Showing posts with label kumar gandharv. Show all posts
Showing posts with label kumar gandharv. Show all posts

Sunday, May 30, 2021

গোরক্ষগীতি ও দিব্যোন্মাদ এক গায়ক





সে এক অলৌকিক, অতীন্দ্রিয় সময়। 

আনুমানিক পঞ্চদশ খ্রীস্টাব্দ। কিংবদন্তি অনুসারে, মহাতীর্থ কাশী'তে পা রেখেছেন নাথপন্থী কুলশ্রেষ্ট, মহাযোগী, জ্ঞানতাপস, সাক্ষাৎ রুদ্রাবতার মহাগুরু গোরক্ষনাথ। 

লোকে বলে শিবের অংশ তিনি। হাবেভাবে সাক্ষাৎ মহাদেব। তাঁর একহাতে ত্রিশূল, অন্যহাতে বরাভয়। চোখা মেজাজ, চওড়া কপাল, পরনে বাঘছাল ... বহুদূর থেকে এসেছেন তিনি। এসেছেন শাস্ত্রচর্চার জন্য। 

গুরু গোরক্ষনাথ নিজে সর্বজ্ঞ। তিনি শুনেছেন পরমপুরুষ, মহাসাধক স্বামী রামানন্দের কথা। তাঁর সাথে শাস্ত্রাভ্যাস করতেই গোরক্ষনাথের কাশীতে আগমন। 

-------
"योगी गोरखनाथ प्रतापी, तासो तेज पृथ्वी कांपी।
काशी नगर में सो पग परहीं, रामानन्द से चर्चा करहीं।"
-------

রামানন্দ পরম বৈষ্ণব। ভক্তি আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ।  ধীর স্থির সৌম্য শান্ত স্বভাবের মানুষ। অদ্বৈত বেদান্ত যার করায়ত্ত। মহাপণ্ডিত অথচ অনাড়ম্বর জীবন যাপন তাঁর চর্চাগত। লোকে বলে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। 

গোরক্ষনাথ দেখলেন একটি উঁচু পাথরের উপর ধ্যানস্থ রামানন্দ। হাতের ত্রিশূল শানিয়ে হুঙ্কার দিলেন তিনি - "ওহে রামানন্দ, চোখ খোলো। আমি গোরক্ষনাথ। তোমার সাথে শাস্ত্রচর্চা করতে এসেছি। আজ দেখি, তুমি কত বড় পণ্ডিত!" 

রামানন্দ চোখ খোলেন। স্মিত হেসে মোহান্ত গোরক্ষনাথকে শ্রদ্ধাপূর্বক প্রনাম করে বলেন, "আমি সামান্য মানুষ। ভাগবত চর্চা করে দিন কাটাই। শ্রীহরির চরনদাস আমি। কিই বা জানি শাস্ত্রের যে আপনার মুখোমুখি হবো?" তিনি বলেন - "অনেক দূর হতে এসেছেন। কুটিরে বিশ্রাম নিন, আহারাদি করুন। শাস্ত্রচর্চা পরে হবে না'হয়।" 

গোরক্ষনাথ এত সহজে ভোলার পাত্র নন। "সে কী হে! এত বড় পণ্ডিত তুমি! এতেই ভয় পেয়ে গেলে! লোকে বলে তুমি মায়াবী শক্তির অধিকারী, বেদজ্ঞ, ত্রিলোকদর্শী। তা দেখি তোমার শাস্ত্রজ্ঞান কতখানি!" 

"নাথ'জি! আগে আমার সাথে শাস্ত্রচর্চা করুন। সন্তুষ্ট না হলে আমার গুরুর সঙ্গে শাস্ত্রচর্চা না হয় করবেন।" - আচমকা বালক কণ্ঠ শুনে চমকে যান গোরক্ষনাথ। অবাক হয়ে দেখেন গুরু রামানন্দের পায়ের কাছে করজোড়ে বসে আছে তাঁরই কনিষ্ঠতম শিষ্য - কবীর দাস। তাঁর মুখে দিব্য আভা, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি। সেই বালক কবীর দাস-ই কিনা মহাযোগী গোরক্ষনাথকে ছুঁড়ে দিয়েছেন খোলা 'চ্যালেঞ্জ'! এ যে অভাবনীয়!  

-----
"कह कबीर सुन गोरखनाथा, चर्चा करो हमारे साथा।
प्रथम चर्चा करो संग मेरे, पीछे मेरे गुरु को टेरे।"
-----

হোহো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন গোরক্ষনাথ৷ বলেন, "তোমার আস্পর্ধা তো কম নয় হে! তুমি কী জানো কার সাথে কথা বলছো? কালকের ছোকরা বলে কিনা আমার সাথে শাস্ত্রাভ্যাস করবে? বয়স কতো তোমার? আর কবেই বা তুমি যোগী হলে?" 

------
"बालक रूप कबीर निहारी, तब गोरख ताहि वचन उचारी।
कबके भए वैरागी कबीर जी, कबसे भए वैरागी?"
------


স্মিত হাসেন কবীর। তাঁর কপালে চন্দনপ্রলেপ ও টিকা। কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, মাথায় বৈষ্ণবীয় টুপি, কবীর দাসজি বলেন, "যখন এই সৃষ্টি ছিল না, যখন ছিল না কোনো শব্দ কল্প দ্রুম, ছিল না স্থিতি লয় মন্ত্র তখন হয়েছে জন্ম আমার। আমারই ধ্বনি থেকে প্রকৃতি পেয়েছে তার বাক। আমার বয়স ততটাই যতটা এই কালাকাল। জন্মাবধি শুরু এই সাধনা। জন্মাবধি শুরু এই বৈরাগ্য। সেই মুহূর্ত থেকে আমি যোগী।" কবীর বলেন, আমিই সেই সদপুরুষ যার সম্মুখ দিয়ে পার হয়েছে চারটি যুগ। গুরুর সান্নিধ্যে প্রাপ্ত হয়েছে অপার পূর্ণতা। আমার মধ্যেই সত্যের প্রকাশ, আমি তত্ত্ব, আমিই জ্ঞান। আমিই অজ্ঞান, নির্গুণ ও সদজ্ঞানের আকার। আমার সামনে সহস্য ব্রহ্মের প্রয়ান, লক্ষ বিষ্ণুর গমন আর কোটি মহেশ্বরের নিদান তবু আমার এক মুহুর্তেরও ক্ষয় নেই, কারণ আমি জন্ম আর আমিই মৃত্যু। আমিই শুরু আর আমি শেষ। আমার বয়েস এতটাই।

-----
अरबों तो ब्रह्मा गए, उनन्चास कोटि कन्हैया।
सात कोटि शम्भू गए, मोर एक नहीं पलैया।।
कोटिन नारद हो गए, मुहम्मद से चारी।
देवतन की गिनती नहीं है, क्या सृष्टि विचारी।।
नहीं बुढ़ा नहीं बालक, नाहीं कोई भाट भिखारी।
कहैं कबीर सुन हो गोरख, यह है उम्र हमारी।।
-----

উদ্ভাসিত হন গোরক্ষনাথ। বলে ওঠেন, "সাধু সাধু! তোমার বয়েস এতটা অথচ তোমায় দেখে তো শিশু বলে মনে হয়।" কিন্তু তিনিও যে স্বামী গোরক্ষনাথ। মহাযোগী, মহাভাগ, মহাতাপস। এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। 

আচমকা সশব্দে হেসে উঠে তিনি তাঁর হাতের সাত ফুট লম্বা ত্রিশূলটিকে মাটির মধ্যে গেঁথে দিলেন। তার পর অজানা মন্ত্রবলে শূন্যে ভেসে উঠে সেই ত্রিশূলের মাথায় চড়ে বসলেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ত্রিশূলের মাথায় তিনি বসে, অথচ ত্রিশূলের সূচালো ফলা তাঁর শরীর স্পর্শ করেনি, হয়নি কোন রক্তপাত। ত্রিশূলাগ্র থেকে গোরক্ষনাথ রাখলেন, "ওহে কবীর দাস! তোমার ভাষণ তো শুনলাম। দেখি তোমার অলৌকিক গুণপনা। আমার সাথে শাস্ত্রালোচনা করতে হলে আমার সমান আসনে বসে দেখাও।" 

এবার কবীর দাস অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, "নাথ জি! এ আপনার কেমন খেলা? আমরা শাস্ত্রাভ্যাস করতে এসেছি। এসব নাটক করতে নয়। দয়া করে নীচে নেমে আসুন ও ভক্তিমার্গ বর্ণনা করুন।" কিন্তু গোরক্ষনাথ অবিচল। মাটি থেকে সাত ফুট উপরে বসে তিনি এবার কবীর দাস ও তাঁর গুরু আচার্য রামানন্দকে নানাবিধ ভৎসনা শুরু করলেন। বাধ্য হয়ে এবার কবীর এগিয়ে এলেন। 

ঝোলা থেকে বের করলেন একটি লম্বা সুতলি। সে সুতোর একপ্রান্ত হাতে ধরে, অপর প্রান্ত তিনি ছুঁড়ে দিলেন আকাশে। আর কী আশ্চর্য! কোন জাদুবলে সেই ১৫০ ফুট লম্বা সুতো, লাঠির ন্যায় শক্ত হয়ে শূন্যে ভেসে উঠলো। আর দেখতে দেখতে কবীর জি নিজেও ভেসে উঠলেন শূন্যে। ভাসতে ভাসতে গিয়ে বসলেন সুতোর অগ্রভাগে। গোরখনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, "আসুন নাথ'জি! এই উচ্চতায় বসে এবার তবে শাস্ত্রচর্চা করা যাক। এই শূন্যের ঘর আমাদের জ্যোতির্চচার আশ্রয়৷" 

এই দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন গোরক্ষনাথ। সেই ত্রিশূল শীর্ষ থেকে নেমে এলেন মাটিতে৷ করজোড়ে কবীরকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে আপনি হে বালক মহাত্মা? আপনি তো সাধারণ মানুষ নন। দয়া করে বলুন কে আপনি? কোন লোক থেকে এসেছেন তা বলুন? আপনার প্রকৃত পরিচয় দিন?" গোরক্ষনাথ কাতর কণ্ঠে আর্জি রাখেন কবীরের সামনে৷ হেসে ওঠেন কবীর। শূন্য থেকে ভূমিতে নেমে এসে তিনি আসেন। বলেন, "শূন্য দিয়ে রচিত যে ঘর আমাদের সেই ঘরের মর্ম অনুধাবন করুন নাথ'জি।" 

বালক কবীরের মুখে সেই অদ্ভুত বাণী শুনে যেন নতুন দর্শনের আলো দেখতে পান গোরক্ষনাথ। "এ কী গভীর বাণী এলো ঘন মেঘের আড়াল থেকে"! নিমেষে দূর হল শতেক অহংকার, সহস্র মোহ। সে অপার্থিব মূহুর্তে তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল সেই কালোত্তীর্ণ রচনা - 

"শূন্য গড় শহর / শহর ঘর বসতি
কৌন সুতা কৌন জাগে হ্যায় 
লাল হামরে / হাম লালন কে
তন সুতা ব্রহ্ম জাগে হ্যায়।" 

--------
"शून्य गढ शहर शहर घर बस्ती कौन सूता कौन जागे है
लाल हमरे हम लालान के तन सोता ब्रह्म जागे है"
-------

[In the empty fort, a city, In the city, a settlement; Who sleeps? Who wakes?
My Love is mine, I am my Love; The body sleeps, the Spirit wakes.]

* 
 
ছয়ের দশক, মহারাষ্ট্র। কোলাবার গুণীজন সভায় গান গাইতে এসেছেন এক গায়ক। দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা কাটিয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর নাম কুমার গন্ধর্ব। ১৯২৪ সালের ৮ এপ্রিল কর্ণাটক, বেলগামে সুলাভাবি গ্রামে তাঁর জন্ম। 

তিনি 'চাইল্ড প্রডিজি'। বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ বি আর দেওধরের ছাত্র'টি মাত্র ৫ বছর বয়সে দেখিয়েছেন তাঁর অসামান্য প্রতিভা। আব্দুল করিম খান হোক, বা 'আফতাব এ মৌসিকী' উস্তাদ ফৈয়াজ খান - তামাম ফনকার'দের গায়কী হুবহু নকল করে গেয়ে শোনাবার ক্ষমতা রাখতেন তিনি। মাত্র ১০ বছর বয়সে যার প্রথম 'স্টেজ পারফরম্যান্স' দেখে তাক লেগেছিল সমস্ত শ্রোতাদের। অসাধারণ ব্যতিক্রমী তাঁর গায়কী৷ ২০ বছর বয়স ছুঁতে না ছুঁতেই সবাই কায়মনোবাক্যে ধরেই নিয়েছেন হিন্দুস্তানী মার্গ সংগীতের 'নকশা' পাল্টাতে অবতীর্ণ হয়েছে এই 'বিস্ময় বালক'। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে গন্ধর্বের খ্যাতি।

কিন্তু 'চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়'। খুব অল্প বয়সে টিউবারকিউলোসিসে আক্রান্ত হন গন্ধর্ব। এতটাই মারাত্মক সেই 'ক্ষয়রোগ' যে চিকিৎসক'রা বলে দেন, আর কোনও দিন গান গাইতে পারবেন না তিনি। জলহাওয়া বদলের জন্য চিকিৎসক-রা তাঁকে মধ্যপ্রদেশের দেবসে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মতো স্ত্রী ভানুমতীকে নিয়ে দেবস যাত্রা করেন কুমার গন্ধর্ব।


এরপর অসহ্য কয়েকটি বছর। টানা সাত বছরের বেশি সময় ঘরবন্দী হয়ে কাটালেন তিনি। রেওয়াজ করতে পারতেন না অসুস্থতার জেরে। বনজঙ্গল, পাহাড়নদী ঘেরা সেই জায়গায় ছোট্ট ঘরের বাইরে খাটিয়া পেতে শুয়ে শুয়ে পাখির ডাক, প্রকৃতির ডাক শুনতেন তিনি। আত্মস্থ হতেন তাদের সাথে। এই সময়েই নির্গুণি সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সন্ত কবীর হয়ে ওঠেন তাঁর আরাধ্য। নির্গুণী ভজন গেয়ে গেয়েই আস্তে আস্তে ফিরে পাব ফের গাইবার ক্ষমতা। 

১৯৫৩ সালে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও মঞ্চে উঠে আসেন গন্ধর্ব। তাঁর ওজস্বী কণ্ঠ, আর সাধুসুলভ বেশভূষা দেখে চমকে যান সকলে। তাঁর কণ্ঠে অবলীলায় খেলা করছেন নানক, কবীর, দুদ্দু শাহ, গোরখনাথেরা। অপ্রচলিত দোঁহায় রাগ-সংগীতের আকার দিয়ে এক নতুন মায়ালোকের রচনা করেন কুমার গন্ধর্ব। এ এক 'অন্য' গন্ধর্ব, যিনি ভক্তিমার্গে সম্পৃক্ত, খুঁজে পেয়েছেন এক অনন্ত জীবনদর্শন।

ষাটের দশকে কোলাবায় স্ত্রী (দ্বিতীয় পক্ষ) বসুন্ধরা কোমকলির সঙ্গে কুমার গন্ধর্বের সেই 'কামব্যাক' সেকেন্ড পারফরম্যান্সের প্রায় গোটা'টাই ছিল সন্ত কবীর ও গোরক্ষনাথের দোঁহা নির্ভর। গন্ধর্ব তাঁর খেয়াল গানের পাশাপাশি নির্গুণী ভজন পরিবেশন করেন। সেই অলৌকিক ভজন যারা শুনেছেন তারা জানিয়েছিলেন, ঈশ্বরিক কৃপা না থাকলে ওই গান ও তার অনবদ্য ব্যাখা কোনও সাধারণ মানুষের মুখ দিয়ে বেরোয় না। তিনি গাইতে গাইতে কাঁদছেন কাঁদতে কাঁদতে হাসছেন...মঞ্চে যেন কুমার গন্ধর্ব নন, স্বয়ং কবীরদাস নেমে এসেছেন সারস্বতচর্চায়।

নয়ের দশকে গন্ধর্বের শেষ অনুষ্ঠানেও ধ্বনিত হয়েছিল এই অলৌকিক গান...গাইতে গাইতে যেন ভাবসমাধি প্রাপ্ত হন তিনি...গোরক্ষনাথের সেই গান আজও ভারতীয় দর্শনে অদ্বৈতবাদী ভাবধারা ও ব্রহ্মচর্চার আধার রূপে পরিগণিত। যাকে সার্থক রূপ দিয়েছিলেন আরেক দিব্যোন্মাদ শিল্পী - পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব।