Sunday, May 30, 2021

দর্দ সে মেরা দামন ভর দেঃ একটি গানের জন্ম ও মৃত্যু


"ম্যয়নে তুঝসে চাঁদ সিঁতারে কব মাঙ্গে
রোশন দিল, বেদার নজর দে, ইয়া আল্লাহ..."

*

জুলাই, ১৯৯০ সাল। মুম্বই। অভিনেত্রী অঞ্জু মহেন্দ্রর বাসভবনে এক গজল সন্ধ্যা তখন ক্রমশ শেষের মুখে। গান গাইছেন গজল সম্রাট জগজিৎ সিং। উপস্থিত রয়েছেন বলিউডের বহু খ্যাতনামা ব্যাক্তিত্ব। জগজিৎ'র গানে অতিথি-অভ্যাগতরা মন্ত্রমুগ্ধ। একের পর এক গজলে শ্রোতাদের বেঁধে রেখেছেন জগজিৎ, এমনই তার কন্ঠের জাদু। তামাম হিন্দুস্তান কেন তাকে গজল সম্রাট বলে ডাকে তা সেদিন বুঝেছিলেন সবাই।

জগজিৎ গাইছেন, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাত। সময় কোথা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। গালিবের একটি গজল গেয়ে হারমোনিয়াম বন্ধ করলেন জগজিৎ। সাথে সাথে দ্রুত এগিয়ে এলেন অঞ্জু। "একটা শেষগান হয়ে যাক"। হেসে ফেলেন জগজিৎ - "এখনও আশ মেটেনি! আচ্ছা, বলুন কি গান শুনবেন?" অঞ্জু কুন্ঠা ভরে জানালেন - "দর্দ সে মেরা দামন ভর দে ইয়া আল্লাহ।" চমকে উঠলেন জগজিৎ। হঠাৎ এই গান? নাহ, তিনি এই গান কিছুতেই গাইবেন না। এ বড় বিষাদের গান। কেমন যেন মৃত্যুর ছোঁয়া, স্বজন হারানোর শোক লেগে আছে এই গানের সুরে। এমন আনন্দমুখর পরিবেশে তা বড় বেমানান। নাহ, এই গান কিছুতে গাইবেন না তিনি। কিন্তু অঞ্জু নাছোড়। তার সঙ্গে পাল্লা দেন অতিথিরা। তারাও সেই গানই শুনতে চান। সম্মিলিত অনুরোধের কাছে হার মানেন জগজিৎ। এবার আর মানা করতে পারেন নি তিনি। স্মিত হেসে টেনে নেন হারমোনিয়াম। শুরু হয় আসরের শেষ গান। 

"ইয়া ধরতি কে জখম পর মরহম রাখ দে
ইয়া মেরা দিল পাত্থর কর দে, ইয়া আল্লাহ!"

*

বড় অলৌকিক সে গান। বড় মায়াবী, আর্তি মাখা তার কথা যা কিনা লিখেছিলেন বিখ্যাত শায়ের কাতিল সিঁফাই (১৯১৯-২০০১)। এও শোনা যায়, একমাত্র মেয়ের অকালপ্রয়াণে এই গজল লিখে ছিলেন সিঁফাই। পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে এক পিতার নিবিড় আর্তি, বুকের গহীন অন্তঃস্থল থেকে বেরিয়ে আসা অতৃপ্তির আভাস, অনুযোগের এক মরমি দাস্তান। জগজিৎ'র নিজেরও বড় প্রিয়গান এটি। নতুন করে সুর দিয়েছেন তিনিই। রাগ আহীর ভৈঁরোর ছোঁয়ার সেই গানের পরিপূর্ণতা। বড় প্রিয় রাগ। সে রাগের সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ নিংড়ে গাইছেন জগজিৎ। গাইছেন নাকি ধ্যানস্থ? ভোরবেলার রাগে বুঝি এতো বিষাদ থাকে? তার চোখ উপচে নেমে এসেছে জল। জগজিৎ কাঁদতে কাঁদতে গাইছেন, গাইতে গাইতে কাঁদছেন। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। প্রতিটি কথা, সুর নিংড়ে উঠে আসছে লোনা জল। জগজিৎ একা নন, সেই অদ্ভুত গান শুনে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন শ্রোতারাও। তাদের হাতে থমকে আছে পেয়ালা। আত্মস্থ, ধ্যানস্থ জগজিৎ সিং'র সেদিকে হুঁশ নেই। তিনি শেষ করছেন - "ইয়া মেরা দিল পাত্থর কর দে, ইয়া আল্লাহ।" 

গান শেষ হল। গোটা বাড়ি থমথমে। কারুর মুখে কোন কথা নেই। কথা নেই জগজিৎ'র মুখেও। মাথা নিচু, একটা হাত হারমোনিয়ামে এলিয়ে বসে থাকেন তিনি। কেটে যায় কয়েক মূহুর্ত। স্তব্ধতায়। এক বৃদ্ধ ওয়েটার এগিয়ে আসেন। সিং সাহেবের পায়ের কাছে বসে হাতজোড় করে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি। জানান, সদ্য তার নাতি মারা গেছে চারদিনের জ্বরে। এই গান শুনলে শিশুটির আত্মা শান্তি পেতো। জগজিৎ তার হাত জড়িয়ে ধরেন। সান্ত্বনা দেন। এগিয়ে আসেন অঞ্জু মহেন্দ্র সহ অন্যান্য অতিথিরা। তাদের মুখেও ভাষা নেই। সেই দুকূল ছাপানো নীরবতা অনেক কিছু বলে দেয়। এক পৃথিবী বিষাদ নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য প্রস্তুত হন সকলে। ঠিক এমন সময়...

বেজে ওঠে টেলিফোন। সেই ফোন জগজিৎ সিং'র জন্য। ফোন এসেছে মেরিন ড্রাইভ পুলিশ স্টেশন থেকে। সাথেসাথে এক চাপা উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এরপরেই আসে সেই নিদারুণ সংবাদ। সেই রাতে মেরিন ড্রাইভে ঘটে গেছে এক ভয়ঙ্কর কার এক্সিডেন্ট। গাড়িতে ছিলেন জগজিৎ-চিত্রা সিং'র একমাত্র পুত্র, ১৯ বর্ষীয় বিবেক জগজিৎ সিং। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। পুলিশ রিপোর্ট জানায়, মেরিন ড্রাইভের ঝাঁ চকচকে রাস্তায় প্রবল গতিতে চলছিল সেই গাড়ি। বরাবর গতি পছন্দ করতেন সপ্রতিভ চেহারার, প্রতিভাবান ছেলেটি। মা চিত্রা সিং'র কাছে শিখেছিলেন গানও। কিন্তু পছন্দের ছিল হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটানো। মা চাননি ছেলে ড্রাইভিং শিখুক। কিন্তু বিবেক পছন্দ করতেন গতি। আর সেটাই কাল হয়েছিল তার। সে রাতে তিনি ড্রাইভ করছিলেন, না তার বন্ধু সেটা জানা যায়নি। কিন্তু গাড়িতে ছিলেন তিনি। হঠাৎই সামনে চলে আসে একটি ট্রাক। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাতেই ধাক্কা মারে গাড়িটি। পুলিশ চেষ্টা করেছিল, গুরুতর রূপে আহত বিবেক ও তার এক বন্ধুকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তার আগেই প্রাণ হারান জগজিৎ পুত্র। 

"সূরজ সি এক চিজ তো হমসব দেখ চুকে
সচমুচ কি অব কোই স্যহর দে, ইয়া আল্লাহ..."

*
ছেলের এই অকাল মৃত্যুর খবরে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে যান গজল সম্রাট। সত্যি সত্যি পাথর হয়ে গেছিলেন স্ত্রী চিত্রাও। জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল গান, সুর, লয়, ছন্দ। দীর্ঘদিন বেছে নিয়েছিলেন 'স্বেচ্ছা নির্বাসন'। প্রায় দশমাস পর, আবারও গানে ফেরেন জগজিৎ। স্ত্রী, বিখ্যাত গজল গায়িকা চিত্রা সিং আর কোনদিন ফেরেননি গানের জগতে। ঘরে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী করে ফেলেছিলেন তিনি নিজেকে। তবে ফিরে ছিলেন জগজিৎ সিং। পরের বছর, ১৯৯১ সালে মুক্তি পায় 'সাজদা'। লতা মঙ্গেশকরের সাথে গলা মিলিয়ে উঠে আসে হৃদয়ের অন্তঃস্থল নিকানো ১৪টি গজল। কাতিল সিঁফাইয়ের "দর্দ সে মেরা দামন" গজলটিও ছিল সেখানে। বাকিটা ইতিহাস। 

ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বরাবরই ব্যতিক্রমী ছাপ রেখেছিলেন জগজিৎ ও চিত্রা সিং। গজল সঙ্গীতকে অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন এই দুই শিল্পী। সম্মান খ্যাতি পেয়েছেন যতটা, আঘাত ও শোক পেয়েছেন ঠিক ততটাই। অথচ ভারতীয় লঘু ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অলিন্দে এই প্রথিতযশা দম্পতির উত্থান ও জীবন যাপন রূপকথাকেও হার মানায়। আঘাত বারবার এসেছে তাদের জীবনে। জীবন সায়াহ্ন স্বস্তি দেয়নি সিং দম্পতিকে। একমাত্র পুত্র বিবেক জগজিৎ সিং'র মৃত্যুর পর, ২০০৯ সালে আত্মঘাতী হন চিত্রা সিং'র প্রথম পক্ষের কন্যা মণিকা চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে বৈবাহিক সম্পর্কে জটিলতার জেরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। বিবাহ বিচ্ছিন্না চিত্রাকে যখন বিয়ে করেন জগজিৎ, মণিকার বয়স মাত্র ছয়। মণিকাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন জগজিৎ। মণিকা ও বিবেক দুজনেই ছিলেন তাদের 'পাপা'র চোখের মণি। কিন্তু জীবদ্দশায় দুই সন্তানকেই হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন জগজিৎ। চিত্রা অনেক আগেই সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। শান্তির খোঁজে আধ্যাত্মিক জগতে মনোনিবেশ করে ছিলেন তিনি। জগজিৎ তাতে কখনও বাধা দেননি। অবশেষে মেয়ের মৃত্যুর দুবছরের মাথায় ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর মুম্বইতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গজল সম্রাট জগজিৎ সিং। দু'দিন পরেই লণ্ডনে বিখ্যাত গজল শিল্পী গুলাম আলীর সঙ্গে তার একটি প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল। এই দুঃসংবাদ পেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেন গুলাম আলী। চোখের জলে ভেসে জানিয়েছিলেন - "মেহদি হাসান যখন মারা যান গজলের আত্মাও তার সাথে চলে গিয়েছিল। যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা এবার জগজিৎ নিয়ে গেলেন।" 

"দর্দ সে মেরা দামন ভর দে ইয়া আল্লাহ
ফির চাহে দিওয়ানা কর দে, ইয়া আল্লাহ..." 

*

প্রায় এক দশক হতে চললো বন্ধ হয়ে গেছে হারমোনিয়াম। বান্দ্রা ওয়েস্টের পেরি ক্রস রোডের সেই বাড়ি থেকে আর শোনা যায় না গজলের সুর। শোনা যায় না জলদগম্ভীর কন্ঠের রেওয়াজ। এখন শুধু সেখানে স্মৃতির পাহাড় আঁকড়ে বেঁচে আছেন পঁচাত্তর বর্ষীয়া চিত্রা সিং। বহুদিন হল সঙ্গীতকে তিনি বলে দিয়েছেন 'আলভিদা'। 

শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল ২০১৭ সালে বেনারসে সঙ্কটমোচন সঙ্গীত সমারোহে অংশ নিতে। রাজকীয় সম্বর্ধনা দেয়া হয় তাকে। মন্দিরের কর্মকর্তারা অনেক করে সাধাসাধি করেছিলেন তাকে অন্তত একটা গান শোনানোর জন্য। মাইক হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন চিত্রা সিং। বলেছিলেন - "সব সুর মরে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব। আমাকে ক্ষমা করবেন।" দুদিন কাশীতে ছিলেন চিত্রা। স্বামী, পুত্র, কন্যার স্মৃতিতে দিয়েছিলেন পুজো। একা একা ঘুরে বেড়াতেন এ ঘাট থেকে সে ঘাট। আক্ষেপ করে বলেছিলেন "যদি আজ উনি (জগজিৎ) থাকতেন, এখানেই এই ঘাটেই বসে যেত ম্যহফিল। ঈশ্বরের অদ্ভুত বিচার।" ঠিক যেমনটি বলেছিলেন জগজিৎ তার পুত্রের অন্ত্যেষ্টিতে। বিখ্যাত কবি গীতিকার গুলজার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুত্র বিবেকের শেষ যাত্রায় জগজিৎ সিং'র উদাস মুখে এক চিলতে হাসি দেখে অবাক হয়েছিলেন তিনি। জগজিৎ জানিয়েছিলেন, "সেই রাতে সত্যি সত্যি আমার প্রার্থনা কবুল করেছিলেন ঈশ্বর। দর্দ সে সহী মে উন হো নে ভর দিয়া থা মেরা দামন। কী অদ্ভুত তার বিচার।" 

গুলজার বলেছিলেন, পুত্রশোকে উন্মাদ ভারতের গজল সম্রাটের ঠোঁটে সেই অদ্ভুত এক ফালি হাসি, ভাগ্যের প্রতি তার পরিহাস ও সব হারিয়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করার চিহ্ন। কোন মানুষ শোকে ভেঙে পড়লে বুঝি এমন সর্বহারা হাসি হাসে? গুলজার বলেন - "এর উত্তর তো জগজিৎই তার গানে দিয়ে গেছেন। শাবানা আজমী, স্মিতা পাটিল অভিনীত 'অর্থ' সিনেমার সেই কালজয়ী গানেই লুকিয়ে আছে উত্তর।"

"তুম ইতনা যো মুস্কুরা রহে হো 
কেয়া গম হে জিস কো ছুপা রহে হো..."


* মূল রচনাঃ আহীর ভৈঁরো 

No comments:

Post a Comment