Showing posts with label sagar veena. Show all posts
Showing posts with label sagar veena. Show all posts

Sunday, May 30, 2021

সাগর বীণার সম্রাজ্ঞীঃ নূর জ্যেহরা কাজিম



'You can find me where the music meets the ocean.' - Rumi  


সাল ১৯৭২। লণ্ডনে বসন্তকাল। 

স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এণ্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (SOAS) সাউথ এশিয়ান সেকশনের ইণ্ডিয়ান ডিপার্টমেন্ট। পড়ন্ত বিকেলের রোদ একটু একটু করে তখন পিছু হটছে কনসার্ভেটরির দেয়াল থেকে। 

ছোট্ট হলঘরে মুখোমুখি বসে দুই নারী, গুরু ও শিষ্যা। তাঁরা গল্প করছেন চোস্ত পঞ্জাবী ভাষায়, হাসছেন, মাঝেমধ্যে গাইছেন গান। ছোটচুলের সপ্রতিভ চেহারা ও মোটা পাওয়ারের চশমার আড়ালে দুটি উজ্জ্বল চোখের বয়স্ক মহিলাটি তাঁর বড় হয়ে ওঠা, গান শেখা, সূদূর পঞ্জাব থেকে শান্তিনিকেতন আসা, বিশ্বভারতী'তে তাঁর পড়াশোনা, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শ পাওয়ার গল্প শোনাচ্ছেন। তিনি রাজেশ্বরী 'বাসুদেব' দত্ত। রবীন্দ্রসংগীতের সেই বিখ্যাত 'পঞ্চকন্যা'র অন্যতম। সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় বান্ধবী। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বিদূষী স্ত্রী। SOAS এর 'লেকচারার অফ ইন্ডিয়ান মিউজিক'।    

উল্টোদিকে বসে সেই মেয়েটি। নূর জ্যহরা কাজিম। অবাক চোখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর 'ম্যাডামে'র গল্প শুনছে বছর একুশের তরুণী। সূদুর পাকিস্তান থেকে সে মিউজিক নিয়ে পড়তে এসেছে SOAS-এ। তাঁর রক্তে গান, প্রাণে রবি ঠাকুর, ইকবাল আর গালিব। গবেষণার বিষয় ভারতীয় যন্ত্রসংগীত, বিশেষ করে প্রাচীন তারের যন্ত্র 'বীণা' নিয়ে তাঁর কাজ। সুন্দরী, সোনালি চুলের মেধাবী মেয়েটি লাহোর থেকে লণ্ডনে আসার আগেই শুনেছিল তাঁর 'দত্তা ম্যাডামে'র কথা, তাঁর গায়কী, পাণ্ডিত্য আর সর্বোপরি 'নিঃসঙ্গতা'র কথা। মেয়েটির বাবা বলেছিলেন, উঁনি সাক্ষাৎ সরস্বতীর মানসকন্যা। যা পারো, যতটা পারো শিখে নাও। এই সুযোগ আর হবে না। বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল মেয়েটি। 

- 'নূর, একটা গান শুনবে?' বলে ওঠেন রাজেশ্বরী।

- 'বেশক! কেন নয়!' ঝলমলিয়ে ওঠে তরুণীটি। 

'দত্ত ম্যাডাম' গান ধরেন। রবীন্দ্রসংগীত। 'এ মোহ-আবরণ খুলে দাও, দাও হে'। ইমন রাগে, খেয়ালাঙ্গ। রবি ঠাকুরের ভাঙা গানগুলির মধ্যে অন্যতম। রাজেশ্বরী অসামান্য গায়কীতে যেন পড়ন্ত বিকেলের আলো উপচে পড়লো ঘরে। আর হবে নাই বা কেন! শুধু রবীন্দ্রসংগীতই না, একসময় কলকাতায় (১৯৪৫-৫৪) সঙ্গীতাচার্য গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, উস্তাদ দবীর খাঁ'র ছাত্র যামিনীনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে রাজেশ্বরী শিখেছেন ঠুমরি ও টপ্পা। পরবর্তী কিছু বছর বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপ্রতিম গোপেশ্বর বাড়ুজ্জ্যের পুত্র রমেশচন্দ্র ব্যানার্জির কাছে খেয়াল শিখেছেন নিষ্ঠাভরে। তাঁর গলায় এমন গান কী যে অদ্ভুত মাধুর্য ফোঁটায়...     

মেয়েটির মুখে ভাষা নেই। তাঁর চোখে জল। গান শেষ হতে অস্ফুটে বলে ওঠে - 'মাশা আল্লাহ'! রাজেশ্বরী জানান, গুরুদেব নিজে শিখিয়েছেন এই গান। নূর কী বলবে! সে তখন আপ্লুত। আনন্দে, অপার মুগ্ধতায় তাঁর মুখে কথা সরছে না। রাজেশ্বরী তাঁর দিকে তাকান। মেয়েটি বলে, 'ম্যাডাম যেদিন আমার বাবা তাঁর স্বপ্নের বীণাটি তৈরি করতে পারবেন, এই গান আমি বাজাব।' সেই গান যাতে মেয়েটি খুঁজে পেয়েছিল পঞ্জাবী টপ্পার প্রভাব। 'বেশ তো!' - হাসিমুখে সম্মতি জানিয়েছিলেন রাজেশ্বরী। 

বিলেতে পড়াশোনা শেষ করে লাহোরে ফিরে সেই কথা রেখেছিল মেয়েটি। বাবার তৈরি সাগর বীণায় প্রথম বাজিয়েছিল সেই সুর। 'ডন' পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী কালে গোটা উপমহাদেশ যাকে চিনবে পাকিস্তানের একমাত্র মহিলা বীণাবাদক রূপে। তিনি নূর জ্যহরা কাজিম। যন্ত্রসঙ্গীতের এক অপার বিস্ময়, অসামান্য প্রতিভা। 

*

The concept and the image of musical sound having such abilities is basically a product of a serious inquiry into the fundamentals of music and musical sound in Indian Classical Music, and the effects they evoke within the artist and the listener.


১৯৫১ সালে পাকিস্তানের লাহোরে জন্ম নূর জ্যহরা কাজিমের। বাবা রেজা কাজিম ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী, চিন্তাবিদ ও সঙ্গীতজ্ঞ। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ায় জন্ম তাঁর।   

আপাদমস্তক কমিউনিস্ট চিন্তাধারার মানুষ রেজা শুধু উচ্চশিক্ষিতই ছিলেন না, ছিলেন বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিত, মুক্তমনা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশারদ। মাত্র ১২ বছর বয়সে জড়িয়ে পড়েন 'ভারত ছাড়ো আন্দোলনে'। যোগ দেন কংগ্রেসে। পরে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তানে (সিপিপি)। পরে ১৯৫১ সালে সিপিপি ত্যাগ করে ওকালতি'তে মনঃনিবেশ করেন। নব্য পাকিস্তানে গনজাগরণ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে বহুবছর জেলও খাটেন রেজা। তাঁর এমনই ছিল প্রভাব যে আয়ুব খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর জমানায় সরকারি মন্ত্রীত্বের অফার পান তিনি। কিন্তু শাসনতন্ত্রে আস্থাভাজন না হওয়ায় সেই পদ প্রত্যাহার করেন তিনি। জিয়াউল হকের জমানায় সরকারি উপদেষ্টার পদ পান তিনি। কিন্তু তাও প্রত্যাহার করেন তিনি। ফল স্বরূপ দীর্ঘ সময় জেল খাটতে হয় তাঁকে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবনে ইতি টেনে ওকালতি ও সঙ্গীতচর্চায় মেতে ওঠেন রেজা। হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশারদ রেজা পছন্দ করতেন তারের যন্ত্র। নিজে ভালো রবাব ও বীণা বাজাতে পারতেন। দীর্ঘ দশ বছরের চেষ্টায়, ১৯৭১ সালে বানাতে সক্ষম হন তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি 'সাগর বীণা'। দক্ষিণ ভারতীয় প্রাচীন চিত্র ও বিচিত্রবীণার যুগলবন্দীতে সৃষ্টি এই বীণার। সুরবাহারের আঙ্গিকে তৈরি করেছিলেন আরেকটি তারযন্ত্র 'শ্রুতিবাহার'।  

'সাগর বীণা' সৃষ্টির বহু আগেই বিবাহ করেন তিনি। তাঁর দুই মেয়ে - নূর জ্যহরা কাজিম ও বেলা রেজা জামিল। মেয়েদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিমও দেন তিনি। নূর সঙ্গীত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন আর বেলা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যান। দুই কৃতি মেয়ের বাবা, রেজা কাজিম ১৯৯৫ সালে লাহোরে গঠন করেন 'সঞ্জননগর ইন্সটিটিউট অফ ফিলজফি এণ্ড আর্ট'। শুরু করেন পঠনপাঠন ও সংগীত বিষয়ক গবেষণা নিয়ে নিরন্তর ও অন্তরঙ্গ চর্চা। নিজের মেয়েদের মধ্যেও নিয়ে আসেন সেই চর্চার ইতিকথা। 

* 

বাবার দেখানো পথ ধরেই হেঁটেছেন নূর। ছাত্রী হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে ঢেলেছেন সুরের সাম্রাজ্যে। শিখেছেন গান, সেতার, সুরবাহার। তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন রেজা। মেয়েকে আরও বেশি করে নিজের হাতে গড়েপিঠে নেন তিনি। পঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে ৭১'এ পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। ভর্তি হন SOAS এ। প্রিয় ছাত্রী হয়ে ওঠেন তৎকালীন শিক্ষিকা রাজেশ্বরী দত্তের। একদা রাজেশ্বরী নিজেও ছিলেন পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী৷ সংস্কৃত ও ফার্সিতে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন তিনি। হয়েছিলেন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। পরে চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। বাকিটা ইতিহাস।  

নূর'কে নিজের হাতে গড়েছিলেন রাজেশ্বরী। কণ্ঠসংগীতের পাশাপাশি চলে যন্ত্রসঙ্গীতের তালিম। বহুদিন SOAS এ ছিলেন নূর। এবার পাড়ি দেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে, ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে আলী আকবর কলেজ অফ মিউজিকে ভর্তি হন তিনি। উস্তাদ আলী আকবর খানের কাছে বীণা ও সেতারে দীর্ঘদিন তালিম নেন নূর। সাতের দশকের শেষে দেশে ফিরে আসেন নূর। সেতার ও রুদ্রবীণার তালিম নেন এটাওয়া ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী উস্তাদ শরীফ খান পুঞ্চওয়ালের কাছে। শরীফ তাঁর 'ওয়ালিদ' উস্তাদ রহীম বখশ খানের কাছে প্রথম নেন ধ্রুপদী সংগীতের তালিম। এই রহিম ছিলেন স্বয়ং কিংবদন্তি সেতারি ইমদাদ খানের প্রিয় শিষ্য ও পুঞ্চের মহারাজার দরবারি শিল্পী। অর্থাৎ যন্ত্রসঙ্গীতে একাধারে 'বাবা' আলাউদ্দিন খানের সেনিয়া মাইহার ঘরানা, এবং অন্যদিকে ইমদাদ খান, এনায়েত খানের এটাওয়া ঘরানার 'বাজে' সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন নূর জ্যহরা কাজিম। আটের দশক থেকে হাতে তুলে নেন তাঁর বাবা রেজা কাজিমের 'সাগর বীণা'। 

*

দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে সাগর বীণা বাজাচ্ছেন নূর। পাকিস্তানে তিনিই একমাত্র শিল্পী যিনি এই বিরল যন্ত্রটি বাজান। সাগর বীণা সম্পর্কে তাঁর মত - 

”The prime objective behind the Sagar Veena was to provide the artist with a rich and extensive palette of musical sounds and timbres evoking different kinds and degrees of pleasure.” 

পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত সহ সারাবিশ্বে এই মুহুর্তে সাগর বীণার মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন রাজেশ্বরী দত্তের এই অজানা ছাত্রী। বীণাবাদ্যে তৈরি করেছেন নয়া "সজ্জন সংগীত" অঙ্গ। পাল্লা দিয়ে সামলাচ্ছেন তাঁর বাবার তৈরি 'সঞ্জননগর ইন্সটিটিউট অফ ফিলজফি এণ্ড আর্ট'র দায়িত্ব। সাগর বীণার তালিম দিচ্ছেন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের। তাঁর স্বামী আলি কাজিম ও দুই সন্তান তাঁরই সাথে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সাগর বীণার সুরেলা আহবান। 

সমুদ্রের ধ্বনি যেখানে মিশে আছে সুরের ছোঁয়ায়, সেখানে দাঁড়িয়ে বীণা হাতে এক নতুন পৃথিবীর ছবি আঁকছেন নূর, নূর জ্যহরা কাজিম। সাগর বীণার একচ্ছত্র সুরসম্রাজ্ঞী। 

                                                                      
* ছবিঃ দ্য ইনার ম্যাগাজিনের সৌজন্যে।