Sunday, May 30, 2021

জড়িয়ে ধরার গানঃ চিপকো আন্দোলন, বহুগুণা ও ঘনশ্যাম রতুরি সেলানী


১১ ডিসেম্বর, সাল ১৯৭২। 

গোটা উত্তরাখণ্ড জুড়ে তখন দাবাগ্নি। একটু একটু করে দেবভূমিতে ছড়িয়ে পড়ছে বন আন্দোলনের আগুন। ধিকিধিকি করে বাড়ছে উত্তাপ।

গড়োয়ালের তিলারি'তে গ্রামবাসীদের উপর চলেছে গুলি। সেই ক্ষত, রক্তের দাগ ক্রমশ বিদ্রোহের রঙ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরকাশী, টেহরি, চামোলিতে। 

রক্ত লেগেছে অরন্যে, গাছের গুড়িতে, পাতায়, শুষ্ক বল্কলে। মাথা দোলাচ্ছে প্রপিতামহের মতো প্রাচীন বনরাজি। ক্ষোভে, বিক্ষোভে, বিদ্রোহে। 

বিদ্রোহ ছড়াচ্ছে গ্রামে গ্রামে। 'বনদেবতা'কে বাঁচাতে জোট বাঁধছে গরীব, হতদরিদ্র মানুষগুলো৷ এই বন, জঙ্গল, পাহাড় তাঁদের জীবন, তাঁদের আশ্রয়, বেঁচে থাকার সম্বল, পিতৃ-পুরুষের আশীর্বাদ স্বরূপ। তাকে ধ্বংস করতে, কেটে ফেলতে দেবে না কেউ। 

কিন্তু রাষ্ট্রতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই চাট্টিখানি কথা নয়৷ কী করবে গরীব মানুষগুলো? লাঠি-বন্দুক, বুলডোজার কাঁদানে গ্যাস আর টাকার ফাঁদ কী ভাবে অতিক্রম করবে তারা? কী ভাবে রক্ষা করবে নিজেদের? কী ভাবেই বা রক্ষা করবে এই আদিম মহাদ্রুম? 

রাতের অন্ধকার চিড়ে ছুটে চলেছে বাস। উত্তরকাশী থেকে চামোলি। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। বন্ধ জানলার কাঁচ ভেদ করে ঢুকছে হিমেল হাওয়া। রাত নটা দশ। 

সপ্রতিভ চেহারার মানুষটির চোখে ঘুম নেই। ইদানীং চোখ বুজলেই সে যেন দেখতে পায় আগ্রাসী করাত, উদ্যত কুঠার, শুনতে পায় ভারি বুটের শব্দ। কিই বা করতে পারে সে! তাঁর নিজস্ব অস্ত্র বলতে একখানি কলম। সে কবি, গীতিকার। শুনেছে, কলমের তেজ তরবারিকেও হার মানায়। কিন্তু তা কতটা সত্যি? 

রাতজাগা মানুষটি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে বাইরে৷ অন্ধকার, ছুটে চলা রাস্তা ভেদ করে, পাহাড় আর বন জঙ্গলের দিকে। হঠাৎ-ই ভিতরে ভিতরে যেন ডিনামাইট ফাটে। চমকে ওঠে সে। ব্যস্ত হাতে টেনে বের করে ডায়েরি, কলম। ঘসঘস করে চলে ব্যস্ত হাত৷ ফুটে ওঠে কয়েকটা লাইন। 

"চিপক যাও প্যের পর
কাটনে মৎ দো! 
বনসম্পদা লুটনে মৎ দো..." 

সেই রাতে 'জড়িয়ে ধরার গান' লিখেছিলেন ঘনশ্যাম রতুরি 'সেলানি'। কবি, লেখক, সমাজসেবী, সুরকার ঘনশ্যাম 'সেলানি'। সেই গান যা নিয়ে, পরবর্তী কালে তিনি ছুটে যাবেন টেহরি গারোয়ালে, সুন্দরলাল 'বাবাজি' বহুগুণার ছবির মতো সুন্দর সিলইয়ারা আশ্রমে। 

বহুগুণা'কে সামনে বসিয়ে, ঘনশ্যাম'জি ভাঙা ভাঙা গলায় শুনিয়ে ছিলেন সেই গারোয়ালি ধুন। আনন্দে আপ্লুত বহুগুণা তাঁকে টেনে নিয়েছিলেন বুকে। স্ত্রী বিমলা নটিয়্যাল বহুগুণা বলেছিলেন, "ইয়ে গানা স্যুন কে প্যের ভি রো পড়েগা"। বহুগুণা ঊর্ধ্ববাহু হয়ে তাকে ঘিরে শিশুর মতো নেচে উঠেছিলেন। বলে ওঠেন - "চিপকো, চিপকো প্যের সে চিপকো।" 

আন্দোলনের অন্যতম কর্মী রাজেন টোগড়িয়া লিখে ছিলেন, "চারদিন পর, ১৫ ডিসেম্বর, গোপেশ্বরে এক বিরাট জনসভায় গাওয়া হয় এই গান। তিন হাজার পাহাড়ি মানুষ তাতে গলা মিলিয়ে ছিলেন। চিপকো আন্দোলনের থিম সং হয়ে ওঠে ঘনশ্যামজির রচনা। সে গানের রেশ ধরেই শুরু হয় চিপকো আন্দোলন"। 

'চিপকো আন্দোলনে'র প্রাণপুরুষ সুন্দরলাল বহুগুণার প্রিয়পাত্র, উত্তরাখণ্ডের বিদ্রোহী কবি, সাহিত্যিক ঘনশ্যাম রতুরি 'সেলানি'র জন্ম ১৮ মে, ১৯৩৪ সালে। টেহরির চড়িগাড় গ্রামে, এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। 

মূলতঃ যজমানি ছিল তাঁদের পারিবারিক পেশা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ব্রাহ্মণ্য পেশা বা মতবাদের বিরোধী ছিলেন ঘনশ্যাম। মেধাবী ছাত্র, তার্কিক ও সাহিত্যানুরাগী ঘনশ্যাম অল্পবয়সেই অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়ান, পরিবার এবং সমাজের আপত্তি উপেক্ষা করেই। 

এমনকি সে সময় এক হরিজনের বাড়িতে গিয়ে সত্যনারায়ণ পাঠ করে রক্ষণশীল সমাজের বিষ নজরে পড়েন। পড়াশোনা চালাতে চলে আসেন হরিদ্বারে৷ সংস্কৃত ও জ্যোতিষচর্চা শুরু করেন৷ এর সাথেই চলতে থাকে কাব্যচর্চা। বয়স বাড়ার সাথে গোটা উত্তরাখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে তার লেখনির খ্যাতি। দেবভূমির প্রথমসারির কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হন তিনি। 

ঘনশ্যাম সেলানী এমনই একজন কবি, গীতিকার ও সুরকার যার রচনা আজও সমাদৃত পার্বত্য অঞ্চলে। যখনই কোথাও কোনও অবিচার চলছে, গলায় হারমনিয়াম ঝুলিয়ে, কবিতায় বিদ্রোহী সুর চড়িয়ে সেখানে পৌঁছে গেছেন তিনি৷ মথিত হয়েছে সাধারণ মানুষ তাঁর গান শুনে। 

চিপকো আন্দোলন থেকে টেহরি বাঁধ প্রকল্প, মোষ বলির বিরোধিতা থেকে মদ নিষিদ্ধকরণ - সবেতেই শোনা গেছে ঘনশ্যাম সেলানীর বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। মেগাফোনের দৌলতে সেই গান গোটা উত্তরাখণ্ডে ছড়ায়। আন্দোলনকারীরা উদাও, সম্মিলিত কণ্ঠে ঘনশ্যামের লেখা গান গাইতে গাইতে অকুতোভয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনে৷ ক্রমশ কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন তিনি নিজ প্রতিভায়। 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর প্রয়াত হন সুন্দরলাল বহুগুণার প্রাণের বন্ধু, উত্তরাখণ্ডের লোককবি ও চিপকো আন্দোলনের অজানা, অশ্রুত সুরেলা অধ্যায়ের প্রণেতা - ঘনশ্যাম রতুরি সেলানী। 

রতুরি চলে গেছেন আগেই। সম্প্রতি চলে গেলেন চিপকো আন্দোলনের প্রাণপুরুষ সুন্দরলাল-জি বহুগুণা'ও। ভারতবর্ষের মাটিতে সবুজ বিপ্লব ঘিরে এক যুগের অবসান। কিন্তু 'চিপকো' মানে কী শুধুই বহুগুণা? তার পাশাপাশি 'চিপকো'র মাস্টারমাইন্ড বহুগুণার স্ত্রী বিমলা ন্যটিয়াল বহুগুণা, গৌরা দেবী, সুবেদার দেবী, বাচ্চিনী দেবী, চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট, গোবিন্দ সিং রাওয়াত, ধুম সিং নেগি, শমসের সিং, কবি ঘনশ্যাম রতুরি, সেই অসংখ্য গ্রামবাসী মহিলারা...তাঁদের কথা বলবে কে? 

কে বলবে অমৃতা দেবীর কথা? ১৭৩০ সালে হওয়া প্রথম 'চিপকো'র অগ্নিকন্যা, তিন সন্তানের জননী, রাজস্থানের মেওয়ারের খেজরিলি গ্রামের অমৃতা দেবী, খেজরি গাছ কেটে রাণা অভয় সিং-র বিলাস বহুল রাজপ্রাসাদ গড়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামে সবুজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইতে ৩৬৩ জন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ দিয়েছিলেন আত্মবলিদান। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে গ্রামের খেজরি গাছগুলিকে। তাই গাছগুলিকে বাঁচাতে তাদের জড়িয়ে ধরে লড়াই করে প্রাণত্যাগ করেন অমৃতা দেবী ও বিষ্ণোইরা। 

২৪০ বছর পর, সাতের দশকে উত্তরাখণ্ডের সবুজ বিপ্লবের প্রাক্কালে অমৃতা দেবী ও বিষ্ণোই সমাজের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের সেই ঘটনা স্বামী সুন্দরলাল বহুগুণাকে শুনিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী বিমলা। তা নিয়ে একাধিক গান লিখে সাথসঙ্গত করেছিলেন ঘনশ্যাম রতুরি সেলানীর মতো মানুষেরা। বাকিটা ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস-ই বা কতটা মনে রেখেছে তাঁদের? 

আমাদের সবার ভিতরেই রয়েছে একটা গাছ। সবার নিজস্ব বোধিদ্রুম। সে বড়ো একলা, অসহায়, সরল। সেও আমাদের স্পর্শ চায়। চায় আদর, ভালোবাসা, সহমর্মিতার ছোঁয়া। 

সময় এসেছে সব কিছু ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরার। 

সেই আমাদের একান্ত আত্মোপলব্ধির 'চিপকো'...

No comments:

Post a Comment