্চিত। হঠাৎ শুনলেন সুব্বুলক্ষ্মীর বাড়িতে হাজির হয়েছেন সিদ্ধেশ্বরী দেবী৷ সরস্বতীর আরেক অবতার। ছ মাস 'কল্কি গার্ডেনে' ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী৷ সে ছ'মাসে সুব্বুলক্ষ্মী পেয়েছিলেন বিশেষ তালিম। নিজের ভাণ্ডার উপুড় করে দিয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী। দু'হাতে শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে তা কুড়িয়েছেন সুব্বুলক্ষ্মী।

অবশেষে এসেছে বহু প্রতিক্ষিত সময়'টি। মুখোমুখি বসেছেন দুই বিরল ব্যক্তিত্ব। বেগম আখতার ও এম এস সুব্বুলক্ষ্মী। আখতারি তাঁকে গজলের নজরানা দিতে চান৷ এমনি সেমনি 'নজম' তা নয়। খোদ মির্জা  আসাদৌলা বেগ গালিবের 'দিবান'। 

"ইশরাত-এ-কাতরা হ্যায় দরিয়া মে ফনা হো জানা
দর্দ কা হদ সে গুজারনা হ্যায় দবা হো জানা..." 

পিলু রাগের (দক্ষিণে কাপি রাগম) সেই অসাধারণ গজল আত্মস্থ করেছিলেন সুব্বুলক্ষ্মী। যেন যমুনার জল এসে মিশে গেল ভারত মহাসাগরে। সৃষ্টি হল এক অভূতপূর্ব সুরেলা জলোচ্ছ্বাস৷ বড়ে গোলাম আলী খানের ভাই বরকত আলী খানও গেয়েছেন এই গজল। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠে গালিবের যেন পুনর্জন্ম হয়েছিল সেদিন৷ 

এতদিন যে কণ্ঠে পরম শ্রদ্ধায় 'ভজ গোবিন্দম' বা 'শ্রী ভেঙ্কটেশ সুপ্রভাতম' ধ্বনিত হয়েছে, সেই কণ্ঠেই কী পরম আকুতিতে ধ্বনিত হল - 'আল্লাহ'! যেন এক আলোকিত ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য এক আলোকিত ঘরে মিশে গেল সুরকল্প। ছোট ছোট মুরকি, গমক ও মীরখণ্ড তাকে দিল এক অকল্পনীয় উচ্চতা যাকে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। রূপকথা বুঝি এভাবেই সৃষ্টি হয়৷ 

আজ বেগম আখতার বা এম এস সুব্বুলক্ষ্মী কেউই ধরাধামে নেই৷ শুধু রয়ে গেছে সে গজলটি। অসংখ্য অজানা, অশ্রুত কিংবদন্তির সাক্ষী হয়ে। ভারতীয় সংগীতের দুই কিংবদন্তি মহাসাধিকার মহাসাধনার যৌথ স্বাক্ষর স্বরূপ। 


'তবু প্রাণ নিত্যধারা' ~ এক অলীক কথোপকথন ২


রাত্রি গভীর হলে এ শহরে বিষাদ নেমে আসে। 

তোমরা তাকে চিনতে পারো না। তোমরা জানো না তাকে। একা একা পথ হাঁটে সে এ গলি-সে গলি। মাথা ঢাকা টুপি তার। গায়ে আলখাল্লা। হাতে বুঝি লাঠি থাকে। মৃদু ঠকঠক। 

রাত্রি গভীর হলে শহরে নামে বিষাদ প্রহরী। নিজস্ব কোনও নাম নেই তার। যে নামেই ডাকো, সে সাড়া দেবে না। শুধু অন্ধকার ছেঁনে হাওয়ায় ভেসে দাঁড়ায় কোনও বন্ধ দরজায়৷ অদৃশ্য নখর দিয়ে চিহ্ন আঁকে। যেন পুরনো জোব্বা থেকে এক চিমটে বিষাদ, লেপে দেয় ঘরে৷ তারপর এগিয়ে যায় অন্য দরজার দিকে৷

'নিশিদিন চাহো রে তাঁর পানে
বিকশিবে প্রাণ তাঁর গুণগানে...'

ধরা যাক, বিষাদের নাম 'যোগিয়া'। 'ভৈরবপুরে' তার বাড়ি৷ তার হাতে ধরা যে লাঠি, রাস্তায় মৃদু ঠকঠকে ছিটকে পড়ে কোমল রেখাব, কোমল ধৈবত নামের দুই জিন। আর থাকে এক অদৃশ্য এক মায়া, গান্ধার যার নাম। মধ্যম, বিষাদের কাঁধে বসা নীলরঙা পাখি তাকে আলতো ঠেলে দেয়। অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে৷

রাত্রি ঘন হলে বিষাদ প্রহরী গুনগুনিয়ে ওঠে। যেন পুরনো জানলার কাঁচে কাঁপন ধরায় কোনো অতন্দ্র রেলগাড়ি। বা পরিত্যক্ত গির্জার পাশে বসে থাকা উন্মাদ পাদরির প্রলাপ। আমি শুনতে পাই সেই সুর।

'তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে...'

প্রহরী জানে বিষাদের তল কোথায়। সে জানে কোন রঙে রাঙানো মন-খারাপ। তাই বারবার ফিরে আসে সুর। ঘুমন্ত শহরের অলিগলিতে প্রতিধ্বনিত হয় তার মূর্চ্ছনা। 

'বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল,   
কে আর রহিল এ বনে...' 

এ বনে সত্যি আজ আর কেউ নেই। জনমানবশূন্য। একাকি রয়ে গেছে প্রহরী৷ তার কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ ভোর হয়ে আসার আগে শেষ পরিক্রমণ। দেখে নেওয়া মেপে মেপে, বিষাদ কিছু কম পড়লো কিনা! সে জানে তাড়াতাড়ি সাঙ্গ হবে কাজ। একটু পরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে সকাল। তার সাথে ফিরবে বুলেটের আওয়াজ, চাপ চাপ রক্ত, রাজনৈতিক হিংসার ভোর...

তার আগে শেষবার, শহরের পথেপথে রাত্রি গভীর হলে তার মৌরসীপাট্টা। অন্ধকার অন্ধ নয়। তারও নিজস্ব আছে চোখ, দেখার৷ অথচ তোমরা দেখতে পাও না৷ তোমরা আজও অন্ধ হয়েই আছে৷ বিষাদ তোমাদের অন্ধত্ব জানে৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে তোমার চোখের পাতা ছুঁইয়ে দেয়৷ তলিয়ে যাওয়ার আগে সে টুপি নামায়, মাথা ঝুঁকিয়ে করে সালাম। তারপর পায়ে-পায়ে হেঁটে যায় দিকচক্রবালে। 

রাত্রি গভীর হলে এ শহরের প্রতিটি দরজায় জেগে থাকে তার নখের দাগ। জন্মদাগের মত জেগে থাকা সেই আঁচড়ের নাম - 'যোগিয়া'। তার ক্ষয় নেই। 

'নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   
নাহি নাহি দৈন্যলেশ -
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে...'

* Picture. Varanasi by Donell Gumiran 

দিবান-এ-জাফরঃ এক অলীক কথোপকথন ১


"গম-এ-ইশক তো অপনা রফিক রহা
কোই ঔর বলা সে রহা না রহা..."

সুবহ হয়ে এল। আমাকে লিখতে দাও এবার। এই খাগের কলম, অস্থিমজ্জা গলিয়ে লিখেছি যে নজম, তাকে ভুলো না প্রিয় শহর। কামানের গোলায় ধ্বংস যে ঈদগাহ, দু'দণ্ড সেখানে বিছাই জায়নামাজ। ঈশা ভর করে ওষ্ঠে আমার। আয়াত নয়, নজম মিশেছে ইবাদতে৷ আমায় লিখতে দাও, পর্বরদিগার!

"দিয়া অপনি খুদ-হি কো জো হমনে উঠা
উহ জো পর্দা সা বিচ মে থা, না রহা..."

আমার সফরনামা 'গরীব-নওয়াজ' জানেন। যা কিছু অন্তরাল, যুমনার মিঠি হাওয়ায় ভেসে যাক। এখনও বাতাসে বারুদের ম্যহেক, ছিন্নভিন্ন খিলান। স্তব্ধতার ভাষা আমি লিখেছি 'দিবান' জুড়ে। শেষবারের মতো আমার জানাজায় হতে দিও সামিল। শেষবার, খুদা ই রহমত, আমায় লিখতে দাও! 

"পড়ি অপনি বুরাইয়ো পর জো নজর
তো নিগাহ মে কোই বুরা না রহা..." 

ভিরানায় একলা দাঁড়িয়ে তুমি কে? কে তুমি বলো হে ছায়াময়, পয়গম্বর আমার? নিঃস্ব, কপর্দকশূণ্য এই তাজ-ও-তখৎ  আমি কাকে দিয়ে যাব? কেউ নেই, শুধু এক বিষাদবৃক্ষ ছাড়া। আমার সলতনৎ তোমার র‍্যহম-ও-করমে ভেসে উঠুক। ভেসে যাক এই গজল, গ্রহে গ্রহান্তরে। এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই এতিমের। 

ঘুমিয়ে পড়ার আগে, আউলিয়া, শেষবার আমায় লিখতে দাও...

Wednesday, June 2, 2021

"যদি থাকি কাছাকাছি দেখিতে না পাও" ~ স্মরণে বিক্রম সিং খাঙ্গুরা


ফেরার কথা ছিল যাদের, ফেরেনি তাঁরা৷ কথা ছিল সন্ধ্যে নামার আগে জ্বলবে প্রদীপ তুলসি তলায়। তা জ্বলেনি আজও। অন্ধকার, দরজায় কড়া নাড়ে।

বহুদূর কোনো শহরতলি, মফস্বলি রাস্তায় পাক খায় ওয়াগন ভাঙার শব্দ। একলা পথের বাঁকে সে কোন অজানা সুরে কেঁদে ওঠে এস্রাজ, পিলু-বাঁরোয়ায়...

সেই পথে তুমি হাঁটোনি কোনোদিন। সে পথের ধূলো মাটিতে মিশে থাকে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা। কী হবে ঘরে ফিরে এতো তাড়াতাড়ি, ভেবে সেই রাস্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যারা ঘাঁই মেরেছিল...আজও তারা ঘরে ফেরেনি৷ কুয়াশার মতো লকডাউন নামে শহরে। 

কী হবে তাঁদের কথা ভেবে? কী-ই বা হবে যদি দেখা না মেলে এই দুঃখরাতে? এস্রাজে জমে থাকা অতৃপ্ত শীতকাল...ধুলো ঝেড়ে ফেলে রজন ঘষে নিই ছড়ে।

এ পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে যারা, তাঁদের পায়ের ছাপ আজও বৃষ্টি মুছে দিতে পারেনি। আর তুমি আবারও সেই জলছাপ ধরে হেঁটে গেছ উধাও, দিকচক্রবালে। 

ফেরার কথা ছিল যাদের, ঘরে ফেরেনি তাঁরা। আজ রাতে আমায় তাঁদের গল্প বলো...

এই বুড়ো পুরনো গিটারঃ না-বলা কিছু কথা


যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি। 
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই আজ। সত্যিই করি। 

আমি গিটার বাজাতে পারি না। অথচ সেতার বা সরোদ শেখার বহু আগে গিটার চিনেছিলাম। মনে মনে ফেলেছিলাম, ভালোবেসে। দু'একবার যে চেষ্টা করিনি, এমন নয়৷ কিন্ত ওই, শেষমেশ হয়ে ওঠেনি। 

গিটারে প্রথম হাতেখড়ি শিবুদার। মফস্বলি পাড়ার 'রেবেল', 'হাইপার ইন্টেলেকচুয়াল', কোঁকড়াচুলো, কানে দুল, গলায় অদ্ভুত সব মালা, হাতে 'জয়েন্ট'। শিবুদার ঘরের দেওয়ালে জিমি হেন্ড্রিক্স, বব মার্লে, ম্যাডোনার ছবি ছাড়াও বিস্তর আঁকিবুঁকি, গ্রাফিত্তি। 

শিবুদা গিটার অন্তপ্রাণ। তাঁর ঘরভর্তি ক্যাসেট, কী নেই সেখানে...'মাইলস', 'এলআরবি', 'ভূমি', 'মহীন', 'ক্যাকটাস', 'চন্দ্রবিন্দু', 'ফসিলস' আর অপ্রতিরোধ্য সুমন-অঞ্জন-নচিকেতার ত্রয়ী সঙ্গম। তারও আগে 'বিটলস', 'রোলিং স্টোন', এরিক ক্ল্যাপটন, ডিলান, বায়েজ, প্রিস্টলে...ছিল বব মার্লে, সান্তানা, জনসন, কোবেন, লেনন, ম্যাকললিন। আজও 'ঈগলসে'র 'হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া'র সেই পৌঁনে দু মিনিটের 'প্রিলিউড' ভুলতে পারিনি। 

শিবুদা বলতো - "গিটার শেখ!" মাঝেমাঝে জোর করে বসাতো তাঁর অ্যাকুইস্টিক নিয়ে। চিনিয়ে দিত কর্ড, প্লেকট্রাম ধরতে শেখা, স্ট্যাকাটো, বসা নোভা আরও কত কী...সেই প্রথম জানতে পারি অষ্টম শতাব্দীতে গ্রীস ও এশিয়া মাইনরে 'কিথারা' বা দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের 'গিথারা'র কথা। এরাই গিটারের বাপ-ঠাকুর্দা, আদিরূপ। 

আয়োজন কম ছিল না। অথচ জানি না কেন শিখে উঠতে পারিনি। এর পর নিঃশব্দে গিটারের জায়গা দখল করে নিয়েছে সেতার, পরে সরোদও। শুরু হয় অন্যধারার পঠনপাঠন। শাস্ত্রীয় সংগীতের কড়াক্কড় বাঁধনে৷ কিন্তু গিটার হারিয়ে যায়নি। অলিখিত রয়ে গিয়েছিল কোথাও। 

তারপর দেখি, হঠাৎ একদিন আমার পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছেন ব্রিজভূষণ কাবরা, কমলাশঙ্কর, বিশ্বমোহন ভাট, পলি ভার্গিস, দেবাশিষ ভট্টাচার্য'রা। ক্লাসিকাল গিটারের সাম্রাজ্য দখল করছে ক্লাসিকাল স্লাইড গিটার। পাশাপাশি উঠে আসছেন গোরক্ষ শর্মা, চিন্টু সিং, রমেশ আইয়ার বা ভুপেন্দ্র। সে এক অবাক পৃথিবী। 

কলেজ-ইউনিভার্সিটির 'ফেস্টে' মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াত গিটারের তরুণ তুর্কিরা। 'হার্ড রক', 'ডেথ মেটালে'র মৌরসীপাট্টা। ইলেকট্রিক গিটারে কর্কশতা ছাপিয়ে অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার 'কনানড্রাম'। আমি অবাক চোখে দেখতাম সেই মাদকতা, 'ইউটোপিয়ান টেরিটোরি'র হাতছানি। হিংসা, দুঃখ, ভালোলাগা সব মিলিয়ে সে এক অনির্বচনীয় 'সাইকডেলিক ট্রান্স'...

মাথার মধ্যে অন্ধকার এক স্টেজে কে যেন সশব্দে আছাড় মেরে ভাঙতো গিটার। ছিঁড়ে ফেলতো তার, আগুন ধরিয়ে দিত ভাঙা কাঠের শরীরে। 

একসময় ঝড় থামে। স্তব্ধতা মেখে রাত্রি নামে বোবা পৃথিবীর বুকে৷ আমি জেগে থাকি। আমার সঙ্গে রাত জাগেন অঞ্জন দত্ত। 'পুরনো গিটারে'। তিনি গাইছেন -

"ফেলে আসা কত মুখ, কত নাম ঠিকানা 
বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে
নানা কথা, নানা সুরে গান নিয়ে ঘুরে ঘুরে 
সুমনের কাছে এনে দিয়েছে
এই বুড়ো পুরনো গিটার..." 

আর সুমন! তিনি আদ্যোপান্ত মজে 'বিভূতিভূষণে'। 

"তখন বিকেল দেয় সন্ধের আল ধরে হানা
গোধুলি আঙুল রাখে আলগোছে পথের ধুলিতে..."

আমি দেখি, মানুষ নয়, দুটো গিটার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আদি অনন্তের কথোপকথন উঠে আসছে চরাচর জুড়ে। সত্যি সত্যিই, দিনের যাবতীয় আওয়াজ, কোলাহল ঝিঁঝিঁর কোরাসে মিশে যায়। 

গান নয়, কথা নয়, দুটো গিটার একে অন্যের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের তীব্র সূচক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আলতো স্পর্শ রেখে যেতে যেতে মিলিয়ে যায় শূন্যে। 

যারা গিটার বাজায়, আমি তাঁদের হিংসে করি খুব। 
আজও। এখনও। চিরকাল-ই।


"ইয়াবাহার', কী বাহার!" ~ ভূমধ্য সাগরের এস্রাজ

মহাকাশ। অনন্ত শূন্য। গ্রহপুঞ্জের সমষ্টি। ছায়াপথে মিশে থাকা নক্ষত্ররাজি। তারও ঊর্ধ্বে, অপার শূন্য ও স্তব্ধতার স্তব। শব্দ নেই, প্রাণ নেই, নেই স্পন্দন। অথচ তারও কী কোনও নিজস্ব সুর থাকে? 

মাটি। মাটির গভীরে মাটি। তারও গভীরে ক্লেদজল, শিকড়, খনিজ স্তর, সালফার, উত্তাপ। আর তারও গভীরে নেমে গেলে অন্ধকার। যেন সেই 'ইনফার্নো', 'পুর্গাতরি' ও 'পারাদিসো'র মধ্যবর্তী শূন্যতায় মিশে থাকা রিরংসার ধ্বনি আলেখ্য৷ 

অথবা সসাগরা পৃথিবী। অবিরত ভেঙে পড়া ঢেউ, বালিয়াড়ি, সরীসৃপ আর শৈবালের মধ্যে খুঁজে দেখা ফাঁপা শঙ্খ। যার গায়ে কান পাতলে সমুদ্রের মূর্চ্ছনা শোনা যায়৷ 

যেন কোনও দাবানল শেষ হওয়ার পর পুড়ে কালো, চিড়ে দু'ফাঁক যাওয়া কাঠের মধ্যে দিয়ে এক চিলতে হাওয়া খেলা করে ভস্মাধারে। লেলিহান অগ্নিশিখার ধ্বনিকল্পের সুরে সুরে। 

ক্ষিতি,অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। এই সেই অনাদি পঞ্চরহস্য। 

পঞ্চভূত, পঞ্চতত্ত্ব  বা পঞ্চ আঙ্গিকের সমাহারে গড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এই পঞ্চতত্ত্বেই সৃষ্টি ও লয়ের বিন্যাস। পৃথিবী জলে, জল সূর্যে, সূর্য বায়ুতে তথা বায়ু অনন্ত আকাশে লীন হয়। আর এর ঊর্ধ্বে? এর ঊর্ধ্বে কী?


তুরস্কে ভূমধ্যসাগরের তীরে, এক পরিত্যক্ত লাইট হাউসের মধ্যে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এই কথা ভাবছিল বছর পঁচিশের এক যুবক। 

গোর্কেম সেন, জন্ম ১৯৮২, ইস্তানবুল। ছোটবেলায় প্রকৃতিই ছিল তাঁর একমাত্র বন্ধু। প্রকৃতিকে নিজস্ব ছন্দে অনুভব করতো সংগীতের সুরে। যন্ত্রসংগীতে সিদ্ধহস্ত গোর্কেম চিনেছিল, তাঁর অনন্ত আশ্রয়, সুর ও ধ্বনিকল্পের জগৎ'কে।

একাকীত্ব পছন্দ করতো গোর্কেম। অবসরে বেরিয়ে পড়তো পাহাড়ে, জঙ্গলে, সমুদ্রে। সঙ্গী বলতে শুধুই 'নেহ' (তুর্কিদেশীয় বাঁশী), 'বালমা' (তুর্কিশ স্ট্রিং) বা 'খামাঞ্চে'। এই প্রাচীন যন্ত্রেই সে পেয়েছিল প্রকৃতির ছোঁয়া। কিন্তু তাতেও আসেনি সন্তুষ্টি। 

গোর্কেম মনে করতো, পঞ্চতত্ত্বের আধার বা তারও ঊর্ধ্বে থাকা অন্য কোনও তত্ত্ব (ষষ্ঠ তত্ত্ব বা সিক্সথ এলিমেন্ট) কে কী ভাবে স্পর্শ করা যায়! দার্শনিক ব্যাখায় তা সম্ভব হলেও, বাস্তবিক অর্থে তা আদৌ সম্ভব কী? হয়তো নতুন কোনও শব্দকল্পদ্রুম তার চিরকাঙ্ক্ষিত সেই খোঁজ'কে সম্পূর্ণতা দিতে পারে৷ 

গোর্কেম বিশ্বাস করেছিলেন, সাঙ্গীতিক প্রয়োগ বা ধ্বনিতত্ত্বের সূত্রে সেই 'সিক্সথ এলিমেন্ট'কে স্পর্শ করা সম্ভব। তার জন্য দরকার নতুন চিন্তা-ভাবনা, নতুন সৃষ্টি, নতুন শব্দব্রহ্ম গঠন। 

সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গোর্কেম। সুদীর্ঘ আট বছরের পরিশ্রম ও অগনিত ব্যর্থতার পর তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেই অদ্ভুত সুন্দর যন্ত্র। ইয়াবাহার। 

২০০৯ সালে তৈরি হল এক সম্পূর্ণ অন্য ধারার যন্ত্র। অবৈদ্যুতিন, কাঠ ও মেটালনির্মিত, চেলোর মত ছড় টানা, দুটি 'থাণ্ডার ড্রামে' তারের শব্দে প্রতিধ্বনি ও অস্ট্রেলিয়ার 'অ্যাবরিজিনাল'-দের বাঁশীর আদলে অতিকায় কাঠামো। এই বহুমাত্রিক সম্মেলনে উঠে এল 'ইয়াবাহারে'র বাস্তবিক রূপ। আর শব্দ? 

গোর্কেম নিজেই বলেন, প্রথম প্রথম এর শব্দ ছিল কর্কশ৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন সূক্ষ্ম 'এক্সপেরিমেন্টে'র ফলে যে শব্দটি পাওয়া গেল, তা আক্ষরিক অর্থেই 'মহাজাগতিক'। সে শব্দ এক পরাবাস্তব, অতীন্দ্রিয় মূর্চ্ছনার প্রকাশ। অন্য পৃথিবীর সুর। যা পঞ্চতত্ত্বের সম্মিলনে ষষ্ঠ তত্ত্বের আভাস। এককথায় অভূতপূর্ব  সাঙ্গীতিক 'স্পেস ওডিসি' যাকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। 

তুর্কিতে 'ইয়া' শব্দের অর্থ তার, 'বাহার' বসন্ত। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ও রাগবিন্যাসে (মাকাম) গোর্কেম সত্যি সত্যিই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন পঞ্চতত্ত্বের নেপথ্যে থাকা আরেক জগৎ'কে। সে জগৎ'কে তিনি তাঁরই সৃষ্টির হাত ধরে দিলেন বসন্তের ছোঁয়া। ২০১১ সালে গোর্কেমের 'ইয়াবাহার'-কে শতাব্দীর অন্যতম সেরা আবিষ্কারের তকমা দিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা। 

আজও গ্রীসে ও তুরস্কের সমুদ্রের ধারে গ্রামে বসে নিত্যনতুন যন্ত্র বানিয়ে চলেছেন গোর্কেম। ইয়াবাহার পেয়েছে তার দোসর - শানবাহার ও দার্ববাহার। তাঁর সৃজনশীলতা অনন্য দর্শনের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।

পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চভূত যে সৃষ্টির আধার, তার মাধ্যমে এক সম্পূর্ণ অন্যধারার তত্ত্ব এবং জগতের পরিচয় করিয়েছেন তুরস্কের এই অজানা সঙ্গীতজ্ঞ। গোর্কেম ও তাঁর 'ইয়াবাহার' এক অনন্য সুরলোকের সন্ধান দিয়েছেন, নিঃশব্দে। নিজের কথায়, যদি তিনটি শব্দে তাঁর সৃষ্টির ব্যাখা করা যায়, তবে তা হল - 

'ইনার - স্পেস - শিপ' 

সুরমূর্চ্ছনার 'অলৌকিক' মহাকাশ সফর অক্ষয় হোক। 
www.gorkemsen.com