Saturday, May 29, 2021

প্রলয়, তাণ্ডব ও উস্তাদ আমন আলী খান



চারের দশকের শেষার্ধ। দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে। বিহারে এক নেটিভ রাজার আমন্ত্রণে গান গাইতে এসেছেন উস্তাদ আমন আলী খান।

আমন আলী মস্ত বড় গায়ক। বম্বের ভেণ্ডিবাজার ঘরানার প্রবাদপুরুষ উস্তাদ ছজ্জু খাঁ সাহেবের সুপুত্র ও তুখোড় খেয়ালিয়া। একইসাথে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপাল। মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বেজায় শিবভক্ত, রাগ হংসধ্বনিতে বিখ্যাত বন্দিশ 'লাগি লগন সতী পতি সঙ্গ'-র রচয়িতা।

ভেণ্ডিবাজার নাম শুনে মুচকি হাসার কিছু নেই। যদি ভেবে থাকেন, ঢ্যাঁড়স বা ভিণ্ডির নামে ঘরানার এমন আজব নামকরণ, তা হলে ভুল করছেন।

বম্বের নাল বাজার ও ইমামবাড়ার পাশে ক্রফোর্ড মার্কেটের পিছনের অঞ্চল'কে তখন সাহেব-সুবোরা 'বিহাইণ্ড দ্য বাজার' বলে ডাকতেন। 'ভেণ্ডিবাজার' তারই অপভ্রংশ। বম্বের কুখ্যাত লাল বাতি অঞ্চল কামাথিপুরা, এর থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত।

ফিরে আসি আমন আলীর কথায়। পুনে থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পটনা এসেছেন তিনি। অতিথি শালায় বিশ্রাম নিয়ে, সামান্য নাস্তা করে পৌঁছলেন আসরে। বিরাট শামিয়ানার নীচে হচ্ছে অনুষ্ঠান।

যথা সময়ে ডাক এল তাঁর। সামনে বসে বিহারের তাবড় তাবড় রইস ও রসিকজনেরা। শাগির্দ'দের নিয়ে মঞ্চে ওঠেন উস্তাদ। সালাম-সৌজন্য ইত্যাদি শেষ হলে তানপুরা বেঁধে গান শুরু করেন আমন। রাগ শুদ্ধ সারঙ।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি চেপে ধরে তাঁকে। তন্ময় হয়ে গান গাইতে গাইতে হঠাৎই খেয়াল করলেন, একটু দূরে জটলা করে বসে কিছু লোক। হতদরিদ্র, জীর্ণশীর্ণ ও কঙ্কালসার চেহারা। গায়ে নোংরা জামাকাপড়, যা ম্যহফিলের পরিবেশে একেবারেই বেমানান।

কারা এরা? কোত্থেকে এল? এরাও কী তাঁর গান শুনতে এসেছে? বিহারের গরীব-গুর্বোরাও বুঝি গান ভালোবাসে? নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে তাঁর মনে। তিনি দেখছেন, সেই ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। প্রহরীরা তাঁদের শামিয়ানার অনেকটা বাইরে, এককোনায় বসিয়ে রেখেছে৷

অস্বস্তি বাড়তে থাকে উস্তাদের। তিনি বুঝতে পারেন মানুষগুলি তাঁর দিকেই তাকিয়ে। বারবার মনোযোগ ঘুরিয়েও লাভ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, অসংখ্য ক্ষুধার্ত চোখ-গুলি কিছু বলতে চাইছে তাঁকে। দুটি খেয়াল পরিবেশনের পর সামান্য বিরতি নেন আমন আলী।

মঞ্চ থেকে নেমে সরাসরি এগিয়ে আসেন সেই মানুষ গুলোর কাছে। হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ায় সকলে। "কঁউন হ্যায় আপলোগ? কঁহা সে আয়ে হ্যায়? কেয়া চাহিয়ে?" প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আমন আলী খাঁ। ততক্ষণে নেটিভ স্টেটের রাজাও এসে পৌঁছেছেন সেখানে।

দেহাতি মানুষগুলি বলেন, বিহারের গ্রামীণ অঞ্চল, বাঢ়, বক্তিয়ারপুর, ফতওয়া থেকে তারা এসেছেন। সেবার বিহারে নেমে এসেছে সাক্ষাৎ প্রলয়। ভয়াবহ ঝড়বৃষ্টিতে ধ্বংস হয়ে গেছে ঘরবাড়ি৷ ফুঁসে উঠেছে গঙ্গা। গোটা অঞ্চল ডুবে গেছে বন্যার জলে। মারা গেছে, নিখোঁজ হয়েছে বহু মানুষ। সহায়সম্বলহীন হয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজ্যের এ মাথা-ও মাথা। নেটিভ স্টেটের রাজাও তাঁদের এহেন পরিণতি'তে দুঃখপ্রকাশ করেন। বলে ওঠেন, "শিব-জি কী ক্যহর সে কৌঁন বচায়ে?"


গরীব মানুষ-গুলি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভুক্ত তারা। খাবার জোটেনি একরত্তি। এমন সময় খবর পেয়েছেন, কোনও এক বড় গাওয়াইয়া এসেছেন রাজ্যে। গান-বাজনা হবে, সাথে হবে নরনারায়ণ সেবা। তাই একটু খিচুড়ির জন্য তারা এসে ভিড় করেছেন অনুষ্ঠানের বাইরে। অপেক্ষা করছেন গান শেষ হওয়ার। শেষ হলে খিচুড়ি পাবে তারা। লোটা, বর্তনে নিয়ে যাবে পরিবারের জন্য। হাতজোড় করে তারা আর্জি রাখেন, অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটাতে তারা চাননি। তবু অজান্তে 'তকলিফ' দিয়ে থাকলে তারা ক্ষমাপ্রার্থী।

কথা শেষ হতে দেখেন, চোখে একসমুদ্র জল নিয়ে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আমন আলী। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। আবেগতাড়িত কণ্ঠে উস্তাদজি রাজামশাই-কে বলেন, তাঁর পারিশ্রমিকের টাকা'টি যেন এই গরীব অসহায় মানুষগুলিকে দেওয়া হয়। সেই টাকায় এদের যেন এদের কল্যাণ হয়। হতদরিদ্র মানুষগুলি বিস্ময়ে, কৃতজ্ঞতায়, আবেগে বাকরুদ্ধ। দু পক্ষই করজোড়ে, নতমস্তকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। নিঃশব্দে, সময় বয়ে যায়।

একসময়, তাঁদেরই অনুরোধে আবারও মঞ্চে ফেরেন আমন আলী। অনুষ্ঠান 'অধুরা' রাখতে নেই যে। তাই এবার আসরের শেষ গান ধরেন রাগ শঙ্করায়। "জয় শিবশঙ্কর, জয় গঙ্গাধর"।

দু'দিন পর বন্যার জল নেমে যায়। শান্ত হয় প্রকৃতি।

No comments:

Post a Comment