২৫ মে, ১৯৯৮। মুম্বইয়ের নানাবতী হাসপাতাল।
ভিড় থেকে দূরে, বাইরে একটি গাছের তলায় একা চুপ করে বসেছিলেন প্যারেলাল রামপ্রসাদ শর্মা। একটু আগেই এসেছে দুঃসংবাদ। প্রয়াত হয়েছেন তাঁর বন্ধু, ভাতৃসম, দীর্ঘদিনের সঙ্গী লক্ষ্মীকান্ত শান্তারাম কুডালকর। এক নিমেষে একা, সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছেন প্যারেলাল।
অবশ্য এই নামে তাঁরা পরিচিত নন। গোটা দেশ তাঁদের চেনে হিন্দি সিনেমার সংগীত পরিচালনার হিট জুটি 'লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল' নামেই। একজন ম্যাণ্ডলিনের জাদুকর, অন্যজন বেহালা। তিন দশকের সফর, অজস্র ছবি, অজস্র হিট গান, পুরষ্কার, সম্মাননা তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন দশকের পর দশক। আজ যেন সেই সফর শেষ হল। লিভার সিরোসিস, সাথে রেনাল ফেলিওর। "কিঁউ ইতনা পিতে হো?" বহুবার এই প্রশ্ন করেছেন প্যারেলাল। জবাবে হাসতে হাসতে লক্ষ্মীকান্ত বলেছেন, "ইয়ার, মরনা তো সভি কো হ্যায়, কাহে পিনা ছোঁড়ে!"
সেই সব কথাই মনে পড়ছিল প্যারেলালের। কষ্টে, চোখের জলে, বুঁজে যাচ্ছিল গলা। কিন্তু রেহাই নেই। পরলোকগত ভাতৃসম, প্রিয়বন্ধুর কথা মনে করে নিঃশব্দে, একাকিত্বে একটু চোখের জল ফেলবেন, সেখানেও হাজির সাংবাদিকেরা। "এবার আপনি কী করবেন, প্যারেলালজি?" প্রশ্নটা চাবুকের মতো এল। চমকে ওঠেন প্যারেলাল৷ ঘোলাটে চোখে এক মুহূর্ত কী যেন ভাবেন। তারপর বলেন, "জিনা পড়েগা... মজবুরি হ্যায়। দোস্ত কে খাতির জিনা পড়েগা।"
আজ রাজন'জির মৃত্যু সংবাদে যতটা না তাঁর কথা, তাঁর অসামান্য গায়কী, পাণ্ডিত্য, মজলিশি মেজাজ আর দিলখোলা হাসির কথা মনে পড়ছিল, বারবার মনে পড়ছিল সাজন'জির কথা। একমুহূর্তে করোনা কেড়ে নিয়েছে অগ্রজ'কে। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে হরিহর আত্মা। রাজন'জির নিজেরই কথায় - "আপ মানো ইয়া না মানো, হাম দো জিসম, এক জান। কভি কই জুদা নহি কর সকতা!" সাজন'জি বলতেন, "জিসম যব তক হ্যায়, সুর হ্যায়। জিসম নহি তব ভি সঙ্গীত রহেগা।" মনে পড়ছিল, কী করছেন এখন অনুজ'টি। প্যারেলাল'জির মতো তিনিও বুঝি এখন একা একা চোখের জল ফেলছেন, স্মৃতিমন্থন করছেন তাঁর প্রিয় 'ভাইসাহেব'-র! অভ্যাস করছেন একা একা বেঁচে থাকার কঠিন পাঠক্রম।
পণ্ডিত রাজন বা সাজন মিশ্র কখনও পৃথক সত্ত্বায় বিশ্বাস করতেন না। তাঁদের নাম একই সাথে, একই সুরে উচ্চারিত হতো৷ পণ্ডিতজি'দের বাবা বেনারস ঘরানার অন্যতম পথিকৃৎ হনুমান প্রসাদ ও কাকা, প্রখ্যাত সারেঙ্গীবাদক গোপাল প্রসাদ মিশ্রের কড়া নির্দেশ ছিল, একসাথে গাইবেন তাঁরা৷ একসাথে পা মেলাবেন মার্গ সংগীতের পথে। সুরের বিস্তার কিম্বা রাগদারি'তে সমান অংশীদার হবেন দুই ভাই। সেই আজ্ঞা শেষদিন পর্যন্ত বহন করেছেন তাঁরা। কাশীর সঙ্কটমোচন মন্দির থেকে দিল্লির কামানি, সওয়াই গন্ধর্ব ফেস্টিভ্যাল থেকে ইউরোপ, গোটা পৃথিবী তাঁদের জেনেছে 'এক নামে'। আজ সেই নাম থেকে একটি নাম মুছে গেল। ২৫ এপ্রিলের সন্ধ্যা কেড়ে নিল বড়ে মিশ্র'জিকে৷ সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে নেমে এল অতিমারী।
বেনারস মানে শুধুই কাশী বিশ্বনাথ নয়, বেনারস ঘরানাও। তালবাদ্য হোক বা খেয়াল-ধ্রুপদ, কাশীর বিখ্যাত চন্দনকাঠের সুগন্ধ লেগে আছে এই ঘরে। আনোখেলাল, সামতা প্রসাদ, কণ্ঠে মহারাজ, রাম দাস মিশ্র, কিষেণ মহারাজ, মহাপুরুষ মিশ্র, গিরিজা দেবী, বড়ি মোতিবাঈ, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, মহাদেব প্রসাদ, দীনানাথ মিশ্র, চুন্নুলাল মিশ্র...এই তালিকা ফুরোবার নয়। বরুণা ও অসির সঙ্গমে যে খেয়ালের উদ্ভাস, তার'ই মাধূর্য কণ্ঠে তুলেছিলেন 'মিশ্র বন্ধু'রা।
কাশীর আকাশে বাতাসে যে সুর, তাতে স্বয়ং স্বয়ম্ভু পিনাকপাণির অধিষ্ঠান। শিববন্দনা এখানে, অলি- গলিতে কান পাতলে শোনা যায়৷ সেই সুরে মথিত হয়েছিল 'মহল্লা কবীর চৌরাহা'-র মিশ্র খানদানও৷ পাঁচের দশকে এই মহল্লা থেকেই দুই ভাই বিশ্বজয়ে বেরিয়ে ছিলেন। যেখানেই গেছেন কুড়িয়েছেন শ্রদ্ধা, খ্যাতি, প্রশংসা। সাজন'জি এক সাক্ষাৎকারে বলে ছিলেন, দাদা 'পথ' দেখান, তিনি সেই পথে 'নিশান' আঁকেন। রাজন'জির মতে, 'ভাইস-ই-ভার্সা'। অথচ প্রকৃতির নিয়মে শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনার এই পথে ধরা দিয়েছে সংসার, গার্হস্থ্য যাপন। সোশিওলজি নিয়ে এমএ করে চাকরিতে মন দিয়েছিলেন রাজন মিশ্র'জি। তখনই আলাপ নামধারী শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পণ্ডিত জগজিৎ সিং-র সাথে৷ 'নকরি ছোড় দো। ইয়ে তুমহারা কাম নেহি'-বলেছিলেন জগজিৎ 'মহারাজ'জি। পত্রপাঠ চাকরি ছেড়ে ফের সঙ্গীতের দুনিয়ায় ফেরেন রাজন। বাকিটা ইতিহাস।
বেনারস ছেড়ে উঠে আসেন দুই ভাই দিল্লিতে৷ রমেশ নগরে। নতুন করে শুরু হয় পথচলা৷ অল ইন্ডিয়া রেডিও'তে তখন প্রতি সন্ধ্যায় আছড়ে পড়ছে 'মিশ্র ব্রাদার্স'দের সুরের ঝড়। দীর্ঘদিন গ্রেড 'এ' আর্টিস্ট রূপে কাজ করেছেন দু'জনেই। ১৯৭৮ সালে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, শ্রীলঙ্কায়। মে দিবসের অনুষ্ঠানে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি'তে সংগীত পরিবেশন। তারপর ইউরোপ জয়৷ কতই না সম্মান, পুরষ্কারাদি।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সে সব স্মৃতি তুলে ধরেন তাঁরা। হল্যাণ্ডে হয়েছিল এক অদ্ভুত ঘটনা৷ পৃথিবীর যে যে প্রান্তেই তাঁরা গেছেন, উপচে পড়েছে মানুষের ভিড়। হাততালি, সাধুবাদে ভরিয়ে দিয়েছেন দুই ভাই'কে৷ তাঁদের মন্দ্র সপ্তকের জাদু'তে মাত গোটা ইউরোপ। সব জায়গায় পেয়েছেন 'স্ট্যাণ্ডিং অভেশন'। উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস ও হাততালির ঝড়ে ফেটে পড়েছে তাবড় অডিটোরিয়াম৷ অথচ ব্যতিক্রম হল্যান্ড। সেখানে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সমবেত জনতা নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি, দেয়নি হাততালি। অলীক স্তব্ধতা ভর করে সভাগৃহে৷ মিশ্র'জি ভাবেন, শ্রোতাদের বুঝি একটুও ভালো লাগেনি তাঁদের গান। মনের দুঃখে দুজন বসে থাকেন গ্রীনরুমে৷ এমন সময় কয়েকজন দর্শক আসেন। তাঁরা বলেন, হাততালি দিয়ে ওই অপার্থিব সুরমণ্ডলের গভীরতা ও প্রভাব নষ্ট করতে চাননি কেউ। অনেকে বলেন, আজ তাঁদের ঈশ্বর দর্শন হল৷ এর পর থেকে কোনও অনুষ্ঠানে গেলে, তাঁরা আর্জি দিতেন, গানের শেষে যেন হাততালি না দেওয়া হয়।
১৯৮৫ সালে 'সুর সঙ্গম' পরিচালনা করেন দক্ষিণের পরিচালক কে বিশ্বনাথ৷ বিখ্যাত 'শঙ্করভরনম'-র হিন্দি রিমেক। সেই প্রথম বলিউডে মুখ দেখালেন রাজন-সাজন। সুরকার লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের সঙ্গীতে ১৩ টি রাগাশ্রয়ী গান গেয়েছিলেন দুই ভাই৷ গিরিশ কারনাডের লিপে জাদু ছড়িয়েছিলেন রাজন মিশ্র। ডুয়েট গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকরের সাথে। বিপুল জনপ্রিয়তা পায় তাঁদের গান। কিন্তু সেই প্রথম ও শেষ। আর বলিউডে পা রাখেননি তাঁরা।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উত্তরসূরী গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হয়েছেন দুই ভাই। এক মুহূর্তের জন্য কখনও আলাদা হননি। পঞ্চাশ বছরের সাঙ্গীতিক সফরে উপহার দিয়েছেন প্রায় ১৫৬ টি প্রচলিত, অপ্রচলিত, কূট, অতিকূট, বক্র, সুগম ও অগম রাগ। এক জীবনে এতো রাগ গাইলেন কী ভাবে, আজও তা রহস্য। দেরাদুন 'গুরুকুল' গড়ে তোলার পাশাপাশি সংরক্ষণ করেছেন সেই সব অজানা, অশ্রুত রাগের কাঠামো। অবসরে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে ছুটে গেছেন অরন্যে, পাহাড়ে। কখনো করবেট কখনো কেদারনাথে৷ শিষ্য শিষ্যাদের নিয়ে মেতে উঠেছেন চড়ুইভাতি বা ক্রিকেট খেলায়। কখনো আবার সিনেমায়। সাজন মিশ্র জানিয়েছেন, "দাদা, গান না গাইলে ভালো ক্রিকেটার হতেন। স্কুল টিমে দাপুটে ক্যাপ্টেন ছিলেন রাজন ভাইয়া।"
আজ জীবনের ২২ গজে সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারলেন না পণ্ডিত রাজন মিশ্র। মাত্র ৭০ রানেই থেমে গেল ইনিংস। বেনারসের মহল্লা কবীর চৌরাহা থেকে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হল দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কেয়ার হাসপাতালে। তবে এই সত্তরে সাত জন্মের অনাবিল সুরমূর্চ্ছনা শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন পণ্ডিতজি। আগামী একশো বছরেও তার অপার্থিব, অলৌকিক মাধূর্য হারাবার নয়৷ ১৫৬ রাগের পরতে পরতে মিশে আছেন তিনি, তাঁর ঐতিহ্য, গায়ণশৈলী৷ তার ক্ষয় নেই৷
চাইলে রাজন'জির পৃথক ছবি দেওয়া বা আলোচনা করা যেত৷ কিন্তু তাতে তাঁর সামগ্রিকতা তুলে ধরার প্রতি করা হতো অবিচার৷ রাজন-সাজন অবিচ্ছেদ্য এক নাম, এক যুগ, কালোত্তীর্ণ এক অভিজ্ঞতা যার পৃথককরণ অসম্ভব৷ আজ একটি নাম যেন 'অদৃশ্য' হয়েও, তার দৃশ্যমান্যতা আরও গভীর হয়ে ফুটিয়ে তুললো। একটি নাম বেঁচে রইলো, অন্য আরেকটি নামের সন্নিবেশে, সম্মোহিত, সমাহিত হয়ে।
রাজন'জির অনুজ পণ্ডিত সাজন মিশ্র'জির কথাই তাহলে সত্যি প্রমাণিত হল - "ইয়ে জিসম যব তক হ্যায়, সুর হ্যায়। জিসম নহি, তব ভি সঙ্গীত রহেগা।" সংগীতের সেই আলোকিত দরবারে, দরবারির রাজকীয়তায় চিরদিন বেঁচে থাকবেন পণ্ডিত রাজন মিশ্র।
No comments:
Post a Comment