Wednesday, June 2, 2021

'খুশ আমদিদ, টেগোর সাব!' পাকিস্তানে রবীন্দ্র জয়ন্তী


২৫ শে বৈশাখ অতিক্রান্ত। পায়ে পায়ে আমরা পেরিয়ে এসেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী।

অতিমারীর প্রকোপে যখন পর্যুদস্ত ভারত সহ গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে অনাড়ম্বর হলেও রাবীন্দ্রিক উৎসব, চর্চার মেজাজে মেতেছিল দুই বাংলা। 

রবি ঠাকুরের অখণ্ড বিশ্বজনীনতা শুধু দুই বাংলা বা বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যাপ্তি অপার, অভাবনীয়। বিশ্বের কমবেশি প্রায় সব দেশেই দিনটি পালিত হয়ে এসেছে৷ কোভিড আবহে সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনায় এসেছে ভাটা; তবুও বিশ্বকবির আত্মিক আরাধনায় পিছিয়ে ছিলেন না রবিভক্তরা। তা সে ভারত, বাংলাদেশ হোক বা পাকিস্তান৷ 

হ্যাঁ পাকিস্তানও৷ শুনতে আশ্চর্য লাগলেও তা সত্যি৷ খুব কম লোক জানেন, পাকিস্তানের একটি প্রাচীন সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও, ছোট আকারে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। অবশ্য তা কিন্তু অন্যান্য দেশের মতো ইংরেজি ক্যালেন্ডার মেনে। ১২৬৮ সন ২৫ বৈশাখের মাহাত্ম্য বোধকরি শুধু এপার-ওপার বাংলার মানুষ'ই কেবল বোঝে।

১৮৬৪ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রাচীন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র তিন বছর ৷ কলেজ-টির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ড. চার্লস উইলিয়াম ফর্ম্যান (১৮২১-১৮৯৪)। ১৮৪৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের দশ বছর আগে অবিভক্ত ভারতে, কলকাতায় প্রথম পা রাখেন ড. ফর্ম্যান। ১৮৪৯ এ তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাহোরে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পঞ্জাব প্রদেশে গড়ে তোলেন রঙ মহল স্কুল। এই স্কুলের লাগোয়া অঞ্চলে লাহোর ক্যানেলের ধারে একটি কলেজ গড়ে তোলেব ফর্ম্যান। প্রথমে তার নাম ছিল 'লাহোর মিশন কলেজ'। 


শোনা যায় সম্রাট শাহজাহানের এক ওয়াজিরের বংশধর জায়গাটি ফর্ম্যানকে মিশনের কাজকর্মের জন্য 'লিজ' দেন। এখানেই ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে মিশন কলেজ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কলেজের পরিচালনা কমিটির শীর্ষ পদে থেকেছেন ড. চার্লস ফর্ম্যান। তাঁর উদ্যোগেই ওই অঞ্চলে ছড়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও ভাবনা। ১৮৯৪ সালে লাহোরেই প্রয়াত হন পাকিস্তানী শিক্ষাজগতের প্রবাদ পুরুষ ড. ফর্ম্যান। আজও লাহোরের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান সিমেট্রি'তে (গোরা কবরিস্তান) চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন তিনি৷ ফর্ম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মিশন কলেজের নতুন নাম রাখা হয় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপ্রাচীন কলেজটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত৷ দেশভাগের পর তা চলে আসে লাহোরের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ২০০৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

১৫৭ বছরের ইতিহাসে এ কলেজ বহু নজিরবিহীন কৃতিত্ব গড়েছে। দিয়েছে অসাধারণ কিছু শিক্ষার্ত্রী, পরবর্তী কালে যারা আধুনিক পাকিস্তান ও ভারতে শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাজনীতির জগতের বহু স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেন। এই কলেজের প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুরেন্দ্র কুমার দত্ত, গণিতজ্ঞ আলমা মাশরিকি, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল, পঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল, মুসলিম লীগের নেতা মিঁয়া বরকত আলী, পঞ্জাবের সাংসদ বলরাম জাখর, প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ শরিফ, পাক সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার আব্দুল রশিদ, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র, সাংবাদিক ও লেখক কুলদীপ নায়ার, সাহিত্যিক কৃষন চন্দ ও প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশারফ৷ নোবেলজয়ী বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার কম্পটন'ও এই কলেজে গবেষণা করেছেন, করেছেন শিক্ষকতা। আজও পাকিস্তানের আধুনিক শিক্ষাঙ্গনে গৌরবময় অধ্যায়ের নাম ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

কথিত আছে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে এ কলেজে একটি শোকসভা আয়োজিত হয়, তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রকুমার দত্তের উদ্যোগে। ২০ বছর পর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গড়া হয় একটি কমিটি৷ কিন্তু '৬৭ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যাবতীয় রবীন্দ্রচর্চায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন জেনারেল আয়ুব খান সরকার। বন্ধ হয়ে যায় রবীন্দ্রচর্চা। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় কবি আলমা ইকবালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা টেনে এনে কবিগুরুর সাহিত্য প্রতিভাকে কখনই সম্মান দিতে চায়নি কট্টরপন্থী পাক সরকার। পরে নয়ের দশকের প্রথম ভাগে পরিস্থিতি শান্ত হলে আবারও নতুন করে পাকিস্তানে শুরু হয় রবীন্দ্র চর্চা। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তাতে নিয়েছিল অগ্রনী ভূমিকা। নয়ের দশকের মাঝামাঝি কলেজের ইতিহাস ও সাহিত্য বিভাগ যুগ্ম ভাবে পালন করা শুরু করে রবীন্দ্র জয়ন্তী৷ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকেরা একসাথে অংশ নেন তাতে। 'সেই ট্র‍্যাডিশন আজও সমানে চলেছে'। 

২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিখ্যাত 'ডন' পত্রিকায় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে বছর কলেজে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের শতবর্ষ পালিত হয়। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সাথে এউইং লিটারারি সোসাইটি যৌথ ভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে৷ রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্র রচনা পাঠ ও সত্যজিৎ রায়ের ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সে উপলক্ষে। 

কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান ড. ইয়াকুব বাঙ্গাশ বলেছিলেন, "অবিভক্ত ভারত হোক বা বর্তমান সময়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন, রাষ্ট্রবাদ ও সমাজচেতনা চির অক্ষয়, অমলিন। কোনও দেশকালের গণ্ডি দিয়ে তাকে মাপা সম্ভব নয়।" কলেজের আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ড. ওয়াসিম আনওয়ার জানান, "একসময় রবীন্দ্র ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু খ্যাতনামা পড়ুয়ারা শান্তিনিকেতন পাড়ি দিয়েছেন। রাজেশ্বরী বাসুদেব (কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত) তার অন্যতম। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, চিন্তা ও মননের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে দেখছে। তাঁর ভাবধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছ।" আনওয়ার বলেন, "ভুললে চলবে না পাকিস্তানের রাষ্ট্রপিতা মহম্মদ আলী জিন্না নিজে রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। আজও আমাদের কাছে বিশ্ব সাহিত্যের ত্রয়ী সাধক নমস্য। এঁনারা হলেন আলমা ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং রবীন্দ্রনাথ।" 

২০২০ সালে গোটা বিশ্ব জুড়ে আছড়ে পড়েছে কোভিড ঢেউ৷ ২০২১ এ এসেছে দ্বিতীয় তরঙ্গ। সেই মারণ হিল্লোলে লণ্ডভণ্ড ভারত, পাকিস্তানও। তবু দু'দেশের সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতিমনস্ক উদারমনা মানুষ আজও রবীন্দ্রচর্চা থেকে সরে আসেননি। সরে আসেনি ১৫৭ বছরের ঐতিহ্যশালী লাহোরের ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। নিঃশব্দে, নিভৃতে রবীন্দ্র সাধনা করে চলেছেন তারা। অতিমারীর সঙ্কটকালে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের কাছে আজও সমান ভাবে গৃহীত রবি ঠাকুরের সেই বাণী - "চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত..." 

রবীন্দ্র প্রদর্শিত সেই মুক্তির আলোয় ভেসে, আজও দেশকালের বিরোধ ভুলে রবীন্দ্র আরাধনায় নিমগ্ন লাহোরের 'প্রেসিডেন্সি' - ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। 

---------------------
তথ্যসূত্র. 'দ্য ডন' সংবাদপত্র, 'ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস' সংবাদপত্র, ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, দিল্লি, উর্দু আকাদেমি - লাহোর ও দিল্লি, জার্নাল অফ রিসার্চ ইন হিউম্যানিটিজ এবং হিস্টরিকাল সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি অফ পঞ্জাব, লাহোর এবং নিউজলেটার, ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ, লাহোর। 


ছবি. ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ গ্যালারি।

Tuesday, June 1, 2021

ছায়া মূর্চ্ছনাঃ 'শ্যাডোগ্রাফি'র অন্দরমহল


'ছায়ার সাথে কুস্তি করে' আজ পর্যন্ত কার গাত্রে ব্যাথা হয়েছে? এক সুকুমার রায় ছাড়া! 

তিনি শুধু কুস্তি করেই ক্ষান্ত হননি, ফলাও করে ছায়া নিয়ে ব্যবসাও করেছেন। সুকুমার রায় বলেই হয়তো এমন অদ্ভুত ভাবনার 'ছায়াবাজি' - 

"ছায়া ধরার ব্যবসা করি তাও জানো না বুঝি,
রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি!"

পরে বুঝতে পেরেছি, অল্পবিস্তর সেই ছায়ার পুঁজি কমবেশি আমাদের সকলের। আমরা ছায়ায় ঘেরা এক অলীক পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে আমাদের সঙ্গে ছায়া নয়, ছায়ার সঙ্গে আমরা পথ হাঁটি। 

ছোটবেলা কেটেছে মফঃস্বলে। লোডশেডিং সেখানে সর্বক্ষণের সঙ্গী। সন্ধ্যেবেলায় আলো চলে গেলে, মা সামনে রাখতেন হ্যারিকেন বা মোমবাতি। তিরতিরে সেই গা ছমছমে ভুতুড়ে আলোয়, দেওয়ালে নিজের ছায়া দেখে চমকে উঠেছি কতবার।

যখন ধাতস্থ হওয়া শিখেছি, তখন দেওয়াল জুড়ে শুরু হতো আঙুলের কারুকাজ। আটের নামতা মুখস্ত করা শিকেয় তুলে ভেসে গেছি ছায়া সমুদ্রে। অজান্তেই হাতের ছায়ায় দেওয়ালে ভেসে উঠেছে হরিণ, বাঘ, কুকুর, বুড়োর মুখ, টুপি-পড়া সাহেব, আর পাখি...অগুনতি পাখি উড়ে বেড়াতো ঘরের রঙচটা দেওয়ালে। 

পরবর্তী কালে মহাজাতি সদন কিম্বা রবীন্দ্র মঞ্চে অবাক হয়ে দেখেছি পি সি সরকারের 'ছায়াবাজি'। ছায়ারা যেন কথা বলতো, নাচত, খেলত তার সঙ্গে। কী অদ্ভুত রহস্যময় সব ছায়ার খেলা! 

বড় হয়ে জেনেছি 'শ্যাডোগ্রাফি' কাকে বলে। অবাক হয়ে বুঝতে শেখা এই 'আর্ট' বহু বছর আগে, সপ্তম শতাব্দীর গোড়ায় মিশর, ইন্দোনেশিয়া, চিনে চর্চা করা হতো। রাজ দরবারে পুরোহিত, জাদুকরেরা সেই সব খেলা দেখাতেন। পুতুল খেলার মধ্যে দিয়ে ছায়ার সাথে যুদ্ধ জারি করা হতো। 

১৭৭৬ সালে ডমিনিক সেরাফিন ইউরোপে প্রথম দেখালেন ছায়াপুতুলের কারসাজি৷ দেখালেন হাত কী অদ্ভুত ছায়া অবয়ব গড়তে পারে৷ তাজ্জব বনে গেছিল প্যারিসের জনতা সেই খেলা দেখে। দ্রুত ছড়ায় তার জনপ্রিয়তা। 

১৮৭৫ সালে ফেলিসিয়ন ট্রিওয়ে এই 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি'কে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। একে একে উঠে আসেন আলেক্সান্ডার হারম্যান, ডেভিড ডেভাণ্ট, এডওয়ার্ড ভিক্টর বা ডেভিড ব্যামবার্গের মতো সব প্রথমসারির কিংবদন্তি 'শ্যাডোগ্রাফার'রা। ১৮৫৯ এ বেরোয় শ্যাডোগ্রাফি নিয়ে প্রথম বই "হ্যাণ্ড শ্যাডোজ টুবি থ্রোন আপন দ্য ওয়াল", লেখক হেনরি বার্সিল। 

ভারতেও প্রাচীন জাদুকরেরা এর চর্চা করেছেন। গণপতি চক্রবর্তী থেকে গোপীনাথ মুথুকার, পি সি সরকার থেকে প্রহ্লাদ আচার্য, মায় পি লাল পর্যন্ত কমবেশি তাঁদের জাদুকীর্তি'তে 'শ্যাডোগ্রাফি'র চর্চা রেখেছেন। আজ সেই 'ছায়াবাজি'কেই অভাবনীয় শিল্পের স্তরে নিয়ে গেছেন কিছু অখ্যাত মানুষ। সেই 'ট্যাডিশন সমানে চলিয়াছে', নিঃশব্দে।

সৃজিত মুখার্জির 'নির্বাক' (২০১৫) সিনেমা হিসেবে যতটা না স্পর্শ করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছুঁয়ে গিয়েছিল তার গল্প বলার গভীরতায়। বিস্মিত হয়েছিলাম অঞ্জন দত্ত বা ঋত্বিক চক্রবর্তীর ছায়া ঘেরা অভিনয়ে। সেই স্তরের পর স্তর খুলে বেরিয়ে আসা কাহিনি ও চরিত্রের অবয়ব, কী অসাধারণ ছায়া-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল স্তব্ধতার সম্মোহনে। 

আর সম্মোহিত করেছিলেন দুজন - অমর সেন ও সব্যসাচী সেন। সিনেমার ওপেনিং ক্রেডিটে তাদের 'হ্যাণ্ড শ্যাডোগ্রাফি' অকল্পনীয়। তার সাথে অঞ্জন পুত্র নীল দত্তের অভাবনীয় 'ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর' কী ছায়ামেদুর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল, তা ভাবলে আজও সত্যি রোমাঞ্চ লাগে। 

'সেন জুটি' এই মুহূর্তে শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অন্যতম সেরা ছায়াশিল্পী৷ শুধু মাত্র হাতের 'মুভমেন্ট' কতটা নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে তা দেখিয়েছেন তাঁরা। এও এক অলৌকিক ছায়া চরাচর, যেখানে শরীরী ভাষ্য ও ছায়াভাষ্য কখন যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়। 

নিঃশব্দে সৃষ্টি হয় ছায়া মূর্চ্ছনা। সেই মূর্চ্ছনা সকলে শুনতে পান না। তাকে অনুভব করার আলাদা চোখ প্রয়োজন। তাকে বোঝা এত সহজ নয়। 

সুকুমার রায় ভোররাতে, সন্তর্পণে এসে জানিয়ে দিয়ে যান  - 

"কেউ জানেনা এ-সব কথা কেউ বোঝে না কিছু,
কেউ ঘোরে না আমার মত ছায়ার পিছুপিছু।"

বিরাজ সত্যসুন্দরঃ 'আনন্দলোকে'র উৎস সন্ধানে


আমার শেখা প্রথম রবীন্দ্রসংগীত। সেই প্রথম পরিচয় রবি ঠাকুরের সঙ্গে। তখনও রবীন্দ্রনাথ কে, ভালো করে জানতাম না। বুঝতাম না। বোঝার বয়সও ছিল না। অবশ্য এখনও যে কতটা জেনে বা বুঝে উঠতে পেরেছি, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। 

'তিনি' এক মহাসমুদ্র, তারও ঊর্ধ্বে সসাগরা পৃথিবী। যার আদি নেই, নেই অন্ত। শুধু রয়েছে অনন্তের এক রহস্যময় আলোর হাতছানি। একজীবনে বোঝা যা সতত দুঃসাধ্য।

তবু গান'টা ছিল। রয়েই গেছে, আজও। না জেনে না বুঝেই শেখা প্রথম রবি-বন্দনা। হয়তো আমার মতো আরও অনেকের'ই। 

আজও এই গান শুনলে নিমেষেই 'ফ্ল্যাশব্যাক' হয়। চোখ বুজে দেখতে পাই নিবারনচন্দ্র নার্সারি স্কুলের সেই একচিলতে মাঠ। কেজি ওয়ান। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার লাইনে। সামনে টেবিলের উপর হারমনিয়াম হাতে হেডস্যার দেবদাস মণ্ডল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কালো ছিপছিপে চেহারা৷ জলদগম্ভীর কণ্ঠে গাইছেন - "গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে..." প্রেয়ারের লাইনে হাত জোড় করে আমরা। না বুঝে, না জেনেই গলা মেলাতাম।

নার্সারির পাঠ চুকে গেছে কবেই। হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে, গানটি  রয়ে গেছে ধ্রুবতারার মতো, অবিচল, নিস্পন্দ, অক্ষয়চিহ্ন স্বরূপ। 

বহু পরে অবশ্য জেনেছি গানটির অশ্রুত ইতিহাস। 


১৮৮১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত মাইসোর বা মহীশূরের মহারাজা দশম চমরাজেন্দ্র ওয়াড়িয়র (১৮৬৪-১৮৯৪) তাঁর রাজ্যের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র এক 'জাতীয় সংগীতে'র কথা ভেবেছিলেন। অতি অল্পবয়সে রাজপাট শাসনের অসামান্য নজির রেখেছিলেন মহারাজ দশম চমরাজেন্দ্র। তিনি স্বয়ং ছিলেন সাহিত্য কলা সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। ছিলেন সুকবি ও কর্ণাটকি বেহালায় সিদ্ধহস্ত। ১৮৯৪ সালে শহর কলকাতায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই রাজা। তাঁকে নিয়ে 'প্রহরে' চমৎকার এক নিবন্ধ লিখেছিলেন অরিত্র সোম। 

মনে রাখতে হবে এই গানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যখন, সেই মুহূর্তে ভারতে পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। 'গড সেভ দ্য কিং'ই তখন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় সংগীত। তা সত্ত্বেও নিজ রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার উদ্যোগে পৃথক 'রাজ্য সংগীত' সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন মাইসোর রাজ। তাঁর উৎসাহে তৈরি হয় "কায়ু শ্রী গৌরী, করুণা লহরী, থয়া যক্ষী শঙ্করেশ্বরী"।


কর্ণাটকি রাগ ধীরাশঙ্করভরনমে (বিলাবল) নিবদ্ধ এই মহীশূরী ভজন লিখেছিলেন সভাকবি বাসাপ্পা বা বাসভাপা শাস্ত্রী। সুর দিয়েছিলেন ওয়াড়িয়রের সভাগায়ক ও যন্ত্রীরা যাদের মধ্যে বীণা সুবন্ন, বীণা শেষান্ন, কে বাসুদেবাচার্য ও বীণা পদ্মনাভাইয়ার মতো কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালেরা। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস।

মনে করা হয়, ঋক বৈদিক গান "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং রো মনাংসি জানতাম" ছিল এই গানের মূল প্রেরণা। এই গানের অনুপ্রেরণাতেই রবি ঠাকুর লিখেছিলেন "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ"। সাল ১৮৯২ তে। বদল এসেছিল রাগের চলনেও। "কায়ু শ্রী গৌরী" বাধা হয়েছিল বিলাবলে, "আনন্দলোকে" এবার নিবদ্ধ হল রাগ ঝিঁঝিটে, ঠাট খাম্বাজ। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন মাইসোরের দিওয়ান স্যার এম কণ্ঠরাজ উরসের অধীন প্রথম কাউন্সিলর স্যার অ্যালবিওন ব্যানার্জির আমন্ত্রণে ব্যাঙ্গালোর যান, তাঁর সম্মানে বাজানো হয়েছিল এই 'মাইসোর অ্যান্থেম'। 

"আনন্দলোকে" গানটি নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম সংসদে। ২৩ জুলাই ২০১৭ সালে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে যৌথ কক্ষের অধিবেশনে সেই দিন শেষবারের মতো এক অসামান্য, আমেগঘন ভাষণ রেখেছিলেন প্রণব বাবু। অনুষ্ঠানের শেষে, যখন সকলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাচ্ছেন, মিলিটারি ব্যাণ্ডে বেজে উঠেছিল "আনন্দলোকে" গানটি। সেই গানের তালে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সংসদ ভবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। 

এই গানের সঙ্গে আজও, ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে নস্ট্যালজিয়া। জড়িয়ে আছে এমন বহু মুহূর্ত, যা চির অমলিন। কতো জনের গলায় এই গান শুনে আপ্লুত হয়েছি। শ্রীকান্ত আচার্য, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর সেন, বা ক্যালকাটা কয়ার। আরও না জানি কতজনের কণ্ঠে সমৃদ্ধ এই গান। তবু দক্ষিণী শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ ড. এম বালামুরলী কৃষ্ণের কণ্ঠে এই রবীন্দ্রসংগীত এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাঁর কণ্ঠমাধূর্যে যেন বারবার উঁকি দিয়ে যায় 'মাইসোর অ্যান্থেম' - 'কায়ু শ্রী গৌরী'র ছায়া।

"আনন্দলোকে" আজও আমার কাছে ফেলে আসা একখণ্ড ছেলেবেলা। যার পরতে পরতে লেগে আছে আমার শৈশব, প্রথম রবীন্দ্র সান্নিধ্য আর কতকটা বোঝা না বোঝায় মেশা এক আলোর সন্ধান। যার পথ বেয়ে দীর্ঘকাল হেঁটে এসেও আবারও সূচনায় ফিরে আসা যায়। এই আমার আত্মানুসন্ধান, সত্য চিন্তন ও প্রজ্ঞার অতীন্দ্রিয় পুণ্যশ্লোক। গানের সূত্র ধরে যা যুগে যুগে মিশে রয়েছে - 

"শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে..."

বুদ্ধ হেসেছেঃ 'ট্রাইবাল রেইন' ও রাহুল রাই


১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ সাল। নামচি, সিকিম। 

সেদিন ভ্যালেন্টাইন। দিনভর বৃষ্টি হয়েছিল পাহাড়ে। বছর সাতাশের তরুণ'টি সন্ধ্যে নামার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিল। 

এমন অসময়ে তাকে বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হয়েছিল সবাই। এই সময়ে, হয় তাঁর প্র‍্যাকটিশ, না হয় কোনো পারফরম্যান্স থাকে। কিন্তু মুখচোরা ছেলেটি কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। 

সে বরাবর এমনই। ভিতরে শত সহস্র ঝড় উঠলেও মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। তাকে আড়াল করে দিত তাঁর শিশুসুলভ হাসি৷ যেন কোনো পাহাড়ি ঝর্না নেমে আসতো রুক্ষ পাথরের ভাঁজে। 

সবার সঙ্গে সে রাতে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল, হেসেছিল, গল্প করেছিল, খেয়েছিল রাতের খাবার৷ তারপর ঢুকে গিয়েছিল নিঃশব্দে নিজের ঘরে। আস্তে করে বন্ধ করে দিয়েছিল দরজা। অনেক রাত পর্যন্ত তাঁর ঘর থেকে পাওয়া গেছিল গিটারের আওয়াজ। 

পরদিন সকালে পুলিশ এসে উদ্ধার করেছিল তাঁর নিথর, নিস্পন্দ দেহ। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, সে আত্মহত্যা করেছে। অথচ পাওয়া যায়নি কোনো সুইসাইড নোট। থাকার বলতে, গান লেখার কিছু আঁকিবুঁকি চেষ্টা, ঘুমের ওষুধ আর তাঁর গিটার। প্রাণের চাইতেও যাকে ভালোবাসতো ছেলেটি৷ 

শুধু তাঁর বোজা চোখ দুটি, মনে হয়, শেষবারের মতো কিছু একটা খুঁজছিল। কী, তা কেউ জানে না। বইয়ের তাকের উপর রাখা 'লাফিং বুদ্ধা' শুধু নীরবে হেসেছিল, দু'হাত মাথার উপর তুলে। 

পরদিন "দার্জিলিং ক্রনিকল"-এ লেখা হয়েছিল - "Rahul Rai, the lead singer of Tribal Rain, has been found dead in an apparent suicide. The talented artist from Sikim reportedly committed suicide at his own residence in Namchi on Tuesday night." 

কেন? কী ভাবে? কিসের জন্য? সে কি কোনো মানসিক অবসাদে ভুগছিল? কোনও প্রেমঘটিত সম্পর্ক? বিচ্ছেদ? টানাপোড়েন? প্রতারণা? সে কী নেশা করতো? ড্রাগস? কোকেইন, চরস, গাঁজা? 

কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি সেদিন, আজও না। শুধু পাহাড় চিরতরে হারিয়েছিল তার প্রিয়বন্ধুকে। শান্ত, সৌম্য, ভদ্র চেহারার সেই ছোট্টখাটো অত্যন্ত গুণী মানুষটিকে। লোকে তাকে "রাহুল দাজু" বলে ডাকতো। 

সে রাহুল রাই, আধুনিক নেপালি সংগীতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা, 'ট্রাইবাল রেইন' ব্যাণ্ডের জনক, কম্পোজার, লিরিসিস্ট, লিড গিটারিস্ট৷ এককথায় রীতিমতো - 'ওয়ান ম্যান ব্যাণ্ড'।


১৯৮৯ সালের ১৪ অক্টোবর। কলকাতায় জন্মেছিল রাহুল। পদ্মা ও নয়ন কুমার রাইয়ের প্রথম সন্তান। ছোটবেলা থেকেই গান অন্তপ্রাণ রাহুল, ভালোবেসে ছিল গিটারকে। 

১৯৯২ সালে নামচির মাউন্ট কারমেলে ভর্তি হয় সে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্যাঙ্গালোরে, তাঁর এক মামার কাছে। বাবা, মা'র থেকে দূরে। পাহাড় থেকে দূরে।

ছোট্ট ছেলেটা একা, বড়ো একা হয়ে পড়েছিল। এই সময়ে স্কুলের বন্ধুদের সাথে সংগীতচর্চা নিয়ে মেতে উঠেছিল সে৷ যেন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে খুঁজে পেয়েছিল আলোর সন্ধান। স্কুলে একটা ছোট ব্যাণ্ড খুলেছিল সে ও তাঁর বন্ধুরা। পড়াশোনার পাশাপাশি চলতো প্রাকটিস, স্টেজ পারফরম্যান্স। এই ভাবেই একটু একটু করে বড়ো হয়ে ওঠে ছেলেটি। তখন তাঁর দোসর বলতে, পকেটমানির টাকা বাঁচিয়ে কেনা সেই গিটার। নিজের সংগীতচর্চা নিয়ে সে খোলাখুলি বলতো - "We are not born with passion, we are develop it as we grow."

অবশ্য গানবাজনা ছিল তাঁর রক্তে, হাড়ে-মজ্জায়। দাদুকে দেখেছিল সে, ছোটবেলায়, হারমনিয়াম ও বেহালা বাজাতে, গান করতে। সেই শুরু৷ ছেলেটি বুঝতে পারে সংগীতের তালিম তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া৷ দাদুই তাঁকে দেখিয়েছিলেন পথ। 

কয়েক বছর পর, ফের নামচি ফেরে ছেলেটি। শুরু হয় নতুন করে পড়াশোনা। এই সময়েই নতুন একটি হেভি মেটাল ব্যাণ্ড খোলে সে, নাম দিয়েছিল "ড্রিম ডায়বলিক"। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে ২০০৯ এ আইআইটি গুয়াহাটি আয়োজিত "রক-ও-ফনিক" টাইটেল জিতে নেয় "ড্রিম ডায়বলিক"। জিতেছিল আরও একাধিক পুরষ্কার ও সম্মান৷ 

নামচির গভর্মেন্ট কলেজে পড়ার সময় পাকাপাকি মিউজিশিয়ান হবে বলে ঠিক করে সে। শুরু হয় নতুন পথচলা। সিকিম ইউনিভার্সিটি-তে মিউজিক নিয়ে পড়ার সময় সে শুরু করা সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার এক্সপেরিমেন্ট। ইংরাজি নয়, মাতৃভাষা নেপালিতে গান লেখা, সুর দেওয়া শুরু করে সে। এই সময়ই তাঁর হাত ধরে তৈরি হয় নতুন ব্যাণ্ড 'ট্রাইবাল রেইন'। 

২০১৪ তে তৈরি হয় ব্যাণ্ড। ২০১৬ সালে কাঠমান্ডুতে রিলিজ করে 'ট্রাইবাল রেইন'র প্রথম অ্যালবাম - "রোকো ইয়ো সময়"। অ্যালবামে মাত্র তিনটি গান - "চিন্তা", " নারিসানা" ও "ভানাই"। সিকিম, দার্জিলিং ও নেপালের পাহাড়ে আগুন জ্বলে ওঠে। ফ্রি স্টাইল সিংগিং-র নতুন ইতিহাস গড়েছিল "ট্রাইবাল রেইন"। তিনটি গানই, লেখা সুর ও কণ্ঠ ছিল রাহুলেরই। রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায় রাহুল রাই ও তাঁর বন্ধুরা। বহু পুরস্কারও পেয়েছিল অ্যালবামটি। 

*

কিন্তু এর মধ্যেই ইন্দ্রপতন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অজ্ঞাতকারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয় রাহুল রাই। শান্ত, নরম লম্বাচুলো, হাসিমাখা মুখের সেই লাজুক ছেলেটি যে এমন কাণ্ড বাঁধাবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। 

অনেকে বলে, সে রাতে 'ড্রাগ ওভারডোজে' কেড়ে নিয়েছিল রাহুল রাই-র প্রাণ। অনেকে বলে, কোনো একটি ব্যক্তিগত বিষয়ে মর্মাহত ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েই এই চরম পদক্ষেপ৷ কিন্তু কেন ২৭ বছরের তরতাজা, প্রতিভাবান একটি ছেলে এমন অকালে ঝরে গেল, আজও তা কেউ জানে না। 

তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে রিলিজ হয় "ভানাই"-র এই মিউজিক ভিডিও'টি। আজও পাহাড়ি ধুনে গাঁথা এই গানে রাহুলের কণ্ঠে "হেরা, তিমরো লাগি তারা তোড়ি দিনছু" (দেখো, তোমার জন্য আকাশের তারা নিয়ে এসেছি) শুনলে মনে হয়...প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ে ঝিকিয়ে উঠেছে রোদ, একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মেঘ আর সোনালী আভায় ঢেকে যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখর। 

না জানি অব্যক্ত কতো কথা মিশে আছে এই গানে। যার পরতে পরতে খেলা করে পাহাড়ি কুয়াশা, হাল্কা বৃষ্টি আর সেই সদাহাস্যজ্বল বুদ্ধমূর্তির করুণাঘন ছায়া।

যার 'অবাঙমনসোগোচর' হাসির আভা কেউ কখনো বোঝেনি। 

রাহুল ছাড়া আর কেউ বুঝবেও না। 


রঞ্জিশ হি সহিঃ চলমান ইতিহাসের জন্মবৃত্তান্ত


সত্তরের দশক, লাহোর। 

'আজরা মুভিস'-র ব্যানারে এক নতুন উর্দু চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাত দিয়েছেন সৈয়দ সুলেমান। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার হায়দ্রাবাদে জন্ম এস সুলেমান (জ.১৯৩৮) পাকিস্তানি ফিল্ম জগতে 'স্বর্ণযুগে'র অন্যতম সেরা পরিচালক, তখন যথেষ্টই প্রতিষ্ঠিত নাম। 

পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের মধ্যেই উর্দু ও পঞ্জাবি মিলিয়ে তৈরি করেছেন এক ডজনেরও বেশি সিনেমা। অধিকাংশই হিট মিউজিক্যাল। ৬৩'তে তাঁরই পরিচালনায় 'বাজি' ভেঙে দিয়েছিল 'বক্স অফিসে'র যাবতীয় রেকর্ড। পেয়েছিল একাধিক সম্মান। সুলেমানের দুই ভাই সৈয়দ দর্পণ ও সন্তোষ কুমার ছিলেন বিখ্যাত ফিল্ম অভিনেতা। স্ত্রী জাইরিন সুলেমান 'পান্না'ও ছিলেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। 

নয়-নয় করে এ যাবত ১৮-টি সিনেমা পরিচালনার কাজ সামলেছেন সুলেমান। তাঁর এবারের 'প্রজেক্ট'   সাহিত্যিক হামিদা জাবিনের বহুচর্চিত উপন্যাস 'তামান্না' অবলম্বনে ফ্যামিলি ও সোশ্যাল ড্রামা - 'মহব্বত'। অভিনয় করেছিলেন মহম্মদ আলী, জেবা, সাবিহা খানুম, রেনুকা দেবী এবং সন্তোষ রাসেলের মত ললিউডের বাঘা-বাঘা অভিনেতারা। 

'মহব্বতে'র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন প্রবাদপ্রতিম সুরকার নিসার বাজমি। সেই বাজমি, যার সাঙ্গীতিক চিন্তা ভাবনার কথা বলতে গিয়ে বারবার কানে হাত ছোঁয়াতেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ফেটে পড়তেন আহমেদ রুশদী থেকে রুণা লায়লা, রফি থেকে মুকেশ। মহম্মদ রফি এতটাই শ্রদ্ধা করতেন বাজমি'কে যে একবার তাঁর সুরে গাওয়ার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নিতে চাননি। বাজমি'র জোরাজোরিতে মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে রফি বলেছিলেন, ওই টাকা তিনি কোনদিন খরচা করবেন না। 

১৯২৪ সালে মহারাষ্ট্রের জলগাঁওতে জন্ম নিসার বাজমি'র। আসল নাম সৈয়দ নিসার আহমেদ। খুব গরীব পরিবারে মানুষ। বাবা সৈয়দ কুদরত আলী ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। অভাবের সংসারে ছিলনা বিন্দুমাত্র গান-বাজনার পরিবেশ। কিন্তু অল্প বয়স থেকেই গান বাজনার প্রতি তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ। গানের টানে পড়াশোনা শিকেয় তুলে যোগ দেন উস্তাদ ইয়াসিন খান 'কাওয়ালে'র দলে। বাজমির সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আলাদা করে তালিম দেন সেই সময়কার বিখ্যাত খেয়ালিয়া উস্তাদ আমিন আলী খান। খান সাহেবের শাগির্দ হয়ে মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তথা নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন বাজমি। 

চল্লিশের দশকে যোগ দেন বম্বের অল ইণ্ডিয়া রেডিও'তে। ৪৬'এ পান প্রথম ব্রেক, এ আর জামিনদার পরিচালিত হিন্দি ছবি 'যমুনা পার'-এর সুরকার রূপে। প্রায় ৪০'টিরও বেশি বলিউড সিনেমায় সঙ্গীত দেন তিনি। এরপর ৬২'তে তাঁর পাকিস্তান যাত্রা ও সঙ্গীত পরিচালনার জন্য সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস। 

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে পেলেন প্রথম ব্রেক, পরিচালক ফৈজল করিম ফজলির 'অ্যায়সা ভি হোতা হ্যায়' তে। ছবি হিট হয়, হিট হয় গানগুলিও। নিসার বাজমির সুরে আহমেদ রুশদী ও গায়িকা নূরজাহানের কন্ঠে 'মহব্বত মে তেরে' গানটি সাড়া ফেলেছিল গোটা পাকিস্তানে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি বাজমি'কে। দিয়েছেন একের পর এক হিট 'মিউজিক্যাল'। তাঁর সুরে বহু কালজয়ী গান গেয়েছেন আহমেদ রুশদী, মেহদি হাসান, রুণা লায়লা, আলমগীর, নায়রা নূরের মত শিল্পীরা। 


কিন্তু ইতিহাস গড়া তখনও বাকি ছিল বাজমির। এবার এস সুলেমানের 'মহব্বতে'র (১৯৭২) সুরকার রূপে ডাক পেলেন তিনি। ছবির গান লিখলেন তিন প্রথিতযশা শায়ের কাতিল সিঁফাই, হাবিল জলিব ও আহমেদ ফরাজ। গান গাইলেন নূরজাহান, তাহিরা সাঈদ, আহমেদ রুশদী, রুণা লায়লা ও মেহদি হাসানের মত শিল্পীরা। প্রাণ ঢেলে সুর দিলেন বাজমি। সাতটি গান ছিল ছবিতে, সাতটিই সুপারহিট। কিন্তু তার মধ্যে একটি গান রাতারাতি গড়েছিল ইতিহাস। ছবির নায়ক মহম্মদ আলীর লিপে ছিল সেই গান। আক্ষরিক অর্থে সেটি 'স্যাড সং'।

আহমেদ ফরাজের কথায়, নিসার বাজমির সুরে ও মেহদি হাসানের কন্ঠে ইমন রাগে সেই কালোত্তীর্ণ গানটি হল - 

"রঞ্জিশ হি সহি দিল ইয়ে দুখানে কে লিয়ে আ
আ ফিরসে মুঝে ছোড় কে জানে কে লিয়ে আ।"

সেই গান নিয়ে ঝড় উঠেছিল তামাম পাকিস্তানে। ঝড় ওঠে সরহদ পার হিন্দুস্তানেও। নতুন করে আবিস্কৃত হন নিসার বাজমি, আহমেদ ফরাজ ও মেহদি হাসান, এই গানের রেশ ধরে। 

'নতুন' করে বলার কারণ, মেহদি হাসানের গাওয়ার অনেক আগেই ষাটের দশকে গজলটি গেয়েছিলেন 'হাম দেখেঙ্গে' খ্যাত ইকবাল বানু। ফরাজ আগেই লিখেছিলেন এই গজল। খুব সম্ভবত 'প্রথম' সুর দিয়েছিলেন সুরকার খাঁজা খুরশিদ আনোয়ার (১৯১২-১৯৮৪)। সেই গান গেয়েছিলেন ইকবাল বানু। ছায়ানট রাগে সেই গানের সঙ্গে মেহদি হাসানের গাওয়া ইমন রাগে, বাজমির সুরে তেমন মিল নেই বললেই চলে। 

কিন্তু সেই গানের সুরে, কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বাজমি। তাই 'মহব্বতে'র সুররোপনের সময় আহমেদ ফরাজের কাছে বিশেষ করে চেয়ে নেন 'নজম'টি। চান নতুন করে সুর দিতে। রাজি হন ফরাজ। 'নজমে'র কথায় সামান্য হেরফের করে সেটি তুলে দেন বাজমির হাতে। তৈরি হয় নয়া ইতিহাস। ইকবাল বানুর 'ভার্সান'ও পেয়েছিল অসাধারণ জনপ্রিয়তা। কিন্তু মেহদি হাসানের কন্ঠে সেই গজল নতুন ইতিহাস রচনা করে। হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থে কালোত্তীর্ণ। পরবর্তী কালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধাঁচে গানটি গেয়ে গোটা উপমহাদেশে অবিশ্বাস্য খ্যাতি কুড়োন হাসান। 'রঞ্জিস হি সহি' আর মেহদি হাসান হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ। পরবর্তী সময়ে, বহু মানুষ এই গজল গেয়েছেন। এখনও গাইছেন। কিন্তু 'রঞ্জিস হি সহি' থেকে মেহদি হাসানকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। তারা হয়ে ওঠেন একে ওপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। 

প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হতে চললো, 'রঞ্জিস হি সহি'র জয়যাত্রা অব্যাহত। 'আফতাব এ গজল' মেহদি হাসান ও কবি আহমেদ ফরাজ সেই অবিস্মরণীয় গজলের হাত ধরে পেয়েছেন 'চির অমরত্ব'। কিন্তু বাজমি? কে মনে রেখেছে বিখ্যাত এই গজলটির সুরকার নিসার বাজমি'র কথা? ২২ মার্চ ২০০৭ সালে করাচি'তে দীর্ঘ রোগভোগের পর ৮২ বছর বয়সে যখন প্রয়াত হলেন বাজমি 'ডন' সংবাদপত্র লিখেছিল - 

Nisar Bazmi, one of the most iconic musicians of the country died after a long illness here at Thursday night. He was 82. Responsible for the success of many a star singer, Bazmi’s numbers had an uncanny knack of catching the imagination of the public.

'রঞ্জিস হি সহি'র সঙ্গে জড়িত মানুষগুলি আজ আর কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু এই গানের পরতে পরতে আজও তাঁদের অবস্থান। বাজমি, ফরাজ, হাসানের এই ত্রয়ী মেলবন্ধনের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাজমির একদা 'শিষ্য', বলিউডের জনপ্রিয় জুটি 'লক্ষীকান্ত-প্যারেলালে'র অন্যতম সদস্য প্যারেলাল বলেছিলেন, "আজও যখনই এই গজল শুনি, বাজমি সাহেবের কথা মনে পড়ে। তাঁর কথা লোকে ভুলে গেলেও এই গজলের মধ্যেই নিহিত আছে তাঁর রূহ...তাঁকে বাদ দিয়ে এই গান অসম্পূর্ণ।" প্যারেলাল বলেছিলেন - সঙ্গীতের সুরে সেই শক্তি আছে যা 'অনহোনি' কে 'হোনি' করে তুলতে পারে। প্রার্থনা করি এই গানের কথার পিঠে ভর করে নিসার বাজমি ফিরে আসুন। আমরা যেন বলতে পারি - 

 "কিস কিস কো বতাঁয়েঙ্গে জুদাই কা সবব হম
তু মুঝসে খফা হ্যায় তো জমানে কে লিয়ে আ -

রঞ্জিস হি সহি!"

*ছবি (বাঁ দিক থেকে) - নিসার বাজমি, মেহদি হাসান, আহমেদ ফরাজ।

নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়োঃ হোরির মাধূর্য, মাধূর্যের হোরি


বছর সাত-আটেক আগের কথা। মুম্বাইয়ের নেহরু সেন্টারে ভেঙে পড়েছে মানুষের ঢল। একসাথে মঞ্চ ভাগ করে নেবেন দুই কিংবদন্তি শিল্পী গিরিজা দেবী ও বিরজু মহারাজ। শাস্ত্রীয় গায়ন এবং নৃত্যের এক অসাধারণ যুগলবন্দীর সাক্ষী হতে উদগ্রীব সকলে। 

যথাসময়ে মঞ্চে এলেন তাঁরা। বসলেন পাশাপাশি৷ গিরিজা দেবীর এক শিষ্যার হাতে তানপুরা, অন্য দিকে তবলায় অনুরাধা পাল। উস্তাদ আল্লারাখা ও জাকির হুসেইনের প্রিয় ছাত্রী অনুরাধা বেনারস ও পঞ্জাব ঘরানার সুযোগ্য উত্তরসূরী। দেশের অন্যতম প্রথিতযশা মহিলা তবলাবাদক।

শুরু হল গান। বেনারস ঘরানার অজস্র রত্নসম্ভার সেদিন শ্রোতা, দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন গিরিজা দেবী। তাঁর কণ্ঠে সাক্ষাৎ সরস্বতীর কৃপা। বেনারস ঘরানার দুর্লভ সব ঠুমরী, দাদরা, কাজরি, চৈতী পেশ করেছিলেন গিরিজা। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন বিরজু মহারাজ'জি। গিরিজা দেবীর পাশে বসেই তিনি দেখিয়েছিলেন অভিনয় আর অভিব্যক্তি, ভঙ্গিমার মাধ্যমে অনবদ্য নৃত্যশৈলীকে কোন স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ক্ষণজন্মা সেই দুই ব্যক্তিত্বের জাদু স্পর্শে সেদিন ম্যহফিলে 'চার-চাঁদ' লেগেছিল।

অনুষ্ঠান মাঝে একসময় গিরিজা বললেন, "অব এক হোরি সুনাতি হুঁ। রঙ্গো কা তেওহার আ রহী হ্যায়।" অর্থাৎ হোলি আসছে। তাই এবার একটা 'হোরি' শুনুন! সাথেসাথে যেন উল্লাসে ফেটে পড়ে নেহরু সেন্টার। গিরিজা দেবী লাগালেন সুর মিশ্র কাফি রাগে -

"রঙ ডারুঙ্গি নন্দ কে লালন পে
সাঁবর রঙ লাল কর দইয়ো - 
মল গুলাল দৌ গলান পে
নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো
ঢপ মৃদঙ্গ তালন পে!" 

তন্ময় হয়ে 'রাধিকা হোরি' গাইছেন গিরিজা৷ তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে মহারাজ'জির সেই অনন্যসাধারণ 'এক্সপ্রেশন', অভিনয়, হাতের মুদ্রা, ভ্রুভঙ্গিমা, চলন যেন সত্যি সত্যিই রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা নামিয়ে এনেছেন সভাগৃহে। দর্শকেরা সুরে, ছন্দে, তালে বুঁদ।

মনে হচ্ছে কেউ যেন একমুঠো আবীর ছুঁড়ে দিয়েছে আকাশে। অদৃশ্য পিচকারি থেকে উড়ে আসছে রঙ। সেই রঙ যতটা না শরীরের, তার চেয়ে ঢের বেশি মন জুড়ে। 

গানের চলনে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে কথাগুলি৷ 'নারী বনাঈ নাচাই ছড়িয়ো'...রাধিকা যে শুধু কৃষ্ণের সাথে হোলি খেলে সন্তুষ্ট নন। মাধবের শ্যামবর্ণ ত্বক তিনি আজ লাল করে ছাড়বেন। শুধু তাই নয়। তাঁকে নারীর বেশে সাজিয়ে, মৃদঙ্গের তালেতালে নাচাবেন। 

অবাক হয়ে ভাবি, রঙের কী অদ্ভুত মহিমা। মুহূর্তের মধ্যে কোথায় ভেসে গেল লিঙ্গ বিভাজন, পুরুষালি দম্ভ, কতৃত্ব, পেশীসঞ্চার। শতেক দাবিদাওয়া, যতেক মৌরসীপাট্টা। 'গুলালে'র গুণে তখন সবই হাওয়ায় লীন৷ রাধিকা তখন কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-ই রাধিকা। শতাব্দী প্রাচীন সেই 'প্রচলিত' ব্রজভাষ্য নিঃশব্দে শিখিয়েছে সমবোধ, সমচেতনা ও সমানাধিকারের তত্ত্বজ্ঞান। 

রঙের উৎসবে যেদিন সত্যি সত্যিই এই তথাকথিত লিঙ্গ-বিধিবদ্ধতা ঘুচে যাবে, সেদিন হয়তো সকলের মধ্যেই ফুটে উঠবে সমলিঙ্গ, সমতত্ত্বের মিশ্র রাগ। যেদিন সমস্ত রঙ মিলেমিশে এক হয়ে, একে অন্যের মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে রঙের অন্তর্নিহিত আলো। চিরায়ত, চিরকাঙ্ক্ষিত সেই দোল পূর্ণিমার অপেক্ষায় রয়েছি আজও। 

"আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধন ছেড়া প্রাণ"।
* ঋণঃ থ্রি সং'স ফর হোলি, ২০১৯

পিনাজ মাসানিঃ গজলের এক বিস্মৃত অধ্যায়


সে এক দাউদাউ সময়। প্রতি রবিবার নিয়ম করে দাবানল লাগে। দুরদর্শনে। গীত গজলের অনুষ্ঠানে। সেই আগুনে একটু হলেও পুড়েছি আমি। 

কতই বা বয়স তখন। নয়ের দশক। একটু একটু করে পেরিয়ে আসছি রামানন্দ সাগরের 'রামায়ণ', বি আর চোপড়া-দের 'মহাভারত'...

পা টিপে টিপে উঠে এসেছে 'নুক্কর', 'ওয়াগলে কী দুনিয়া', 'সার্কাস', 'বুনিয়াদ', 'গুল গুলশন গুলফাম', 'করমচাঁদ জাসুস' বা 'মুঙ্গেরীলাল...' এসবের গন্ধ মেখেই একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা। 

সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি 'চিত্রহার' বা 'সুপারহিট মুকাবলা'র চাইতেও তখন বেশি টানছে 'গীত গজল সন্ধ্যা'৷ সেখানে তখন চাঁদের হাট। কে নেই সেখানে? গুলাম আলী, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ, জগজিৎ-চিত্রা, উদিত নারায়ণ, কুমার শানু আর...আর সেই মেয়েটি...পিনাজ মাসানি। 

'লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট' বলে কথা। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই শাড়ি পড়া লম্বা চেহারা, কোঁকড়াচুলো রোগা-পাতলা মেয়েটিকে। মাইক হাতে আদুরে গলায় মিষ্টি হেসে গান গাইছে৷ 

তাঁর চোখ কথা বলে। কথা বলে তাঁর শরীর। যার ঠোঁটে সবসময় লেগে আছে হাসি। চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলছে। ঠিক যেমন খেলত তাঁর কণ্ঠের সুর মাধুর্যে, গজলের অন্তঃস্থলে। 

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, প্রেমে পড়েছিলাম...হ্যাঁ, ঘোরতর প্রেমে পড়েছিলাম আমি। দাউদাউ করে দাবানল জ্বলেছিল কোথাও৷ সেই আগুনের ধোঁয়া দেখা যায় না। শুধু টের পাওয়া যায় উত্তাপ।

এক সময়ে গজল সাম্রাজ্যের 'শাহজাদি' বলা হতো যাকে, তাঁর কথা আজ আর কেই বা মনে রেখেছে? 

*

ষাটের দশকে (আনুমানিক ১৯৬৭) গুজরাটের নভসারি'তে এক পার্সি পরিবারে জন্ম পিনাজ মাসানির। গান ছিল তাঁর রক্তে। বাবা ডলি মাসানি ছিলেন সুগায়ক, শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় সমঝদার। 'আফতাব ই মৌসিকী' উস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের শাগির্দ৷ বাবার কাছেই গানের প্রথম তালিম পেয়েছে পিনাজ৷ পরে উস্তাদ আমানত হুসেইন খানের কাছে পেয়েছেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম। 

অল্প বয়সেই স্টেজ শো শুরু করেন পিনাজ। শুধু গান নয়, লেখাপড়া খেলাধুলাতেও ছিলেন সমান কৃতি। বরাবর ফার্স্ট হয়ে এসেছেন ক্লাসে৷ হয়েছেন ইউনিভার্সিটি টপার। চেয়েছিলেন অধ্যাপনা, কিন্তু বেছে নিয়েছেন গানের জগৎ। মুনশিয়ানা পান লঘু শাস্ত্রীয় সংগীত ও গজলে। এই তাঁর একটু একটু করে বড় হওয়া। একইসাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠাও। 

আটের দশক, যখন গীত গজল সার্কিটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মেহেদী হাসান, গুলাম আলী, জগজিৎ সিং, চিত্রা, পঙ্কজ উদাস, তালাত আজিজ-রা; ঠিক তখনই হ্যালির ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব পিনাজ মাসানির। কলেজে থাকতে মিউজিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট হওয়া ছিল তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাস। এভাবেই একদিন পিনাজ নজরে পড়ে যান বিখ্যাত সুরকার জয়দেব-এর। 


সুরকার জয়দেব-ই তাঁকে গজল চর্চার পথে এগিয়ে দেন। বিশেষ তালিম নিতে পাঠান স্বর্ণযুগের বিখ্যাত গজল গায়িকা মধুরানীর কাছে৷ নাম না জানা এক অখ্যাত পার্সি মেয়ে'কে নিজের শাগির্দ করতে চাননি মধুরানী৷ কিন্তু পিনাজের গায়কী'তে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তালিম দেওয়ার মনস্থ করেন তিনি৷ মধুরানীর কাছে নতুন করে গজলের অ আ ক খ তথা উর্দুও শেখেন পিনাজ। এবার সুরের সাম্রাজ্য বিস্তার অনেকটাই সুবিধে হয়ে যায় তাঁর। 

১৯৮১ সালে চোদ্দ পনের বছর বয়সে তাঁর প্রথম অ্যালবাম - "আপ কি বাজম মে"। আট-দশটি গজলের সমাহার৷ প্রথম রেকর্ডেই বাজিমাৎ। পান তুমুল জনপ্রিয়তা। ৮১'র অন্যতম সেরা আবিষ্কার হয়ে ওঠেন পিনাজ। এর পর আর পিছু ফিরে তাকাননি পিনাজ। আগামী দশ বছরে বেরিয়েছে তাঁর ডজন খানেক অ্যালবাম যার প্রতিটিই হিট। 

শুধু গজল নয়, হিন্দি ফিল্মে প্লে ব্যাকও করেন তিনি। জয়দেব, ও পি নাইয়ার, বাপি লাহিড়ী, আর ডি বর্মনের মতো প্রথিতযশা সুরকারদের সুরে বহু হিট গান গেয়েছেন পিনাজ। ১৯৮২ তে 'হামারি বহু অলকা' ছবি দিয়ে শুরু তাঁর প্লে ব্যাকের সফর। সে ছবিতে অলকা ইয়াগনিকের সাথে ডুয়েট গান তিনি। গজলের পাশাপাশি ইন্ডি-পপ'ও গান পিনাজ। 'তু দিল দে দে' আজও আমরা ভুলিনি। গালিব, ফৈজ আহমেদ ফৈজ, শাকিল বদাউনি, নিদা ফজলির মতো কিংবদন্তি 'শায়ের'দের রচনাতে সুরও দেন পিনাজ৷ হিন্দি বা উর্দুর পাশাপাশি রাশিয়ান, ফিজি, জাপানিজ, ভিয়েতনামি, ইংরেজি ভাষাতেও গান গেয়েছেন তিনি৷ 

সঙ্গীতের জগতে অবদানের জন্য পেয়েছেন বহু সম্মান। ১৯৯৬ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাকে 'শাহজাদি তরান্নুম' উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০২ সালে 'কলাকার অ্যাওয়ার্ড' ও ২০০৯ সালে সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য পান 'পদ্মশ্রী'। 

* 

আজ দীর্ঘদিন সংগীতের জগতে তিনি 'অনুপস্থিত'। ব্যাঙ্গালোরে অজ্ঞাতবাসে আছেন। সে ভাবে আর পেশাদারি গানের দুনিয়ায় দেখা যায় না পিনাজ-কে। লোকে বলে, তিনি 'নিভৃতচারিনী', একাকিনী। একাধিক পোষ্য নিয়ে থাকেন ও হাতে গোনা কিছু ছাত্রছাত্রীদের গজলের পাঠ পড়ান। নিজের সম্পর্কে গোপনীয়তা রাখতে পছন্দ করেন তিনি। প্রিয়বন্ধু বলতে তালাত আজিজ ও প্রয়াত অভিনেতা টম অল্টার। 

তবুও সঙ্গীত ছেড়ে একেবারে সরে আসেননি এই অসামান্য গায়িকা। আজও গজলের দুনিয়ায় তাঁর নাম 'আদবে'র সাথে নেয়া হয়ে থাকে। আজও তাঁর সেই ট্রেণ্ড সেটিং অ্যাপিয়ারেন্স, সেই মোহময়ী হাসি আর ততোধিক মোহময় গায়কী ভারতীয় গজলের স্বর্ণালী অধ্যায়'কে আচ্ছন্ন, মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। 

তিনি পিনাজ মাসানি। আমার একান্ত নিজস্ব গজল।